তালেবান শাসনের পাঁচ বছর : অর্জন, প্রতিশ্রুতি ও অসম্পূর্ণতার হিসাব

গত পাঁচ বছরের হিসাব মেলাতে গেলে দেখা যায়, তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানে যুদ্ধ থেমেছে। সামরিক সংঘাত ও সহিংসতা অনেক কমে এসেছে। এতে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও স্বস্তি পেয়েছেন।
64e60fe93c0b3.image

দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধের পর মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুলের মসনদে ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তানের (আইইএ) পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। আফগানিস্তানের ইতিহাসে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। ২০২৬ সালের আগস্টে এসে তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। এই পাঁচ বছরে আফগানিস্তান কতটা বদলেছে, তা নিয়ে দেশটির ভেতরে-বাইরে রয়েছে নানা মত। একদিকে তালেবান কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় গণমাধ্যম অবকাঠামো, অর্থনীতি ও নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রগতির কথা তুলে ধরছে। অন্যদিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নারী অধিকার হরণ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবকে সামনে রাখছে।

যুদ্ধ থামার স্বস্তি

পাঁচ বছরে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভবত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে হয়েছে। চার দশকের সংঘাতের পর কাবুলসহ বেশিরভাগ এলাকায় বড় ধরনের লড়াই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন।

কাবুলের অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর শহর ও মহাসড়কে চুরি, ডাকাতি ও সহিংসতা অনেকটাই কমেছে। আগের চেয়ে নিরাপদ বোধ করছেন তাঁরা। কাবুলের বাসিন্দা মোহাম্মদ কাসিম সংবাদমাধ্যম এপিকে বলেছেন, আগের দিনের তুলনায় গত পাঁচ বছর তাঁরা নিরাপদে ছিলেন। এ জন্য তিনি প্রশাসনের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ সহায়তা মিশন (উনামা)ও বলেছে, সংঘাত কমে যাওয়ায় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতি

গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে যেমন কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তেমনি নানা চাপও রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশে।

মূল্যস্ফীতির চিত্র অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তা কমে ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

এই সময়ে আফগান মুদ্রা ‘আফগানি’র মানেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের সময় মার্কিন ডলারের বিপরীতে আফগানির মান অনেকটাই কমে যায়। ওই বছরের ডিসেম্বরে ১ মার্কিন ডলারের মান দাঁড়ায় ১৩০ আফগানিতে। বর্তমানে সেই মান শক্তিশালী হয়ে ১ ডলারের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ০১ আফগানিতে।

রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২১ সালে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ছিল ১৪০ বিলিয়ন আফগানি। ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭২ বিলিয়ন আফগানিতে।

২০২৬ সালের ২৬ মে প্রকাশিত ‘আফগানিস্তান ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানায়, আঞ্চলিক উত্তেজনা ও পাকিস্তানের সাথে সীমান্তপথ বন্ধ থাকার পরও আফগানিস্তানের অর্থনীতি ইতিবাচক ধারায় এগিয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

আফগানিস্তানের অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের কারিগরি বিষয়ক উপমন্ত্রী আবদুল লতিফ নাজারি পাজওয়াক আফগান নিউজকে বলেন, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অনেকেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তালেবান ক্ষমতায় এলে আফগানিস্তানের অর্থনীতি ধসে পড়বে। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। বরং আইইএ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি করেছে। তাঁর দাবি, আফগান মুদ্রার মান বর্তমানে এ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

নাজারি আরও জানান, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে আফগানিস্তানের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেড়েছে। কৃষি, জ্বালানি, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে এসব দেশের সাথে নানা চুক্তিও হয়েছে।

দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার কারণে অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার সম্ভব হয়েছে বলেও দাবি করেন নাজারি। এর ফলে কোশ তেপা খালের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মহাসড়ক ও রেলপথের উন্নয়নে শহর ও গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ এবং আমদানি-রপ্তানি সহজ হয়েছে।

তবে এই পরিসংখ্যানের বিপরীত দিকও আছে। ক্ষমতা বদলের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের আফগান সম্পদ জব্দ করে। এর প্রায় ৭ বিলিয়ন যুক্তরাষ্ট্রে এবং বাকিটা ইউরোপে রাখা আছে। বৈদেশিক সাহায্য কমে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতে নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ জব্দ থাকার কারণে আফগানিস্তানের অর্থনীতি এখনও বড় ধরনের চাপে আছে।

হাওয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল জহুর মোদাব্বেরের মতে, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে ওঠানামা ছিল। একদিকে তোপি গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প, কোশ তেপা খাল এবং মধ্য এশিয়ার সাথে সম্পর্কের অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়া ও সম্পদ আটকে থাকা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তাঁর মতে, আফগানিস্তানে পর্যাপ্ত শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ, বাতাস ও বৃষ্টির মতো নবায়নযোগ্য সম্পদ রয়েছে। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে স্বনির্ভর ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের মূল সমাধান।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন

আইইএর পাঁচ বছরের শাসনামলে যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরিতে উল্লেখযোগ্য গতি দেখা গেছে। দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধকবলিত সড়কব্যবস্থা সংস্কারে বড় বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে উন্নয়নমূলক কাজে ২ হাজার কোটি আফগানির বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এর সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে সড়ক অবকাঠামো তৈরিতে।

❤️

এই আর্টিকেলটি ভালো লেগে থাকলে এক কাপ কফির দামে আমাদের সাপোর্ট করতে পারেন

সাপোর্ট করুন

পৌরসভাগুলোর পুরো বাজেটই তাদের নিজস্ব রাজস্ব থেকে সংগৃহীত। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তারা কোনো তহবিল নেয়নি। শহরের সব জেলায় সমানভাবে সেবা ও উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার নীতি বজায় রাখা হচ্ছে।

কাবুল পৌরসভার মুখপাত্র নেমাতুল্লাহ বারাকজাই জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে শহরের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নতুন প্রধান ও অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। আরও প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পুরোনো সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে ১৬৬টি সড়কের কাজ চলছে। বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ১০ হাজারের বেশি সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

যানজট নিরসনে কাবুলে সাতটি উড়ালসেতু নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দেড় বিলিয়ন আফগানি ব্যয়ে নির্মিতব্য বারাকি উড়ালসেতু সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল। এছাড়া লোগার, জালালাবাদ ও খাইরখানা সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক মহাসড়ক সম্প্রসারণের কাজও শেষ পর্যায়ে।

কাজের মান ঠিক রাখতেও বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঠিকাদারদের নিম্নমানের কাজ এবং নকশা না মানার কারণে পৌরসভা চারটি প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করেছে। এর মধ্যে গুলবাগ সড়কের প্রথম অংশের কাজ অন্যতম।

বারাকজাই জানান, যেসব কোম্পানির চুক্তি বাতিল করা হয়েছে, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তারা পরবর্তীতে পৌরসভার কোনো কাজ পাবে না।

নারী উদ্যোক্তা ও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চিত্র

তালেবান সরকারের অধীনে সামাজিক বিধিনিষেধ থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীদের সক্রিয়তা বেড়েছে। আফগানিস্তান উইমেনস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক লাইসেন্সধারী নারীর সংখ্যা চারগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২০ সালে নিবন্ধিত নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪২১। ২০২৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছেছে।

সংস্থাটির প্রধান ফরিবা নূরি জানান, এসব নারী শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিচার মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও পৌরসভার মাধ্যমে তাঁদের লাইসেন্স সংগ্রহ করেছেন।

তিনি আরও জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নারীদের পাশাপাশি গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও প্রায় ১ লাখ নারী ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। তাঁরা মূলত দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন, পশুপালন, বাগান পরিচর্যা ও এ ধরনের বিভিন্ন কাজে যুক্ত। এসব কাজ মূলত স্থানীয় ও ঐতিহ্যভিত্তিক হওয়ায় এর জন্য লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। বছরের পর বছর ধরে এসব কাজের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

এ ছাড়া কৃষি, হস্তশিল্প ও গৃহভিত্তিক ডিজিটাল মার্কেটিংয়েও আফগান নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিছুদিন আগে মধ্য এশিয়ায় ‘বিবি খাদিজাতুল কুবরা’ বাণিজ্যিক প্রদর্শনীতে আফগান নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার না থাকা, আর্থিক সম্পদের অভাব এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক খাতে প্রবেশে বাধা এখনও তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

ভবিষ্যৎ পথরেখা

গত পাঁচ বছরের হিসাব মেলাতে গেলে দেখা যায়, তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানে যুদ্ধ থেমেছে। সামরিক সংঘাত ও সহিংসতা অনেক কমে এসেছে। এতে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও স্বস্তি পেয়েছেন। দেশের অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান কাজ হয়েছে, মুদ্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়েছে এবং ব্যবসায়িক খাতে নারীদের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ বেড়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়া, ব্যাংক খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক সাহায্য কমে যাওয়া আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে শ্লথ করে রেখেছে। নারী অধিকার নিয়েও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তালেবান সরকারের বিরোধ রয়ে গেছে। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ অবশ্য বারবার বলে আসছেন, ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী মেয়েদের শিক্ষা ও কাজের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।

তবুও পাঁচ বছর পূর্তির এই দিনে আফগানিস্তানের রাস্তায় উদযাপনের পাশাপাশি জনগণের মৌলিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অধিকার বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: পাজওয়াক আফগান নিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ।

❤️

এই আর্টিকেলটি ভালো লেগে থাকলে এক কাপ কফির দামে আমাদের সাপোর্ট করতে পারেন

সাপোর্ট করুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন