সিরিয়া এখন স্থিতিশীলতার প্রতীক, সংকট উসকে দিচ্ছে ইসরায়েল: আহমাদ আশ শারা

আমি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই করেছি, সম্মানের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। বেসামরিক মানুষকে নিরাপদ রাখতে নিজের জীবনসহ সহযোদ্ধাদের জীবনকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলেছি।
আহমাদ আশ শারা
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারা। ছবি : আল জাজিরা

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ শারা বলেছেন, সিরিয়া এখন সঠিক পথে এগোচ্ছে। একসময় যে অঞ্চলকে সংকটের উৎস বলা হতো, সেই সিরিয়াই এখন স্থিতিশীলতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আর ইসরায়েলই আজ নানা সংকট অন্যদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আহমাদ আশ শারার মতে, দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহারের দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন তাদের অবস্থান সমর্থন করছে।

দোহা ফোরামের ২৩তম আসরের এক সেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, গত এক বছরে ইসরায়েল সিরিয়ার ভেতরে এক হাজার বার বিমান হামলা চালিয়েছে এবং চারশোর বেশিবার অনুপ্রবেশ করেছে। তবুও সিরিয়া ১৯৭৪ সালের চুক্তি সম্মান করে চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, সিরিয়ার এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো স্থায়ী ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর না থাকে। কারণ ব্যক্তি অসুস্থ হতে পারেন বা মারা যেতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান থাকলে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা অটুট থাকে।

তিনি বলেন, সিরিয়া এখনই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজনের অবস্থায় নেই। অস্থায়ী সাংবিধানিক ঘোষণায় বর্তমান প্রেসিডেন্টকে পাঁচ বছরের মেয়াদ দেওয়া হয়েছে, যার চার বছর এখনো বাকি।

তিনি আরও বলেন, সিরিয়ার নারীরা দেশে পূর্ণ অধিকার ভোগ করছেন এবং সরকার ও পার্লামেন্টেও তাঁদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব আছে। সাম্প্রদায়িক বিবেচনায় পদ বণ্টনের ধারণা তিনি সরাসরি নাকচ করেন। তাঁর দাবি, মনোনয়ন থেকে শুরু করে দায়িত্ব বণ্টন, সবই হয় যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং সবার জন্য সিরিয়া

সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শারা জোর দেন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে। তাঁর মতে, কয়েকজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থার বদলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের ন্যায়সংগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারে। তিনি বলেন, টেকসই রাষ্ট্রগঠনের মূল ভিত্তি হলো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি নয়। কারণ ব্যক্তি অসুস্থ হতে পারেন, মারা যেতে পারেন; কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে এবং রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে।

তিনি আরও বলেন, যদি দেশের তত্ত্বাবধান একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। তাঁর ইঙ্গিত উন্নত অনেক দেশ, যেখানে এখনো রাজতন্ত্র রয়েছে, সেসব দেশও নিজেদের ভেতরে বহু কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং কার্যত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপ নিয়েছে।

আহমাদ আশ শারা স্পষ্ট করে বলেন, রাষ্ট্র রাজতন্ত্র হোক বা প্রজাতন্ত্র সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, রাষ্ট্রকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো উচিত যা ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির বাইরে গিয়ে স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারে।

অভ্যন্তরীণ ঐক্য নিয়ে উদ্বেগের জবাবে আহমাদ আশ শারা অভিযোগটি খারিজ করে বলেন গত এক সপ্তাহে লাখো মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে শাসনব্যবস্থা পতনের আনন্দ প্রকাশ করছে। তারা কি ভীত?

তিনি বলেন, সিরিয়া এখন তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। দেশটি সম্ভাবনাময়, আর দুনিয়ার কোনো দেশেই শতভাগ ঐক্য বা সম্পূর্ণ সমস্যা-মুক্ত নয়।

ইতিহাসের উদাহরণ টেনে আহমাদ শারা বলেন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ক্ষেত্রে সিরিয়া একসময় দৃষ্টান্ত ছিল। মানুষ কীভাবে একসঙ্গে বাস করতে পারে, সেটা সিরিয়া বিশ্বকে শিখিয়েছে। সিরিয়ার সব জনগোষ্ঠীই বিপ্লবে কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল। খ্রিষ্টানরা আগের শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল, আর আলাভি সম্প্রদায় ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও শোষণের কারণে সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে।

সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শারা জানান, সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, আন্তর্জাতিক দলকে স্বাগত জানিয়েছে, আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে এবং উপকূলীয় এলাকা ও সুয়াইদায় যাঁরা অপরাধ করেছে তাদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাগুলো নেতিবাচক ও ভয়াবহ ছিল, তবে সীমিত। আমরা এগুলোর কোনো ন্যায্যতা দিই না; যাঁরা অপরাধ করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনের সময়সূচি

নির্বাচনের সময়সূচি প্রসঙ্গে আহমাদ শারা জানান, দামেস্ক বিজয়ের পর একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সাংবিধানিক ঘোষণা গৃহীত হয়, যা স্থায়ী সংবিধান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

তিনি বলেন, এটা বর্তমান প্রেসিডেন্টকে পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছে, এরপর শুরু হবে নির্বাচন। এই পাঁচ বছরে নতুন আইন প্রণয়ন, অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সাজানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচনা করে তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি তৈরি হয়।

আহমাদ আশ শারা জানান, পাঁচ বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে এক বছর পার হয়েছে, সামনে আরও চার বছর বাকি।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন আয়োজনের আগে সিরিয়ার আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামো সুসংহত করা প্রয়োজন। সিরিয়া এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যদিও স্থানীয় কিছু নির্বাচন ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

‘সন্ত্রাসবাদ মানে কী?’

নিজের অতীত এবং আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে শারা নিজেকে সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে নাকচ করেন। তিনি পাল্টা জানতে চান, সন্ত্রাসী বলতে কী বোঝায়? সন্ত্রাসবাদের মূল সংজ্ঞাটাই বা কী?

তিনি বলেন, তাঁকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এক ধরনের রায়। বিশ্বের নানা স্থানে যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়াই অনেক ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী তকমা দেওয়া হয়। সাধারণ ধারণায় সন্ত্রাসী হল সেই ব্যক্তি, যে নিরীহ মানুষ, শিশু ও সাধারণ জনগণকে হত্যা করে এবং তাঁদের ক্ষতি করতে অবৈধ উপায় ব্যবহার করে।

তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, যদি এই সংজ্ঞা বহু রাষ্ট্রের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে গাজায় প্রায় ৬০ হাজার নিরীহ মানুষ শহিদ হয়েছে। সিরিয়ায় গত ১৪ বছরে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। এখনো আড়াই লাখের বেশি মানুষ নিখোঁজ।

আহমাদ আশ শারা জানান, তাঁরা সব কারাগার খুলে দিয়েছেন, কিন্তু ওই নিখোঁজ মানুষদের কাউকে পাওয়া যায়নি। যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তবুও এসবকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বর্ণনা করা হয় না—এ নিয়ে শারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি কোনো দিনই বেসামরিক মানুষের ক্ষতি করেননি। তাঁর বক্তব্য, আমি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই করেছি, সম্মানের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। বেসামরিক মানুষকে নিরাপদ রাখতে নিজের জীবনসহ সহযোদ্ধাদের জীবনকে বারবার ঝুঁকির মুখে ফেলেছি।

আহমাদ আশ শারা বলেন, সময় প্রমাণ করেছে এসব অভিযোগ ভুল ছিল। শেষ পর্যন্ত বিশ্বও বুঝেছে যে সেই নীতি এবং বর্ণনা দুটোই ভুল ছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে সন্ত্রাসীর তকমা তুলে নিয়েছে।

নারীর অধিকার

নারীর অধিকার নিশ্চিতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আহমাদ আশ শারা বলেন, সিরিয়ার সমাজে নারী পূর্ণ ক্ষমতা ও সুযোগ–সুবিধা ভোগ করেন। তিনি জানান, ইদলিবে থাকাকালে তাঁরা একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীদের দুই–তৃতীয়াংশই ছিলেন নারী। পড়াশোনা শেষে তাদের অনেকেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, কেউ যুক্ত হয়েছেন সাধারণ শ্রমবাজারে।

শারা বলেন, সিরিয়ার নারী ইতিমধ্যেই ক্ষমতায়িত; তাঁদের অধিকারও সুরক্ষিত। সরকার, জাতীয় সংসদ সব জায়গাতেই নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, আমার মনে হয় সিরিয়ান নারীদের নিয়ে আশঙ্কার কিছু নেই; বরং আমরা বেশি চিন্তিত সিরিয়ান পুরুষদের নিয়েই।

দোহা ফোরামের ২৩তম আসর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠা: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতায়’ শিরোনামে। শনিবার ও রোববার দু’দিন ধরে দোহা শেরাটন হোটেলে চলছে ফোরামের অধিবেশন। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা ও শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন।

ফোরামে ছয় হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী এবং প্রায় ১৬০ দেশের ৪৭১ জন প্রতিনিধি উপস্থিত আছেন। খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আঞ্চলিক সংঘাতসহ নানা বৈশ্বিক ইস্যুতে তাঁরা আলোচনা করছেন। যেখানে তাত্ত্বিক ভাবনাকে বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য সমাধানে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা