গত মে মাসের শেষ দিকে দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক শাকিফ দুর্গ পুনর্দখলের ঘোষণা দেয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। মধ্যযুগীয় ক্রুসেডারদের স্মৃতিবিজড়িত এই দুর্গটিকে তারা ‘বিউফোর্ট দুর্গ’ নামে ডাকত। তবে পরবর্তীতে মুসলিম সেনাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ক্রুসেডারদের হাত থেকে এটি মুক্ত করেন।
ঐতিহাসিক এই দুর্গের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও ১৯৮২ সালে দুর্গটি দখল করেছিল তেল আবিব। তবে দীর্ঘ ১৮ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর, ২০০০ সালে হিজবুল্লাহ ও লেবাননি প্রতিরোধের মুখে সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় তারা। এরপর থেকে ইসরায়েলের সাথে তাদের একাধিক যুদ্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ২০০৬ সালের জুলাই যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের সংঘাত অন্যতম। সবশেষ গত মে মাসে দুর্গটি আবারও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে ইসরায়েলি বাহিনী।
এদিকে শাকিফ দুর্গ দখলকে একটি ‘নাটকীয় পদক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সাথে লেবাননের ভূখণ্ডে সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
তবে ইসরায়েলের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্গও ইসরায়েলি বাহিনীকে হিজবুল্লাহর আত্মঘাতী ড্রোনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। এসব ড্রোনের আঘাতে প্রতিনিয়ত ইসরায়েলের সামরিক যান ও জনবলের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইয়াল বেন-রুভেন স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘আমরা লেবাননের যত ভেতরের দিকে এগোব, তত বেশি সৈন্যের প্রয়োজন হবে। আর ততই আমাদের দুর্বলতা ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে।’
নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধ করা ইসরায়েলি লেখক হাইম হার-জাহাভের মতে, বিউফোর্ট দুর্গে ফিরে যাওয়া আসলে হিজবুল্লাহর সাথে এক দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্ব ও ক্ষয়যুদ্ধের ফাঁদে ইসরায়েলের প্রত্যাবর্তনেরই ইঙ্গিত। তাঁর মতো অনেক ইসরায়েলি সামরিক বিশেষজ্ঞই এখন এই অভিযানকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ওফের শেলাহ মনে করেন, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব মূলত নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই যুদ্ধ টেনে লম্বা করতে চায়। কারণ এখন যুদ্ধ বন্ধ করা মানেই হবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে দেওয়া সব ফাঁকা প্রতিশ্রুতি ও বড় বড় বক্তৃতার পরাজয় স্বীকার করা।
সামরিক নেতৃত্ব এখনও ৭ অক্টোবরের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তারা যুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ভূমিকা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।
ওফের শেলাহ
তাঁর মতে, ‘সামরিক নেতৃত্ব এখনও ৭ অক্টোবরের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তারা যুদ্ধের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ভূমিকা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। তাই তারা শুধু সামনে এগোনোর কথাই বলে যাচ্ছে। কিন্তু এই এগোনো আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে? আমরা কি সত্যি বৈরুত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব? আমরা আসলে এক চিরস্থায়ী নিরাপত্তার স্বপ্ন দেখছি। অথচ বাস্তব সত্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়।’
ক্রুসেডার ও জায়নবাদী উপনিবেশের সমান্তরাল পথ
এক হাজার বছর আগে ক্রুসেডারদের দখল করা শাকিফ দুর্গ আজ যখন ইসরায়েল পুনর্দখল করে, তখন তা এক গভীর ঐতিহাসিক বার্তা দেয়। আর তা হলো, বর্তমান জায়নবাদী উপনিবেশ মূলত মধ্যযুগীয় ক্রুসেডীয় উপনিবেশেরই আধুনিক উত্তরসূরি, যার চূড়ান্ত পরিণতিও হতে যাচ্ছে ঠিক আগেরটির মতোই।



একটি বহুল প্রচলিত ঐতিহাসিক সত্য রয়েছে, ইসরায়েল অন্য সব স্বাভাবিক রাষ্ট্রের মতো নয়, যাদের একটি নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকে; বরং ‘ইসরায়েল নিজেই এমন এক সেনাবাহিনী, যার একটি রাষ্ট্র আছে।’ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই রাষ্ট্রটি মূলত দখলদারিত্ব, ধ্বংসযজ্ঞ ও জাতিগত নির্মূল অভিযানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বহুমাত্রিক সামরিক কাঠামো, এবং আজও তার সেই আগ্রাসী চরিত্র অপরিবর্তিত রয়েছে।
আজকের ইসরায়েলের দিকে তাকালে মধ্যযুগের ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোর উত্থান-পতনের ইতিহাসই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বর্তমান জায়নবাদী প্রকল্পও ঠিক সেই একই ধ্বংসাত্মক পথ ধরে হাঁটছে। বিশেষ করে, যেসব ঔপনিবেশিক শক্তি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো অঞ্চলের আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও সমাজকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি, তাদের যে ঐতিহাসিক পরিণতি হয়েছিল, ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও আজ ঠিক তা-ই ঘটতে যাচ্ছে।
ফিলিস্তিন ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের জনগণকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার যে লক্ষ্য জায়নবাদী প্রকল্প নিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ফলে এই বসতি-উপনিবেশ এখন ইতিহাসের এমন এক সংকটময় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তার সামনে কেবলই ক্রমবর্ধমান অবসাদ, বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ ভাঙনের স্পষ্ট আলামত দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এ অঞ্চলের মানুষের অনমনীয় প্রতিরোধ, আত্মত্যাগের মানসিকতা এবং বিশ্বমঞ্চে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ক্ষয়িষ্ণু দাপট।
এর ওপর, জায়নবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব যখন একদল উগ্র ধর্মীয়, তালমুদীয় ও ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত হয়েছে, তখন থেকেই এই ঔপনিবেশিক সমাজের ভেতরে তৈরি হয়েছে গভীর ফাটল ও তীব্র মেরুকরণ। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, খোদ ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাই এখন হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, দেশটি এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
তাছাড়া, যে পশ্চিমা আধিপত্যের ওপর ভর করে এই ঔপনিবেশিক সত্তার জন্ম হয়েছিল, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে তারা আজ আর আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। ফলে বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলও তার সেই পুরনো একচ্ছত্র দাপট হারিয়েছে। আর এরই ফলশ্রুতিতে, আজ তারা গাজা কিংবা লেবাননের মতো ছোট ও সীমিত ফ্রন্টেও কোনো চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জন করতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে ফরাসি নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলের একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর তিনি বলেছিলেন, ‘ইসরায়েল এমন একটি অঙ্গ, যার শরীর তাকে প্রতিনিয়ত প্রত্যাখ্যান করে চলেছে।’
এই কৃত্রিম রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকট মূলত এখানেই। এই অঞ্চলের মানুষ ও সমাজ কখনোই তার অস্তিত্ব মেনে নেয়নি, বরং শুরু থেকেই দৃঢ়ভাবে তার মোকাবেলা করে আসছে। ফলে চরম সহিংসতা ও গণহত্যাই এখন এই রাষ্ট্রের টিকে থাকার একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা একই সাথে তার অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় সংকটও বটে।
এমনকি খোদ ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ বেনি মরিসও মনে করেন, যেদিন বেন গুরিয়নের নেতৃত্বে জায়নবাদী আন্দোলন ফিলিস্তিনিদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেদিনই আসলে এই অবাস্তব প্রকল্পের চূড়ান্ত ও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি লিখে দেওয়া হয়েছিল।
অবসাদের ভারে নুয়ে পড়া এক সেনাবাহিনী
ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলান পাপে সম্প্রতি লিখেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে কখনোই কোনো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধের উপযোগী করে তৈরি করা হয়নি। ফলে ক্রমাগত সামরিক চাপের পাশাপাশি তীব্র অভ্যন্তরীণ সংকট ধীরে ধীরে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, যা রাষ্ট্রটিকে কাঠামোগত পরিবর্তন কিংবা চূড়ান্ত ভাঙনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তিনি এই সামগ্রিক সংকটকে মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন,
১. মানবিক অবসাদ: ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে বিপুলসংখ্যক রিজার্ভ সেনাকে নিয়মিত সৈন্যদের মতোই দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রন্টলাইনে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এর ফলে তারা চাকরি হারাচ্ছেন, ব্যবসা হারাচ্ছেন এবং তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
২. সামরিক সম্পদের ক্ষয়: ইসরায়েলের প্রচলিত সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তিই ছিল মূলত তিনটি অনড় শর্তের ওপর,
ক. যুদ্ধটা ইসরায়েল সবসময় নিজে আগে শুরু করবে।
খ. যুদ্ধ হবে সর্বদাই শত্রুর মাটিতে (যা বর্তমান পরিস্থিতিতে আর সম্ভব হচ্ছে না)।
গ. এবং সেই যুদ্ধ হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও দ্রুতগতির।
এই মৌলিক শর্তগুলো পূরণ না হয়ে যুদ্ধ যখনই দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়, তখনই ইসরায়েল তার কৌশলগত ও কাঠামোগত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
হতাশার স্বীকারোক্তি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার ভিডিওচিত্র যখন ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এর সদস্যদের দেখানো হয়, তখন সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে কয়েকজন সংসদ সদস্য পর্যন্ত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং তাদের জরুরি চিকিৎসা নিতে হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ গভীর হতাশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘ইসরায়েল কোনো নৈতিক রাষ্ট্র নয়, এটি কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তিও নয় এবং এই যুদ্ধে আমাদের জেতার কোনো সুযোগ নেই।’ পরবর্তীতে তিনি আরও মন্তব্য করেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আসলে ইসরায়েলসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ধ্বংস করার এক আত্মঘাতী খেলায় মেতেছেন।
সম্প্রতি নরওয়েজীয় অধ্যাপক গ্লেন ডিসেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব চাস ফ্রিম্যানের মধ্যে এক ঘণ্টার একটি পডকাস্ট আলাপচারিতা হয়। সেখানে চাস ফ্রিম্যান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন, তথাকথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর যে স্বপ্ন, তা তার সমস্ত রূপকথা ও আগ্রাসনসহ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। পরিশেষে তিনি স্পষ্ট করেই হুঁশিয়ারি দেন, এই জায়নবাদী প্রকল্প এখন তার চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।
আল জাজিরা আরবি থেকে অনূদিত












