আল জাজিরার প্রতিবেদন

গাজায় যুদ্ধরিবরিত চুক্তির নয় মাস: কী কী হয়েছে এবং সামনে যা হতে পারে 

ছবি : আল জাজিরা
ছবি : আল জাজিরা

গত অক্টোবরে কাগজে-কলমে গাজায় যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যায়নি।

শারম আশ-শেখে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৯ মাস কেটে গেছে। চুক্তিটি এখনো প্রথম ধাপেই আটকে আছে। দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে দখলদার ইসরায়েলের ওপর সুস্পষ্ট কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল। ইসরায়েল সেই দায়বদ্ধতা পূরণের পরিবর্তে উল্টো গাজায় দখলদারিত্ব বিস্তার ও নতুন করে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করছে।

শর্ত লঙ্ঘন করে প্রতিদিনই হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল; মানছে না নিজেদের কোনো প্রতিশ্রুতিও। উল্টো তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ (ইয়েলো লাইন) পশ্চিম দিকে সরিয়ে নিয়ে গাজা উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকাই এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অথচ চুক্তিতে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার এবং উপত্যকাটি পুনর্গঠনের স্পষ্ট অঙ্গীকার করা হয়েছিল। 

এদিকে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত হামাস চুক্তির সব শর্ত পুরোপুরি মেনে চলার দাবি করলেও, ইসরায়েলি হামলায় মৃত্যুর মিছিল থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চুক্তি স্বক্ষরের পর থেকে  ১ হাজার ১২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে; আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৫৯৯ জন।

চুক্তিতে কী আছে?

মিসরের শারম আশ-শেখ শহরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কয়েক দিনের পরোক্ষ আলোচনা শেষে এই চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় তুরস্ক, মিসর ও কাতারের প্রতিনিধিদলও অংশ নেয়।

প্রথম ধাপে রয়েছে:

  • যুদ্ধবিরতি: সাময়িকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
  • গাজায় ত্রাণ সরবরাহ: গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা বা ত্রাণ পাঠানো।
  • ইসরায়েলি বন্দি ও মরদেহ হস্তান্তর: জীবিত ইসরায়েলি বন্দি এবং নিহতদের মরদেহ হস্তান্তর করা।
  • ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি ও মরদেহ হস্তান্তর: ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জীবিত ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি এবং মৃত বন্দিদের মরদেহ হস্তান্তর।
  • সেনা প্রত্যাহার: ‘হলুদ রেখা’ (ইয়েলো লাইন) হিসেবে পরিচিত সীমানা পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা।

দ্বিতীয় ধাপ

গত ১৪ জানুয়ারি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেন। এই ধাপে গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত বেশ কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই ধাপের মূল লক্ষ্য হলো সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা সামরিক উত্তেজনা প্রশমন থেকে স্থায়ী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

দ্বিতীয় ধাপে যা রয়েছে:

  • অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠন: গাজার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা অস্থায়ী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
  • টেকনোক্র্যাট সরকার প্রতিষ্ঠা: বিশেষজ্ঞ বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ‘টেকনোক্র্যাট’ শাসন ব্যবস্থা চালু করা।
  • পুনর্গঠন কাজ শুরু: যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা নতুন করে গড়ে তোলার কাজ শুরু করা।
  • নিরস্ত্রীকরণ: গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করা।
  • ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার: গাজা উপত্যকা থেকে সব ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া।

ক্রমাগত লঙ্ঘন ও বিধিনিষেধ

চুক্তির প্রথম ধাপের শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে চলেছে হামাস। তারা সব ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে। এছাড়া গাজার শাসনভার ‘ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটি’র হাতে ছেড়ে দিতে এবং চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে নিজেদের ‘সরকারি জরুরি কমিটি’ও বিলুপ্ত করেছে তারা। তবে ইসরায়েল পুরো চুক্তিটিকে কেবল হামাসের নিরস্ত্রীকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে।

এদিকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, মৌলিক পণ্য ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহের ওপর ইসরায়েলের টানা বিধিনিষেধের কারণে গাজাবাসী দৈনিক চাহিদা জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে সেখানকার মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

গাজার সরকারি তথ্য কার্যালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী যুদ্ধবিরতি চুক্তি অন্তত ৩ হাজার ৬ শত ৮৯ বার লঙ্ঘন করেছে। এবং চুক্তি অনুযায়ী এখন পর্যন্ত গাজায় যেখানে ১ লাখ ৬৫ হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক ঢোকার কথা ছিল, সেখানে প্রবেশ করেছে মাত্র ৫৮ হাজার ৬৬৪টি ট্রাক। অর্থাৎ, ত্রাণ সরবরাহের ক্ষেত্রে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষার হার মাত্র ৩৫ শতাংশ।

৯ মাসে কিছু বাঁকবদল

তবে গত নয় মাসে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্তমূলক ঘটনা ঘটেছে, যা চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানোর ও অগ্রগতি অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হয়েছিল।

১৬ জানুয়ারি ২০২৬: ‘পিস কাউন্সিল’ বা শান্তি পরিষদ

‘পিস কাউন্সিল’ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত গাজার অন্তর্বর্তীকালীন শাসন কাঠামোর অন্যতম অংশ। যাতে গাজাকে পুনর্গঠন ও উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়টি সমন্বয় করার কথা রয়েছে ।

সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকার বেশ কিছু এলাকায় মানবিক আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিচালনার জন্য ‘পিস কাউন্সিল’ পরীক্ষামূলকভাবে একটি প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। গাজার বাসিন্দাদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করবে ফিলিস্তিনের একদল প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি টেকনোক্র্যাট কমিটি। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এই কমিটির নাম ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর ম্যানেজিং গাজা’। তারা এই এলাকার সামগ্রিক প্রশাসনের দায়িত্বেও থাকবে। অন্যদিকে, জাতিসংঘ সমর্থিত আন্তর্জাতিক বহুজাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনীর (মাল্টিন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সেস) সহায়তায় বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত পুলিশ বাহিনী সেখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করবে।

তবে এই পরিষদের সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী—-  এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অন্য সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, গাজায় যেখানে ২০ হাজার সদস্য মোতায়েন করার কথা, সেখানে মাত্র ২০ জন সদস্য মোতায়েন করতেই হিমশিম খাচ্ছে ‘পিস কাউন্সিল’।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী এই সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রথমে গাজা থেকে ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে কারেম আবু সালেম ক্রসিংয়ের কাছাকাছি একটি নির্দিষ্ট স্থানে তাদের মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ওয়াশিংটনের বে আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রধান পাওলো ভন শিরাখ অবশ্য মনে করেন, পিস কাউন্সিল যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে তারা এখন পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

ভন শিরাখ আরও স্পষ্ট করে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী পিস কাউন্সিলের কাজ ছিল ধাপে ধাপে গাজার শাসনভার নিজেদের হাতে নেওয়া। একই সঙ্গে সেখানে শান্তি রক্ষা বাহিনী মোতায়েন ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিও তাদের তদারকি করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিই এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

২১ মে: ম্লাদেনভ রোডম্যাপ 

গাজা পিস কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক নিকোলাই ম্লাদেনভ গাজা উপত্যকা নিয়ে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৫ দফার একটি ‘রোডম্যাপ’ তুলে ধরেন। 

ম্লাদেনভের এই রোডম্যাপে গাজার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন, নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনীর কার্যক্রম এবং পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। 

১৮ জুন: প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নমনীয়তা 

ইসরায়েল যখন চুক্তি লঙ্ঘন করে নানাভাবে এর মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা ম্লাদেনভের একটি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ম্লাদেনভের ওই প্রস্তাবের আদ্যোপান্ত মূলত ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গি ও তাদের আখ্যানেরই প্রতিফলন ছিল।

হামাস জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও এর দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী এবং আন্তর্জাতিক পিস কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের আলোচনায় ‘ব্যাপক সমঝোতা ও বড় ধরনের অগ্রগতি’ হয়েছে।

সে সময় দলটির মুখপাত্র হাজেম কাসেম জানান, আলোচনায় গাজা উপত্যকায় ‘ন্যাশনাল কমিটি’র প্রবেশ ও আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের অস্ত্র রাখার বিষয়টিও স্থান পেয়েছে—যা ‘সব পক্ষের কাছে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য একটি রূপরেখার আওতায়’ আলোচনা করা হয়েছে। 

তবে ইসরায়েল ম্লাদেনভের পেশ করা এই নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে কোনো সাড়া দেয়নি। উল্টো বিশ্লেষকদের মতে, তারা এমন একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আবার একেবারে শুরুর জায়গায় (শূন্যবিন্দুতে) ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।

৬ জুলাই: হামাস কর্তৃক জরুরি কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা

একটি নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহে, গাজার সরকারি দফতর আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ‘সরকারি জরুরি কমিটি’ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে কমিটির প্রধান মোহাম্মদ জাওয়াদ আল-ফারার পদত্যাগ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের যাবতীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথাও জানানো হয়েছে।

এই পদক্ষেপটিকে ঘিরে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল হিসেবে দেখছেন, যা ইসরায়েলকে এক পাশে ঠেলে দিয়েছে এবং তাদের নতুন করে গণহত্যা চালানোর সব অজুহাত বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, তেল আবিব এই পদক্ষেপের আন্তরিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছে।

হলুদ রেখা এবং গাজায় বসতি স্থাপনের আহ্বান 

তবে পূর্বের এই প্রচেষ্টাগুলো মাঠপর্যায়ে ইসরায়েলের অনড় অবস্থানের মুখে বারবার হোঁচট খেয়েছে। তারা ক্রমাগত ‘হলুদ রেখা’ বা ‘ইয়েলো লাইন’ স্থানান্তরের মাধ্যমে গাজার ভূমির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এই হলুদ রেখা মূলত গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে ইসরায়েল কর্তৃক জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া একটি নিরাপত্তা বলয় (বাফার জোন), যার আশপাশের এলাকাগুলোতে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

রয়টার্সের  বর্ণনা অনুযায়ী, ইরানের সাথে যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ববাসীর ব্যস্ততার সুযোগে  অত্যন্ত নীরবে গাজা উপত্যকার নতুন মানচিত্র জারি করেছে ইসরায়েল। এর মাধ্যমে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিকে ক্রমশ সম্প্রসারিত হতে থাকা একটি নির্দিষ্ট অবরুদ্ধ এলাকার মধ্যে বন্দি করে ফেলা হচ্ছে—যে এলাকার সীমানা যেকোনো মুহূর্তে পরিবর্তন করা হতে পারে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী।

শুরুর দিকে এই হলুদ রেখাটি উপত্যকার অর্ধেক এলাকাকে পৃথক করে রেখেছিল। তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুই মাস পর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূমির পরিমাণ ৫৩% থেকে বেড়ে ৫৮%-এ দাঁড়ায় এবং তখন থেকেই তাদের এই সীমানা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। 

গত মাসের শেষের দিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভোক্তি করে বলেন, তাদের সেনাবাহিনী বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০% এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তার এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, ইসরায়েলি বাহিনী গাজা উপত্যকার ভেতরে তাদের দখলকৃত এলাকার পরিধি ক্রমাগত বাড়িয়েই চলেছে।

বসবাসের উপযোগী অবশিষ্ট জায়গার পরিমাণ মাত্র ১১০ বর্গকিলোমিটারে সংকুচিত হয়ে আসায়, প্রায় ২১ লাখ ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৯ হাজারেরও বেশি মানুষের এক দমবন্ধ ঘনত্বের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে দিনাতিপাত করছেন; যেখানে চারদিকে রয়েছে কেবলই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এবং আশ্রয় ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি।

চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত গণহত্যা এবং নতুন নতুন এলাকা দখলের জেরে ফিলিস্তিনিদের নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। দখলদার বাহিনীর এই ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে এবং জীবন রক্ষাকারী ত্রাণ সরবরাহের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

বিষয়টি কেবল ‘হলুদ রেখা’ স্থানান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং গাজায় পুনরায় বসতি স্থাপন ও নতুন ইসরায়েলি উপনিবেশ গড়ে তোলার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

গত ২৯ জুন ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেতসালেল সমোটরিচ জানান, তারা গাজায় ৩টি নতুন বসতি স্থাপনের রূপরেখা তৈরি করেছেন, যা বাস্তবায়নে এখন কেবল প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অনুমোদনের অপেক্ষা।

এদিকে, উত্তর গাজা সফরের সময় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সেখানকার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে দম্ভোক্তি করেন। একই সাথে তিনি গাজা উপত্যকায় সামরিক ধাঁচের ৩টি নতুন আউটপোস্ট (অননুমোদিত বসতি) গড়ে তোলার পরিকল্পনাও প্রকাশ করেন।

ভবিষ্যৎ কী? ইসরায়েল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ ড. মুহান্নাদ মুস্তফার মতে, ইসরায়েল স্বল্পমেয়াদে গাজা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে চাইছে। অন্যদিকে তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো উপত্যকাটিতে দখলদারিত্ব বজায় রাখা এবং এর ভেতরে সীমানা সম্প্রসারণ করা।

ড. মুস্তফা জানান, এই লক্ষ্য অর্জনে তেল আবিব তিনটি মূল নীতি অনুসরণ করছে: যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেই দৈনিক হামলাকে একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করা, সুপরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সীমানা সম্প্রসারণ করা এবং গাজায় জাতীয় কমিটির প্রবেশ, মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কাজ আটকে দিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ রাখা—যাতে পুরো বিষয়টিকে কেবল একটি সামরিক ও নিরাপত্তা সংকট হিসেবে জিইয়ে রাখা যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ তানানি উল্লেখ করেছেন, চুক্তি বাস্তবায়নে সব অজুহাত দূর করতে হামাস গাজা প্রশাসনের ওপর থেকে নিজেদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারের এবং একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির জন্য পথ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া কায়রোতে ‘ম্লাদেনভ’ প্রস্তাবের বেশিরভাগ ধারার বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ে উত্তরণের জন্য ইসরায়েল সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর চাপ প্রয়োজন; যাতে কেবল মুখে কথা না বলে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে এই মানবিক সংকটের অবসান ঘটানো যায় এবং যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

তবে ইসরায়েলের সব অজুহাত ফুরিয়ে আসার মুখে, মার্কিন ভূরাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্র্যাটফোর’ গাজায় নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর ধসে পড়া জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যদি তিনি একে হামাসের বিরুদ্ধে একটি “আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ” হিসেবে চিত্রায়িত করতে পারেন।

সূত্র: আল-জাজিরা  

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন