একটি অন্ধকার গলি। সেটি পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সাতজন যোদ্ধা। গলিটি পেরোতে তাঁদের সময় লাগে ঠিক ৩০ মিনিট। অপর প্রান্তে পৌঁছেই তাঁরা তুলে নেন যার যার অস্ত্র ও সরঞ্জাম। তারপর চূড়ান্ত আক্রমণের নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকেন।
সময়টা ২০০৬ সালের গ্রীষ্মকাল। স্থান, গাজা উপত্যকার সীমানার ঠিক বাইরে, সুড়ঙ্গের মুখের কাছে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সুপরিকল্পিত এক অভিযান। মূল লক্ষ্য ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি ‘কেরেম শালোম’। টার্গেটের তালিকায় একটি সামরিক ওয়াচটাওয়ার, একটি সাঁজোয়া ক্রু বাহক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একটি হাইটেক ‘মারকাভা’ ট্যাংক।
ট্যাংকটি নিষ্ক্রিয় করার পরপরই দুই যোদ্ধা উঠে পড়েন সাঁজোয়া যানটির ওপর। ভেতরে থাকা সেনাদের লক্ষ্য করে মুড়ি-মুড়কির মতো চালাতে থাকেন গুলি আর গ্রেনেড। নিহত হয় ট্যাংকের কমান্ডার ও আরও এক সেনা। এর মধ্যেই তৃতীয় সেনাটি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ঠিক তখনই নির্দেশ আসে, এই সেনাকে বন্দি করে সীমান্ত বেড়া টপকে সোজা গাজায় নিয়ে আসতে হবে।
বাকি যে যোদ্ধারা অক্ষত ছিলেন, তাঁরা পিছু হটেন। আর একজন ফিরে যান ঠিক সেই সুড়ঙ্গের মুখ দিয়েই। ১০ মিনিটেরও কম সময়ে যোদ্ধারা ফিরে আসেন গাজা উপত্যকায়, ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিত তখন তাঁদের কবজায়। মাটির নিচ থেকে আসা এই বড় ধাক্কার পরও ইসরায়েল দাবি করে বসল, তারা নাকি গাজার ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বজায় রেখেছে!
অথচ এই হামলা চালাতেই প্রায় এক বছর ধরে খোঁড়া হয়েছিল ৪৫০ মিটারের এক সুড়ঙ্গ। এর কিছুটা অংশ ছিল গাজার ভেতরে, বাকিটা সীমানার বাইরে। গভীরতা ছিল প্রায় ৯ মিটার। এটি ছিল গাজার সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের এক প্রাথমিক রূপ। এরপর বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাটির নিচে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সুড়ঙ্গের পর সুড়ঙ্গ। ছোট সেই পথগুলো ধীরে ধীরে আরও দীর্ঘ হয়, আরও গভীরে নামে, একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হতে থাকে। একসময় গাজার মাটির নিচে গড়ে ওঠে এক বিশাল অদৃশ্য জগৎ।
প্রতিটি যুদ্ধের পরই ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, সুরঙ্গ ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধযোদ্ধারা মাটির নিচের এই বিশাল অস্ত্রাগারকে আরও উন্নত ও শক্তিশালী করে তুলেছে। কিন্তু কীভাবে এই সুরঙ্গগুলো ইসরায়েলের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে সাহায্য করল? আর এটি কি আমাদের ইতিহাসের সেই অসম লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দেয় না—যেখানে বিশাল এক বাহিনীর বিরুদ্ধে মাটির নিচ থেকে লড়াই করে জয়ী হয়েছিল এক অনিয়মিত গেরিলা বাহিনী?
সুরঙ্গের শুরু
সুরঙ্গ বরাবরই প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দুর্বল পক্ষের এমন এক অস্ত্র, যা দিয়ে তারা শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। প্রতিপক্ষ যখন মাটির ওপরে সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তিতে যোজন যোজন এগিয়ে, তখন দুর্বল পক্ষ আশ্রয় নেয় মাটির গভীরে।
চিত্রটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। গাজা উপত্যকা মূলত এক সমতল ভূমি। মোট আয়তন মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। এর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দীর্ঘতম সরলরেখাটিও ৫০ কিলোমিটারের বেশি নয়। পাহাড়-পর্বত নেই, ঘন জঙ্গল নেই, নেই এমন কোনো দুর্গম প্রাকৃতিক জায়গা, যেখানে যোদ্ধারা সহজে নিজেদের আড়াল করতে পারেন। ফলে মাটির ওপরে লুকিয়ে থাকা, সামরিক মহড়া চালানো কিংবা অস্ত্র-সরঞ্জাম নিরাপদে রাখার সুযোগও ছিল খুবই সীমিত।
এই ভূখণ্ডেই বিগত ২০ বছরে গড়ে উঠেছে ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এক সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক! এর কোনো অংশ মাটির ২০ থেকে ৫০ মিটার গভীরে, আবার কোনোটি ৮০ মিটার পর্যন্ত নিচে। অন্তত আমরা যতটুকু জানি, ততটুকুই। কারণ এই নেটওয়ার্ক সম্পর্কে যা কিছু প্রকাশ পেয়েছে, তার উৎস হয় ইসরায়েলের আবিষ্কৃত তথ্য, নয়তো প্রতিরোধ বাহিনীর নিজস্ব প্রচার কিংবা প্রতিপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির অংশ।
এই গল্পের শুরুটা হয়েছিল গাজা ও মিসর সীমান্তের চোরাচালান সুড়ঙ্গ থেকে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে আর সীমান্তের দুই পারের সামাজিক বন্ধন টিকিয়ে রাখতে গাজাবাসীর কাছে এটিই ছিল একমাত্র ভরসা। পরবর্তীতে ইসরায়েলি দখলদারদের চোখের আড়ালে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো এই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করতে শুরু করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনা-নেওয়ার কাজে।
দ্বিতীয় ইন্তিফাদার দিনগুলোতে আল-কাসসাম ব্রিগেডস খুঁড়েছিল একেবারে সাধারণ মানের কিছু সুড়ঙ্গ। মাটির নিচ দিয়ে এগিয়ে এসব সুড়ঙ্গ পৌঁছে যেত এমন সব দুর্গম ঘাঁটিতে, যেখানে ওপর দিয়ে যাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। যোদ্ধারা সেখানে গিয়ে টার্গেটের কাছে মাইন বা বোমা পুঁতে দিতেন, তারপর নিরাপদে ফিরে আসতেন সেই পথেই।
২০০৬ সালের পর গাজার ভেতরের পরিস্থিতি বদলে গেল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সীমান্ত থেকে পিছু হটে আর গাজার দায়িত্বে আসে হামাস। কিন্তু অবরুদ্ধ অবস্থা আর ইসরায়েলি আকাশপথের কড়া নজরদারি প্রতিরোধের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই মাটির অন্ধকারেই চলতে থাকে খননকাজ। নীরব, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন। মাটি খোঁড়ার কাজটা এতটাই বিপজ্জনক ছিল যে, নির্মাণ চলাকালেই প্রাণ হারিয়েছেন বহু শ্রমিক মুজাহিদ। গাজার নরম ও বেলে মাটি হাত দিয়ে কিংবা সাধারণ হাতিয়ার দিয়ে খোঁড়া হয়তো সহজ ছিল, কিন্তু সুড়ঙ্গকে ধসে পড়া থেকে বাঁচাতে ভেতরের দেয়ালগুলো কংক্রিটের স্ল্যাব দিয়ে মজবুত করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
শ্রমিকদের সামনে বাধা ছিল অনেক। শব্দ করা যাবে না, শত্রুর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ জাগানো চলবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা, মাটির বিশাল স্তূপ সরাতে হবে নিঃশব্দে! প্রতিরোধ যোদ্ধারা অবশ্য কখনো খোলসা করেনি, তারা এই মাটি কোথায় সরাত। তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের ধারণা, অতিরিক্ত মাটি স্রেফ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো কিংবা সাধারণ দালানকোঠার নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হতো।
মাটির নিচের পাজল
ইসরায়েল প্রথম দিকে বুঝতেই পারেনি, মাটির নিচে তৈরি হওয়া এই বিস্তৃত রাজ্যটা আসলে কতটা বিশাল। তাদের গোয়েন্দা তথ্যে ছিল বড় ধরনের খামতি। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে ইসরায়েল যখন গাজায় হামলা চালায়, তখন তারা চরম অবাক হয়ে দেখে—এই সুরঙ্গ ব্যবহার করেই সীমানা পেরিয়ে প্রতিরোধ যোদ্ধারা চালিয়েছে ছয়-ছয়টি সফল অভিযান! কখনো গাজায় ঢুকে পড়া সেনাদলের ওপর, কখনো সীমান্তের ওপারে সুরক্ষিত ইসরায়েলি চৌকিতে। হামলা চালিয়ে একইভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা।
ইসরায়েল ততদিনে বুঝে গেছে, তারা স্রেফ কিছু গর্তের মুখোমুখি নয়। এটি দীর্ঘ ও জটিল এক সুরঙ্গজাল। এর রয়েছে বহু প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম, সুসজ্জিত মেডিকেল সেন্টার এবং মাসের পর মাস টিকে থাকার মতো খাবার ও অস্ত্রের গুদাম! একে অপরের সঙ্গে যুক্ত সুরঙ্গগুলোতে রয়েছে হাওয়া-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সিস্টেম।
প্রতিটি সুরঙ্গের কাজও আলাদা। আক্রমণের জন্য তৈরি করা সুরঙ্গগুলোর শেষ প্রান্ত গিয়ে মিশেছে মাটির নিচের রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে। যোদ্ধারা মাটির নিচ থেকেই রকেট পজিশন করে ফায়ার করেন, তারপর শত্রুর চোখে পড়ার আগেই আড়ালে চলে যান। অন্যদিকে কিছু সুরঙ্গ ব্যবহৃত হয় খাবার ও রসদ সরবরাহ এবং দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের জন্য। আর গাজার সীমানার ভেতরে থাকা ‘ডিফেন্সিভ’ বা আত্মরক্ষামূলক সুরঙ্গগুলো থেকে ছড়িয়ে গেছে ডজন ডজন চোখ বা গোপন পথ। ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনীকে থমকে দিতে কিংবা তাদের পেছনের সারিতে অনুপ্রবেশ করতে প্রতিবারই এই পথগুলো ব্যবহার করেছে ফিলিস্তিনিরা।
মাটির নিচের এই চলাচলের গতি আর নমনীয়তা ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের এমন এক সুবিধা দিয়েছে যে, ইসরায়েলি সেনাদের মনে হতে শুরু করেছিল, তারা যেন রক্তমাংসের কোনো মানুষের সঙ্গে নয়, কোনো ভূতের সঙ্গে লড়ছে! মাটির নিচ থেকে হঠাৎ দৃশ্যমান হওয়া, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হামলা চালানো, তারপর আবার নিমেষেই উধাও হয়ে যাওয়া–শত্রুর মনে চরম বিভ্রান্তি আর ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল।



তবে ভূগর্ভস্থ সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে লড়াই করার এমন দৃশ্য শুধু আজকের গাজায় বা এই সময়েই প্রথম নয়। মাটির নিচে লুকিয়ে থেকে, হঠাৎ আঘাত করে আবার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার এই কৌশল আরও বহু আগে ব্যবহার করেছিল আরেক অনিয়মিত বাহিনী। ইতিহাস আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে, দক্ষিণ ভিয়েতনামে।
ভিয়েতনামের ছায়া যোদ্ধারা
মাটির নিচে ছোট্ট এক গর্তের মুখ, যা খুলে দেয় এক অবিশ্বাস্য পাতালপুরীর দুয়ার! বলছিলাম বিখ্যাত ‘কু চি’ (Cu Chi) সুরঙ্গ ব্যবস্থার কথা। এটি ছিল বহু স্তরে সাজানো এক জটিল গলিঘুঁজি, যা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশাল এক এলাকা জুড়ে। ভেতরে ছিল আশ্রয়কেন্দ্র, অস্ত্রাগার, ফিল্ড হাসপাতাল, মিটিং রুম, ঘুমানোর ঘর, এমনকি রান্নাবান্নার রন্ধনশালাও! এগুলো ব্যবহার করত ‘ভিয়েতকং’ তথা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের যোদ্ধারা। যারা তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। একদম আজকের গাজার মতোই তারাও অতর্কিত হামলা চালাত মার্কিন সেনাদের ওপর, তারপর নিমেষেই মিলিয়ে যেত মাটির গহ্বরে।
আমেরিকানরা যখন ভিয়েতনাম আক্রমণ করে, তখন তারা টেরই পায়নি যে এই সুরঙ্গ ব্যবস্থা সেখানে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে এবং এর শিকড় অনেক গভীরে। দীর্ঘদিন ধরে ভিয়েতনামিরা নিজেদের চেনা ভূমির নিচে তৈরি করেছিল এই জটিল ধাঁধা। এই খননকাজ কোনো সাধারণ সামরিক অভিযান ছিল না, এটি ছিল এক সামাজিক আন্দোলন! বৃদ্ধ, নারী, কিশোর-কিশোরী, এমনকি শিশুরাও হাতে হাত মিলিয়ে মাটি খুঁড়েছে। এই খননকাজে ভিয়েতনামিদের সবচেয়ে বড় সহায় ছিল তাদের মাটি। এই মাটি ছিল লোহাসমৃদ্ধ ও আঠালো কাদার মিশ্রণ। একদিকে যেমন সুড়ঙ্গের দেয়ালকে শক্ত করে ধরে রাখত, অন্যদিকে সাধারণ কোদাল কিংবা হাত দিয়েই তা কাটা যেত।
আর এই বিপুল পরিমাণ মাটি কোথায় সরানো হতো? তৎকালীন নির্দেশ ছিল, মাটিগুলো ঘরের ভেতরে বাড়তি মেঝে তৈরিতে, আলু চাষের নালায়, লড়াইয়ের পরিখায় অথবা সোজা নদীর স্রোতে ফেলে দিতে হবে। শর্ত একটাই, বাইরে মাটির স্তূপ বানিয়ে রাখা যাবে না কোনোভাবেই!
মাটির নিচের জীবনটা ছিল চরম নিষ্ঠুর। খাবার ছিল হিসাব করে, নড়াচড়া মেপে মেপে। কখনো কখনো টানা কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহজুড়েও অন্ধকারে লুকিয়ে থাকতে হতো। শুধু যোদ্ধারাই নন, তাঁদের সঙ্গে আঁধারঘরে বন্দি থাকতেন নার্স, লেখক থেকে শুরু করে শিল্পী সমাজের মানুষও। মাটির ওপরের পৃথিবীর সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেত, যখনই ওপর থেকে ঘেরাও আরও শক্ত হতো।
এমনই একজন ভিয়েতকং লেখকের ভাষ্য, ‘ভেতরে টাইপরাইটার ছিল খুব অল্প কয়েকটি। সেগুলো দিয়ে আমরা মূলত গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে বুলেটিন বা চিঠি লিখতাম। তাদের কেবল এটা মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি ছিল যে, আমরা তাদের ছেড়ে যাইনি… আমরা এখনও বেঁচে আছি, ঠিক তাদের পায়ের নিচে। মাটির গভীরে।’
সুরঙ্গ ধ্বংস করতে আমেরিকার ভারী বিমান হামলা বা কার্পেট বোম্বিংও কোনো কাজে আসেনি। বাধ্য হয়ে মার্কিন ও তাদের মিত্র বাহিনী অন্য পথ ধরল। তারা সুরঙ্গের ভেতরে টিয়ার গ্যাস ছড়াতে শুরু করল। এতে ভিয়েতকং যোদ্ধাদের জন্য তৈরি হলো এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হলো ধোঁয়া বোমা। সুরঙ্গের একটি মুখে ধোঁয়া ছেড়ে পর্যবেক্ষণ করা হতো, অন্য কোনো মুখ দিয়ে সেই ধোঁয়া বের হয় কি না।
ধোঁয়া বোমার ধোঁয়া যখন অন্য মুখগুলো দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করল, তখনই ফাঁস হয়ে গেল সুরঙ্গের গোপন অবস্থান। এরপর মার্কিন বাহিনী বেছে নিল এক নতুন ধরনের যোদ্ধা, যাদের নাম দেওয়া হলো ‘টানেল র্যাট’ বা সুরঙ্গের ইঁদুর! মূলত এরা ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক সেনা। তাঁদের শারীরিক ও মানসিক গড়নও হতে হতো নির্দিষ্ট ধরনের। উচ্চতায় খাটো, ছিপছিপে গড়নের। বিপদের মুখোমুখি হলে চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ক্ষিপ্রতাও থাকতে হতো তাঁদের।
এই ‘ইঁদুর’-দের কাজ ছিল ভিয়েতনামের কু চি সুরঙ্গের গভীরে ডুব দেওয়া। সঙ্গে থাকত একেবারে নামমাত্র সরঞ্জাম—একটি ছুরি, একটি পিস্তল আর একটি ফ্ল্যাশলাইট। মাটির নিচে মাইলের পর মাইল বুকে হেঁটে এগোতে হতো তাঁদের। প্রতিটি বাঁকে ওত পেতে থাকত মৃত্যু—হয় বিস্ফোরক ফাঁদ, নয়তো বেঁধে রাখা বিষাক্ত সাপ, কিংবা সরাসরি ভিয়েতনামি যোদ্ধাদের সঙ্গে মরণপণ লড়াই! আমেরিকানরা এই পথগুলোর নাম দিয়েছিল ‘মাকড়সার গর্ত’ (Spider holes)। এক মার্কিন সেনার ভাষায়, “আপনি জানেন না সামনে কী আছে বা কী দেখতে পাবেন! শুধু প্রার্থনা করতে হয় যেন মাথাটা ঠিক থাকে। অভিজ্ঞতাটা ছিল রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। আমি ওই সুরঙ্গগুলোকে ঘৃণা করতাম।”
কিছু টানেল র্যাট অবশ্য সফলভাবে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। টিয়ার গ্যাসের গুঁড়ো কিংবা বিস্ফোরক দিয়ে কিছু সুরঙ্গ তাঁরা নিষ্ক্রিয়ও করেছিলেন। সাময়িকভাবে সেগুলো অকেজো করা গেলেও, বড় সংখ্যক টানেল র্যাটকে মাটির নিচ থেকে টেনে তুলতে হয়েছিল লাশ হিসেবে কিংবা গুরুতর আহত অবস্থায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভিযান মার্কিন সেনাদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়। স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যাও তখন তলানিতে এসে ঠেকে। শেষমেশ কয়েক বছরের মাথায় আমেরিকা ভিয়েতনাম ছাড়তে বাধ্য হয়, আর সগৌরবে টিকে থাকে কু চি সুরঙ্গ।
লেবাননের পাথুরে প্রাচীর: হিজবুল্লাহর আন্ডারগ্রাউন্ড দুর্গ
ইতিহাসের এই পাতাটি কি আপনাকে কোনো কিছুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে? একটু দাঁড়ান, আমরা আবার গাজায় ফিরব। তার আগে চলুন ঘুরে আসি লেবাননের আরেকটি সুরঙ্গ-ফ্রন্ট থেকে, যার রহস্য ভেদ করতে ইসরায়েল এখনো মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে।
হিজবুল্লাহ তাদের সুরঙ্গগুলো কেটেছে কঠিন পাথরের বুকে। এখানকার পরিবেশ গাজার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাথর কেটে পথ তৈরি করতে যেমন বেশি সময় লাগে, তেমনি প্রয়োজন হয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির। এই সুরঙ্গগুলোর আসল আকার, গভীরতা বা এগুলো তৈরিতে কাদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে—তার প্রায় সব তথ্যই রহস্যাবৃত। হিজবুল্লাহ এটি চরম গোপনীয়তায় ঢেকে রেখেছে। যদিও ইসরায়েলের একটি গবেষণা কেন্দ্রের দাবি, উত্তর কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় হিজবুল্লাহ এই সুরঙ্গ-নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা সিরিয়া থেকে শুরু করে ইসরায়েল পর্যন্ত বিস্তৃত। বৈরুত, বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননের তিনটি আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টারকে নাকি যুক্ত করেছে এই বিশাল নেটওয়ার্ক।
লেবাননের সুরঙ্গগুলো অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০০৬ সালের গ্রীষ্মে মারুন আল-রাসের যুদ্ধে অংশ নেওয়া ইসরায়েলি সেনা ‘গাদ’-এর কথা শোনা যাক। তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ভেবেছিলাম, সেখানে হয়তো একটা তাঁবু আর তিনটে কালাশনিকভ রাইফেল পাব।’ কিন্তু গাদ ও ম্যাগেলান ইউনিটের অন্য সেনারা সেখানে যা দেখলেন, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না তারা। একটি হাইড্রোলিক স্টিলের দরজা তাঁদের নিয়ে গেল এক সুসজ্জিত সুরঙ্গ-ব্যবস্থার ভেতরে! ইসরায়েলি ইউনিটটি বিস্মিত হয়ে দেখল, হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা সেই সুরঙ্গ দিয়ে পিছলে ভেতরে ঢুকছে আর বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে।



২০০৬ থেকে ২০২৪ এই দীর্ঘ সময়ে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সুরঙ্গগুলো বোঝার এবং তা মোকাবিলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। প্রতিটি যুদ্ধেই ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল এই সুরঙ্গগুলো ধ্বংস করা। কিন্তু সম্প্রতি, যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই হিজবুল্লাহ পাহাড়ের গভীরে খোঁড়া তাদের বিশাল সব সামরিক স্থাপনার ভিডিও প্রকাশ করে, যার নাম ‘ইমাদ ফোর’ এবং ‘ইমাদ ফাইভ’। এগুলো যেন মাটির নিচের আস্ত এক শহর! যার শুরু কোথায় আর শেষই বা কোথায়, তা বোঝা দায়। প্রশস্ত এই সুড়ঙ্গগুলোতে ফোর-হুইলার গাড়ি এবং বড় ট্রাক অনায়াসে চলতে পারে। মাটির গভীরের এই স্থাপনাগুলোতে সাজানো রয়েছে সারি সারি শক্তিশালী রকেট ও লঞ্চার।
ইসরায়েল হাতেগোনা কয়েকটি সুরঙ্গের সন্ধান পেয়েছে, যার মধ্যে কিছু দক্ষিণ লেবানন থেকে সীমান্ত অতিক্রম করেছিল। এগুলো অকেজো করতে ইসরায়েল কোনোটিতে বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে, আবার কোনোটি কংক্রিটের মিশ্রণ দিয়ে ভরাট করে দিয়েছে। হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া দু-একটি সুরঙ্গ হয়তো এই পদ্ধতিতে ধ্বংস করা সম্ভব, কিন্তু একের পর এক সামরিক অভিযান চালানোর পরও সামগ্রিকভাবে এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা এখনো এক অসম্ভব স্বপ্ন।
গাজায় ইসরায়েলি প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা
এবার গাজায় ফেরা যাক। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ইসরায়েল কি গাজার সুরঙ্গ ধ্বংসের সব উপায়ই প্রয়োগ করে ফেলেছে? এই লক্ষ্য অর্জনে তারা আসলে নতুন কী উদ্ভাবন করেছিল?
সীমান্ত পেরোনো এই সুরঙ্গগুলো যে বড়সড় হুমকি, তা ইসরায়েল বহু আগেই টের পেয়েছিল। আর তাই ২০২১ সালে গাজা সীমান্তে তারা এক দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা প্রাচীর গড়ে তোলে। মাটির ওপরে ছয় মিটার উঁচু কাঁটাতার ও ইস্পাতের দেয়াল, আর মাটির গভীরে সমান্তরালভাবে নামানো হয় কংক্রিটের আরেক দেয়াল। এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় অত্যাধুনিক সেন্সর ও রাডার ব্যবস্থা, যাতে কোনো খননকাজ বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা হলেই তা ধরা পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর প্রায় দু’বছর পর ঠিক এই দুর্ভেদ্য প্রাচীরের নিচেই বিশাল এক সুরঙ্গের খোঁজ মেলে, যার ভেতর দিয়ে গাড়ি পর্যন্ত চলতে পারে!
আকাশপথের ব্যর্থতা: মাটির কাছাকাছি থাকা অগভীর সুরঙ্গ ধ্বংস করতে ইসরায়েল ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। ব্যবহার করেছে বাঙ্কার-বাস্টার (Bunker Busters)-এর মতো ভারী বোমা। অত্যন্ত দ্রুতগতির এই বোমাগুলোর সামনের অংশ বেশ শক্ত হয় এবং এতে বিলম্বিত বিস্ফোরণ প্রযুক্তি থাকে, যাতে এটি মাটির অনেক গভীরে ঢোকার পর বিস্ফোরিত হয়। তবে এর বড় একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ছোট জায়গায় আঘাত হানে। পুরো সুরঙ্গ ধ্বংস করতে পারে না।
শোনা যায়, তারা থার্মোবারিক (Thermobaric) বা ভ্যাকুয়াম বোমারও ব্যবহার করেছে। এই বোমায় দুটি বিস্ফোরক চার্জ থাকে। প্রথম বিস্ফোরণে জ্বালানির একটি বিশাল মেঘ তৈরি হয়, যা সুরঙ্গের ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর দ্বিতীয় বিস্ফোরণে ওই মেঘটি পরিণত হয় এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে, যা মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের সব অক্সিজেন শুষে নেয়। কিন্তু এত কিছুর পরও ইসরায়েলের বিমানবাহিনী মাটির অনেক গভীরে থাকা সুরঙ্গগুলোর তেমন কোনো ক্ষতিই করতে পারেনি।
স্থলপথের প্রযুক্তি: স্থলপথেও ইসরায়েল বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করে দেখেছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘ইমালসন’ (Emulsion) নামের এক ধরনের জেলি-সদৃশ তরল বিস্ফোরক। পাইপের মাধ্যমে এই তরল সুরঙ্গে ঢুকিয়ে তারপর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কিন্তু একটি মাত্র সুরঙ্গ ধ্বংস করতেই প্রচুর সময় এবং কয়েক টন ইমালসনের প্রয়োজন হতো।
তারা ‘স্পঞ্জ বম্ব’ (Sponge Bomb)-ও ব্যবহার করেছে। এটি আসলে কোনো বোমা নয়, বরং এক ধরনের ফোম, যা ছুড়লে দ্রুত প্রসারিত হয়ে শক্ত হয়ে যায়। এটি দিয়ে সুরঙ্গের মুখ সাময়িকভাবে ব্লক করা গেলেও পুরো সুরঙ্গ ধ্বংস করা যায় না।
শিকারি কুকুর আর আটলান্টিকের জল
ইসরায়েল যত নিত্যনতুন প্রযুক্তি আর অস্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছে, সুরঙ্গের নেটওয়ার্কগুলোও যেন ততটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। সুরঙ্গমুখে ফাঁদ, মাটির আরও গভীরে খনন, বিস্ফোরণ-নিরোধী ব্লাস্ট ডোর (Blast doors), যা সুরঙ্গকে একেকটি আলাদা কম্পার্টমেন্টে ভাগ করে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটির নিচে গড়ে উঠেছে এমন এক জটিল প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যার প্রতিটি স্তর ভেদ করাই হয়ে উঠেছে নতুন এক চ্যালেঞ্জ।
সুরঙ্গ ধ্বংস করার আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর অবস্থান খুঁজে বের করা। মাটির নিচের বস্তু শনাক্ত করতে ইসরায়েল গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার (GPR), খননের শব্দ শুনতে জিওফোন (Geophones) এবং সিসমিক সেন্সর ব্যবহার করেছে। কিন্তু অত্যন্ত গভীরে থাকা কিংবা আগে থেকেই তৈরি হয়ে থাকা সুরঙ্গের ক্ষেত্রে এগুলোর কোনোটিই খুব একটা কাজে আসেনি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কমব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অধীনে কাজ করে ‘ইয়াহালোম’ (Yahalom) নামের একটি বিশেষ ইউনিট। তবে ভিয়েতনামের ‘টানেল র্যাটদের’ মতো তারা সরাসরি মাটির নিচে নামে না। কারণ সেখানে পদে পদে ছড়িয়ে আছে মৃত্যুর ফাঁদ। এর বদলে তারা ভেতরে পাঠায় সামরিক কুকুর কিংবা দূরনিয়ন্ত্রিত রোবট।
এর মধ্যেই সামনে আসে এক অভিনব বুদ্ধি। যদি সুরঙ্গগুলোতে সমুদ্রের পানি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তবে কেমন হয়? গাজার ভেতরে দখল করা সুরঙ্গমুখগুলোর কাছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অন্তত পাঁচটি বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাম্প বসিয়ে দেয়। শুরু হয় হাজার হাজার কিউবিক মিটার সমুদ্রের পানি পাম্প করার কাজ।
শুনতে বেশ ভয়ংকর মনে হলেও, বাস্তবে এই বিপুল পরিমাণ পানি হাতেগোনা কয়েকটি সুরঙ্গ ছাড়া খুব বেশি ভেতরে ঢুকতেই পারেনি। কিছু পানি কংক্রিটের দেয়াল চুইয়ে বেরিয়ে গেছে, আর বাকিটা আটকে গেছে মাটির নিচের সেই ভারী দরজাগুলোর কাছে। একটি ছোট সুরঙ্গ ডোবাতেই তাদের টানা দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল! বিপুল সময় আর অকল্পনীয় পরিমাণ পানির অপচয় দেখে অবশেষে বাধ্য হয়ে ইসরায়েল এই পরিকল্পনা থেকেও পিছু হটে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হয়তো বেশ কিছু সুরঙ্গের চারপাশ ধ্বংস করেছে এবং সেগুলো অবরুদ্ধ করেছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাদের কাছে এই বিশাল সুরঙ্গ-নেটওয়ার্কের কোনো সম্পূর্ণ মানচিত্র নেই। আধুনিক ও সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে দুর্বল ও স্বল্পাস্ত্রের যোদ্ধারা নিজেদের মাটির জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে শক্তির এক অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করেছে। যা প্রমাণ করে, মাটির নিচের এই লড়াইয়ের গল্প এখানেই শেষ হওয়ার নয়।
মাটির ওপরের পৃথিবী যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, গাজার মাটির নিচে তখন নীরবে বোনা হচ্ছে এক অদম্য প্রতিরোধের গল্প। এই সুরঙ্গগুলো শুধু কিছু গর্ত বা কংক্রিটের পথ নয়; এগুলো যেন ফিলিস্তিনের শেকড়—জলপাই গাছের সেই প্রাচীন শেকড়ের মতো, যা শত আঘাতেও মাটির গভীর থেকে রসদ টেনে আনে। ওপরের ডালপালা যতই কেটে ফেলা হোক না কেন, শেকড় যতদিন বেঁচে আছে, নতুন পাতা গজাবেই।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বাঙ্কার-বাস্টার কিংবা সমুদ্রের লোনা জল, কোনো কিছুই এই শেকড়কে উপড়ে ফেলতে পারেনি। মাটির গভীরের এই অন্ধকারই হয়তো একদিন আলোর পথ দেখাবে। কারণ ইতিহাস বারবার এই সাক্ষ্যই দেয়, যারা নিজেদের মাটির প্রতিটি ধূলিকণাকে চেনে, যারা অন্ধকারের বক্ষ চিরে নিজেদের অধিকার আদায়ের শপথ নেয়, তাদের চূড়ান্ত বিজয় হয়তো বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো পরাশক্তির নেই।
কবি আহমাদ ফয়েজের একটি কবিতা দিয়ে শেষ করি–
دل ناامید تو نہیں ناکام ہی تو ہے
لمبی ہے غم کی شام مگر شام ہی تو ہے
হৃদয় আজ হয়তো ক্লান্ত, কিন্তু তা তো আশাহীন নয়।
দুঃখের এই প্রহর হয়তো অনেক দীর্ঘ, কিন্তু তা তো কেবলই একটি রাত!



