যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় পাল্টা কৌশল হিসেবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধ করার প্রস্তুতি নিতে বলেছে ইরান। গত ১৬ জুলাই ইরানের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফ-এর একটি প্রতিবেদনের পরদিনই এই তথ্য সামনে এল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সোমালিয়ার আশ-শাবাবের সঙ্গে মিলে হুথিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে ইরানের পক্ষে নতুন ফ্রন্ট খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগে থেকেই হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় এই নতুন হুমকি বিশ্বকে নজিরবিহীন সংকটে ফেলেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাণিজ্য ও জ্বালানি পথ একসঙ্গে অচল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত শতাব্দীর আশির দশকের ট্যাংকার যুদ্ধ, ২০২৩ সালের নৌপথে হুথিদের হামলা কিংবা সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা—সব সময়ই পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের উত্তেজনা আলাদা ছিল। তবে এবার তেহরানের রণকৌশলে এই দুটি ক্ষেত্র একসঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
লোহিত সাগর.. ইরানের দ্বিতীয় ফ্রন্ট
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর সমুদ্র-ভূরাজনীতি তেহরানের প্রধান কৌশলে পরিণত হয়। গত ৪ মার্চ থেকে আইআরজিসি হরমোজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রাখায় প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ বর্জন করছে।
এই অবরোধের মুখে সৌদি আরব তেল রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নিয়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্তত ৭ শতাংশ। ফলে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালীই এখন উপসাগরীয় তেলের একমাত্র লাইফলাইন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোয় মার্কিন সেন্টকমের হামলার পর রণকৌশল বদলেছে তেহরান। নিজেদের ক্ষতির খেসারত তারা মিত্রদের দিয়ে উসুল করতে চায়। সরাসরি বড় যুদ্ধে না জড়িয়ে কৌশলগত নৌপথগুলো বন্ধের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলাই এখন তেহরানের মূল উদ্দেশ্য।
টেলিগ্রাফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নিজস্ব প্রচারমাধ্যমেই এই নীতি স্পষ্ট করা হয়েছে। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এক ডকট্রিনে বাব আল-মান্দাবকে বৃহত্তর যুদ্ধের ‘দ্বিতীয় ফ্রন্ট’ হিসেবে আখ্যা দেয়। তেহরানের মূল লক্ষ্য, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালীও বন্ধ করে বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির করে দেওয়া, যাতে প্রতিপক্ষের রসদ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়।
আইআরজিসির অবস্থান আর সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার ঘোষণা—‘জ্বালানি রপ্তানি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো কারও জন্যই নয়’—আসলে একই বার্তা দেয়। তেহরানের এই নীতির কারণে লোহিত সাগর থেকে হর্ন অব আফ্রিকা পর্যন্ত পুরো অঞ্চলটি এখন আর কেবল বাণিজ্যিক পথ নেই, এটি আন্তর্জাতিক জোটগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক ঘাঁটিতে রূপ নিয়েছে।
দ্বিমুখী নৌ-স্থবিরতার সিনারি
আধুনিক ইতিহাসে দুটি কৌশলগত প্রণালী একসঙ্গে বন্ধ হওয়ার নজির নেই। দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালী কখনোই একই সময়ে বন্ধ হয়নি। আর এখানেই বিশ্ব অর্থনীতি অচল করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের বর্তমান সক্ষমতা স্পষ্ট, যা সমসাময়িক ইতিহাসের অন্য যেকোনো আঞ্চলিক শক্তিকে ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাবে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়েছে। এটি বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তরল জ্বালানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। এর পাশাপাশি, বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যেরও প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালী দিয়ে যায়, যার সিংহভাগ কাতারের।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাব আল-মান্দাব দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪২ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। হুথিদের হামলার কারণে জাহাজের পথ পরিবর্তনই এই ধসের মূল কারণ। এর বাইরে, বিশ্বব্যাপী সমুদ্রগামী বাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এই প্রণালী দিয়েই চলে।
এই সংকটের বিপজ্জনক দিক হলো, এর বিকল্প পথ নেই বললেই চলে। সৌদির ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ এবং আমিরাতের ‘হাবশান-ফুজিরাহ’ পাইপলাইন হরমুজ প্রণালীকে আংশিক এড়িয়ে চললেও, এশিয়ামুখী তেলকে শেষ পর্যন্ত বাব আল-মান্দাব পার হতেই হয়। আর সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যাওয়া ছাড়া পথ নেই। ফলে এই দ্বিমুখী অবরোধ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের পথ একসঙ্গে রুদ্ধ করে দেয়।
এই পরিস্থিতি পশ্চিমা সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী কিন্তু কৌশলগতভাবে সংযুক্ত দুটি রণক্ষেত্রে তাদের সামরিক সক্ষমতা ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে গঠিত ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ মূলত লোহিত সাগরেই মনোযোগী ছিল। ‘সেন্টার ফর মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজি’র মতে, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘতম নৌযুদ্ধ। তা সত্ত্বেও হুথিদের পুরোপুরি থামানো যায়নি। ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী অস্ত্রের ঘাটতির মধ্যেই এখন পশ্চিমা নৌবহরগুলোকে একই সঙ্গে পারস্য, ওমান, লোহিত ও এডেন উপসাগর পাহারা দিতে হচ্ছে। ফলে তাদের সীমিত সামরিক সম্পদ এমন দুটি ফ্রন্টে ভাগ হচ্ছে, যার শুরুর সময়টা নির্ধারণ করছে ইরান।
কীভাবে লোহিত সাগর দুই শত্রুকে এক করল?
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারের দুই প্রান্তে মতাদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী, ইয়েমেনের হুথি এবং সোমালিয়ার আশ-শাবাবের মধ্যে স্বার্থের এক অদ্ভুত মিল ঘটেছে। আগে গোয়েন্দা সূত্রে এই সমন্বয়ের ইঙ্গিত মিললেও, দ্য টেলিগ্রাফ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তা বন্ধ করে দেওয়াই এই জোটের মূল লক্ষ্য। আর তা সফল করতে হুথিরা তেহরানের ড্রোন প্রযুক্তি আশ-শাবাবের কাছে হস্তান্তর করছে।


প্রথম দেখায় এই জোটকে অযৌক্তিক মনে হতে পারে। কারণ ২০১২ সাল থেকে আল-কায়েদাপন্থী আশ-শাবাব সালাফি-জিহাদি গোষ্ঠী হিসেবে শিয়াদের বিরোধী। অন্যদিকে হুথিরা হলো জায়েদি শিয়া, যারা ইরানের অস্ত্র ও আদর্শে পুষ্ট। তাত্ত্বিক মানদণ্ডে দুই পক্ষই একে অপরের চরম ধর্মীয় শত্রু।
তবে ভূরাজনীতিতে বৈরী আদর্শও অনেক সময় স্বার্থের কাছে হার মানে। অতীতে ইরান নিজের স্বার্থে আল-কায়েদাকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল এবং কট্টর শত্রুতা সত্ত্বেও আল-কায়েদা তা গ্রহণ করেছিল। এবারের সমীকরণ সহজ, সাধারণ শত্রু সাময়িক বন্ধু তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুথি ও আশ-শাবাব উভয়ইয়ের অবস্থান আজ একই। ওয়াশিংটনের তালিকায় উভয়ই নিষিদ্ধ সংগঠন এবং উভয়েই এডেন উপসাগরের যুদ্ধ ও চোরাচালানের অর্থনীতির ওপর ভর করে টিকে আছে।
ইয়েমেনের বাইরে প্রভাব বাড়াতে আফ্রিকার উপকূলে হুথিদের এমন একটি শক্তির প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে আশ-শাবাবের প্রয়োজন ছিল আধুনিক অস্ত্র, বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি। ফলে এই সম্পর্ক কোনো আদর্শিক জোট নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক ব্যবসায়িক চুক্তি। যেখানে সোমালি উপকূলের কৌশলগত অবস্থানের বিনিময়ে মিলছে উন্নত অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ।

২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবরে প্রকাশিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে এই ধারনার কথাই বলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দুই গোষ্ঠীর সহযোগিতা শুধু পারস্পরিক স্বার্থের লেনদেন নয়, বরং এটি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর হুথি কৌশলের অংশ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হুথিরা তাদের অভিযানের পরিধি বাড়াতে সোমালি উপকূল থেকে সমুদ্রপথে হামলা চালানোর বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখছে। তবে এই সহযোগিতার অর্থ এই নয় যে তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আদর্শিক পার্থক্য ঘুচে গেছে।
সহজ ভাষায় বললে, এই জোটটি আসলে দুই পক্ষের সামরিক শক্তির পারস্পরিক সম্পূরক। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (আইআইএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের কাছে জাহাজবিধ্বংসী ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ইরানি মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘আসিফ’ ও ‘তানখিল’ অন্যতম। এগুলোর পাল্লা প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার এবং এগুলো ৩০০ কেজিরও বেশি ওজনের ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এর পাশাপাশি তাদের অস্ত্রাগারে রয়েছে ‘সামাদ’ ও ‘শাহেদ’ সিরিজের আত্মঘাতী ড্রোন, সামুদ্রিক মাইন এবং বিস্ফোরক বোঝাই চালকহীন ড্রোন বোট।
রয়টার্স-কে দেওয়া এক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হুথিরা হুদায়দাহ ও এডেন উপসাগরমুখী পাহাড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করে আইআরজিসি-র নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। ওদিকে মাঠপর্যায়ের ভৌগোলিক জ্ঞান, বিশেষ স্থল অভিযান এবং জলদস্যুতা ও চোরাচালানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে আফ্রিকার উপকূলে হুথিদের ঘাটতি পূরণ করছে আশ-শাবাব।
প্রথম দেখায় এই জোটকে অযৌক্তিক মনে হতে পারে। কারণ ২০১২ সাল থেকে আল-কায়েদাপন্থী আশ-শাবাব সালাফি-জিহাদি গোষ্ঠী হিসেবে শিয়াদের বিরোধী। অন্যদিকে হুথিরা হলো জায়েদি শিয়া, যারা ইরানের অস্ত্র ও আদর্শে পুষ্ট। তাত্ত্বিক মানদণ্ডে দুই পক্ষই একে অপরের চরম ধর্মীয় শত্রু।
জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, এই দুই গোষ্ঠীর সহযোগিতা বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে, ইয়েমেনে আশ-শাবাব সদস্যদের ড্রোন ও বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ, সোমালিয়ায় হুথি প্রকৌশলী পাঠানো এবং শত শত সোমালি যোদ্ধার ইয়েমেন সফর। এ ছাড়া হাদরামাউতে আশ-শাবাবের বিশেষ সেল হুথি-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের থেকে অস্ত্র কিনে সোমালিয়ার কান্দালা, আলুলা ও রাস আসির বন্দরে পাচার করছে।
ইতোমধ্যেই সোমালি নিরাপত্তা বাহিনী ইয়েমেন থেকে আসা বেশ কিছু বিস্ফোরক ও ড্রোনের চালান জব্দ করেছে। ‘সাহার রিসার্চ সেন্টার’-এর পরিচালক ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা ম্যাথিউ ব্রাইডেনের মতে, আশ-শাবাব স্থল ও নৌযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য শত শত সোমালি যুবককে ইয়েমেনে পাঠিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই নেটওয়ার্ক পূর্ণতা পেলে লোহিত সাগরের দুই প্রান্তেই একটি দ্বিমুখী সামরিক বেষ্টনী তৈরি হবে। ফলে কেবল ইয়েমেনের উপকূলে আঘাত হেনে এই আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর সম্ভব হবে না।
হর্ন অব আফ্রিকাকে যুদ্ধের দিকে টানছে
হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের ভঙ্গুর পরিস্থিতি এই সংঘাত ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। সোমালি সরকার আগের হারানো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ এই পরিস্থিতিকে ‘কৌশলগত অচলাবস্থা’ হিসেবে দেখছে। এর সঙ্গে আফ্রিকান ইউনিয়ন মিশনের সেনা হ্রাস ও তহবিল সংকটে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা সরাসরি ইরানের কৌশলগত উদ্দেশ্য সফল করতে ভূমিকা রাখবে।
এই ভৌগোলিক অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে জিবুতি। প্রণালীর মুখে অবস্থিত এই ছোট দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র স্থায়ী ঘাঁটি ‘লেমনিয়ার’ ছাড়াও ফ্রান্স, চীন, জাপান ও ইতালির সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। হুথিদের ড্রোন প্রযুক্তি আশ-শাবাবের হাতে এলে, ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়েও জিবুতির এসব বিদেশি ঘাঁটিতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা সম্ভব।


এই সংকটের মানবিক মূল্য সামরিক হিসাবের চেয়েও অনেক বড়। সোমালিয়া তাদের প্রয়োজনীয় সব জ্বালানি ও বেশির ভাগ খাদ্য আমদানি করে সমুদ্রপথে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, চলমান পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশটির ৬৫ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। এ ছাড়া জিবুতি তাদের খাদ্যের ৯০ শতাংশই আমদানি করে এবং ইথিওপিয়ার সামগ্রিক বাণিজ্যের ৯৫ শতাংশই জিবুতি বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।
ডব্লিউএফপির হিসাবে, এই উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের কবলে পড়তে পারে। এতে পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আফ্রিকার উপকূলীয় বন্দরগুলো অনিরাপদ হয়ে উঠলে তা কেবল বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলই ভাঙবে না, বরং এই অঞ্চলের দরিদ্র দেশগুলোতে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করবে।
নৌপথে যুদ্ধের খেসারত
এই দ্বিমুখী অবরোধের কারণে জাহাজগুলো উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হলে প্রতিটি যাত্রায় অতিরিক্ত সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার নটিক্যাল মাইল পথ যোগ হবে। এতে যাত্রার সময় ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়বে এবং এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে প্রতিবার আসা-যাওয়াতেই জাহাজপ্রতি জ্বালানি খরচ বাড়বে প্রায় ১০ লাখ ডলার।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাবে, আরব সাগর থেকে উত্তর ইউরোপের একটি যাত্রায় লোহিত সাগর হয়ে যেখানে ১৯ দিন সময় লাগে, সেখানে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যেতে সময় লাগে প্রায় ৩৪ দিন। প্রতিবছর বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে যেখানে প্রায় এক লাখ কোটি (১ ট্রিলিয়ন) ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য চলে, সেখানে এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীও বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
এই ক্ষতি কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, বরং বাস্তব হিসাব। সুয়েজ খাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ওসামা রাবি জানান, ২০২৪ সালে খালের রাজস্ব আয় ৬১ শতাংশ কমে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে নেমেছে, যা ২০২৩ সালে ছিল রেকর্ড ১ হাজার ২৫ কোটি ডলার। একই সময়ে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যাও অর্ধেকে নেমেছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আস-সিসি জানিয়েছেন, এই সংকটে মিশরের প্রতি মাসে প্রায় ৮০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে এবং মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার। একটি নৌপথের আংশিক সংকটের কারণেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে দুটি প্রণালী একসঙ্গে সম্পূর্ণ বন্ধ হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা সহজেই বোঝা যায়।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত বিমা খরচ ২০২৬ সালের মার্চে সর্বোচ্চ আড়াই থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এর ফলে একটি বড় তেলবাহী ট্যাংকারের প্রতিবার পারাপারে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫০ লাখ ডলার।
যুদ্ধের আগে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭১ ডলার থাকলেও ২০২৬ সালের মার্চে তা ১১২ থেকে ১২০ ডলারে পৌঁছায়। সংকটের চরম মুহূর্তে তা ১৫০ ডলারও স্পর্শ করেছিল। পরে যুদ্ধক্ষেত্রে স্থবিরতা এলে দাম কমে ৮৫ ডলারে নামে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুটি নৌপথ একসঙ্গে বন্ধ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
হুথিদের বক্তব্যেও একই ইঙ্গিত মিলেছে। গত ১৫ জুলাই এক জ্যেষ্ঠ হুথি কর্মকর্তা যৌথ কৌশলে প্রণালী দুটি বন্ধ করে তেলের দাম ২০০ ডলারে নেওয়ার হুমকি দেন। তবে এটি অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে এবং তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে তাদের এই কৌশলের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আঘাত ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে কোনো পারমাণবিক বোমার প্রয়োজন নেয়, কৌশলগত এই নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই ইরানের জন্য যথেষ্ট।
একটি প্রণালী বন্ধের সফলতাই তেহরানকে একই কৌশলের পুনরাবৃত্তিতে উৎসাহিত করেছে। দ্বিতীয় আরেকটি প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তাদের দরকষাকষি ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা দ্বিগুণ করবে। এই লক্ষ্যেই তারা সহযোগী হুথি ও হর্ন অব আফ্রিকার নতুন মিত্র আশ-শাবাবকে দিয়ে বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর অভিজ্ঞতাই লোহিত সাগরে দুই বৈরী গোষ্ঠীর অপ্রত্যাশিত অংশীদারত্বে বাস্তব রূপ পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি সংকটের সময়ে ‘বিকল্প পথের পুরোনো নিয়ম’ ভেঙে দিচ্ছে। আগে পারস্য উপসাগর বা লোহিত সাগরের একটি বন্ধ থাকলে অন্যটি সচল থাকত। কিন্তু দুটি প্রণালী একসঙ্গে বন্ধ হলে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পৌঁছানোর সংক্ষিপ্ত কোনো পথ থাকবে না। তখন পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যাতায়াতে সময় ও খরচ ব্যাপক বাড়বে। একটি নৌপথের আংশিক সংকটে সুয়েজ খাল যেখানে অর্ধেকের বেশি রাজস্ব হারিয়েছে, সেখানে দুটি পথ পুরোপুরি বন্ধ হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা স্পষ্ট।
আরবি আর্টিকেল থেকে সংক্ষেপে অনূদিত










