সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা

আফগানিস্তানের ব্যাংকিং খাতে যে মিরাকল ঘটে গেলো 

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি আর নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মাঝেও যেভাবে ইসলামিক আমিরাত এই ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলেছে, তা দেখে পুরো বিশ্ব আজ বিস্মিত।
আফগানিস্তান
A- A+

যেখানে সুইজারল্যান্ড কিংবা লেবাননের মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্যাংকিং হাবগুলো সামান্য অর্থনৈতিক ধাক্কায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, সেখানে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আর যুদ্ধবিদ্ধস্ত অর্থনীতি নিয়ে এক অবিশ্বাস্য রূপকথা লিখল আফগানিস্তান। বিশ্ব অর্থনীতিকে তাক লাগিয়ে দেশটির ব্যাংকিং খাত এখন কেবল স্থিতিশীলই নয়, বরং আমূল বদলে যাওয়া এক নতুন মডেলের নাম।

সম্প্রতি আফগানিস্তানের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘আজীজি ব্যাংক’-এর মহাপরিচালক মিরওয়াইস আজীজির একটি বিস্ফোরক মন্তব্য বৈশ্বিক অর্থিনীতিবিদদের নজর কেড়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন– ‘বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি আর নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মাঝেও যেভাবে ইসলামিক আমিরাত এই ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলেছে, তা দেখে পুরো বিশ্ব আজ বিস্মিত।’

বৈরুত বনাম কাবুল: দুই মেরুর গল্প

নিজের বক্তব্যের সপক্ষে মিরওয়াইস আজীজি টেনে এনেছেন লেবাননের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ। একসময় যাকে বলা হতো ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস’ কিংবা আরবের ব্যাংকিং রাজধানী, সেই লেবানন মাত্র কয়েক বছরের অব্যবস্থাপনায় আজ দেউলিয়া। ব্যাংকে নিজের জমানো টাকা তুলতে পারছে না সাধারণ মানুষ।

অথচ তার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে কাবুল। দীর্ঘ চার দশকের যুদ্ধ, বৈদেশিক রিজার্ভ ফ্রিজ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাহাড় মাথায় নিয়েও আফগানিস্তান ব্যাংকিং খাতকে কেবল ধসের হাত থেকেই বাঁচায়নি, বরং করে তুলেছে ঈর্ষণীয় রকম শক্তিশালী।

সুদকে বিদায়, সংকটকে জয়

গত পাঁচ বছরে আফগান আর্থিক খাতে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, তার সবচেয়ে বড় মাইলফলক হলো, সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার পুরোপুরি বিলুপ্তি।

পুরো দেশ এখন শতভাগ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রূপান্তর হয়েছে। শুরুর দিকে পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা একে ‘আত্মঘাতী’ পদক্ষেপ মনে করলেও, বাস্তবে তা অভ্যন্তরীণ বাজারে তারল্য সংকট কাটাতে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে দারুণভাবে কাজ করেছে।

নেপথ্যের ম্যাজিক: কীভাবে সম্ভব হলো?

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কাবুলের এই অভাবনীয় আর্থিক স্থায়িত্ব কিন্তু হুট করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে তিনটি পরিকল্পনা—-

প্রথমত, সুপরিকল্পিত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে এশিয়ায় অন্যতম সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতির হার ধরে রাখতে পেরেছে আফগানিস্তান, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক রেখেছে। 

দ্বিতীয়ত, চরম বৈশ্বিক চাপ সত্ত্বেও তাদের চমৎকার কারেন্সি স্ট্যাবিলিটি বা মুদ্রা স্থিতিশীলতার নীতি ডলারের বিপরীতে আফগান মুদ্রা ‘আফগানি’র মানকে শক্ত অবস্থানে ধরে রেখেছে। 

তৃতীয়ত, পুরো ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে তাদের কঠোর আর্থিক সুশাসন। যেখানে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কালোবাজারি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় পুরো আর্থিক খাতে এক ধরনের কাঠামোগত শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। মূলত এই ত্রিমুখী কৌশলের জোরেই সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে টিকে আছে আফগান অর্থনীতি।

মিরওয়াইস আজীজির এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে, ব্যাংকিং খাতের সাফল্য কেবল পশ্চিমা ফর্মুলা বা বিদেশি খয়রাতির ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে সৎ নীতি ও কঠোর প্রশাসনিক সদিচ্ছার ওপর। গ্লোবাল ব্যাংকিং যখন ক্রান্তিকাল পার করছে, তখন কাবুলের এই ‘সারপ্রাইজ রাইজ’ নিশ্চিতভাবেই আগামী দিনের অর্থনীতিবিদদের গবেষণার খোরাক জোগাবে।

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন