সম্প্রতি পোল্যান্ডের এক সাংবাদিক একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন। তিনি ১৯৪৩ সালের একটি নাৎসি পর্যটন নির্দেশিকার (ট্যুরিস্ট গাইড) সন্ধান পেয়েছেন, যা তৎকালীন ‘সাধারণ সরকার’ (General Government) নামক অঞ্চলে ভ্রমণকারী পর্যটকদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই অঞ্চলটি ছিল নাৎসি জার্মানি দ্বারা দখলকৃত পোল্যান্ডের সেই কুখ্যাত এলাকা, যেখানে লাখ লাখ ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ মানুষকে নির্বাসনে পাঠিয়ে নির্মমভাবে হত্যা ও পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ, সেই গাইডবই হাতে নিয়ে গর্বিত জার্মান পর্যটকরা সানন্দে এলাকাটি ভ্রমণ করতেন এবং সেখানকার বিভিন্ন স্থানকে নতুন করে ‘জার্মান ঐতিহ্য’ হিসেবে প্রচার করা হতো।
আজ ঠিক একই রকম এক ভয়াবহ দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে। ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি ‘পূর্ব তুর্কিস্তান’ নামে পরিচিত, যা ১৯৪৯ সালে দখল করার পর চীন নতুন নাম দেয় ‘জিনজিয়াং’। এই অঞ্চলটি বর্তমানে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চালানো এক নির্মম গণহত্যার ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
উইঘুরদের সম্ভাব্য সব ধরনের প্রতিরোধ ইতিমধ্যেই কঠোর হাতে দমন করেছে চীন সরকার। এ উদ্দেশ্যে তারা গড়ে তুলেছে এক বিশাল ও অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা। উইঘুরদের প্রতি সামান্যতম সহানুভূতি দেখালেও যেকোনো ব্যক্তিকে পাঠানো হচ্ছে বন্দিশিবিরে; আর সেখান থেকে বেঁচে ফেরা মানুষদের বাধ্য করা হচ্ছে দাসশ্রমে। এই চরম দমনপীড়নের পর, চীন সরকার এখন পূর্ব তুর্কিস্তানে দেশি-বিদেশি পর্যটন আকর্ষণের জন্য এক বিশাল প্রচার অভিযান শুরু করেছে।
পর্যটন প্রচারণার এই আড়ালে মূলত চলছে এক তীব্র ও সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া উইঘুর গণহত্যার বিরুদ্ধে ওঠা আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে ধামাচাপা দেওয়া। সেই সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, তারা যেন ‘স্বচক্ষে এসে দেখে যান’—জিনজিয়াং আসলে কতটা নিরাপদ, শান্ত ও সমৃদ্ধ!
নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক নগর পরিকল্পনা এবং হরেক রকম বিনোদনমূলক আয়োজনের টোপ দিয়ে চীনা নাগরিকদের জিনজিয়াং ভ্রমণে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে কৃত্রিম ডাইনোসর পার্ক, তেমনই রয়েছে তথাকথিত ‘রহস্যময়’ সব ঐতিহাসিক স্থান। এসব স্থানে উইঘুর সংস্কৃতিকে একদিকে যেমন চীনের নিজস্ব ঐতিহ্য বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে আদিম সংস্কৃতি হিসেবেও ।
তবে সবকিছুই যে পুরোপুরি নির্বিঘ্নে চলছে, তা বলা যায় না। পর্যটকদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও, বিপুলসংখ্যক চীনা নাগরিক যে এই অঞ্চলে ভিড় করছেন—তা স্পষ্ট। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘সিনহুয়া’র দাবি অনুযায়ী, ২০২৩ সালেই জিনজিয়াংয়ে পর্যটকদের যাতায়াতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লাখে (২৬৫ মিলিয়ন)।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভ্রমণকারীদের মধ্যে শুধু যে চীনের বেতনভুক্ত ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানো সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা আছেন, তা নয়; সাধারণ বিদেশি পর্যটকেরাও এখন সেখানে যাচ্ছেন। তারা চীনের সাজানো প্রচারণাগুলোকেই সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন এবং নিজ দেশে ফিরে গিয়ে তা প্রচার করছেন, যা স্বাভাবিকভাবেই চীনের প্রচার কর্মকর্তাদের দারুণভাবে উৎসাহিত করছে। মূলত ২০২৩ সালের দিকে এই বিদেশি পর্যটনে নতুন গতি আসে, যখন চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের দমনপীড়নের সাফল্যে আত্মবিশ্বাসী হয়ে জিনজিয়াং ভ্রমণের প্রকাশ্য অনুমোদন দেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রাভেল এজেন্সি জিনজিয়াং ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রি শুরু করে এবং সাধারণ মানুষও সেখানে অবাধে যাতায়াত করতে থাকে।
১০ লক্ষাধিক উইঘুর শিশুকে—যার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে—তাদের পরিবার থেকে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্ন করে চীনা বোর্ডিং স্কুলগুলোতে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, চীনের এই গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ প্রকল্পটির প্রথম ধাপ সার্বিকভাবে সফল হয়েছে। এর দ্বিতীয় ধাপে, ১০ লক্ষাধিক উইঘুর শিশুকে—যার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে—তাদের পরিবার থেকে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্ন করে চীনা বোর্ডিং স্কুলগুলোতে বন্দি করে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্যদিকে, উইঘুর নারীদের পরিকল্পিতভাবে বন্ধ্যা করা হচ্ছে; পাশাপাশি জনসংখ্যা ও শিক্ষা সংক্রান্ত সব পরিসংখ্যানকে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হিসেবে আড়াল করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম যুবকদের বাধ্য করা হচ্ছে দাসশ্রমে, আর লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে কার্যত মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশকের জন্য কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে।
উইঘুর সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি আজ পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতির ধারক-বাহক, শিল্পী, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি পুরো প্রজন্মকে গুম এবং স্তব্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমেই মূলত এই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সব ঐতিহাসিক নিদর্শন ও পবিত্র ধর্মীয় স্থান, যাতে ভবিষ্যতে এগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো উইঘুর চেতনা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে এই গণহত্যা প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য— উইঘুরদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সম্পূর্ণ নির্মূল করা এবং যারা বেঁচে আছেন, তাদের চীনা ভাষাভাষী এক অনুগত কারখানার শ্রমিকে রূপান্তর করা।


একই সময়ে জিনজিয়াং সংক্রান্ত সব আন্তর্জাতিক সংবাদ ও প্রতিবেদনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং চীনের এই কৌশলটিও বেশ সফল। টেলিভিশন বা গণমাধ্যমে যখন নির্যাতনের কোনো দৃশ্য বা ছবি সরাসরি উঠে আসে না, তখন বিশ্ব মিডিয়াও এক ধরনের নীরব ভূমিকা পালন করে।
বাস্তবে কিন্তু তথ্যের প্রবাহ পুরোপুরি থেমে নেই; তবে জিনজিয়াং থেকে যে খবরগুলো বাইরে আসছে, সেগুলো প্রায়শই বেশ কয়েক মাস আগের। বর্তমানে ওই অঞ্চলের ভেতর থেকে কোনো ভিডিও ফুটেজ ফাঁস হওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। বড়জোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেসাঝে কিছু ক্ষণস্থায়ী ক্লিপ ও অডিও রেকর্ডিং ছড়িয়ে পড়ে, যা থেকে নির্যাতনের সামান্য আভাস মেলে। তবে পেশাদার সাংবাদিকতার কঠোর মানদণ্ড অনুযায়ী, তাৎক্ষণিকভাবে এগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় না।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চিরচেনা কৌশলই হলো প্রকৃত সত্যকে আড়াল করা এবং এর বিপরীতে নিজেদের মতো করে সাজানো একটি কৃত্রিম ও গ্রহণযোগ্য ‘বিকল্প সত্য’ তৈরি করে তা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। দেশি কিংবা বিদেশি সব পর্যটকের ক্ষেত্রেই চীনের এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলটি দারুণভাবে সফল হচ্ছে।
ইংরেজিতে চীনের এই পর্যটন প্রচারণার মূল স্লোগান হলো: ‘যা দেখবেন, তাই বিশ্বাস করবেন’ (Seeing is believing)। তারা জিনজিয়াংয়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সুপরিকল্পিতভাবে কেবল জমজমাট শপিং স্ট্রিট, সুস্বাদু খাবারের দোকান আর কৃত্রিম নাচের অনুষ্ঠানই দেখায়। এই কৃত্রিম ‘স্বাভাবিকতা’ সাধারণ পর্যটকদের কাছে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় যে, তারা বুঝতেই পারেন না এটি আসলে একটি সাজানো নাটক মাত্র। ফলে পর্যটকরা কখনোই কারাগারে বন্দি লাখ লাখ উইঘুর, দাসশ্রমের অন্ধকার শিল্পকারখানা, কাঁটাতারে ঘেরা বোর্ডিং স্কুল কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন ঐতিহ্য দেখতে পান না। কারণ এসব নির্মম বাস্তবতাকে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তাদের চোখের আড়ালে রাখা হয়।
এর পরিবর্তে, পর্যটকরা সেখানে কেবল চীনা ব্যবসাবাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারই দেখতে পান। পাশাপাশি উইঘুর ঐতিহ্যের বাছাই করা কিছু প্রতীককে এমনভাবে প্রদর্শন করা হয়, যা দেখে মনে হয় উইঘুররা যেন কেবলই সুদূর অতীতের কোনো ইতিহাসের অংশ। যেসব মসজিদ পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়নি, সেগুলোকে এখন রেস্তোরাঁ কিংবা পর্যটন হোটেল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই রূপান্তর মূলত একটি স্পষ্ট বার্তাই দেয়–- এখানে আর কোনো নামাজি নেই, ধর্মকে সমাজ থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে এবং নতুন (চীনা) ব্যবসায়ীরা এখন এই পবিত্র স্থানগুলোর দখল নিয়েছে। একই সঙ্গে উইঘুরদের নিজস্ব মালিকানাধীন সফল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার একটি বড় উদাহরণ প্রাদেশিক রাজধানী উরুমছির বিখ্যাত ‘মিরাজ’ চেইন রেস্তোরাঁ; যার সব শাখা বন্ধ করে এর মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণ চীনা পর্যটকদের মনে এক ধরনের আধুনিকতার অহমিকা ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ জন্ম দেয়। ফলে তারা স্থানীয় উইঘুরদের নিজেদের চেয়ে নিচু স্তরের মনে করে এবং তাদের কেবলই ‘সেবক’ হিসেবে গণ্য করে। এই পুরো ব্যাপারটা আসলে পুরোনো দিনের ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন শ্বেতাঙ্গ শাসকরা যখন কোনো বিজিত দেশ বা উপনিবেশে যেত, তাদের মনেও ঠিক এই রকমের একটা অহংকারী ও বর্ণবাদী মানসিকতা কাজ করত।
গবেষক মেলিসা শ্যানি ব্রাউন এবং ডেভিড ও’ব্রায়েন যেমনটা লক্ষ করেছেন, পর্যটকদের এই ‘স্বচক্ষে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি’ আসলে জিনজিয়াংয়ের ইতিহাসকে বিকৃত করে সাজানো সরকারি ভাষ্যকেই অজান্তে গিলতে সাহায্য করে। ফলস্বরূপ, পরবর্তীতে যখনই কেউ তাদের জিনজিয়াং নিয়ে প্রশ্ন করে, পর্যটকরা অবিকল সেই সরকারি প্রোপাগান্ডাই উগরে দেয়।
শুধু পর্যটনই নয়, বরং চীনা নাগরিকদের এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যও উৎসাহিত করা হচ্ছে। এটি চীনের সেই কুখ্যাত ও বাধ্যতামূলক ‘হোম-স্টে’ (Home-stay) ব্যবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে—যে ব্যবস্থায় জিনজিয়াংয়ের হান চীনারা জোর করে এমন উইঘুর পরিবারগুলোর ঘরে গিয়ে থাকা শুরু করত, যাদের তখনও বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়নি।
নাৎসিদের দখলে থাকা ইউরোপে যেভাবে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলকে ‘জার্মানিকরণ’ করা হয়েছিল, তার সঙ্গে জিনজিয়াংয়ের বর্তমান পরিস্থিতির এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। এখানকার চীনারা এখন এমন সব বাড়িঘরের দখল নিচ্ছে, যেগুলো উইঘুর মালিক ও তাদের পুরো পরিবার নিখোঁজ বা বন্দি হওয়ার পর শূন্য হয়ে পড়েছিল। এই বাড়িগুলো নতুন আসা হান চীনা অভিবাসীদের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে; সেই সঙ্গে বোনাস হিসেবে দেওয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাব এবং বিয়ের জন্য উইঘুর নারীদের প্রলোভন।
একই সময়ে জিনজিয়াং সংক্রান্ত সব আন্তর্জাতিক সংবাদ ও প্রতিবেদনকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং চীনের এই কৌশলটিও বেশ সফল।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে চীনের এই বসতিস্থাপনকারী ঔপনিবেশিক (Settler-colonial) প্রকল্পটিকে আধুনিক গবেষণায় ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই নতুন গবেষণাগুলো পুরোনো সব সামাজিক দ্বিধা কিংবা নিষেধাজ্ঞা ভেঙে দিয়ে, চীনের বর্তমান উপনিবেশবাদকে ইতিহাসের অন্যান্য কুখ্যাত ঔপনিবেশিক উদাহরণের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করছে। তবে যে বিষয়টি আমরা প্রায়শই এড়িয়ে যাই, তা হলো পর্যটনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই চীনা কৌশল এবং ইতিহাসের অন্যান্য স্বৈরাচারী শাসকদের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যকার গভীর ও প্রত্যক্ষ মিল।


আমি নিজে চীন এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে একজন পর্যটক হিসেবে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে পর্যটকদের ওপর কড়া নজরদারি এবং তাদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ছিল এক নিত্যকার বিষয়। সোভিয়েত রাশিয়ায় এর উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই পরিষ্কার—পর্যটকরা যেন কেবল সরকার অনুমোদিত সাজানো দর্শনীয় স্থানগুলোই দেখতে পায়, তা নিশ্চিত করা।
বিদেশি পর্যটকদের ডেকে নিয়ে আসার পেছনে সোভিয়েতদের এই যে এক ধরনের তাড়না ছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার স্বার্থে তাদের অভিজ্ঞতাকে একটি ‘সাক্ষ্য’ হিসেবে ব্যবহার করা। স্থানীয় জনগণের ক্ষেত্রেও তারা একই কাজ করত; তবে আন্তর্জাতিক মহলে বিদেশিদের সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা যেহেতু বেশি, তাই একে কাজে লাগানোই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ১৯২০-এর দশক থেকে সোভিয়েতদের ‘এক নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক কূটনীতি’র হাত ধরে এই ব্যবস্থার সূচনা হয় এবং পরবর্তীতে জোসেফ স্ট্যালিনের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় একদল অন্ধ সমর্থক বা ‘সহযাত্রী’ (Fellow travellers) তৈরির মাধ্যমে এটি এক নিখুঁত রূপ লাভ করে।
নাৎসি জার্মানি কর্তৃক দখলকৃত পোল্যান্ডে ভ্রমণের জন্য জার্মান নাগরিকদের উৎসাহিত করার যে উদাহরণটি শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছিল, তার সঙ্গে চীনের এই বর্তমান পরিস্থিতির হুবহু মিল রয়েছে। সেই নাৎসি পর্যটন নির্দেশিকার (General Government) পাঠকেরা মূলত এমন একটি সাজানো অঞ্চল উপভোগ করতেন, যাকে তৎকালীন নাৎসি শাসকগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব উগ্র জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
প্রকৃতপক্ষে, নাৎসি শাসকগোষ্ঠী এই ধরনের ‘গণহত্যা পর্যটন’ (Genocide tourism)-এর পেছনে ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। এর মধ্যে ‘স্ট্রেংথ থ্রু জয়’ (Strength through Joy)-এর মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত বড় বড় প্রচারণামূলক উদ্যোগও শামিল ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এই কৌশল কেবল বাণিজ্যিকভাবেই সফল হয়নি, বরং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এক বিশাল সাফল্য অর্জন করেছিল। গবেষক ক্রিস্টিন সেমিয়েন্স তাঁর ‘সিয়িং হিটলার্স জার্মানি: ট্যুরিজম ইন দ্য থার্ড রাইখ’ বইয়ে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—এই কৌশলটি এমন লাখ লাখ পর্যটক তৈরি করতে সফল হয়েছিল, যারা নাৎসি জার্মানির এই কৃত্রিম ‘স্বাভাবিকতা’ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত এবং এমনকি হিটলারের শাসনব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে সাফাই গাইত।
জুলিয়া বয়েড তাঁর ‘ট্রাভেলার্স ইন দ্য থার্ড রাইখ’ বইয়ে বর্ণনা করেছেন যে, নাৎসি জার্মানি ভ্রমণ করাটা সেই সময়ে কেমন ছিল—যখন মানুষের মনে ‘যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের কোনো ধারণা ছিল না’। অর্থাৎ, তখন পর্যন্ত নাৎসিদের আসল নৃশংসতার ছবি ও ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে আজকের মতো এত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়নি।
আজকের চীনের মতোই, তৎকালীন বিদেশি পর্যটকদের কাছে নাৎসি জার্মানিকে একটি অত্যন্ত আনন্দদায়ক, সমৃদ্ধ ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ বলে মনে হতো; যেখানে পর্যটকদের মন ভোলানোর মতো চমৎকার সব আয়োজন ছিল। নাৎসি শাসকেরা বিশেষ করে মার্কিন ও ব্রিটিশ পর্যটকদের জার্মানি ভ্রমণে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করত। এর ফলে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় জার্মানি ভ্রমণে তাদের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি (কেবল ১৯৩৭ সালেই প্রায় পাঁচ লাখ আমেরিকান জার্মানি ভ্রমণ করেছিলেন)। এমনকি তৎকালীন আমেরিকান ও ব্রিটিশ নাগরিকেরা হিটলারের শাসনামলে তাঁদের সন্তানদের বিপুল সংখ্যায় জার্মানিতে পড়াশোনা করতেও পাঠিয়েছিলেন!
জুলিয়া বয়েড সেইসব ব্রিটিশ ও আমেরিকান দর্শনার্থীর ইতিবাচক মনোভাবের কথা তুলে ধরেছেন, যাঁরা বছরের পর বছর জার্মানিতে ছুটি কাটাতে পছন্দ করতেন। তাঁরা এমন এক সময়েও সানন্দে সেখানে যেতেন, ‘যখন খোদ তাঁদের নিজ দেশেই নাৎসি শাসনব্যবস্থার চরম নৃশংসতা ও বর্বরতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা এবং কঠোর তদন্ত চলছিল।’
আর এই সব সমালোচনার মধ্যেই নাৎসি শাসকগোষ্ঠী পর্যটনকে দুহাত বাড়িয়ে স্বাগত জানিয়ে তাদের আসল এজেন্ডা সমানে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কারণ, আজকের চীনের মতোই তারাও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত—‘যা দেখবেন, তাই বিশ্বাস করবেন’ (Seeing is believing)।
উইঘুর বিশ্লেষক আব্দুল মালিক আব্দুল আহাদ এর একটি আরবি প্রতিবেদন থেকে অনূদিত।











