বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তার সংকটাপন্ন এই সময়ে হরমুজ প্রণালীর মতো সংবেদনশীল জলপথের বিকল্প হিসেবে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে দৃশ্যপটে হাজির সিরিয়া। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিরিয়া কেবলই একটি রাষ্ট্র নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত করিডোর’। এক দশকেরও বেশি সময়ের অস্থিরতা শেষে সিরিয়া এখন আঞ্চলিক জ্বালানি পরিবহন নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার পথে। বিশেষ করে, সমুদ্রপথের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প ও নিরাপদ স্থলপথ হিসেবে সিরিয়াকে ব্যবহারের সম্ভাবনা এখন আন্তর্জাতিক মহলে বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচাইতে আলোচিত বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাম্প্রতিক পরিকল্পনা দলিল বা ‘আমেরিকান ডকুমেন্ট’। এই দলিলে আগামী চার বছরের মধ্যে সিরিয়ার তেল খাতকে আমূল সংস্কার ও পুনর্গঠনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৪ বছর ধরে অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ আর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে সিরিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই তেল খাতটি কার্যত অচল ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর বাশার আল আসাদের পতনের পর দেশটিতে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা সিরিয়ার রুদ্ধ অর্থনৈতিক দুয়ারগুলো নতুন করে খুলে দিচ্ছে।
সিরিয়ার এই নবযাত্রার প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে কয়েক দশক পর দেশটির ‘বানিয়াস’ বন্দরের সক্রিয়তা। এই বন্দরের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে ইরাকি তেল রপ্তানি শুরু হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি কূটনীতিতে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি কেবল সিরিয়ার রাজস্ব বৃদ্ধি করবে না, বরং ইরাকের জন্যও সমুদ্রপথের নির্ভরতা কমিয়ে একটি দ্রুত ও সাশ্রয়ী বিকল্প পথ তৈরি করে দিতে পারে।
এই প্রতিবেদনে মার্কিন নথির বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে সিরিয়ার তেল খাতের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে সিরিয়াকে একটি আঞ্চলিক সংযোগস্থল হিসেবে গড়ে তুলতে দেশটির সাম্প্রতিক পদক্ষেপসমূহ এবং এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এক নজরে সিরিয়ার তেল খাত
দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ সিরিয়ার তেল ও গ্যাস খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি, পদ্ধতিগত চুরি, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময়ের সমৃদ্ধ এই খাতটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সিরিয়ার জ্বালানি খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১১৫.২ বিলিয়ন ডলার।
২০১০ সালে সিরিয়ায় দৈনিক প্রায় ৩ লক্ষ ৮৫ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদিত হতো। তবে যুদ্ধের প্রকোপে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ২৪-৩৪ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। বর্তমানে উৎপাদন দৈনিক ১ লক্ষ ১০ হাজার ব্যারেলে উন্নীত হলেও এর সিংহভাগই নতুন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেই। মোট উৎপাদনের মধ্যে ১ লক্ষ ব্যারেলই আসে ‘সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস’ (SDF) নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে; আর প্রশাসনের হাতে থাকে মাত্র ১০ হাজার ব্যারেল।
নিষেধাজ্ঞা এবং ভূ-রাজনৈতিক নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ইরান সমুদ্র ও স্থলপথে সাবেক সিরীয় সরকারকে দৈনিক প্রায় ১ লক্ষ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে আসছিল। তবে এই সহায়তাকে প্রায়ই রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো এবং মাঝেমধ্যেই সরবরাহ বন্ধ রাখা হতো। অবশ্য, বাশার আল-আসাদ মস্কোতে পালিয়ে যাওয়ার পর এই জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
সিরিয়ার প্রধান তেল খনিগুলোর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই একসময় এসডিএফ-এর (SDF) নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা তাদের অর্থনীতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। এসডিএফ এই তেল মূলত চারটি মাধ্যমে সরবরাহ করত: স্থানীয় সেকেলে শোধনাগারগুলোতে ব্যবহারের জন্য, ইরাকি কুর্দিস্তানে রপ্তানির উদ্দেশ্যে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এবং একটি বড় অংশ সরাসরি সড়কপথ বা দজলা নদী পার করে সিরীয় সরকারের কাছে।
২২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সিরীয় সরকার ফোরাত নদীর পূর্ব তীরের ‘আল-জাজিরা’ অঞ্চলের তেল খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। এই অঞ্চলে প্রায় ৯০০টি তেল ও গ্যাসকূপ রয়েছে, যার মধ্যে কেবল ‘আল-ওমর’ খনিতেই কূপের সংখ্যা ৪৫০টি। এসডিএফ-এর বিরুদ্ধে দ্রুতগতির এক অভিযানের পর যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয় এবং এই বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করার চুক্তির মাধ্যমেই মূলত এই নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তবে দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত উত্তোলন, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সেকেলে আমলের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পূর্ব সিরিয়ার খনিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এই অবকাঠামোগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, যা সম্পন্ন করতে অন্তত তিন বছর সময় লেগে যেতে পারে।
সিরিয়ার জ্বালানি মন্ত্রী মোহাম্মদ আল বশিরের ভাষ্যমতে, বর্তমানে দেশটির তেলের মজুদ প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ব্যারেল, যদিও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে দৈনিক প্রায় ২ লক্ষ ব্যারেল তেলের প্রয়োজন হয়। তিনি আরও জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে এবং প্রযুক্তিগত মানদণ্ড বজায় রেখে আমদানিকৃত তেলের চালান দেশে আসতে শুরু করেছে, যা সিরিয়ার নিজস্ব শোধনাগারগুলোতে পরিশোধন করা হচ্ছে।
সিরিয়ার তেল শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান থামের দারউইশ জানান, আল-জাজিরা অঞ্চলের তেল খনিগুলোর অবস্থা সব জায়গায় এক নয়। এসডিএফ-এর কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় কিছু খনিতে ভাঙচুর ও চুরির ঘটনা ঘটলেও, অনেক খনি তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সীমিত ও সহজলভ্য সম্পদ ব্যবহার করেই সেগুলো পুনরায় সচল করা সম্ভব।
মার্কিন নথিতে কী আছে?
সিরিয়া বিষয়ক মার্কিন দূত টম বারাক-এর তৈরি এবং ‘আল-মাজাল্লা’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি নথিতে সিরিয়াকে জ্বালানি খাতের একটি আঞ্চলিক হাব বা সংযোগস্থলে রূপান্তরের পরিকল্পনা উন্মোচন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সিরিয়ার তেল খনিগুলো পুনর্গঠনের তিনটি পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, উপযুক্ত নিরাপত্তা, সুশাসন এবং টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সিরিয়ার তেল উৎপাদন ক্ষমতা পুনরায় দৈনিক ৩ লক্ষ ৮০ হাজার ব্যারেল বা তার বেশিতে উন্নীত করা সম্ভব।
প্রথম পর্যায় (২০২৬): এই ধাপে স্বল্প ব্যয়ে কূপগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং অবকাঠামোর মৌলিক সংস্কার করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো—সৌদি আরবের কারিগরি সহায়তায় তেল উৎপাদন দৈনিক ৪৫ হাজার ব্যারেলে উন্নীত করা এবং গ্যাস উৎপাদন ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা।
দ্বিতীয় পর্যায় (২০২৭-২০২৮): এই পর্যায়ে মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াটার ইনজেকশন সিস্টেম ও আর্টিফিশিয়াল লিফট প্রযুক্তির ব্যবহার, পাইপলাইন সংস্কার এবং হোমস ও বানিয়াস শোধনাগারগুলোর আধুনিকীকরণ। পাশাপাশি দৈনিক ১ লক্ষ ৫০ হাজার ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নতুন শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও এই ধাপের অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় পর্যায় (২০২৮-২০৩০): এই ধাপের লক্ষ্য হলো তেল খনিগুলোর পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন নিশ্চিত করা, সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং তুরস্ক ও ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির উদ্দেশ্যে নতুন পাইপলাইন স্থাপন করা।
এছাড়াও এই পরিকল্পনায় প্রথম ৯০ দিনের জন্য কিছু অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে:
তাতক্ষণিক পদক্ষেপ: প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, আইনি জটিলতা নিরসন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য স্বচ্ছ চুক্তিনামা তৈরি করা।
স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ (৬০ দিন): নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং চ্যানেল তৈরি, আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থা গ্রহণ, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অফশোর লাইসেন্স প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায় একটি স্পষ্ট আর্থিক কাঠামো গঠন।
মধ্যমেয়াদী পদক্ষেপ (৯০ দিন পর্যন্ত): অবকাঠামো সংস্কারের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং বিনিয়োগ সুরক্ষায় অর্থায়ন ও বিমা সুবিধা চালু করা।
মার্কিন এই পরিকল্পনায় জ্বালানি পথ পুনর্নির্ধারণে সিরিয়ার জন্য চারটি বড় সুযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সিরিয়াকে একটি আঞ্চলিক সংযোগস্থল বা হাব হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে এর জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তৃত করা সম্ভব। এই পরিকল্পনার আওতায় বানিয়াস ও তারতুস বন্দর ব্যবহার করে সরাসরি ইউরোপে তেল-গ্যাস রপ্তানি করা যাবে। অন্যদিকে, ইরাক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে তুরস্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে সিরিয়াই একমাত্র কার্যকর স্থলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতে সিরিয়ার সামনে চারটি বড় সুযোগ
প্রথম সুযোগ: ২০০৩ সাল থেকে বন্ধ থাকা ইরাকের কিরকুক থেকে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত তেল পাইপলাইনটি পুনরায় সচল করা। ৩৬ মাসের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। ২০২৫ সালের আগস্টে বাগদাদ ও দামেস্ক দৈনিক ১৫ লক্ষ ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি নতুন পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়ে একমত হয়েছে। এর ফলে ট্রানজিট ফি বাবদ সিরিয়ার বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে, যা ভবিষ্যতে লেবাননের ত্রিপোলি বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করার সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় সুযোগ: কাতার-তুরস্ক গ্যাস পাইপলাইন। এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, যা জর্ডান ও সিরিয়ার মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরকে তুরস্ক ও ইউরোপের সাথে যুক্ত করবে। ২০০৯ সালে রাশিয়ার চাপে স্থগিত হওয়া এই প্রকল্পটি আসাদ সরকারের পতনের পর পুনরায় আলোচনায় এসেছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো কাতারের ‘নর্থ ফিল্ড’-এর গ্যাসকে রুশ গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ‘ট্যানাপ’ (TANAP) পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছে দেওয়া।
তৃতীয় সুযোগ: আজারবাইজান-কিলিস-আলেপ্পো গ্যাস করিডোর। আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এটিই প্রথম কার্যকর হওয়া জ্বালানি পথ। তুরস্কের কিলিস থেকে সিরিয়ার আলেপ্পো পর্যন্ত বিস্তৃত, বছরে ১.২ বিলিয়ন ঘনমিটার ক্ষমতাসম্পন্ন এই লাইনটি ২০২৫ সালের আগস্টে আজারবাইজানের ‘সোকার’ (SOCAR) কোম্পানির সাথে চুক্তির মাধ্যমে চালু হয়েছে। বর্তমানে এটি আলেপ্পো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করছে এবং ভবিষ্যতে এটি দক্ষিণে হোমস শহর পর্যন্ত সম্প্রসারণের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
চতুর্থ সুযোগ: মিশর থেকে জর্ডান ও সিরিয়া হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত ‘আরব গ্যাস পাইপলাইন’ সম্প্রসারণ। ইউরোপমুখী এই আঞ্চলিক প্রকল্পে সিরিয়া একটি প্রধান স্থল সংযোগ (Land Bridge) হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকার পর তুরস্ক এখন মিশর ও ইসরায়েলের গ্যাস ইউরোপীয় বাজারে পাঠানোর লক্ষে এই পাইপলাইনটি পুনরায় সচল করার পথ খুঁজছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: মার্কিন দূতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সীমিত পরিসরে সংস্কারের মধ্য দিয়ে সিরিয়ার জ্বালানি খাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ২০২৭ সালে কিরকুক-বানিয়াস প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, আজারবাইজানি গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং শোধনাগারগুলোর আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে মূল পাইপলাইনগুলো পুনর্গঠন এবং কাতার-তুরস্ক লাইনের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজও পুরোদমে চলবে।
মার্কিন দূত টম বারাকের মতে, মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে এক ‘অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ’ অতিক্রম করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের চলমান সংকট নিরসনে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিরিয়া একটি কার্যকর বিকল্প মাধ্যম হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।
তবে এই মার্কিন দলিল ও প্রস্তাবিত পরিকল্পনাগুলো সিরিয়ার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বা চাহিদার সাথে কতটা সংগতিপূর্ণ, সে বিষয়ে সিরিয়ান পেট্রোলিয়াম কোম্পানি (SPC) এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
জ্বালানি খাতে চলমান পদক্ষেপ
সিরিয়ার নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্থবির জ্বালানি খাতকে সচল করতে জোরালো উদ্যোগ ও নতুন সব পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এই খাতের প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তেল ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ‘জ্বালানি মন্ত্রণালয়’ গঠন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের জন্য দেশটির দুয়ার এখন উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
‘সিরিয়ান পেট্রোলিয়াম কোম্পানি’ ইতিমধ্যেই সৌদি, কাতার এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলোর সাথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদনের লক্ষ্যে আমেরিকান ও সৌদি কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জোট বা ‘কনসোর্টিয়াম’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে তুরস্কের কিলিস প্রদেশের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আজারবাইজানি প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে, যার পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৩৩.৩ লক্ষ ঘনমিটার।
২০২৫ সালের নভেম্বরে সিরিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং ‘UCC Concession Investments’ গ্রুপের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি বর্তমানে ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৫০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন চারটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।
চলতি বছরের ১০ এপ্রিল সিরিয়ান পেট্রোলিয়াম কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ইউসুফ কাবলাউই ঘোষণা করেছেন, আমেরিকান জ্বালানি জায়ান্ট ‘শেভরন’ (Chevron) সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও বিনিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম নাগাদ আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন করে প্রযুক্তিগত কাজ শুরু করার পথ প্রশস্ত হলো।
একই ধারাবাহিকতায় ‘এডিস’ (ADES), ‘তাকা’ (TAQA), ‘আরকাজ’ (ARKAZ) এবং ‘অ্যারাবিয়ান ড্রিলিং’-এর মতো শীর্ষস্থানীয় সৌদি কোম্পানিগুলোর সাথেও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, কার্যক্রম শুরুর প্রথম ছয় মাসেই প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ২৫% বৃদ্ধি পাবে এবং ‘এডিস’ কোম্পানির কাজ শুরুর এক বছর পর এই প্রবৃদ্ধির হার ৫০%-এ পৌঁছাবে।
পূর্ব সিরিয়ার গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন এবং হোমস প্রদেশের ‘সাদাদ’ থেকে শুরু করে দামেস্কের গ্রামীণ অঞ্চল ‘দেইর আলী’ পর্যন্ত বিস্তৃত নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি ‘কনোকোফিলিপস’-এর (ConocoPhillips) সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইউসুফ কাবলাউই-এর তথ্যমতে, ৯০টিরও বেশি বিদেশি ও আরব কোম্পানি সিরিয়ার বাজারে ফিরতে বা নতুন করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সিরিয়ার তেল খাতে এই প্রাণচাঞ্চল্যের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো দেশটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। উল্লেখ্য, এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই ২০১০ সালে সিরিয়ার মোট অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রায় ৪৯.৬ শতাংশের দায়িত্বে থাকা ১১টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারা ক্রমাগত সিরিয়াকে বিভিন্ন দেশের সংযোগস্থল হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং দেশটির কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর মতে, সিরিয়া বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল ক্ষেত্র। গত ১৬ এপ্রিল ‘আনতালিয়া ডিপ্লোম্যাটিক ফোরাম’-এ অংশ নিয়ে তিনি আবারও এই অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
আহমাদ আশ শারা জোর দিয়ে বলেন, সিরিয়া জ্বালানি সরবরাহ ও লজিস্টিক চেইনের জন্য একটি নিরাপদ করিডোর এবং নির্ভরযোগ্য বিকল্প পথ। বিশেষ করে সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে তুরস্কের সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে সিরিয়ার অবস্থান পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে পণ্য এবং জ্বালানি আদান-প্রদানের একটি চমৎকার ও নিরাপদ যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে।
সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে সম্পাদিত যৌথ চুক্তি এবং সিরিয়ার বন্দর ব্যবহার করে ইরাকি তেল রপ্তানি শুরু হওয়াকে তিনি ‘আঞ্চলিক সংযোগের সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি মনে করেন, স্থিতিশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই প্রক্রিয়ায় বড় সহায়ক হবে। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝে সিরিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার মতো কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান রয়েছে।
আঞ্চলিক অর্থনীতিতে সিরিয়া: ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
সিরিয়াকে জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ বা ‘ট্রানজিট হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার আলোচনা বর্তমানে বেশ তুঙ্গে। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও অবকাঠামোগত ধ্বংসলীলার শিকার একটি দেশে এমন বৃহৎ প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রবল সংশয় রয়েছে। এমনকি সিরীয় সরকারও এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত।
মার্কিন পরিকল্পনাতেও এ অঞ্চলের দুর্বল সুশাসন ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন দূত টম বারাকের মতে, ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের পাইপলাইনগুলো কখনোই তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি। মূলত যুদ্ধ, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং বিনিয়োগের অভাবে সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. আনাস আল-হাজ্জি মনে করেন, অর্থনৈতিকভাবে কেবল ‘কিরকুক-বানিয়াস’ পাইপলাইনটি সংস্কারযোগ্য হলেও এর রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়া ড্রোন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা পাইপলাইনের নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সিরিয়াকে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প ভাবা কঠিন, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল-গ্যাস এখন ইউরোপের চেয়ে পূর্ব এশিয়ায় বেশি রপ্তানি হয়।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন গবেষক আয়মান আল-দাসুকি। তাঁর মতে, জ্বালানি খাতের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতির সাথে যুক্ত হওয়া সিরিয়ার জন্য একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’। এটি রাষ্ট্রের কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের পুনরুজ্জীবনে ভূমিকা রাখবে। তবে এ জন্য স্বচ্ছ সুশাসন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং একটি বিচক্ষণ পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য।
একই সুরে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক নাজাহ আবদুল হালিম বলেন, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সিরিয়া দীর্ঘ ১৪ বছরের যুদ্ধ কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। কারণ তখন সিরিয়ার স্থিতিশীলতার ওপর পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বার্থ নির্ভর করবে। এটি দেশটিকে নতুন কোনো বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করার ‘কবচ’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তেল শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান থামের দারউইশ মনে করেন, আগামী দিনে উপসাগরীয় গ্যাস ও ইরাকি তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে সিরিয়া কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে, যা বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
সবশেষে বলা যায়, সিরিয়াকে জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি এখন আর শুধু কথার কথা নয়; ইরাকি তেল রপ্তানি শুরু হওয়া এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগমন এর বাস্তব প্রমাণ। তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করছে স্থানীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর।
সূত্র : আরবি আর্টিকেল অবলম্বনে












