ইউরোপীয়দের নরমাংস ভক্ষণের গোপন ইতিহাস

আমরা একেকজন মুসলিমের মৃতদেহ থেকে এক বা দুই টুকরো মাংস কেটে নিতাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তো ঝলসানোর অপেক্ষাও করত না, বরং বন্য পশুর মতো কাঁচা মাংসই দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খেত।’
ছবি : এ আই
ছবি : এ আই

`ইউরোপীয়রা নরখাদক’—এই বাক্যটি যারা পড়ে তাদের অনেকেই হয়তো বিশ্বাস তো করে ঠিক কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা এর একটি রূপক অর্থ খুঁজে নেন। তারা অবচেতন মনেই ধারনা চলে যায় ঔপনিবেশিক শাসন, নির্মমতা, ভিনদেশি সম্পদ লুণ্ঠন এবং স্থানীয়দের হত্যা বা নির্যাতনের ইতিহাসের দিকে।

নরখাদক—শব্দটি শুনলেই বিশ্বজুড়ে এমন এক সম্মিলিত মানসিক চিত্র ভেসে ওঠে যে, এই ঘৃণ্য প্রথাটি বুঝি কেবল আফ্রিকান উপজাতিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পশ্চিমা বিশ্বের দাবি অনুযায়ী, আফ্রিকানরা অনগ্রসর জাতি বলেই এমনটা করে থাকে। আর ইউরোপীয়রা? তারা তো সভ্যতা, প্রগতি এবং উৎকর্ষের ধারক; তাদের দ্বারা এমন জঘন্য কাজ কি আদৌ সম্ভব?

যাই হোক, এই লেখায়  ইউরোপের ইতিহাসের এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরা হবে, যা হয়তো ইউরোপের তথাকথিত সেই সভ্যতার মিথকে আরো একবার নাড়িয়ে দেবে।

ফরাসি সাংবাদিকরা ‘ল্য পয়েন্ট’ (Le Point) পত্রিকায় প্রকাশিত একবার এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছেপেছিলেন : ‘১২ ডিসেম্বর ১০৯৮: যেদিন ক্রুসেডাররা মা’রাতুন নুমানের বাসিন্দাদের মাংস ভক্ষণ করেছিল।’

এই প্রতিবেদনে সাংবাদিকরা নিশ্চিত করেছেন যে, জেরুজালেম দখলের অভিযানে ক্রুসেডার সেনাবাহিনীর খাদ্যতালিকায় দখলকৃত শহরের মুসলিম বাসিন্দাদের মাংস ছাড়া আর কিছুই ছিল না। প্রতিবেদনটিতে ১০৯৮ সালের ১২ ডিসেম্বর মা’রাতুন নুমান শহরে ক্রুসেডারদের প্রবেশের পর সংঘটিত সেই ভয়াবহ গণহত্যার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে, সেদিন সেখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

সেই অভিযানের এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়—‘তারা মুসলিমদের বড় বড় ডেকচিতে সেদ্ধ করত এবং শিশুদের মাংস শিকে গেঁথে আগুনে ঝলসিয়ে খাওয়ার জন্য পরিবেশন করত।’ অন্য একজন ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন—‘আমরা একেকজন মুসলিমের মৃতদেহ থেকে এক বা দুই টুকরো মাংস কেটে নিতাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তো ঝলসানোর অপেক্ষাও করত না, বরং বন্য পশুর মতো কাঁচা মাংসই দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খেত।’

আচ্ছা চলুন, ইতিহাসের আরো কিছুটা গভীরে গিয়ে দেখি, নরমাংস ভক্ষণের এই ঘটনা কি ইউরোপীয়দের জীবনে নিতান্তই সাময়িক কোনো বিষয় ছিল, নাকি তা ছিল তাদের ইতিহাসের শিকড়ে প্রোথিত?

চিকিৎসায় নরমাংস: এক অন্ধ বিশ্বাস

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ইউরোপে ওষুধ মনে করে মৃত মানুষের মাংস ভক্ষণ মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয়রা ব্যাপকভাবে নরমাংস ভক্ষণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাদের বিশ্বাস ছিল, এতে বিভিন্ন রোগ নিরাময় হয়। এই চর্চা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। চার্চের যাজক থেকে শুরু করে রাজপরিবারের সদস্যরা—মৃতদেহের অংশবিশেষ পাওয়ার জন্য মোটা অংক খরচ করতে দ্বিধা করতেন না কেউই।

সদ্যমৃত ব্যক্তির লাশ দাফনের আগেই তা সংগ্রহ করা সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও, ইউরোপীয়রা মূলত মমি সংগ্রহের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করত। চিকিৎসকরা এই মমিগুলোকে গুঁড়ো করে পাউডার বানাতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, এটি অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বন্ধ করার মহৌষধ।

মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের চিকিৎসায় তারা মমির মাথার খুলি চূর্ণ করে পানীয়ের সাথে মিশিয়ে সেবন করত। ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস (Charles II) তো নিজের জন্য এক বিশেষ ভেষজ ফর্মুলা তৈরি করেছিলেন, যার মূল উপাদান ছিল মানুষের মাথার খুলির গুঁড়ো ও অ্যালকোহলের মিশ্রণ।

ইউরোপীয়দের নরমাংসের ব্যবহার কেবল এখানেই থেমে থাকেনি। চিকিৎসকরা বাহ্যিক ক্ষতের নিরাময়ের জন্যও মানবদেহের চর্বি ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন। দগদগে কোন ক্ষত সারিয়ে তোলা, গেঁটে বাত বা বাহ্যিক প্রদাহ কমানোর জন্য তারা কাপড়ের টুকরো মানুষের চর্বিতে ভিজিয়ে ক্ষতের ওপর বেঁধে দিতেন। তৎকালীন ইউরোপীয় চিকিৎসকদের কাছে মানুষের রক্ত ছিল সব রোগ সারাতে সক্ষম কোন আরাধ্য উপাদান। তারা নির্দ্বিধায় রোগীদের জন্য রক্তের প্রেসক্রিপশন দিতেন।

এই অদ্ভুত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসারের সাথে সাথে বিগত শতাব্দীগুলোতে ইউরোপ এক ধরনের গণ-হিস্টিরিয়া বা উন্মাদনার মধ্য দিয়ে গেছে। ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর দেখার জন্য মানুষের ঢল নামতো, আর মৃত্যুদণ্ড শেষ হওয়ামাত্রই মৃতদেহের অংশবিশেষ কেনার জন্য তারা কাড়াকাড়ি শুরু করত এবং কাঙ্ক্ষিত অংশ পাওয়ার জন্য নিলামের হাকডাক তুলে মোটা অংক প্রদান করত।

এর ফলে কবর খুঁড়ে লাশ চুরির ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। চোরেরা সদ্য কবর দেওয়া লাশ তুলে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করত। অন্যদিকে দরিদ্ররা সামান্য অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসকদের কাছে নিজেদের রক্ত বিক্রি করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ত।

মৃতদেহের অংশ খাওয়ার এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একটি ভুল ধারণা কাজ করত। তারা বিশ্বাস করত, মানুষের মাংস খেলে মৃত ব্যক্তির জীবনীশক্তি ও তেজ তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে। এ কারণেই টগবগে তরুণদের মৃতদেহের দাম ছিল আকাশচুম্বী। ঊনবিংশ শতাব্দীর পুরোটা জুড়েই মৃগীরোগসহ নানা ব্যাধির চিকিৎসায় মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের এই ধারা অব্যাহত ছিল পুরো ইউরোপজুড়ে।

প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপে নরমাংস ভক্ষণ: সংস্কৃতি না প্রয়োজন?

সম্প্রতি এক গবেষণায় হাজার বছর আগে ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে নরমাংস ভক্ষণের এমন এক ‘চরম সত্য’ উন্মোচিত হয়েছে, যা ইউরোপের সভ্য-ভব্যের প্রচলিত ধারণাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। সাধারণত সবার ধারনা ছিল যে, এই প্রথা কেবল আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ঐতিহাসিক গবেষণা বলছে, প্রায় ১৫,০০০ বছর আগে ইউরোপে নরমাংস ভক্ষণ ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ারই এক স্বাভাবিক অংশ। মানুষ কেবল ক্ষুধার তাড়নায়ই নয়, বরং তাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই মৃতদের মাংস ভক্ষণ করত।

ইংল্যান্ডের ‘গফ’স কেভ’ (Gough’s Cave)-এ মানুষের হাড় ও খুলি দিয়ে তৈরি পানপাত্র পাওয়া গিয়েছিল। ‘কোয়াটারনারি সায়েন্স রিভিউ’ (Quaternary Science Review) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।

গবেষকরা প্রাগৈতিহাসিক ‘ম্যাগডালেনিয়ান’ (Magdalenian) যুগের ওপর অনুসন্ধান চালিয়েছেন। লন্ডনের ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম’-এর বিশেষজ্ঞরা ৫৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান চিহ্নিত করেছেন, যেখানে মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, রাশিয়া, ব্রিটেন, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র এবং পর্তুগালে অবস্থিত।

এর মধ্যে ১৫টি স্থানে মানুষের হাড়ে কামড়ের দাগ, খুলির হাড় কাটার চিহ্ন এবং হাড় ভেঙে মজ্জা বের করার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা নিঃসন্দেহে নরমাংস ভক্ষণের ইঙ্গিত দেয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের দেহাবশেষের সাথে পশুর হাড়গোড় মেশানো অবস্থায়ও পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপজুড়ে এই প্রথাগত আচরণ প্রমাণ করে যে, নরমাংস ভক্ষণ ছিল তাদের মৃতদেহ সৎকারেরই একটি পদ্ধতি।

এখানে সুস্বাদু স্বাস্থকর নরমাংস পাওয়া যায়

আশঙ্কার বিষয় হলো, ইউরোপীয়রা হয়তো তাদের এই ইতিহাস পুনরায় আবিষ্কার করে সেই জঘন্য প্রথা ফিরিয়ে আনতে পারে। হয়তো একদিন দেখা যাবে, একজন মানুষ তার ভাই কিংবা বাবার মাংস নৃশংসভাবে ভক্ষন করছে এবং এরপর তারা ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সভ্যতা’-র দোহাই দিয়ে এই প্রথা বিশ্ববাসীর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, যে যুগে যে জাতি একজন পুরুষ পুরুষের সাথে এবং নারী নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ নারীতে এবং নারী পুরুষে রূপান্তরিত হয়—আর এই অধঃপতনকে নাম দেওয়া হয় ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সভ্যতা’—সে যুগে সবকিছুকেই রাখতে হয় সম্ভবনার কাতারে। যারা এই বিকৃতি ও মানবীয় অবক্ষয়ের বিরোধিতা করে, তাদের বলা হয় পশ্চাৎপদ। তাই নরমাংস ভক্ষণকেও হয়তো একদিন আধুনিকতার মোড়কে উপস্থাপন করা হবে, হয়তো রেস্টুরেন্টগুলোর বিলবোর্ডে ঝুলবে ‘এখানে সুস্বাদু স্বাস্থকর নরমাংস পাওয়া যায়’ এর ব্যানার।

সূত্র : মাজাল্লাতুল বায়ান