ইসলামপন্থীদের সঙ্গে কেন বিরোধে জড়ালেন ইব্রাহিম ট্রাওরে?

ইমামের প্রায় ১০০ সমর্থককে সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি একইভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বোবো-দিউলাসোর ইমাম মাহমুদ বারোকে।
ap_6a5f1c4d99c46-1784618061

বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ট্রাওরে দেশের ইসলামি স্কলার ও ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘উগ্র’ ও ‘চরমপন্থী’ ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তবে সরকারের এই অভিযোগ ও সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে দেশটির মুসলিমদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ।

সম্প্রতি এক বক্তব্যে ট্রাওরে বলেন, ‘র‍্যাডিকাল’ বা ‘চরমপন্থী ইসলাম’-এর কোনো জায়গা বুরকিনা ফাসোয় নেই। যেসব ইসলামি প্রচারককে তিনি কট্টরপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করছেন, তাঁদের উদ্দেশে ট্রাওরে বলেন, ‘যদি এটিই আপনাদের ইসলাম হয়, তবে আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াই করব… চরমপন্থীদের বদলাতে হবে, তা না হলে যুদ্ধ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।’

ট্রাওরে বলেন, ধর্মের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করতে হবে ভালো আচরণের মাধ্যমে, ভয় দেখিয়ে কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। একই সঙ্গে দেশে পাস হওয়া নতুন ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন’-এর বিরোধিতা কিছু মুসলিম কেন করছেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তিনি বলেন, যেসব ইমাম খুতবা বা বক্তব্যে উগ্র বার্তা ছড়াবেন, তাঁদের কার্যক্রম স্থগিত করা হবে। বিপরীতে যাঁরা তাঁর ভাষায় শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ধর্মীয় বার্তা প্রচার করবেন, তাঁদের সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। ট্রাওরের দাবি, বহিরাগত কিছু শক্তি ধর্মকে ব্যবহার করে বুরকিনা ফাসোয় অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

তবে তাঁর কঠোরতা শুধু দেশের ভেতরের ইমাম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নেই। আরব দেশগুলোতে শরিয়াহ নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদেরও দেশে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন ট্রাওরে। তাঁর দাবি, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কোনো ব্যবহারিক পেশাগত দক্ষতা অর্জন না করে বিদেশে ইসলামি শিক্ষা নিচ্ছেন। যাঁরা দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানাবেন, তাঁদের নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

এর আগেই জুনের শেষ দিকে সরকার নির্দেশনা জারি করে, বিদেশে পড়তে যেতে হলে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয় সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করতেই এই ব্যবস্থা।

এরও আগে ২০ জুন অন্তর্বর্তী পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে বিতর্কিত ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন’ অনুমোদন করে। সরকারের ভাষায়, এর উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে আরও সুসংহত করা। আইনে ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের বাধ্যতামূলক ভিক্ষাবৃত্তিতে ঠেলে দেওয়া এবং ধর্মীয় সংগঠনের আর্থিক অস্বচ্ছতার মতো বিষয়ও রয়েছে।

মিত্র থেকে শত্রু

আইনটি পাস হওয়ার আগেই সরকার ও ইসলামি সমাজের বিরোধ রাজপথে গড়ায়। মে মাসের শেষ দিকে প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা করার পর সুন্নি ধারার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ইমাম মুহাম্মদ ইশাক কিনদোকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাম্প্রতিক ভাষণে এই ঘটনা ও পরবর্তী বিক্ষোভের দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাওরে দাবি করেন, একটি ‘ক্ষুদ্র চরমপন্থী সংখ্যালঘু’ই এসব সমস্যার পেছনে রয়েছে।

কিনদোর মুক্তির দাবিতে মুসল্লিরা সমবেত হলে ‘জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার’ আশঙ্কা দেখিয়ে রাজধানী ওয়াগাদুগুর সবচেয়ে বড় সুন্নি মসজিদ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এএফপিকে একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইমামের প্রায় ১০০ সমর্থককে সামরিক ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ অবশ্য একে বলেছে ‘নাগরিক প্রশিক্ষণ’। এর আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি একইভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বোবো-দিউলাসোর ইমাম মাহমুদ বারোকে। টিম্বাকটু ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বিক্ষোভ দমনের পর ইমাম কিনদোর অবস্থার বিষয়ে আর কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এসব ঘটনা ট্রাওরের জন্য নতুন একটি সংকট তৈরি করেছে। টিম্বাকটু ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ হলো, সরকার ও ইসলামি সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এত দিন যে অলিখিত সমঝোতা ছিল, তা এখন ভেঙে পড়ছে। অথচ এই শক্তিগুলোর সমর্থনের ওপরই ট্রাওরের জনপ্রিয়তার একটি অংশ দাঁড়িয়ে ছিল।

ফলে মিত্রদের শত্রুতে পরিণত করে ট্রাওরে নিজের জনসমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিই দুর্বল করার ঝুঁকি নিচ্ছেন। আরও বড় প্রশ্ন হলো, যে নিরাপত্তা সংকটের কথা বলে তিনি এসব কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সেই সংকটেরই এখনো কোনো কার্যকর সমাধান করতে পারেননি।

পটভূমিতে ইসরায়েলি যোগসূত্র

দেশের ভেতরে ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে কড়াকড়ির মধ্যেই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পথে এগোচ্ছেন ট্রাওরে। ওয়াগাদুগুতে ইসরায়েলের নতুন রাষ্ট্রদূত সাইমন সারোসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি এবং তাঁর পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন।

‘আফ্রিকা ইন্টেলিজেন্স’-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে জমা দেওয়া ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের অনুমোদনের আবেদনটি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর অনেকটা নীরবেই অনুমোদন পায়। এত দিন ট্রাওরের পশ্চিমাবিরোধী ভাবমূর্তি ধরে রাখতে ইসরায়েলের সঙ্গে দৃশ্যমান ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে যে সতর্কতা ছিল, এই অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে তারও অবসান ঘটেছে। এমন এক সময়ে এই পরিবর্তন এসেছে, যখন সাহেল অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে ইসরায়েল এবং এসব দেশেরও ইসরায়েলি নিরাপত্তা প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

ফলে একটি বৈপরীত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের ভেতরে ‘চরমপন্থা’ দমনের নামে ইমাম ও ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে ট্রাওরে সরকার, আর একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে। এর মধ্যেই টিম্বাকটু ইনস্টিটিউটের তোলা প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যে ইসলামি সামাজিক শক্তির সমর্থন একসময় ট্রাওরের জনপ্রিয়তার ভিত্তি তৈরি করেছিল, তাদের সঙ্গে এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কি তাঁর নিজের জনসমর্থনের জন্যই নতুন সংকট হয়ে উঠবে? 

সূত্র: আল জাজিরা 

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন