সম্পাদকের কলাম

উপমহাদেশের মুসলিম প্রশ্নে তালেবানের ‘ভারতঘনিষ্ঠ কূটনীতি’ কেন প্রশ্নবিদ্ধ 

এমন এক বাস্তবতায় তালেবানের এই নীরব বা বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনীতিকে অনেকে নিছক ‘প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক’ হিসেবে দেখতে নারাজ।
আফগানিস্তান

কয়েক বছর আগেও এমন একটি বক্তব্য কল্পনা করাও কঠিন ছিল। যে তালেবানকে একসময় ভারতের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হতো, সেই সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখে এমন ভাষা শুধু একটি কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শরও বটে। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি কেবল আফগানিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম রাজনীতির ওপরও পড়তে যাচ্ছে?

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান যখন দ্বিতীয়বারের মতো কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা দ্রুত প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। অনেকের বিশ্বাস ছিল, আফগানিস্তান পুরোপুরি পাকিস্তানের কৌশলগত প্রভাববলয়ে চলে যাবে এবং কাবুলে ভারতের দুই দশকের বিনিয়োগ, কূটনৈতিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব কার্যত বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বাস্তবতা সেই ধারণার ঠিক উল্টোপথে হাঁটছে। 

কাবুল ও নয়াদিল্লির মধ্যে এখন নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ হচ্ছে। মানবিক সহায়তা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, অবকাঠামো, আঞ্চলিক সংযোগ ও নিরাপত্তা—বিভিন্ন ইস্যুতে দুই পক্ষ আলোচনা করছে। তালেবান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রকাশ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করছে। অন্যদিকে ভারতও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়েই তালেবানের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলছে। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন।

কিন্তু এই পরিবর্তনের গুরুত্ব শুধু ভারত বা আফগানিস্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে—রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানোর পর একটি ইসলামপন্থী আন্দোলনের পররাষ্ট্রনীতি কতটা আদর্শনির্ভর থাকে, আর কতটা রাষ্ট্রস্বার্থনির্ভর হয়ে ওঠে?

এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তালেবানকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের বড় অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আদর্শিক প্রত্যাশা ছিল। অনেকের কাছে তালেবান কেবল আফগানিস্তানের একটি সরকার নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক প্রতিরোধের সফল এক প্রতিচ্ছবি। ফলে ভারতের সঙ্গে তাদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রের অনিবার্য বাস্তববাদী কূটনীতি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন, এর ফলে উপমহাদেশের মুসলিমদের রাজনৈতিক সংহতি ও প্রত্যাশার ধারণা দুর্বল হচ্ছে।

এমন এক বাস্তবতায় তালেবানের এই নীরব বা বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনীতিকে অনেকে নিছক ‘প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক’ হিসেবে দেখতে নারাজ।

এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য, কোনো পক্ষকে সমর্থন বা সমালোচনা করা নয়। বরং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, গবেষণা এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা—তালেবানের ভারতঘনিষ্ঠ কূটনীতি কি কেবল আফগানিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম রাজনীতির ওপরও সমানভাবে পড়ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আবেগের চেয়ে তথ্য, স্লোগানের চেয়ে কূটনীতি এবং ধারণার চেয়ে বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলে, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রায়ই আদর্শের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলেও, তার ভিতরে কাজ করে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের কঠিন হিসাব-নিকাশ। তালেবানের বর্তমান কূটনীতি সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

বদলে যাওয়া তালেবান : গেরিলা থেকে রাষ্ট্র

তালেবানের বর্তমান কূটনীতি বোঝার ক্ষেত্রে  যদি ২০২৫ বা ২০২৬ সালের তালেবানকে ১৯৯৬ সালের তালেবানের মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তাহলে বড় ভুল হবে। একই নাম, একই নেতৃত্বের একটি অংশ এবং একই আদর্শিক শিকড় থাকা সত্ত্বেও দুই সময়ের তালেবানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বোঝাপড়া এক নয়।

প্রথম দফায় ক্ষমতায় আসার সময় তালেবান ছিল মূলত একটি বিজয়ী সশস্ত্র গেরিলা আন্দোলন। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা এবং নিজেদের আদর্শিক শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়ন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বৈশ্বিক বাণিজ্য কিংবা অর্থনৈতিক কূটনীতি তখন তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল না। ফলে তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয় মাত্র তিনটি দেশ। বাকি বিশ্বের কাছে তারা ছিল কার্যত বিচ্ছিন্ন।

কিন্তু ২০২১ সালের পর যে আফগানিস্তান তালেবানের হাতে আসে, সেটি ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই দশকের যুদ্ধ শেষে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থবির, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেছে, বেকারত্ব ও মানবিক সংকট তীব্র। এমন একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করা কোনো সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনার মতো নয়। 

ক্ষমতায় ফেরার পর তালেবানের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ‘জিহাদ’ বা ‘বিপ্লব’ শব্দের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চারিত হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা’, ‘বিনিয়োগ’, ‘আঞ্চলিক সংযোগ’, ‘বাণিজ্য’ এবং ‘ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি’। এগুলো কেবলমাত্র  শাব্দিক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারেরও পরিবর্তন।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। নব্বইয়ের দশকে ভারত ছিল তালেবানের অন্যতম কট্টর বিরোধী। ২০০১ সালের পর ভারত আফগানিস্তানে যে সরকারগুলোকে সমর্থন করেছে, তালেবান তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। সেই ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, আজকের ভারত–তালেবান সংলাপ প্রথম দৃষ্টিতে অসম্ভব বিস্ময়কর মনে হতে পারে।

কিন্তু তালেবানের দৃষ্টিতে বিষয়টি ইতিহাসের নয়, বর্তমানের।

তাদের সামনে এখন যে প্রশ্ন, তা হলো—কোন দেশ আফগানিস্তানে বিনিয়োগ করতে পারে? কার মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব? কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে সহায়ক হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই ভারত তাদের কূটনৈতিক হিসাবের অংশ হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। ২০২১ সালে ইসলামাবাদে অনেকেই মনে করেছিলেন, তালেবান সরকার পাকিস্তানের কৌশলগত গভীরতাকে আরও শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবে সীমান্ত সংঘর্ষ, টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) ইস্যু এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। ফলে তালেবান বুঝতে পারে, শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভর করে তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

এই প্রেক্ষাপটে তারা ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি গ্রহণ করে। চীন, রাশিয়া, ইরান, কাতার, তুরস্ক, মধ্য এশিয়ার দেশ এবং ভারতের সঙ্গে সমান্তরাল যোগাযোগ সেই নীতিরই অংশ। অর্থাৎ, ভারতের দিকে ঝোঁকা কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বৃহত্তর কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের একটি উপাদান।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। তালেবান কি তাদের আদর্শ পরিবর্তন করেছে, নাকি কেবল কৌশল পরিবর্তন করেছে?

এখন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অন্তত এটুকু ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের মৌলিক আদর্শিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা থাকলেও, পররাষ্ট্রনীতিতে তারা স্পষ্টভাবে বাস্তববাদী হয়েছে। অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের টিকে থাকাকে তারা এমনভাবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা ১৯৯৬ সালের তালেবানের আচরণ থেকে স্পষ্টতই আলাদা।

এই পরিবর্তনই ভারত–তালেবান সম্পর্ককে সম্ভব করেছে। তবে এই সম্পর্কের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে এখন ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখা জরুরি। কারণ সম্পর্ক কখনোই একপাক্ষিক হয় না; যেমন তালেবানের ভারতের প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি ভারতেরও তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের নিজস্ব কৌশলগত কারণ রয়েছে।

ভারতের তালেবান-নীতি মূলত কৌশলের পুনর্বিন্যাস

ভারতের তালেবান-নীতিকে অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কেউ মনে করেন, নয়াদিল্লি আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তন করেছে। আবার কেউ বলেন, এটি পাকিস্তানবিরোধী একটি তাৎক্ষণিক কৌশল। কিন্তু গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের পদক্ষেপগুলো বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—ভারত এখনও তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। অর্থাৎ, কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলেও রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রশ্নে নয়াদিল্লির অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। 

ভারতের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা নিরাপত্তা। আফগানিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দিল্লির আশঙ্কা, যদি কাবুলের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে আফগান ভূখণ্ড আবারও ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য নিরাপদ পরিবেশে পরিণত হতে পারে। তাই তালেবানের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে তারা অন্তত একটি কার্যকর যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে চায়।

দ্বিতীয় বিবেচনা আঞ্চলিক প্রভাব। দুই দশক ধরে ভারত আফগানিস্তানে সড়ক, বাঁধ, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং আফগান পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ২০২১ সালের পর যদি ভারত সম্পূর্ণভাবে আফগানিস্তান থেকে সরে দাঁড়াত, তাহলে সেই বিনিয়োগের পাশাপাশি তাদের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক উপস্থিতিও কার্যত বিলীন হয়ে যেত। তাই নয়াদিল্লি এমন একটি নীতি গ্রহণ করেছে, যেখানে সম্পর্কও থাকবে, আবার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে চাপও বজায় থাকবে।

তৃতীয় কারণ পাকিস্তান। দীর্ঘদিন ধরে ইসলামাবাদ আফগানিস্তানকে তার কৌশলগত বলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতি এগোয়নি। সীমান্ত সংঘর্ষ, টিটিপি ইস্যু এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দুই দেশের সম্পর্কে নতুন সংকট তৈরি করেছে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এই পরিবর্তনকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। তবে এই সুযোগের অর্থ পাকিস্তানবিরোধী কোনো জোট গঠন নয়; বরং আফগানিস্তানে ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যদিও বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ ভারতের সাথে তালেবানের ক্রমবর্ধমান এই সম্পর্ককে পাকিস্তানকে চাপে ফেলার কূটনীতি বলার চেষ্টা করছেন। 

ভারতের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ। পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারায় বহু বছর ধরেই ভারত ইরানের চাবাহার বন্দর এবং আফগানিস্তানকে একটি বিকল্প করিডর হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তাই আফগানিস্তানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে চীনের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং আফগানিস্তানে খনিজ সম্পদ, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। রাশিয়াও তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যদি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকত, তাহলে কাবুলে অন্য শক্তিগুলোর প্রভাব আরও দ্রুত বাড়ত। ফলে ভারতের জন্য আফগানিস্তানের সাথে সম্পৃক্ত থাকা কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজনেও পরিণত হয়েছে।

সব মিলিয়ে ভারতের নীতিকে একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করা যায়—‘প্রভাব ধরে রাখতে হলে উপস্থিত থাকতে হবে।’ সেই উপস্থিতির মাধ্যমই হলো, সীমিত কিন্তু ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আসে। ভারতের এই বাস্তববাদী কৌশলের সঙ্গে তালেবানের বাস্তববাদী কূটনীতি মিলিত হওয়ার ফলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোথায় দেখা গেছে?

উত্তরটি খুঁজতে হলে আমাদের কাশ্মীর প্রশ্নে তালেবানের অবস্থান, ভারতের মুসলমানদের ইস্যুগুলোতে তাদের নীরবতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম রাজনৈতিক প্রত্যাশার দিকে তাকাতে হবে। কারণ সেখানেই এই সম্পর্ক ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয়েছে।

কাশ্মীর প্রশ্নে তালেবানের নীরবতার রাজনৈতিক অর্থ

ভারত–তালেবান সম্পর্ককে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কাশ্মীর প্রশ্ন। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার বহু মুসলমানের কাছে তালেবান শুধু আফগানিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নয়, বরং একটি ইসলামপন্থী আন্দোলন, যার কাছ থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠী-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশা করা হয়। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব কূটনীতির দূরত্বই এই বিতর্কের মূল উৎস।

তবে বিষয়টি বোঝার জন্য ২০২১ সাল থেকে শুরু করলে ভুল হবে। এর সূত্র আরও আগে।

২০১৯ সালে ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করলে পাকিস্তানের একটি অংশ আশা করেছিল, তালেবান এ ঘটনাকে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ করবে। কিন্তু তালেবান সে পথে হাঁটেনি। তারা জানায়, আফগানিস্তানের প্রশ্ন ও কাশ্মীর প্রশ্নকে এক করে দেখা উচিত নয় এবং ভারত–পাকিস্তানের উচিত শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত যে, তালেবান কাশ্মীরকে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগ্রামের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখতে আগ্রহী নয়।

২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পরও সেই প্রবণতার বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তালেবান নেতৃত্ব একদিকে মুসলমানদের মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন। এই দুই বক্তব্য একই সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, তারা প্রকাশ্যে এমন কোনো অবস্থান নেয়নি, যা নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।

এরপর ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়ে ভারত–তালেবান বৈঠকগুলোর যৌথ বার্তা এবং আনুষ্ঠানিক বিবৃতিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল— অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক সংযোগ, নিরাপত্তা।

অন্যদিকে কাশ্মীর প্রশ্ন কার্যত অনুপস্থিত ছিল। শুধু কাশ্মীর নয়, ভারতের মুসলমানদের ঘিরে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বিভিন্ন ইস্যুতেও তালেবানের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সংযত। নাগরিকত্ব আইন (CAA), এনআরসি, ধারাবাহিক মুসলিম নির্যাতন কিংবা অন্যান্য বিতর্কিত ঘটনায় তারা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্য কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এটি সচেতন নীরবতা ছিল, নাকি কেবল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির অংশ—সেই প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর তালেবান দেয়নি। তবে ঘটনাপ্রবাহ থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে, তারা এসব বিষয়কে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রধান আলোচ্য করতে চায়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার বহু মুসলমানের কাছে কাশ্মীর কেবল একটি সীমান্ত-সংঘাত নয়; এটি একটি আবেগ, একটি রাজনৈতিক পরিচয় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। ফলে যে আন্দোলনকে একসময় মুসলিম প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই আন্দোলন যখন কাশ্মীরকে তার কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের বাইরে রাখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়।

এই কারণে তালেবানের ভারতঘনিষ্ঠ কূটনীতির সবচেয়ে বড় অভিঘাত হয়তো কোনো তাৎক্ষণিক নীতিগত পরিবর্তনে নয়; বরং একটি ধারণার পরিবর্তনে। দীর্ঘদিন ধরে যে বিশ্বাস ছিল, ইসলামপন্থী আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও মুসলিম বিশ্বের প্রতীকী রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোকে সর্বাগ্রে রাখবে—তালেবানের বর্তমান আচরণ সেই ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রস্বার্থের বিজয় নাকি মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রত্যাশার সংকট

এ পর্যন্ত আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—ভারত ও তালেবান, উভয়েই নিজেদের সম্পর্ককে আদর্শিক নয়; বরং কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করছে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—এই বাস্তববাদী কূটনীতির প্রভাব উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য কেমন হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অন্য দেশের জনগোষ্ঠীর আবেগ বা স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয় না; বরং তা নির্ধারিত হয় নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সমীকরণে। তালেবানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। আফগানিস্তানের বিধ্বস্ত অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রয়োজনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের জন্য একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা।

রাষ্ট্রের বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত এবং জনগণের আদর্শিক প্রত্যাশার এই যে সংঘাত, তা কেবল তালেবান বা ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যখন রাষ্ট্রস্বার্থের নামে এই সম্পর্ককে বিতর্কহীন বা সম্পূর্ণ ইতিবাচক হিসেবে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়, তখন তা উপমহাদেশের মুসলিমদের রাজনৈতিক লড়াই ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলে।

তবে এই কূটনীতি সাধারণ কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মনে হলেও, তালেবানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং বিশ্বজুড়ে একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। স্বাভাবিকভাবেই, সাধারণ রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় তাদের কাছে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক সংহতি ও আদর্শিক অবস্থানের প্রত্যাশা অনেক বেশি। যারা কাশ্মীর ইস্যু কিংবা ভারতে মুসলিমদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতন, নাগরিকত্ব আইন (CAA) ও সংখ্যালঘু সংকটের মতো বিষয়গুলোতে তালেবানের বলিষ্ঠ ভূমিকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাদের কাছে এই ভারতঘনিষ্ঠতাকে এক ধরনের ‘প্রতীকী পশ্চাদপসরণ’ বলেই মনে হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে ভারত কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়। কাশ্মীরের দীর্ঘস্থায়ী সংকট, ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মেরুকরণ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সন্ত্রাসী আরাকান আর্মিকে অস্ত্র সহায়তা এ অঞ্চলের মুসলিমদের মনে গভীর ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি ও পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। এমন এক বাস্তবতায় তালেবানের এই নীরব বা বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনীতিকে অনেকে নিছক ‘প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক’ হিসেবে দেখতে নারাজ। তাদের মতে, সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আর সেই সম্পর্ককে এমনভাবে উপস্থাপন করা যে, মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক উদ্বেগ বা ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে—এই দুয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু বিশাল পার্থক্য রয়েছে।

রাষ্ট্রের বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত এবং জনগণের আদর্শিক প্রত্যাশার এই যে সংঘাত, তা কেবল তালেবান বা ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যখন রাষ্ট্রস্বার্থের নামে এই সম্পর্ককে বিতর্কহীন বা সম্পূর্ণ ইতিবাচক হিসেবে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়, তখন তা উপমহাদেশের মুসলিমদের রাজনৈতিক লড়াই ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলে। তারা যে আদর্শিক সাহসের প্রতীক হিসেবে তালেবানের দিকে তাকিয়ে ছিল, সেই জায়গাটিতেই এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

পরিশেষে, তালেবানের ভারতঘনিষ্ঠতাকে শুধু আফগানিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থের চশমায় দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একদিকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে উপমহাদেশের মুসলিমদের রাজনৈতিক উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা—এই দুই বিপরীতমুখী বাস্তবতার টানাপোড়েনই আগামী দিনের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেবে। তালেবান কি শেষ পর্যন্ত নিজের আদর্শিক সত্তা ধরে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে, নাকি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে বিসর্জন দেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের রাজনীতির ভবিষ্যৎ।

মতামত লেখকের নিজস্ব

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন