পুরো বিশ্বের চোখ যখন ফুটবলের জমকালো মাঠে , ঠিক তখনই গাজায় দখদারত্ব ও অবরোধ আরও জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নৃশংস সামরিক অভিযান। অথচ বিগত মাসগুলোর তুলনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কভারেজ এবং বৈশ্বিক চাপ, দুই-ই এখন তলানিতে। বিশ্বের এই চরম উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে গাজার মাটিতে প্রতিদিন নতুন নতুন নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল।
গাজা দখলের ইসরায়েলি নীল নকশা!
যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরপরই তথাকথিত এই ‘হলুদ রেখা’ টানা হয়েছিল। নামেমাত্র এটিকে একটি সাময়িক সীমানা বলা হলেও, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে থাকা এলাকাগুলোকে গাজার বাকি অংশ থেকে আলাদা করা। শুরুতে এই রেখার মাধ্যমে গাজা উপত্যকার প্রায় ৫৩% এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইসরায়েলের হাতে।
কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি তারা। পরবর্তী মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতাকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক কংক্রিটের ব্যারিকেড সরিয়ে সামরিক জোনের পরিধি বাড়াতে থাকে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইতিমধ্যে গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা এখন দখলদার বাহিনীর বুটের তলায়, যা খুব দ্রুত সত্তর শতাংশে নিয়ে যাওয়ার এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে দখলদার ইসরায়েল।
ইতিমধ্যে গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা এখন দখলদার বাহিনীর বুটের তলায়, যা খুব দ্রুত সত্তর শতাংশে নিয়ে যাওয়ার এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে দখলদার ইসরায়েল।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে বিমান হামলা এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে দখলদার বাহিনী। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন, পাশাপাশি গাজার বিভিন্ন এলাকায় এখনও অব্যাহত আছে সামরিক অভিযান।
আটকে আছে চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ
যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখনও থমকে আছে। মূলত দখলদার বাহিনীর প্রত্যাহার, ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি বিরোধের জেরেই এই অচলাবস্থা।



এর পাশাপাশি, প্রথম ধাপে যেসব মৌলিক মানবিক শর্তাবলীর ওপর ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলোও চুক্তি অনুযায়ী পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি দখলদার ইসরায়েল। ফলে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি এবং মানবিক সংকটের কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে গাজা
তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’র পশ্চিমে একটি সংকীর্ণ অঞ্চলে গাদাগাদি করে বাস করছেন ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি। এখানকার সিংহভাগ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য একমাত্র মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
এর ওপর দখলদারদের অব্যাহত অবরোধ ও ত্রাণ সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় অনাহার এবং তীব্র পুষ্টিহীনতা চরম আকার ধারণ করছে।
ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্য ও আবাসন খাত
দখলদারদের হামলায় গাজার প্রায় ৮৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র সম্পূর্ণ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে টিকে থাকা হাসপাতালগুলো তীব্র জ্বালানি সংকট, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব সত্ত্বেও তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত রোগী পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন ২০ হাজারেরও বেশি গুরুতর অসুস্থ রোগী।
একই সাথে, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ওপর চালানো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে গাজার প্রায় ৯০ ভাগ বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। চারপাশের এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে লাখ লাখ মানুষের নিজ এলাকায় প্রত্যাবর্তন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
আশা করা হয়েছিল, শারম আশ-শেখ চুক্তি এবং এর পরের সমঝোতাগুলোর হাত ধরে পরিস্থিতি শান্ত হবে ও মানবিক সংকটের উন্নতি ঘটবে। তবে বাস্তবে গাজা উপত্যকা এখন আরও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি।
রাজনৈতিক প্রক্রিয়া স্থবির হওয়ার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের মানবিক চ্যালেঞ্জগুলো ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। মধ্যস্থতাকারীদের চোখের সামনেই এসব ঘটছে, অথচ ঠিক এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের চোখ আটকে আছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের দিকে। যার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে গাজার এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি।










