সূত্রের দাবি নাকি বাস্তবতা?

আহমাদিনেজাদের বিরুদ্ধে ‘ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের’ অভিযোগ কতটা নির্ভরযোগ্য

image_101792_1720232367

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) গ্রেপ্তার বা গৃহবন্দী করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই খবরটি সাম্প্রতিক সময়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে বিশ্বজুড়ে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’ মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর দাবিটি সামনে আনে। তবে তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সংবেদনশীল খবরটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। এটি কি কোনো প্রতিষ্ঠিত সত্য, নাকি চলমান ইরান-ইসরায়েল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা ইনফরমেশন ওয়ার ফেয়ারের অংশ—তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।

​দাবি ও মূল প্রতিবেদনের ব্যবচ্ছেদ

দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ দীর্ঘ সময় ধরে কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছিল। এমনকি তাঁকে ভবিষ্যতে ইরানের নেতৃত্বে পুনর্বাসনের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও ছিল ইসরায়েলের। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গোপন যোগাযোগের বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পরই আইআরজিসি গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে গৃহবন্দী করে তদন্ত শুরু করেছে।

​তবে এই প্রতিবেদনের ভাষা ও উপস্থাপন শৈলী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সাংবাদিকতার মৌলিক কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুরো প্রতিবেদনে কোনো প্রকাশ্য সরকারি নথি বা আদালতের দলিলের উল্লেখ নেই। তার চেয়ে বড় কথা, এতে বারবার ‘কর্মকর্তারা জানিয়েছেন’ (officials said), ‘সূত্র অনুযায়ী’ (according to sources), কিংবা ‘খবর পাওয়া গেছে’ (reportedly)—এ ধরনের পরোক্ষ ও অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, খবরের পুরো ভিত্তিটিই দাঁড়িয়ে আছে কিছু অজ্ঞাতনামা সূত্রের ওপর, যার কোনো বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়।

​ইরান ও আইআরজিসির রহস্যজনক নীরবতা

এই ধরনের একটি স্পর্শকাতর ও হাই-প্রোফাইল বিষয়ে এখন পর্যন্ত তেহরানের প্রতিক্রিয়া রহস্যজনক। সাধারণত ইরানের শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতার বিরুদ্ধে বা মোসাদের মতো বৈরী গোয়েন্দা সংস্থার অনুপ্রবেশ নিয়ে এমন গুরুতর খবর ছড়ালে আইআরজিসি বা ইরান সরকার দ্রুততার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান বা স্বীকার করে বিবৃতি দেয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে—

​• আইআরজিসি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগের কথা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।

​• ইরান সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা মুখপাত্র থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি।

​• স্বয়ং আহমাদিনেজাদ কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ থেকেও কোনো স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

​এই প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা ইঙ্গিত করে যে, বিষয়টি এখনো হয়তো স্রেফ জল্পনা-কল্পনার পর্যায়ে রয়েছে, অথবা ইরান এই প্রোপাগান্ডাকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব দিতে চাচ্ছে না।

​তথ্যযুদ্ধ নাকি মনস্তাত্ত্বিক চাল?

চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিবেদনের সময়কাল (Timing) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই কেবল সীমান্তে নয়, সাইবার জগত ও গণমাধ্যমেও একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ চালিয়ে যাচ্ছে।

​এই কৌশলগত তথ্যযুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের ভেতরে অবিশ্বাস ও ফাটল তৈরি করা। মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মতো একজন কট্টর পশ্চিমা-বিরোধী ও ইসরায়েল-বিরোধী হিসেবে পরিচিত সাবেক শীর্ষ নেতাকে যদি ‘মোসাদের সহযোগী’ হিসেবে চিত্রায়িত করা যায়, তবে তা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো এবং সাধারণ জনগণের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। একই সাথে এটি ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলে একে অপরের প্রতি চরম সন্দেহ তৈরি করতে পারে। অতীত ইতিহাস বলে, সংকটকালে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক ফায়দা লুটতে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে ‘তথ্য ফাঁস’-এর নাটক সাজিয়ে থাকে।

​বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মূল নীতি অনুযায়ী, যেকোনো সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক খবরের সত্যতা নিশ্চিত হতে অন্তত দুটি স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যেহেতু খবরের উৎস কেবলই কিছু অজ্ঞাতনামা কর্মকর্তা এবং এর বিপরীতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সত্যতা বা দলিল নেই, তাই একে চূড়ান্ত সত্য বা প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই।

সার্বিক তথ্য ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের এই অভিযোগটি এখন পর্যন্ত মূলত অজ্ঞাতনামা সূত্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডা বা দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইরানের কোনো দায়িত্বশীল সরকারি প্রতিষ্ঠান বা আইআরজিসি আনুষ্ঠানিকভাবে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। ফলে একে সত্য বলে ধরে নেওয়ার চেয়ে, চলমান ইরান-ইসরায়েল মনস্তাত্ত্বিক তথ্যযুদ্ধের একটি কৌশলগত চাল হিসেবে দেখার সম্ভাবনাই বেশি জোরালো।