বিবিসির একপেশে প্রতিবেদন

ক্ষুধার তাড়নায় আফগানরা কি সত্যিই সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছে ? 

আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমগুলো আফগান জনগণের পাশে না দাঁড়িয়ে একে কেবলই বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রায়িত করছে।
পশ্চিমা মিডিয়ার একমুখী ম্যানুফ্যাকচার্ড ন্যারেটিভ বনাম আফগান বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ

​২০২১ সালের আগস্টে কাবুলে মার্কিন মদদপুষ্ট আশরাফ গনি সরকারের পতনের পর থেকে আফগানিস্তানের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। দীর্ঘ দুই দশকের মার্কিন-ন্যাটো আগ্রাসন এবং তৎকালীন পুতুল সরকারের নতজানু রাষ্ট্রনীতি দেশটির অর্থনীতিকে এক ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তবে বর্তমান আফগানিস্তানের এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় যতটা না কাঠামোগত বাস্তব, তার চেয়ে অনেক বেশি কৃত্রিম ও রাজনৈতিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া। প্রায় সাড় নয় বিলিয়ন ডলারের আফগান জাতীয় রিজার্ভ অন্যায়ভাবে জব্দ করে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা ব্যাংকগুলো। অথচ এই সত্যকে আড়াল করে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোতে কিছুদিন পরপরই আফগানিস্তানের দারিদ্র্য ও বিপর্যস্ত জনপদকে একপেশেভাবে ফোকাসে আনা হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো বর্তমান ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান সরকারের ওপর সব দায় চাপিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট মিডিয়া ন্যারেটিভ বা রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করা।

​নিশ্চিতভাবেই ২০ বছরের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধাবস্থা আফগানিস্তানে দারিদ্র্য বাড়িয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি একটি বৈশ্বিক মানবিক উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমগুলো আফগান জনগণের পাশে না দাঁড়িয়ে একে কেবলই বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রায়িত করছে। এই দ্বিমুখী নীতির অসারতা প্রমাণে পশ্চিমা মিডিয়ার আখ্যান, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং খোদ দক্ষিণ এশিয়াসহ পশ্চিমা বিশ্বের নিজস্ব দারিদ্র্যের রূপরেখা নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

​বিবিসির ‘সন্তান বিক্রির’ আখ্যান: প্রচারণার আড়ালে যে সত্য লুকায়িত

​ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (BBC) ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের ‘ঘোর’ (Ghor) প্রদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনগুলোর মূল উপজীব্য ছিল চরম ক্ষুধার তাড়নায় আফগান পরিবারগুলো তাদের সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

বিবিসি ফিরোজকোহ (Firozkoh) শহরের সাইদ আহমেদ নামক এক ব্যক্তির উদাহরণ দেয়, যিনি তার পাঁচ বছর বয়সী কন্যা শাইকাকে ২,০০,০০০ আফগানির বিনিময়ে এক আত্মীয়ের কাছে হস্তান্তরে বাধ্য হন। কারণ ছিল মেয়ের অ্যাপেনডিসাইটিস ও লিভার সিস্টের চিকিৎসার খরচ মেটানো। একইভাবে আব্দুল রশিদ আজিমির গল্পে বলা হয়, তিনি তার জমজ কন্যাসন্তানদের একজনকে বিক্রির ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বাকিদের বাঁচানোর তাগিদে।

​প্রতিবেদনে ঘোর প্রদেশের কবরস্থানে বড়দের চেয়ে শিশুদের কবরের সংখ্যা দ্বিগুণ দেখিয়ে দাবি করা হয় যে, নবজাতকের মৃত্যুহার ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। স্থানীয় নার্স ফাতেমা হোসেনীর বরাতে এর কারণ হিসেবে মায়েদের অপুষ্টির কথা বলা হয়।

​এই চিত্রগুলো অত্যন্ত মর্মান্তিক হলেও পশ্চিমা মিডিয়া একে সামগ্রিক আফগানিস্তানের সাধারণ চিত্র হিসেবে সচলীকরণের করার অপচেষ্টা চালায়। প্রকৃত পক্ষে আফগানিস্তানে ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা নেতিবাচক মোকাবিলা কৌশল- যেমন; চরম সংকটে পরিবারগুলোর মধ্যে শিশু বিবাহ বা শ্রমের বিনিময়ে স্বজনদের কাছে শিশু হস্তান্তরকে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো চটকদার শব্দবন্ধ ‘সন্তান বিক্রি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করেছে। কিন্তু এই সংকটের মূল উৎস যে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যাংকিং অবরুদ্ধতা—যা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে বাধা সৃষ্টি করছে—তা এই সমস্ত প্রতিবেদনে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

​কাউন্টার-ন্যারেটিভ: কৃত্রিম অর্থনীতি বনাম স্বনির্ভরতার সংগ্রাম

​পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের এই একপেশে বয়ানের বিপরীতে ইমারতে ইসলামিয়া কর্তৃপক্ষ এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও যৌক্তিক একটি কাউন্টার-ন্যারেটিভ তুলে ধরছেন।

আফগানিস্তানের মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত এই আন্তর্জাতিক প্রচারণার জবাবে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেন, বিগত ২০ বছরের মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর উপস্থিতির সময় আফগানিস্তানে একটি কৃত্রিম অর্থনীতি তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি সম্পূর্ণভাবে বিদেশি ডলারের অবৈধ প্রবাহ এবং দাতাগোষ্ঠীর দানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ২০২১ সালে সেই কৃত্রিম ডলারের প্রবাহ আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অর্থনীতিতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ দায় পূর্ববর্তী পুতুল শাসন ব্যবস্থা এবং বিদেশি দখলদারদের। বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি পেয়েছে।

তবে পশ্চিমা প্রোপাগান্ডাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় ও দুর্নীতি দমনে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই তারা ১৭৪.১ বিলিয়ন আফগানি রাজস্ব আদায় করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। দুর্নীতিমুক্ত কর ব্যবস্থা এবং চোরাচালান বন্ধ করার মাধ্যমে এই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছে। সাথে আরও যুক্ত হয়েছে সম্পূর্ণ সুদমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। 

মিডিয়া ওয়াচডগদের চোখে পশ্চিমা ভণ্ডামি

কলম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউ (CJR) এবং ফেয়ারনেস অ্যান্ড একিউরেসি ইন রিপোর্টিং (FAIR)-এর মতো নিরপেক্ষ সংবাদ পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো পশ্চিমা মিডিয়ার এই দ্বিচারিতার তীব্র সমালোচনা করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় আমেরিকার মূলধারার টেলিভিশনগুলো যে পরিমাণ মিডিয়া কাভারেজ দিয়েছিল (প্রায় ৪২৭ মিনিট), তার তুলনায় পরবর্তীতে আফগানিস্তানের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের সময় কাভারেজ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে মাত্র ২১ মিনিটে নামিয়ে আনা হয়। সাংবাদিক অ্যাডাম জনসনের মতে, পশ্চিমা মিডিয়ার নৈতিক মানদণ্ড আফগান জনগণের মঙ্গল নয়, বরং মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত স্বার্থের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়।

​সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা: স্থিতিশীলতা বনাম স্থবিরতা (২০২৪-২০২৫)

​আফগানিস্তানের বর্তমান অর্থনীতি একটি নিম্ন-স্তরের ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তীব্র বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও ২০২৪ সালে আফগানিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২.৫ থেকে ২.৭ শতাংশ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু আয় কিছুটা সংকুচিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ‘আফগান ফান্ড’ নামে একটি ওয়াশ-আউট তহবিল গঠন করে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার সেখানে স্থানান্তর করার নাটক করলেও আজ অবধি তার একটি সেন্টও আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পৌঁছায়নি। এই তারল্য সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার নিজস্ব খনিজ সম্পদ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ওপর ভর করে মুদ্রা [আফগানি (AFN)]-এর মানকে একটি বড় সময় ধরে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে।

​এছাড়া ২০২৪ সালে পাকিস্তান সরকারের ইললিগ্যাল ফরেনার্স রিপ্যাট্রিয়েশন প্ল্যান (IFRP)-এর আওতায় প্রায় ৯ লাখ আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক পুশব্যাক করা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সাহায্য ছাড়াই ইমারতে ইসলামিয়া সরকার এই বিপুল জনসংখ্যার পুনর্বাসনের ব্যবস্থাপনা করছে। এটি তাদের প্রশাসনিক সক্ষমতার বড় পরিচয় বহন করে। একইসাথে যুদ্ধাবস্থার ফলে পাকিস্তানের ওপর বাণিজ্য নির্ভরতা কমিয়ে ইরানের চাবাহার ও বন্দর আব্বাস রুটের দিকে ঝুঁকেছে আফগানিস্তান। ফলে বর্তমানে আফগান বাজারে ইরানের অংশীদারিত্ব ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যেখানে পাকিস্তানের অংশীদারিত্ব নেমেছে ১৬ শতাংশে।

​চীনের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি: অর্থনৈতিক বাস্তববাদ ও আঞ্চলিক সংযোগ

​পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যখন মানবাধিকার ও নারী স্বাধীনতার ধুয়া তুলে আফগানিস্তানকে একঘরে করার নীতি নিয়েছে, তখন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তববাদ (Economic Realism) ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কাবুলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে।

বিআরআই (BRI) ও খনিজ খাতের বিকাশ: আফগানিস্তানকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর সাথে যুক্ত করা বেইজিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য। চীনের কোম্পানিগুলো আমু দরিয়া তেল ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়িয়েছে এবং লোগার প্রদেশে একটি বিশাল সিমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। ২০২৪-২৫ সালে খনি খাত থেকে তালেবানের আয়ের একটি সিংহভাগ এসেছে চিনা বিনিয়োগ থেকে।

নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা ও শুল্কমুক্ত সুবিধা: চীন আন্তর্জাতিক ফোরামে বারবার আফগানিস্তানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। বেইজিং মনে করে, আফগানিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া বানালে সেখানে উগ্রবাদ বৃদ্ধি পাবে, যা চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই ২০২৪ সালের শেষভাগে চীন আফগানিস্তানের পণ্যের ওপর ১০০% শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটি দেশটির রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

আঞ্চলিক মেগা প্রজেক্ট: উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলারের ট্রান্স-আফগান রেলওয়ে এবং তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত (TAPI) গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ২০২৬ সালের মধ্যে পাইপলাইনটি আফগানিস্তানের হেরাত পর্যন্ত পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এটি সফল হলে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক আইসোলেশন চিরতরে কেটে যাবে।

​দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: দারিদ্র্যের রূপ কি কেবল আফগানিস্তানেই এত নির্মম?

​পশ্চিমা মিডিয়া সবসময় আফগানিস্তানের দারিদ্র্যকে একটি সুনির্দিষ্ট ইসলামিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে ফ্রেমিং করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চরম অস্তিত্বের লড়াইকে সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে দেয়।

​বিবিসি আফগানিস্তানের যে নেতিবাচক দিকটির কথা বলছে, তার চেয়েও ভয়াবহ চিত্র বিদ্যমান দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:-

বাংলাদেশের কালাই উপজেলার ‘কিডনি গ্রাম’: British Medical Journal (BMJ) Global Health-এর গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশেও চরম দারিদ্র্য ও কিস্তির ঋণের চাপ মানুষকে অঙ্গ বিক্রিতে বাধ্য করছে। জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার বাউগুনি গ্রামটি আজ বিশ্বজুড়ে ‘এক কিডনির গ্রাম’ নামে পরিচিত। ২০২৩ সালে ‘ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (BMJ) গ্লোবাল হেলথ’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, কালাই উপজেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১.৯৮% থেকে ২.৮৪% মানুষ (প্রতি ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন) অভাবের তাড়নায় দালালের মাধ্যমে মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার ডলারে নিজেদের কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন।

পাকিস্তানের বন্ধকী শ্রম ও অঙ্গ পাচার: বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, পাকিস্তানের লাহোর ও পাঞ্জাবের ইটভাটায় কর্মরত ৫ মিলিয়নেরও বেশি শ্রমিক বংশপরম্পরায় ঋণের জালে আটকা পড়ে নিজেদের কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে ৬ বছরের শিশুরাও কাদা-মাটির অমানবিক কাজে লিপ্ত।

বাল্যবিবাহের বৈশ্বিক রাজধানী ভারত: অর্থনৈতিক সুরক্ষার কৌশল হিসেবে কন্যাসন্তানদের দ্রুত বিয়ে দেওয়ার হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। ইউনিসেফের তথ্যমতে, একক দেশ হিসেবে ভারতেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বাল্যবধূ (প্রায় ১৪ মিলিয়ন) বাস করে।

​আমেরিকা: বেঁচে থাকার লড়াইয়ে রক্তরস বা প্লাজমা বিক্রি: ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এমিলি গ্যালাঘারের সহ-রচিত বিখ্যাত গবেষণা “Blood Money: Selling Plasma to Avoid High-Interest Loans”. এই গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দারিদ্র্যের রূপ অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন এবং নির্মম। পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব এবং আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে লাখ লাখ আমেরিকান টিকে থাকার জন্য নিয়মিত নিজেদের শরীরের রক্তরস বা প্লাজমা বিক্রি করছেন।

​মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্লাজমা সংগ্রহ একটি বহুজাতিক লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। ২০০৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্লাজমা সেন্টার ছিল ৩০০-এর কম, যা ২০২০ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে ৯০০ ছাড়িয়ে যায়। ২০১৯ সালে প্লাজমা বিক্রির সংখ্যা রেকর্ড ভেঙে ৫৩.৫ মিলিয়নে পৌঁছায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকার এই প্লাজমা সেন্টারগুলো মূলত গভীর দারিদ্র্য এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাসকারী শহুরে এলাকাগুলোতে স্থাপন করা হয়ে থাকে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের আমেরিকানরা প্রতি সপ্তাহে দুইবার করে প্লাজমা বিক্রি করে মাসে কয়েকশো এবং বছরে প্রায় ৬,০০০ ডলার আয় করেন। কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাজমা সেন্টার খোলার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার তরুণদের উচ্চ-সুদে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ১৮% হ্রাস পায়। অর্থাৎ আমেরিকার প্রান্তিক মানুষ ঋণ বা অপরাধ এড়াতে নিজের শরীরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে।

ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের চিত্র: ​ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোতে, যেমন হাইতিতে দারিদ্র্যের চিত্র অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এবং কাঠামোগত। বিশ্বব্যাংকের ২০০৮ সালের রিপোর্ট “Poverty in Rural and Urban Haiti” এবং ২০১২ সালের বিশদ রিপোর্ট “Poverty and Inclusion in Haiti: Social gains at timid pace” এর তথ্যসূত্র বলছে, হাইতির প্রায় ৬০% মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে এবং প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জন দৈনিক মৌলিক চাহিদাই পূরণ করতে পারে না। সেখানকার মানুষ টিকে থাকার জন্য শিশুশ্রম, অনানুষ্ঠানিক চরম পরিশ্রম এবং অভিবাসনের মতো নেতিবাচক মোকাবিলা কৌশলের ওপর নির্ভর করে।

অন্যদিকে ইউরোপের তথাকথিত উন্নত ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোতে চরম দারিদ্র্য সরাসরি অঙ্গ বিক্রির মতো দৃশ্যমান রূপ না নিলেও তীব্র জ্বালানি দারিদ্র্য এবং জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের মাধ্যমে তাদের দারিদ্র্য সংকট সামনে আসে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের উপাত্তে দেখা যায়; ইউরোপের প্রায় ৯.৩% নাগরিক (প্রায় ৪ কোটি মানুষ) শীতকালে তাদের ঘর পর্যাপ্ত উষ্ণ বা গরম রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ইউরোস্ট্যাট (Eurostat – Official Statistical Office of the EU)-এর ‘Inability to keep home adequately warm’ শীর্ষক বার্ষিক সূচকে দেখা গেছে, গ্রিস, বুলগেরিয়া, সাইপ্রাসের পাশাপাশি ফ্রান্স ও জার্মানির মতো শীর্ষ অর্থনীতির দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছেন। বিশেষ করে একক অভিভাবক এবং নিম্ন আয়ের প্রবীণ নাগরিকেরা এই ‘হিট অর ইট’ সংকটের প্রধান শিকার।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এক অবর্ণনীয় সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতি বছর শীতকাল এলে লাখ লাখ নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে টিকে থাকার জন্য চরম এক দ্বিধায় পড়তে হয়- টেবিলে খাবার সাজানো নাকি ঘর গরম রাখার হিটার সচল রাখা?

সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে এই নির্মম মানবিক সংকটকে অভিহিত করা হচ্ছে ‘হিট অর ইট’ (Heat or Eat) ডিলিম্বা বা উভয়সংকট হিসেবে। উন্নত ইউরোপের এই প্রচ্ছন্ন দারিদ্র্য প্রমাণ করে, কাঠামোগত অর্থনৈতিক বৈষম্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের একক সংকট নয়, বরং তা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোরও এক বড় সামাজিক ট্র্যাজেডি।

বিবিসি কিংবা নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে তাদের অভ্যন্তরীণ এই ধরনের সংকটগুলো বড় আকারে কভারেজ পায় না। সেখানে নিয়মিত নিজস্ব দারিদ্র্য সংকট নিয়ে আবেগঘন গল্প তৈরি কিংবা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো দেশের সামগ্রিক চিত্র হিসেবে সরলীকরণ করার প্রবণতাও দেখা যায় না। বিপরীতে বাংলাদেশের পশ্চিমা–কপি-পেস্ট মিডিয়াগুলো নিজ দেশের দারিদ্র্য ও বঞ্চিত মানুষের আহাজারি তুলে ধরতে ব্যর্থ তো হচ্ছেই। অধিকন্তু বিবিসির মতো পশ্চিমা ন্যারেটিভের একমুখী সংবাদকে অন্ধভাবে প্রচার করছে, যাতে একটি কৃত্রিম ও স্থানীয় মানবিক সংকটকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা হিসেবে চিত্রায়িত করা যায়। কারণ সেই সরকারের শুরুতে ‘ইসলাম’ শব্দটা যুক্ত আছে।

আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

​আফগানিস্তানের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ার প্রতিবেদনগুলো যে আংশিক চিত্র তুলে ধরেছে, তা নিঃসন্দেহে বাস্তবতার একটি দিক। তবে একে এককভাবে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হলে তা হবে চরম রাজনৈতিক অসততা এবং অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ। আফগানিস্তানের এই সংকটের মূলে রয়েছে ২০ বছরের মার্কিন যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক উত্তরাধিকার, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আকস্মিক সাহায্য প্রত্যাহার এবং সুপরিকল্পিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, যা দেশটির ব্যাংকিং ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অচল করে দিয়েছে। এটি কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক যুদ্ধ।

​দারিদ্র্য ও মানুষের বেঁচে থাকার নির্মম লড়াই আফগানিস্তানের একচেটিয়া সমস্যা নয়। উপরে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে এটি একটি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকট। ভারত যেখানে মানবিক কূটনীতির মাধ্যমে নিজের স্বার্থ খুঁজছে, পাকিস্তান যেখানে সীমান্ত সংঘাত ও শরণার্থী ইস্যুতে জর্জরিত, সেখানে চীন অর্থনৈতিক বাস্তববাদের সুযোগ নিয়ে দেশটির খনিজ সম্পদ বিকাশে ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সত্যিই আফগান জনগণের কল্যাণ চায়, তবে মিডিয়া প্রোপাগান্ডা ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি বন্ধ করে আফগানিস্তানের জব্দকৃত অর্থ ফেরত দেওয়া এবং দেশটিকে আঞ্চলিক সংযোগের মূল স্রোতে যুক্ত হতে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। অন্যথায় কৃত্রিমভাবে তৈরি এই মানবিক বিপর্যয় একদিন পুরো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় এক মহাবিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

সম্পর্কিত ট্যাগ

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন