কাশ্মীরে দখলদার ভারতের সামরিক তৎপরতার আড়ালে সাধারণ মানুষের ওপর যে অবর্ণনীয় নির্যাতনের ইতিহাস, তা নতুন কিছু নয়। দশকের পর দশক ধরে চলা জোরপূর্বক গুম, নিখোঁজ স্বামীর অপেক্ষায় থাকা ‘অর্ধ-বিধবার’ করুণ আর্তি, ছররা গুলিতে শিশুদের চিরতরে দৃষ্টি হারানো কিংবা নামহীন গণকবরের মতো লোমহর্ষক সব ঘটনা বিশ্বজুড়ে বারবার ধিক্কৃত হয়েছে।
তবে এই দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আড়ালে এখন এক নতুন ও গভীর সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে, যা ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা সুকৌশলে আড়াল করতে চাইছেন। এই সংকটটি হলো, খোদ দখলদার বাহিনীর সদস্যদের চরম মানসিক বিপর্যয়। উপত্যকাজুড়ে দমন-পীড়ন আর সার্বক্ষণিক যুদ্ধের উন্মাদনা কেবল কাশ্মীরিদের নয়, বরং সেখানে দায়িত্বরত সেনাদেরও এক ভয়াবহ মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর থেকে বুঝা যায়, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার খেসারত শেষ পর্যন্ত সব পক্ষকেই দিতে হচ্ছে।
গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬, জম্মুর নাগরোটা সামরিক ক্যাম্পে এক ভারতীয় সেনার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ডগ ইউনিটে কর্মরত সেই সেনার এই করুণ মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সুগভীর এবং সুপরিকল্পিতভাবে চেপে রাখা সংকটেরই অংশ। পরিসংখ্যানে তাকালে এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে ৭৮৭টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে ৫৯১ জন, বিমান বাহিনীতে ১৬০ জন এবং নৌবাহিনীতে ৩৬ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।
‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ইন্ডিয়ান সাইকোলজি’ (২০২৫)-এর তথ্যমতে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৮৯১ জন সামরিক কর্মী আত্মহত্যা করেছেন, এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যই ছিলেন ৭০৭ জন।
‘সাউথ এশিয়া টাইমস’ (২০২৪)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেস (CAPF) এ আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৫৩২-এ।
বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে দায়িত্বরত অন্তত ৬১২ জন ভারতীয় সেনা ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, রণক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহতের চেয়েও বর্তমানে আত্মহত্যার হার বেশি। গড়ে প্রতি তিন দিনে একজন সেনা সদস্য আত্মহত্যা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রতিকূল পরিবেশ, পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং বেসামরিক জনগণের ওপর দমনপীড়ন চালানোর ফলে তৈরি হওয়া তীব্র মানসিক চাপ ও অনুশোচনা থেকেই এই আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়ছে। ভারতের কাশ্মীর নীতির এক শক্তিশালী এবং অভ্যন্তরীণ নেতিবাচক প্রতিফল হিসেবেই দেখা হচ্ছে সেনাদের এই রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যুকে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে মূলত বিজেপি সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নরেন্দ্র মোদীর শাসনামলে জম্মু ও কাশ্মীরকে একটি রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখার পরিবর্তে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণের একটি ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের আগস্টে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে এই অঞ্চলের যতটুকু স্বায়ত্তশাসন ছিল তাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এতে কাশ্মীরিদের ক্ষোভ যেমন বেড়েছে, তেমনি আগে থেকেই পরিশ্রান্ত সৈন্যদের ওপর চেপেছে এক অসহনীয় বাড়তি বোঝা।
২০২২ সালে প্রবর্তিত ‘অগ্নিপথ’ স্কিম এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মাত্র চার বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং পেনশনহীন এই ব্যবস্থা তরুণ সৈন্যদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, ‘মোদী কি সেনা’ এখন আর কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটিই রূঢ় বাস্তবতা। যুদ্ধক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে এখন ‘হিন্দুত্ববাদী’ আদর্শের প্রতি আনুগত্যই পদোন্নতির মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।
পদোন্নতিতে বৈষম্য ও জাতপাতের প্রভাব
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ভেতরে এই অবক্ষয় আরও গভীরে প্রোথিত। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে মুসলিম কর্মকর্তাদের জন্য পদোন্নতির পথে এক অদৃশ্য দেয়াল (গ্লাস সিলিং) তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মেধার চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে উঠছে। ভারতের অন্যতম অভিজাত ইউনিট ‘প্রেসিডেন্ট’স বডিগার্ড’-এর বিরুদ্ধে রাজপুত, হিন্দু জাট এবং শিখ জাটদের মতো নির্দিষ্ট কিছু বর্ণ ও গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই ধরণের জাতিভেদ ও বৈষম্য সৈন্যদের নৈতিক মনোবল এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নিঃশেষ করে দিচ্ছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজগুলো করতে হয় যেসব নিম্নপদস্থ সেনাসদস্যদের (NCOs), তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তুলনায় অনেক বেশি। দরিদ্র গ্রাম থেকে আসা, রাজনৈতিক প্রভাবহীন এই তরুণদের কার্যত কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই অনিশ্চিত সময়ের জন্য কাশ্মীরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং এক পর্যায়ে তাদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
সত্য গোপন ও পলায়নপর মনোবৃত্তি
ভারত প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনাকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলে ভিন্ন কথা। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সিভিল আর্মড ফোর্সের প্রায় ৪৭,০০০ সদস্য স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছেন অথবা সময়ের আগে অবসরে গিয়েছেন। ৪৭,০০০ সৈন্যের এমন সিদ্ধান্তকে কখনোই ব্যক্তিগত কারণ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। এমনকি ভারতের নিজস্ব বিচারব্যবস্থাও এখন সত্য বলতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট স্বীকার করেছে যে, টানা পোস্টিং, পরিবার থেকে বিচ্ছেদ এবং বিন্দুমাত্র ভুল সহ্য না করার (zero-error) কর্মসংস্কৃতি সৈন্যদের ওপর জীবনঘাতী মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। নয়াদিল্লি যা স্বীকার করতে অস্বীকার করছে, ভারতের আদালত এখন সেই স্বীকারোক্তি দিচ্ছে।
এক ব্যর্থ নীতির করুণ পরিণতি
যে সেনাবাহিনী নিরস্ত্র কাশ্মীরি বিক্ষোভকারীদের ওপর পেলেট গান চালায়, হাজার হাজার তরুণকে টর্চার সেলে গুম করে দেয় এবং ‘আফস্পা’র (AFSPA) মতো আইনে দায়মুক্তি নিয়ে কাজ করে, সেই সেনাবাহিনীই এখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। সাত দশকের এই দখলদারিত্বের জন্য কাশ্মীরি জনগণ যেমন অসহনীয় মূল্য দিচ্ছে, তেমনি সেই দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে আসা সৈন্যরাও আজ নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য আর জীবন দিয়ে চরম মূল্য দিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, উভয় পক্ষই আজ একই ব্যর্থ নীতির শিকার। ভারতীয় সেনাদের আত্মহত্যার এই ক্রমবর্ধমান হার আসলে দীর্ঘ আট দশকের সংঘাত, বিজেপির বলপ্রয়োগের রাজনীতি, ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পের মাধ্যমে অস্থায়ী সৈন্য তৈরির প্রচেষ্টা এবং বাহিনীর ভেতরের জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্যেরই প্রতিফলন। মোদি সরকারের রাজনৈতিক সমাধানের বদলে সামরিক আধিপত্যকে বেছে নেওয়ার ফল এখন হাতেনাতে পাওয়া যাচ্ছে। কাশ্মীরের মানুষের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও দীর্ঘশ্বাস আজ দখলদারদেরও একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্র: কে এম এস










