সম্প্রতি কাবুলে সরকারি দপ্তরগুলোর নামফলক বদলানো নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। বিগত সপ্তাহগুলোতে আফগানিস্তানের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে الوطني ‘ওয়াতানি’—অর্থাৎ ‘জাতীয়’ শব্দটি। তার জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে, العام ‘আম’ ও العامة ‘আম্মাহ’-এর মতো শব্দ, যার অর্থ ‘সাধারণ’ বা ‘পাবলিক’।
প্রথম নজরে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক বা ভাষাগত পরিবর্তন মনে হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের ইঙ্গিত। তাদের মতে, ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতা ফিরে পাবার পর দেশটির রাষ্ট্রীয় ভাষা, প্রশাসনিক পরিচয় ও শাসনধারাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এটি তারই অংশ। পরিবর্তনের ছাপ এখন স্পষ্ট সরকারি চিঠিপত্র, দাপ্তরিক নথি, সরকারি ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টগুলোতে। এমনকি বিভিন্ন দপ্তরের স্লোগান ও পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ডেও নতুন শব্দচয়ন দেখা যাচ্ছে।
আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও একাডেমিক মহলে এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বইছে। অনেকের মতে, শব্দের এই পরিবর্তন নিছক ভাষার রদবদল নয়; বরং রাষ্ট্রের আদর্শিক পরিচয়কে নতুন কাঠামোয় উপস্থাপনের প্রচেষ্টা।
তালেবান সরকারের অধীনে আফগানিস্তানে গত কয়েক বছরে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ধারাবাহিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে; আইন, সরকারি ভাষা, নীতিগত পরিভাষা—সব ক্ষেত্রেই চলছে পুনর্বিন্যাস। আফগান সরকার বলছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের ‘ইসলামি ও আফগান পরিচয়ের’ সাথে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবর্তন একরকম নয়, চলছে ধাপে ধাপে
আফগানিস্তানের বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইট ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে দেখা যায়, ‘জাতীয়’ শব্দটি বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সকল প্রতিষ্ঠানে একইভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। কোথাও পরিবর্তন সম্পূর্ণ হয়েছে, কোথাও আবার আংশিক; এমনকি একই প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এর একটি উদাহরণ আফগানিস্তানের জাতীয় পরীক্ষা কর্তৃপক্ষ। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বহুল পরিচিত ‘কানকোর’ পরীক্ষার আয়োজন করে এই প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইট ও বেশ কিছু দাপ্তরিক লোগো থেকে ‘জাতীয়’ শব্দটি সরিয়ে ফেলা হলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি অফিসিয়াল অ্যাকাউন্টে এখনো পুরোনো নামটিই রয়ে গেছে। দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনা করে। ফলে প্রতিষ্ঠানের নাম বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে যেকোনো পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে পরিসংখ্যান ও তথ্য প্রশাসনেও। প্রতিষ্ঠানটি এক্স প্ল্যাটফর্মে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ‘সাধারণ পরিসংখ্যান ও তথ্য প্রশাসন’ নামে। কিন্তু তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এখনো আগের ‘জাতীয়’ নামটিই ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে চলমান ধীরগতির রূপান্তরেরই ইঙ্গিত। পরিবেশ সুরক্ষা প্রশাসনেও পরিবর্তন এসেছে আংশিকভাবে। কিছু সরকারি পোস্ট ও অ্যাকাউন্টে ‘জাতীয়’ শব্দের বদলে ‘সাধারণ’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও, প্রতিষ্ঠানের মূল লোগোতে এখনো পুরোনো নাম রয়ে গেছে। আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশন সংস্থার ভেতর থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবহারে ‘জাতীয়’ শব্দটি ইতিমধ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে; তবে প্রতিষ্ঠানের কিছু পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ও আনুষ্ঠানিক প্রতীকে এখনো পুরোনো নাম দৃশ্যমান।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এবার সরকারি প্রশাসনে ব্যবহৃত ‘বিদেশি পরিভাষা’ পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিবর্তন শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আরও কিছু সরকারি দপ্তর তাদের বিবৃতি ও প্রশাসনিক চিঠিপত্রে إمارتي (ইমারাতী) এবং العام (সাধারণ)—এ ধরনের নতুন শব্দ ব্যবহার শুরু করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কেবল নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং আফগান রাষ্ট্রের ভাষা, পরিচয় ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ।
বিদেশি শব্দগুলো পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এবার সরকারি প্রশাসনে ব্যবহৃত ‘বিদেশি পরিভাষা’ পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে তালেবান প্রধান হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা একটি বিশেষ ফরমান জারি করেছেন, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ইসলামী ও আফগানী’ পরিচয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফরমান অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরগুলোকে তাদের প্রশাসনিক নথি, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, অভ্যন্তরীণ নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠানের নাম ও উপাধিতে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। একইসাথে যেসব শব্দ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হবে, তার পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্যও ব্যাখ্যা করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, প্রশাসনিক ভাষা থেকে এমন সব শব্দ বাদ দেওয়াই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য, যেগুলোকে বিদেশি, অপ্রাসঙ্গিক অথবা আগের রাজনৈতিক সময়ের উত্তরাধিকার হিসেবে দেখা হয়। এসবের পরিবর্তে এমন শব্দ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে; যা আফগানিস্তানের ইসলামি ও আফগানি পরিচয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ভাষা সংস্কারের উদ্যোগ নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বয়ানকে নতুনভাবে নির্মাণের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তালেবান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার প্রায় পাঁচ বছর পর এখন তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাষা ও প্রতীকগুলোতেও নিজেদের আদর্শিক ছাপ স্পষ্ট করতে চাইছে। ইতিমধ্যে আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে جمهوري (প্রজাতান্ত্রিক) বা وطني (জাতীয়) শব্দ বাদ দিয়ে সেখানে إمارتي (ইমারাতী) শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান আনুষ্ঠানিক পরিচয়, ‘ইমারাতে ইসলামিয়া’—এর সাথে প্রশাসনিক ভাষাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই ‘ইমারাতি’ শব্দের এই রূপান্তর ঘটানো হচ্ছে।
ভাষার আড়ালে রাজনৈতিক বার্তা
আফগানিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও পরিভাষায় যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে—এগুলোকে নিছক প্রশাসনিক সংশোধন হিসেবে দেখছেন না গবেষক ও বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এটি রাষ্ট্র, পরিচয় ও রাজনৈতিক ভাষ্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ।



আফগান ভাষা ও রাজনীতি নিয়ে কাজ করা গবেষক আবদুল্লাহ জারমতি আল জাজিরাকে বলেন, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গঠনে ভাষা ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তার ভাষায়, সরকারি পরিভাষার পরিবর্তন সব সময়ই সরাসরি ভাষাগত অর্থের বাইরে আরও গভীর রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে।
তিনি বলেন, ‘জাতীয়’ শব্দের পরিবর্তে ‘সাধারণ’ বা ‘ইমারাতি’ শব্দ ব্যবহার করার প্রবণতা মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আত্মপরিচয় ও আদর্শিক ভিত্তিকে নতুনভাবে নির্ধারণের প্রচেষ্টা। গত দুই দশকে ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণাটি আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্বের প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। বর্তমান তালেবান সরকার সেই বয়ান থেকে সরে এসে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভিন্ন এক ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
একই ধরনের বিশ্লেষণ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল মালিক মুবারিজ। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আফগানিস্তানে এখন ভাষাকে ক্রমেই রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় পুনর্গঠনের একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার মতে, সরকারি ভাষা কেবল প্রশাসনিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং রাষ্ট্র কীভাবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করবে এবং জনগণের সামনে কী ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরবে—সেটিও এই ভাষার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

এদিকে পরিবর্তনের প্রভাব এখন দৃশ্যমান সরকারি দপ্তরগুলোর বাইরের সাইনবোর্ড ও নামফলকেও। আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে নতুন নাম ও পরিভাষা সংবলিত ফলক স্থাপন করা হচ্ছে, যা এই রূপান্তরের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে।
একাডেমিক অঙ্গনে আফগান পরিচয় নিয়ে নতুন বিশ্লেষণ ও সমালোচনা
আফগানিস্তানের সরকারি ভাষা ও পরিভাষার এই পরিবর্তন দেশটির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রীয় পরিচয় ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে—তা নিয়ে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, আফগানিস্তানের ইতিহাসে সরকারি ভাষা সবসময়ই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। গত কয়েক দশকে দেশটিতে যেসব রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, প্রতিটি সময়েই শাসকগোষ্ঠী নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নতুন ভাষা, নতুন শব্দ ও নতুন বয়ান তৈরি করেছে। ফলে রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও সমাজ সম্পর্কে তাদের যে ধারণা ছিল, তা সরকারি ভাষার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। এখনও সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি নতুন অধ্যায় দেখছে আফগানিস্তান। কোথাও পুরোনো নাম মুছে ফেলা হচ্ছে, কোথাও আবার নতুন আদর্শিক কাঠামোর আলোকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে সরকারি পরিচিতি। ফলে পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক কাঠামো বা আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কীভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করবে, সেই ভাষাও বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
‘জাতীয়’ থেকে ‘সাধারণ’—এই শব্দগত রূপান্তর তাই এখন কেবল ভাষার প্রশ্ন নয়; বরং আফগান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিচয় ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে। আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতায় আলোচনাটি একটি মৌলিক প্রশ্নে এসে ঠেকেছে— এটি কি কেবল সীমিত প্রশাসনিক ও ভাষাগত সংশোধন, নাকি প্রজাতান্ত্রিক যুগ-পরবর্তী আফগানিস্তানে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক ভাষ্যের আরও বিস্তৃত পুনর্নির্মাণের অংশ?
সূত্র : আল জাজিরা আরবি অবলম্বনে











