১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং বাদশাহ আব্দুল আজিজের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘কুইন্সি চুক্তি’র মূল ভিত্তি ছিল—‘সুরক্ষার বিনিময়ে তেল’। পরবর্তী দশকগুলোতে এই নীতিই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের বন্ধুত্বের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকে ছিল। নিজেদের নিরাপত্তার প্রয়োজনে সৌদি আরব বরাবরই স্থিতিশীলতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখাকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে বিশ্বব্যবস্থা দেশটিকে এক শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় প্রদান করেছিল, তা এখন দ্রুত ফিকে হয়ে আসছে। এর পেছনে চীনের উত্থান যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের আগের মতো জোরালো ভূমিকা পালন করতে না পারা। অন্যদিকে গাজা থেকে ইরান পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী তৎপরতা পুরো অঞ্চলকে সংঘাতের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
মার্কিন নিরাপত্তা বলয় নিয়ে তৈরি হওয়া এই অনিশ্চয়তার মুখে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ সৌদি আরবকে এখন নতুন সমীকরণে হাঁটতে হচ্ছে। রিয়াদ এখন কেবল একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে সরবরাহকারী দেশের তালিকায় বৈচিত্র্য আনছে; একইসঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং নিজস্ব মাটিতে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের গণ্ডি পেরিয়ে সিউল, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ পর্যন্ত রিয়াদ যেভাবে নিজেদের নতুন প্রতিরক্ষা বলয় বিস্তৃত করছে, তার মূল প্রেক্ষাপট সম্ভবত এটিই।
যুক্তরাষ্ট্র: অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে ঝুঁকি হ্রাসের চেষ্টা
‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (SIPRI)-এর তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষ দশে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে সৌদি আরব। তবে বর্তমানে রিয়াদ মার্কিন অংশীদারত্ব থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে না এলেও, একক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে ঝুঁকি হ্রাসের চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালের মে মাসে হোয়াইট হাউস ও সৌদি প্রেস এজেন্সির (SPA) ঘোষণা অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্যাকেজ এবং গোলাবারুদ উৎপাদন, প্রশিক্ষণ ও সিস্টেম আপগ্রেডের লক্ষ্যে একটি ‘লেটার অফ ইনটেন্ট’ (LoI) স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিও সম্পন্ন হয়।
তবে এই সম্পর্কের মূলে রয়েছে বর্তমান ভূ-রাজনীতির ‘আস্থার সংকট’।
ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয় দুটিকে আলাদাভাবে দেখার কৌশল নিয়েছে, যা আগে শর্তাধীন ছিল। ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (CSIS)-এর তথ্যমতে, সৌদির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও মূলত মার্কিন নির্ভর এবং চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উন্নয়নের পথে মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। তাই রিয়াদ পুরোনো বলয় ভাঙার চেয়ে বর্তমান সম্পর্ক বজায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আদায়ের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক: আমদানির বদলে যৌথ উৎপাদন
বর্তমানে সৌদি আরব তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে সমরাস্ত্র আমদানির চেয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে আর এক্ষেত্রে তুরস্ক তাদের অন্যতম প্রধান অংশীদার। তুর্কি প্রতিষ্ঠান ‘বায়কার’-এর সাথে সম্পাদিত ড্রোন চুক্তিতে সমরাস্ত্র কেনার চেয়ে প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘আসেলসান’ ও ‘এফএনএসএস’-এর মতো তুর্কি সংস্থাগুলোর সাথে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার ফলে সৌদি আরব তুর্কি প্রযুক্তির সহায়তায় নিজ দেশেই উন্নত সামরিক যান ও স্থল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আনাদোলু এজেন্সি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ (KAAN) প্রকল্পেও সৌদি আরবের বড় ধরনের বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তুরস্ক এখানে কেবল আমেরিকার বিকল্প নয়, বরং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার একটি কার্যকর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংযোগ ও আকাশ প্রতিরক্ষা
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় করতে এক নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে হওয়া ৩২০ কোটি ডলারের চুক্তির আওতায় সৌদি বাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ‘চিউনগুং-২’। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যখন কিছু ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরিয়ে নেয়, রিয়াদের কাছে তা ছিল একটি বড় সতর্কবার্তা। এই বাস্তবতা বুঝতে পেরেই সৌদি আরব এখন দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিকল্প শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, যাতে কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির কৌশলগত পরিবর্তনের মুখে নিজেদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা যায়।
রিয়াদ-প্যারিস অক্ষ: প্রতিরক্ষা ও কূটনীতির নতুন সমীকরণ
সৌদি আরব ও ফ্রান্সের সম্পর্ক গত দুই বছরে গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশ দুটি একটি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের রোডম্যাপ’ সই করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদির ‘এয়ার ওয়ারফেয়ার সেন্টার’-এ আয়োজিত ‘স্পিয়ার্স অফ ভিক্টরি ২০২৫’ মহড়ায় ফরাসি সশস্ত্র বাহিনীর রাফাল যুদ্ধবিমান ও সেনাসদস্যরা অংশ নেন। রিয়াদের কাছে ফ্রান্সের গুরুত্ব শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্যারিসের সক্রিয় ভূমিকার কারণেও। লেবানন ইস্যু এবং ফিলিস্তিন সংকটে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নিয়েও জাতিসংঘে দুই দেশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে।
পাকিস্তান: ঐতিহাসিক সম্পর্ক থেকে কৌশলগত মৈত্রী
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা কৌশলে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম পাকিস্তান। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশ দুটি একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে, যার ভাষা ছিল অত্যন্ত জোরালো—যেকোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে তা অপর দেশের ওপর হামলা হিসেবেই গণ্য হবে। এর মাধ্যমে বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা বলয়ে যুক্ত করা হলো। ‘চ্যাটাম হাউস’-এর মতে, এই চুক্তি মূলত একটি ‘বর্ধিত প্রতিরোধ’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদাহরণ, যা পারমাণবিক সক্ষমতার কথা সরাসরি উল্লেখ না করেও অলিখিতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে এবং এটি একই সঙ্গে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য একটি জোরালো সংকেত।
ইউক্রেনীয় অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
সৌদি আরবের সমকালীন প্রতিরক্ষা কৌশলে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হলো ইউক্রেনের সাথে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির রিয়াদ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। রয়টার্সের তথ্যমতে, ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞরা সৌদি আরবের জেনারেল স্টাফের সাথে ড্রোন বা এ ধরনের অপ্রথাগত (Asymmetrical) আকাশপথের হামলা থেকে জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা করার কৌশল নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন।
সৌদি আরবের এই সাম্প্রতিক তৎপরতা ওয়াশিংটন বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বজায় রেখেই নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বহুমুখী করার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা। রিয়াদের এই কৌশল মূলত একক নির্ভরতা কমিয়ে বদলে যাওয়া ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জনেরই একটি দূরদর্শী প্রয়াস।
তথ্যসহায়তা: SIPRI, GAMI, SPA, CSIS, আনাদোলু এজেন্সি, রয়টার্স এবং চ্যাটাম হাউস।












