বিশ্বকাপ উন্মাদনা

গাজা গণহত্যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার দায় বনাম আমাদের বিশ্বকাপ উন্মাদনা 

পুরো বিশ্বের বিবেককে বিনোদনে আটকে রেখে গাজায় চলছে ধারাবাহিক নৃশংস গণহত্যার উৎসব।  
এ আই নির্মিত ছবি
এ আই নির্মিত ছবি
A- A+

১১ জুন রাত ১১টা, পুরো বিশ্বের চোখ যখন মেক্সিকোর এজটেক স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানর দিকে, তখন গাজার ‘আল মাগাজি রিফিউজি ক্যাম্পে’ চলছে নীরব মোম্বিং। পুরো বিশ্বের বিবেককে বিনোদনে আটকে রেখে গাজায় চলছে ধারাবাহিক নৃশংস গণহত্যার উৎসব।  

ফুটবল বিশ্বকাপের হাওয়া বইলে আমাদের মুসলিম তরুণ-তরুণীদের ফুটবল উন্মাদনার এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি শুরু হয়। আমরা যারা এক উম্মাহর কথা বলি, যারা ফিলিস্তিন বা আরাকানের রক্তক্ষরণের খবরে চোখের পানি ফেলি, তারাই আবার বিশ্বকাপের মৌসুমে নিজেদের অস্তিত্ব ভুলে ভিনদেশি দলের অন্ধ ভক্তে পরিণত হই। একদিকে রক্তাক্ত গাজা আর অন্যদিকে আমাদের ফুটবল উৎসব, এ যেন একই মুদ্রার দুটি পিঠ। যেখানে এক পিঠে লেপ্টে আছে নিষ্পাপ শিশুদের নিথর দেহ, আর অন্য পিঠে উড়ছে আমাদের অন্ধ আবেগের রঙিন পতাকা।

বিশ্বকাপ এলেই আমাদের চারপাশ বদলে যায়। ঘরের ছাদে বিশাল সব পতাকা ওড়ে, চায়ের দোকানে ঝড় ওঠে তর্কের, মাঝরাতে গোল উদযাপনে ফেটে পড়ে পুরো এলাকা। আমরা বিভক্ত হয়ে যাই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায়, কিংবা ফ্রান্স-জার্মানি-পর্তুগালে। কিন্তু গোলপোস্টের পেছনেও যে কিছু লুকানো সত্য আছে, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি?

​যে দেশগুলোর জাদুকরী ফুটবলে আমরা বুঁদ হয়ে আছি, সেই দেশগুলোর সরকার কিন্তু গাজার মাটিতে চলা নির্মম গণহত্যার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের অংশীদার। অথচ মাঠের টানটান উত্তেজনায় এই ভয়ংকর ও রূঢ় সত্য আমরা বেমালুম ভুলে যাই। একদিকে মজলুমের জন্য আমাদের দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে তাদের হত্যাকারীদের প্রধান মদদদাতাদের ফুটবলীয় জাদুতে আত্মহারা হওয়া, আমাদের এই চরম নৈতিক দ্বিচারিতা সত্যিই সেলুকাসকে স্তব্ধ করে দেয়!

দিনের আলোয় আমরা চত্বরে দাঁড়িয়ে প্লেকার্ড হাতে চিৎকার করি, ‘Free Palestine’। ফিলিস্তিনের শিশুদের কান্নায় আমাদের চোখ ভিজে ওঠে, আমরা ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের ডাক দিই। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামলেই সেই আবেগ কর্পূরের মতো উড়ে যায়। গাজায় যে বুলেটের আঘাতে একটা ১০ বছরের শিশুর বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে, সেই বুলেটের জোগানদারদের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আমরা মেতে উঠি অসভ্য উল্লাসে। গোল হলে আমরা যখন বাজি ফোটাই, ঠিক তখনই হয়তো গাজার কোনো হাসপাতালে আছড়ে পড়ছে আরেকটি বোমার অগ্নিশিখা।

আমরা এত নিষ্ঠুর, এত স্মৃতিভ্রম জাতি কীভাবে হলাম! ফিলিস্তিনের সেই রক্তাক্ত কোনো শিশু যদি আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়াত, তবে কোন মুখে আমরা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা উঁচু করে ধরতাম? ফুটবলের সৌন্দর্য আছে, আর্ট আছে, কিন্তু তা কি হাজার হাজার শিশুর লাশের চেয়েও দামি? যারা পর্দার আড়ালে মুসলিম গণহত্যার ছক কষে, তাদের নিয়েই মুসলিম তরুণ-তরুণীদের মোহের শেষ নেই। 

ফুটবলকে আধুনিক বিশ্ব নাম দিয়েছে ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এই খেলাটি মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রচ্ছন্ন বর্ণবাদ এবং নৈতিক দ্বিমুখী আচরণের এক বিশাল রঙ্গমঞ্চ। গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়, গণহত্যাকারী রাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ থেকে শুরু করে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা নীতি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষমতার দম্ভ এবং পশ্চিমা বিশ্বের তথাকথিত ‘উদারবাদী’ মুখোশের আড়ালে থাকা কঠোর বাস্তবতা। সেই ভয়ংকর বাস্তবতা এক ঝলক দেখে আসা যাক।

গাজা গণহত্যায় আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাষ্ট্রগুলোর দায় 

ফ্রান্স (অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা)

গাজা গণহত্যায় ফ্রান্সের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব ছিল বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। মানবাধিকার সংগঠন ACAT (Action by Christians for the Abolition of Torture)-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির কথা বললেও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পর্দার আড়ালে কাজ করছে। ইসরায়েলের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহের ক্ষেত্রে ফ্রান্সের আইনি ফাঁকফোকরগুলো Le Monde-এর অনুসন্ধানে বারবার উঠে এসেছে। তারা কেবল অস্ত্রই বিক্রি করছে না, বরং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নজরদারি প্রযুক্তি দিয়েও সহায়তা করছে। 

যদিও ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে তারা ইসরায়েলে ‘মারাত্মক অস্ত্র’ (lethal weapons) পাঠায় না, তবে ACAT (Action by Christians for the Abolition of Torture)-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ফ্রান্স থেকে এমন অনেক সরঞ্জাম বা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হয়। 

এদিকে Human Rights WatchLe Monde-এর রিপোর্ট বলছে, ফ্রান্সের একটি আদালত এবং বেশ কিছু মানবাধিকার সংস্থা ফ্রান্স সরকারকে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল। এর মূল ভিত্তি ছিল ‘আর্মস ট্রেড ট্রিটি’ (Arms Trade Treaty), যা যুদ্ধাপরাধের ঝুঁকি থাকলে অস্ত্র রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। 

আর্জেন্টিনা (কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন)

বর্তমান আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই ইসরায়েলকে তাদের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। Al Jazeera এবং Reuters-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা গাজা সংকটে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানানোর পাশাপাশি হামাস বিরোধী আন্তর্জাতিক জোট গঠনের সক্রিয় সমর্থক। 

আর্জেন্টিনা সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের চেয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে ইসরায়েলকে সহায়তা করছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।

ব্রাজিল (দ্বিমুখী পরিবর্তনশীল অবস্থান)

প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বললেও DW News, Associated Press এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের সামরিক বাহিনীর সাথে ইসরায়েলের ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি বিনিময় চুক্তি এখনো বলবৎ। এই চুক্তিগুলো পুরোপুরি বাতিল করার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতা দেখিয়ে তারা দায় এড়াতে চাইছে, যা তাদের পররাষ্ট্রনীতির চরম অসামঞ্জস্যতাকে ফুটিয়ে তোলে।

এছাড়াও আল জাজিরার ২৩ মে ২০২৬ তারিখের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে অবদান রাখা ৫১টি দেশের তালিকা প্রকাশ পেয়েছে। এই তালিকায় আছে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, মেক্সিকো, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মালেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর সহ বেশকিছু দেশের নাম।

যদিও আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে, এই ৫১টি দেশ ইসরায়েলে সরাসরি যুদ্ধাস্ত্র পাঠিয়েছে তা নয়, বরং এই তালিকায় সেই দেশগুলো রয়েছে যাদের কোম্পানিগুলো ইসরায়েলের সামরিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স এবং সফটওয়্যার সরবরাহ করেছে। তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ড্রোন এবং আর্টিলারি সিস্টেম কার্যকর রাখতে এই দেশগুলোর বাণিজ্যিক সহযোগিতা অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বকাপের আয়নায় পশ্চিমাদের মুসলিম বিদ্বেষ ও মিডিয়ার দ্বিচারিতা 

২০২২ সালে এককভাবে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল কাতার। কিন্তু কাতার মুসলিম দেশ হওয়ার কারণে ২২ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়া ‘মানবাধিকার’ ও ‘শ্রম অধিকার’-এর জিগির তুলেছিল, ফ্রান্সের মিডিয়া লা কানার অনশেন (Le Canard Enchaîné) কাতার ফুটবলারদের সন্ত্রাসী বলে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন এঁকেছিল। পশ্চিমা গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান কঠোরভাবে আয়োজক দেশের সমালোচনা করেছিল। তাদের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৬,৫০০ প্রবাসী শ্রমিক নির্মাণকাজ ও অন্যান্য কারণে মারা গেছেন। তাদের অভিযোগ ছিল, কাতারের ‘কাফালা’ (Kafala) পদ্ধতিতে শ্রমিকরা একপ্রকার দাসত্বের শিকার হচ্ছেন। 

অন্যদিকে কাতারের আইন ও সংস্কৃতির কারণে সমকামিতা নিষিদ্ধ থাকায় পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যাপক আপত্তি ওঠে। অনেক খেলোয়াড় এবং দল সমকামিতার সমর্থনে বিশেষ আর্মব্যান্ড পরার ঘোষণা দেয়, যা নিয়ে আয়োজক দেশ কাতারের সাথে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফুটবল বিশ্বকাপের পরিবেশে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত মদ্যপান ও পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা কাতারে সীমিত থাকা, বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ফিফার ভেতর দুর্নীতির অভিযোগ এবং অবকাঠামো নির্মাণে অতিরঞ্জিত খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব ছিল, এমন দাবি করে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিস্তর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

জার্মান কোচ হ্যান্সি ফ্লিক কাতার নিয়ে মন্তব্য করেন, ‘বিশ্বকাপের মতো একটি আসর এমন দেশে হওয়া উচিত যেখানে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে। কাতারে যা ঘটছে তা নিয়ে আমাদের অবশ্যই কথা বলতে হবে। আমরা যদি ফুটবলের মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন আনতে পারি, তবে সেটিই হবে বড় অর্জন।’

আরেক জার্মান ফুটবলার টনি ক্রুস বলেন, ‘আমার মতে, কাতারকে বিশ্বকাপ আয়োজক হিসেবে নির্বাচন করা ভুল ছিল। এর কারণ হলো মানবাধিকার পরিস্থিতি। সেখানে অভিবাসী শ্রমিকরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অত্যধিক গরম এবং বেতন না পাওয়ার মতো যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে কাজ করাকে একপ্রকার ‘আধুনিক দাসত্ব’ বলাই যায়।’

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে তার বিপরীতে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা আয়োজিত এই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বে ভিসা জটিলতা ও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যে নগ্ন বৈষম্য চলছে, তা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়া ভদ্রতার মুখোশ পরা ব্যক্তিরা রহস্যজনকভাবে নীরব। এর আগেও রাশিয়া বিশ্বকাপ (২০১৮) বা চীনে (২০২২ শীতকালীন অলিম্পিক) যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় অভিযোগ ছিল, তখন পশ্চিমা গণমাধ্যম ও মানবাধিকারের জিগির তোলা সেই সাবেক ফুটবলাররা ছিল একদম নীরব।

এপর্যন্ত ওয়াশিংটন প্রশাসন যা যা করল–

The New York Times এর তথ্যমতে, দুবাই থেকে বিমানযোগে শিকাগোর ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ইরাকের তারকা স্ট্রাইকার এবং সহ-অধিনায়ক আইমেন হুসেনকে প্রায় ৭ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। 

The Athletic আরও জানাচ্ছে, মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (CBP) কর্মকর্তারা তার মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনিং এবং ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেন। 

 CBS News-এর বরাতে জানা গেছে, ইরাক দলের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার তালাল সালাহ্‌কে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে রেখে জেরা করা হয়। পরবর্তীতে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ (Vetting Concerns) দেখিয়ে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না দিয়ে সরাসরি ফেরত পাঠানো হয়। 

ইরান জাতীয় দলের জন্য কঠোর নিয়ম

মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান ফুটবল দলের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তারা কেবল ম্যাচের দিন মেক্সিকোর ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে এসে ম্যাচ খেলতে পারবে এবং খেলা শেষ হওয়া মাত্রই ওই রাতেই মেক্সিকোতে ফিরে যেতে বাধ্য থাকবে, জানিয়েছে The National News।

আফ্রিকান রেফারি ও কর্মকর্তাদের বাধা: ২০২৫ সালের ক্যাফ (CAF) বর্ষসেরা রেফারি ও সোমালিয়ার নাগরিক ওমর আরতান এবং সেনেগালের ফুটবলাররা একইভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছেন। ওমর আরতানের বিশেষ কূটনৈতিক পাসপোর্ট থাকলেও তাকে ট্রাভেল পাস দেওয়া হয়নি। সোমালিয়া ও সেনেগালের মতো দেশগুলো মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ ট্রাভেল ব্যান বা নজরদারি তালিকায় থাকায় এই জটিলতা হচ্ছে। American Immigration Council থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

সাংবাদিক ও ফ্যানদের ভিসা বাতিল: আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনের (AIPS) অভিযোগের ভিত্তিতে American Immigration Council জানিয়েছে, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল এবং ইরানের বহু সাংবাদিককে মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হয়নি, যার ফলে এক ভেন্যু থেকে অন্য ভেন্যুর ম্যাচে যাতায়াত করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। 

 খেলোয়াড় ও দলের ওপর বৈষম্যমূলক তল্লাশি: ইরাক দলের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শুধু আফ্রো-এশীয় দেশই নয়, ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ডের একজন ফুটবলারকেও সম্প্রতি মার্কিন বিমানবন্দরে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

সেনেগাল জাতীয় ফুটবল দল: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং চ্যানেল ৫ নিউজ (Channel 5 News)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনেগালের ফুটবলাররা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের চরম হিউমিলিয়েশন বা অবমাননার শিকার হতে হয়। রানওয়ে বা এয়ারপোর্টের টারমাক-এর ওপর দাঁড় করিয়ে প্রকাশ্যেই খেলোয়াড়দের জুতো খুলে তল্লাশি এবং পুরো শরীর স্ক্যান করা হয়, যা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছে। এদিকে উজবেকিস্তানের খেলোয়াড়রা বিমানবন্দর পার হওয়ার পরও রেহাই পায়নি। তাদের ট্রেনিং ভেন্যুতে পৌঁছানোর পর মেটাল ডিটেক্টর এবং স্নিফার ডগ (তল্লাশি কুকুর) দিয়ে তাদের শরীর ও ব্যাগ পুনরায় পরীক্ষা করা হয়, যা কোনো আন্তর্জাতিক দলের জন্য অত্যন্ত আপত্তিকর। 

ফুটবল কর্মকর্তাদের ওপর কড়াকড়ি

আল জাজিজার  বরাতে জানা গেছে, ইরান দলের খেলোয়াড়রা শেষ মুহূর্তে ভিসা পেলেও দলের বেশ কয়েকজন মূল ম্যানেজার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং টেকনিক্যাল স্টাফদের সরাসরি ভিসা বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর ফলে পুরো দল মেক্সিকোর টিজুয়ানায় ক্যাম্প করতে বাধ্য হচ্ছে। 

সাধারণ সমর্থক ও দর্শকদের হয়রানি

হাইতি এবং ইরানের সাধারণ সমর্থক: যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাভেল ব্যান বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে USA Today-এর তথ্যমতে, হাইতি এবং ইরানের সাধারণ নাগরিকদের জন্য টুর্নামেন্টের টিকিট থাকা সত্ত্বেও মার্কিন ট্যুরিস্ট ভিসা সম্পূর্ণ স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ এই দুটি দেশের কোনো সাধারণ দর্শক গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না।

আমেরিকান ইমিগ্রেশন কাউন্সিল-এর ব্লগ থেকে জানা গেছে, স্কটল্যান্ডের বেশ কয়েকজন সমর্থকের বৈধ ‘ট্রাভেল অথরাইজেশন’ (ESTA) শেষ মুহূর্তে কোনো কারণ না দেখিয়ে বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি মরক্কোর শত শত দর্শক লাখ টাকা খরচ করে ম্যাচ টিকিট কেনার পরও মার্কিন কনসুলেট থেকে তাদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নজরদারি

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলোর আশেপাশে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) অত্যন্ত সক্রিয়। যে সমস্ত মানবাধিকার কর্মী বা সাধারণ মানুষ সেখানে বহিরাগত ও শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন, মার্কিন প্রশাসন বিভিন্ন আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে তাদের ফোন ট্র্যাক করছে ও নানাভাবে হ্যারাস (হয়রানি) করছে।

নিরাপত্তার অজুহাতে মার্কিন প্রশাসনের এমন পারফরমেটিভ ক্রুয়েলটি বা প্রদর্শনমূলক কঠোরতা দেখালেও ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফিফা’ টুঁ শব্দ করছে না। অথচ ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়া ইসরায়েল অনুর্ধ্ব-২৩ দলকে ভিসা দিতে অস্বীকার করলে ফিফা সাথেসাথে সেই টুর্ণামেন্ট আর্জেন্টিনায় সরিয়ে নেয়। আবার ইউক্রেন যুদ্ধের দায়ে ফিফা রাশিয়ার বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা কেড়ে নিলেও গাজায় অনবরত গণহত্যা চালানোর অপরাধে দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি, উল্টো তাদের বিশ্বকাপ বাচাইপর্ব খেলার সুযোগ করে দিয়েছে।

এভাবেই চলছে ফিফা ও পশ্চিমাদের সিলেক্টিভ নীতি ও মুসলিম বিদ্বেষ। মুসলিম রাষ্ট্র যখন বিশ্বকাপের আয়োজন করে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিতে চায়, তখনই পশ্চিমা গণমাধ্যম ও তথাকথিত মানবাধিকারের ধ্বজাধারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। কাতার বিশ্বকাপের সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে মানবিকতার মুখোশ পরে তারা অবিরাম বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। নারী অধিকার, শিশু নিরাপত্তা কিংবা সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে ঢাল বানিয়ে তারা মুসলিম বিশ্বকে ‘অসভ্য’ প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র হওয়ার কারণে। পক্ষান্তরে মুসলিম দেশে যখন সরাসরি গণহত্যা চলছে, তখন তাদের সেই মানবাধিকারের সংজ্ঞা হারিয়ে যায়। তারা এক অদ্ভুত ‘শ্মশানের নীরবতা’ পালন করে।

এদিকে আবার গাজা গণহত্যায় যে দেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য-অস্ত্র-অর্থ দিয়ে সমর্থন জোগায়, তাদের প্রতি আমাদের মোহ কাজ করে, তাদের রঙিন পতাকা-জার্সি মুড়িয়ে আমরা উৎযাপন করি। গাজাবাসীর সেই অসহায়ত্ব আর দুর্দশাকে আমরা আবেগের টুল হিসেবে ব্যবহার করি। তাদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা হয়ে গিয়েছে সিলেক্টিভ, দিনের আলোতে মিডিয়ার সামনে আমরা ‘হায় গাজা’-‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বলে রব তুলি, আবার গভীর রাতে গাজার খুনিদের দোসর রাষ্ট্রগুলোর জয়ধ্বনি করি। বিবেক ও নৈতিক মানদণ্ডের বিবেচনায় আমাদের এই অবস্থান হিপোক্রেসির কোন লেভেলে পড়ে, সেটা ভেবে দেখা উচিত।

‘খেলার সাথে রাজনীতি না মেলানো’র একটা বহুল প্রচলিত ন্যারেটিভ চালু আছে। কিন্তু খেলা-ই যখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, সেখানে খেলাকে রাজনীতির থেকে আলাদা করার সুযোগ নেই। নতুবা একজন স্পোর্টসম্যান হিসেবে স্প্যানিশ কোচ পেপ গার্দিওলা কিংবা স্প্যানিশ লীগ ম্যাচের গ্যালারিতে থাকা ফুটবল সমর্থকরা গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে নিন্দা-তিরস্কারের মুখে পড়তেন না। ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে ট্রফি উৎযাপন করার কারণে বার্সেলোনার ফুটবল তারকা লামিন ইয়ামালকে প্রকাশ্যে নিন্দাসূচক বাক্য শুনতে হতো না। 

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন