গাজার শেখ রাদওয়ান এলাকার ধ্বংসস্তূপের সামনে আবু আকরাম দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রতিবার এ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় যেন অদৃশ্য কোনো টান তাকে ফিরিয়ে আনে ভেঙে পড়া দালানগুলোর কাছে। তিনি যেন এখনো ধ্বংসস্তূপের ভেতর কিছু খুঁজে বেড়ান।
২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বরের সেই সকাল পর্যন্ত এখানেই ছিল সন্তান-সন্ততি আর নাতি-নাতনিদের হাসি-কোলাহলে মুখর একটি প্রাণবন্ত বাড়ি। কিন্তু কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই চালানো এক বিধ্বংসী ইসরায়েলি হামলায় মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে যায় পুরো আবাসিক ব্লক। সাজানো-গোছানো চারটি বাড়ি একসঙ্গে ধসে পড়ে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে স্বপ্নের সেই বাড়ি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে, আর একটি যৌথ পরিবারের প্রায় ৮০ জন মানুষ মুহূর্তেই হারিয়ে যান।
আশি বছর বয়সী আবু আকরাম আজও সেই সকালের কথা এমনভাবে বর্ণনা করেন, যেন ঘটনাটি ঘটেছে সেদিনই। তিনি বলেন, ওই এলাকায় যুদ্ধের ভয়াবহতা নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি পুরো পরিবার এত অল্প সময়ের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে—এমন কল্পনা কেউ কখনো করেনি।
আবু আকরাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যখন বের হয়ে আসি, তখন কী ঘটেছিল কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মাথা ও ঘাড়ে আঘাত পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছিল—আমার সন্তান আর নাতি-নাতনিদের খুঁজে বের করতে হবে। কিছুক্ষণ খোঁজার পর জানতে পারলাম, পরিবারের সবাই একে একে চলে গেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বুঝতে পারলাম, কয়েক দশক ধরে যে জীবনকে আমি চিনে এসেছি, তারই পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে।



এই হামলায় আবু আকরাম হারান তার স্ত্রী, চার ছেলের মধ্যে তিনজন, দুই পুত্রবধূ, বেশ কয়েকজন নাতি-নাতনি এবং নিকটাত্মীয়কে। তার পুরো যৌথ পরিবারের প্রায় ৮০ জন সদস্য শহীদ হন, যাদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন তার নিজের ঘরের মানুষ।
কিন্তু শহীদদের দাফন-কাফনের মধ্যেই তার কষ্ট শেষ হয়নি। বরং প্রকৃত সংগ্রাম শুরু হয় সেই অধ্যায়ের পর, যখন জীবনের এই শেষ বয়সে এসে তাকে এমন এক দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়, যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
তার ২১ জন নাতি-নাতনি একেবারে এতিম হয়ে পড়ে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং ন্যূনতম জীবনধারণের উপকরণের তীব্র সংকটের মধ্যেই আশি বছরের এই বৃদ্ধ হয়ে ওঠেন তাদের একমাত্র অভিভাবক।
জীবনের শেষ সময়টা যেখানে সন্তান আর নাতি-নাতনিদের স্নেহে কাটানোর কথা ছিল, সেখানে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন শিশুদের লালন-পালনের কঠিন দায়িত্বে। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করছেন, পরনের কাপড়ের খোঁজ রাখছেন, যাদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ আছে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তারা যে গভীর মানসিক আঘাত নিয়ে বেঁচে আছে, তা কিছুটা হলেও লাঘব করার চেষ্টা করছেন। যদিও তিনি জানেন, মা-বাবার শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়।
সবচেয়ে কঠিন সময় আসে তখন, যখন কোনো নাতি-নাতনি বাবা কিংবা মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে, অথবা মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে ঘুম ভেঙে যায়।
আবু আকরাম বলেন, মাঝে মাঝে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি একা বসে থাকি। আমি চাই না তারা আমাকে কাঁদতে দেখুক। তাদের সামনে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু একজন মানুষ কি কখনো নিজের সন্তানদের ভুলে থাকতে পারে?
আবু আকরামের পরিবারের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় জনবসতিপূর্ণ বাড়িঘরে বারবার হামলার একই চিত্র দেখা গেছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে অসংখ্য পরিবার। হাতে গোনা যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের ছাড়া হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর নাম কিংবা মুখ স্মরণ করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই।
এমন বহু ঘটনার সাক্ষী গাজা, যেখানে একটি মাত্র বিমান হামলায় একই পরিবারের কয়েক প্রজন্ম নিশ্চিহ্ন গেছে। আর পুরো একটি পরিবারের স্মৃতি একা বয়ে বেড়াচ্ছেন কেবল সেই একমাত্র জীবিত সদস্য।


