মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ৭ আগস্ট শুক্রবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান স্বাক্ষর করেছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। তিন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দেওয়া এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর বাইরের কোনো সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে এটি শুধু সহযোগিতার ঘোষণা নয়, বরং পারস্পরিক প্রতিরক্ষার একটি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ।
চুক্তিটি এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণ, সামনে আসছে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ। ফলে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া স্বাভাবিক।
চুক্তির ঘোষিত ধারাগুলোও তাই তিন দেশের সীমা ছাড়িয়ে কিছু বড় প্রশ্ন সামনে আনছে। এটি কি তুলনামূলকভাবে স্বাধীন একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার শুরু? মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ভাবনায় কি বড় কোনো পরিবর্তন আসছে? মিসরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আঞ্চলিক শক্তি কেন এর বাইরে থাকল? আর শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কি নতুন কোনো ‘ইসলামিক ন্যাটো’র ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে?
মক্কা চুক্তির পেছনের প্রেক্ষাপট
এই চুক্তিকে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিরতা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। পরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ সেই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতির পাশাপাশি এর প্রভাব পড়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও সরবরাহব্যবস্থাতেও।
ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সমর্থনের পাশাপাশি বিভিন্ন জলপথ ও যোগাযোগব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও এসব পথ সংঘাতের হাতিয়ারেও পরিণত হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নতুন কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রচলিত কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি ডাভোস ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন একটি অধ্যায়ের শুরুর কথা বলে সেই পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
তবে ‘মক্কা চুক্তি’ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতারই একটি পরিণতি এই চুক্তি। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই এর খসড়া প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসে। তবে পাকিস্তান তখন মনে করেছিল, সই করার সময়টি উপযুক্ত নয় এবং তিন দেশের মধ্যে আরও রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।
প্রতিরক্ষামূলক, কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়
চুক্তিটি ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এটি নিছক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা, নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো সামরিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান অবশ্য শুরুতেই বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, চুক্তির লক্ষ্য সম্মিলিত প্রতিরোধ, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ প্রকল্প এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হবে।
এরদোয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর ধারায় স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকারের ভিত্তিতে তৈরি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এটি ‘কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি’। বরং যারা অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, ভবিষ্যতে তাদের জন্যও এতে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। বিরোধের সমাধানে তুরস্ক সংলাপ ও কূটনীতির পথ এবং আন্তর্জাতিক আইনের নীতি মেনে চলবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
রয়টার্সকে এক তুর্কি কর্মকর্তাও বলেছেন, চুক্তিতে যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা থাকলেও এর চরিত্র পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে একে অপরকে সহায়তাই এর উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি এবং ভবিষ্যতে অন্য আঞ্চলিক দেশও এতে যোগ দিতে পারবে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আগে থেকে থাকা কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি বা ব্যবস্থার বিকল্প হবে না।
তিন দেশের আলাদা তাগিদ
চুক্তির পেছনে তিন দেশের অভিন্ন কিছু স্বার্থ থাকলেও প্রত্যেকের নিজস্ব প্রয়োজনও রয়েছে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিবর্তন তাদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত অবস্থান নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় নিরাপত্তা। মিসাইল ও ড্রোন হামলার হুমকির মধ্যে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের অস্থিরতা মোকাবিলায় এই চুক্তি রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর যে চেষ্টা সৌদি আরব করছে, চুক্তিটি তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।



তুরস্কের হিসাব আবার কিছুটা ভিন্ন। প্রতিরক্ষা শিল্পে আঙ্কারার প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য উপসাগর ও কৌশলগত জ্বালানি রুটগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে ন্যাটোতে তুরস্কের অবস্থান ও ভূমিকার ওপরও পড়তে পারে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের সময়ে এই জোট রিয়াদ ও আঙ্কারার সঙ্গে ইসলামাবাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার সুযোগ তৈরি করছে। ফলে পাকিস্তানের কাছে চুক্তিটি শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; অর্থনীতিকে সহায়তা করা, নিজস্ব প্রতিরক্ষা পণ্যের বাজার বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিরও একটি পথ।
চুক্তি হতে এত দেরি কেন?
তিন দেশের সম্পর্ক যখন গত কয়েক বছরে এতটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং জানুয়ারিতেই চুক্তির খসড়া প্রায় তৈরি ছিল, তখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো কেন? প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক। তবে বিষয়টি শুধু সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ার নয়। চুক্তির চূড়ান্ত রূপ ও ঘোষণার সময় কয়েকটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত হিসাবের ওপর নির্ভর করছিল।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা। কোনো দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দুই দেশের দায়বদ্ধতা কতটা হবে, সেই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কীভাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ঠিক করা প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীও আগে বলেছিলেন, চুক্তির বিষয়ে তিন দেশের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।
এর সঙ্গে ছিল ন্যাটোতে তুরস্কের অবস্থান। নতুন এই জোটকে ন্যাটোর বিকল্প হিসেবে দেখা হলে আঙ্কারার জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত। তাই তুরস্ককে নিশ্চিত করতে হয়েছে, নতুন চুক্তিতে অংশ নেওয়া ন্যাটোর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বিশেষ করে ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারায় থাকা সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতির সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই। গত জুলাইয়ের আঙ্কারা সম্মেলনেও তুরস্ক বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছিল।
রিয়াদেরও ছিল নিজস্ব হিসাব। বাড়তি একটি প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজন থাকলেও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে নতুন কোনো সংঘাত তৈরি করতে চায়নি। তাই চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখে এটিকে এমন একটি আত্মরক্ষামূলক কাঠামোয় আনার প্রয়োজন ছিল, যাতে অন্য কোনো অংশীদারের সংঘাতে সৌদি আরব সরাসরি বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে না পড়ে।
শেষ পর্যন্ত দ্রুত বদলে যাওয়া আঞ্চলিক পরিস্থিতিই চুক্তি ঘোষণার গতি বাড়িয়ে দেয়। জানুয়ারিতে যা ছিল একটি সম্ভাব্য খসড়া, আগস্টে এসে আঞ্চলিক হুমকি ও চ্যালেঞ্জগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তিন দেশ সেই বোঝাপড়াকে একটি স্পষ্ট প্রতিরক্ষা কাঠামোর রূপ দেয়।
সফলতার ভিত্তি
এই জোটের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সক্ষমতা। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল আর্থিক ও অর্থনৈতিক শক্তি, আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতেও রিয়াদ বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ফলে জোটের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তুরস্কের শক্তি তার সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক ইলেকট্রনিক্স, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও গোলাবারুদ তৈরিতে দেশটির সক্ষমতা রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বহুমুখী সামরিক শক্তি, যা তুরস্ককে এই জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করে তুলতে পারে। ন্যাটোর সদস্যপদও জোটটির জন্য সামরিক শক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার একটি বড় উৎস হতে পারে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তুরস্কের বিস্তৃত যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ তার পরমাণু সক্ষমতা। চুক্তিতে এর সরাসরি উল্লেখ নেই, তবে যেকোনো প্রতিরোধের হিসাবেই এটি গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা খাতে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতাও এই জোটকে বাড়তি শক্তি দিতে পারে।
আমরা কি এক ‘ইসলামিক ন্যাটো’র সামনে দাঁড়িয়ে?
এই ত্রিপক্ষীয় জোটকে কেউ কেউ ‘ইসলামিক ন্যাটো’র ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। তবে এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। ন্যাটোর মতো একটি জোট গড়ে উঠতে দীর্ঘদিনের সমন্বয় ও বোঝাপড়া, রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে ঐকমত্য এবং একটি অভিন্ন আঞ্চলিক অবস্থান প্রয়োজন। তিন দেশের মধ্যে এখনো এসবের সবটা তৈরি হয়নি।
জোটটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এর কিছু ধারা স্পষ্ট নয়। তিন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, লক্ষ্য ও কৌশলগত অবস্থানেও পার্থক্য রয়েছে। তার ওপর রয়েছে তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ। এসব স্বার্থ কখনো এক জায়গায় মিলতে পারে, আবার কখনো সংঘাতও তৈরি করতে পারে। তাই একে এখনই পূর্ণাঙ্গ ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা আগাম হয়ে যাবে।



তবে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে যদি জোটটি টিকে থাকে, এর ধারাগুলোর ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা দূর করা যায় এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এটি এগিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তাহলে এটি নতুন এক মধ্যপ্রাচ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে গড়ে উঠতে পারে একটি সুসংহত আঞ্চলিক ইসলামিক জোট, যা শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তা সমীকরণে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।
মিসর কেন অনুপস্থিত?
নতুন এই প্রতিরক্ষা জোটে মিসরের অনুপস্থিতি তাই আলাদা করে নজর কেড়েছে। বিশেষ করে মার্কিন-ইরান যুদ্ধের সময় আঞ্চলিক সমন্বয়ের জন্য গঠিত চারদলীয় কার্যপদ্ধতিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কায়রোও ছিল। এবার জোটের বাইরে থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, তিন দেশের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার এক নয়। পাকিস্তানের প্রধান হিসাব ভারতকে ঘিরে, সৌদি আরবের নজর ইরান ও তার মিত্রদের দিকে। তুরস্কের নিরাপত্তা ভাবনা সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও ককেশাস পর্যন্ত বিস্তৃত। মিসরের অগ্রাধিকার আবার গাজা, সিনাই, সুদান, লিবিয়া, লোহিত সাগর, হর্ন অব আফ্রিকা, সুয়েজ খাল এবং নীল নদ ও ইথিওপিয়ার পানি নিয়ে বিরোধকে ঘিরে।
দ্বিতীয়ত, জোট নিয়ে মিসরের নিজস্ব নীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কায়রো এমন কোনো সামরিক দায়বদ্ধতায় জড়াতে চায় না, যা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয় বা তার সরাসরি অগ্রাধিকারের বাইরে থাকা কোনো সংঘাতে টেনে নেয়। বরং মিসর অংশীদারত্ব বহুমুখী রাখা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বজায় রাখার পক্ষপাতী। সরাসরি সংঘাতের চেয়ে কূটনীতি ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণকেই তারা বেশি গুরুত্ব দেয়।
এর সঙ্গে রয়েছে চুক্তির কিছু ধারা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন। সংকটের সময় জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে? কোনো ঘটনাকে সামরিক হামলা হিসেবে বিবেচনা করবে কে? সামরিক সিদ্ধান্তে সদস্যদের মধ্যে মতভেদ হলে প্রতিটি দেশের দায়বদ্ধতার সীমা কতটুকু হবে? মিসরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির জন্য এসব প্রশ্ন আরও সংবেদনশীল। তাই জোটের নিয়মকানুন ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার সীমা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কায়রোর সময় নেওয়াকে কৌশলগত সতর্কতা হিসেবেই দেখা যায়।
জোটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
এই জোটের সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জই হলো তিন দেশের ভিন্ন নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি। পাকিস্তান যাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি মনে করছে, সৌদি আরব বা তুরস্ক তা একইভাবে নাও দেখতে পারে। আবার সৌদি আরব বা তুরস্কের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো হুমকিকে পাকিস্তানও একই মাত্রায় নাও দেখতে পারে। ফলে কোনো সংকটে তিন দেশ একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এর সঙ্গে রয়েছে ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তুরস্কের অবস্থান। আঙ্কারা ন্যাটোর প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার কথা বলেছে। কিন্তু ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারায় একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির দায়বদ্ধতার কারণে তুরস্ক কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর যদি তাদের নিজেদের ভূখণ্ডেও হামলা হয়, তাহলে দুই জোটের প্রতি তাদের দায়িত্ব কীভাবে সমন্বিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই পরিস্থিতিতে যৌথ প্রতিরক্ষা ধারাটির ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের ধরন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। চুক্তিটি যে প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি, এ কথা বারবার বলা হচ্ছে। তাই যৌথ প্রতিরক্ষার অর্থ যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া, এমনটি নাও হতে পারে। শুরুতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, লজিস্টিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহায়তার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হলে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই জোট আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিন দেশের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা একে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা শুধু সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ভিন্ন স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি সামলে চলার ক্ষমতা এবং জোটের কার্যক্রম ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার সীমা স্পষ্ট করা।
তাই আসল পরীক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরে নয়, এরপর কী হয়, তাতে। এই জোট কি আগের অনেক আঞ্চলিক চুক্তির মতো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি কার্যকর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধব্যবস্থায় পরিণত হবে? মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা মানচিত্রে এর জায়গা শেষ পর্যন্ত কোথায় হবে, সেই উত্তর মিলবে আগামী দিনের পদক্ষেপেই।
মূল : ইমাদ আনান
মিশরীয় সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি/মিডিয়া গবেষক


