গত শুক্রবার ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যখন নতুন করে শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে, তখনই এই চুক্তি হলো। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধও এর পটভূমিতে রয়েছে। ফলে নতুন এই প্রতিরক্ষা উদ্যোগ আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চুক্তিতে থাকা তিন দেশ বলছে, এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। তবে চুক্তির পর ইরানকে নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও শক্তির সমীকরণে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্ষ। ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধের আশঙ্কাও এই অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে। এ কারণে মক্কা চুক্তি নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক মহল ও গণমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ইরান এই চুক্তিকে কীভাবে দেখছে? নতুন এই জোট থেকে তেহরান কী বার্তা পাচ্ছে? আর বদলে যাওয়া আঞ্চলিক সমীকরণে নিজেদের অবস্থান কীভাবে ঠিক করতে চাইছে ইরান?
তেহরানের কৌশল—নিন্দা নয়, ঐক্যের বার্তা
ইরান সরকার এখনো মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। তবে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যায়, তেহরান এটিকে শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে দেখছে না। মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে ওঠা নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবেই দেখছে। এ কারণে চুক্তিটির প্রকাশ্য নিন্দা কিংবা অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি বিরোধে যেতে চাইছে না ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির বক্তব্যেও এর ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সামরিক শক্তিগুলোর’ বিরুদ্ধে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে—এখানে তাঁর ইঙ্গিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। পাশাপাশি বাইরের শক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের ওপর জোর দেন তিনি। আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আত্মনির্ভরতা ও ‘প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব’ আরও জোরদার করার আহ্বানও জানান আরাকচি।
অর্থাৎ, তেহরান আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগের ধারণার বিরোধিতা করছে না। তাদের আপত্তি এমন কোনো ব্যবস্থায়, যা বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বা এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে বিভাজন তৈরি করে। ইরানের দৃষ্টিতে, নিরাপত্তাব্যবস্থা হওয়া উচিত বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
ইরানের বাইরে আরও কিছু হিসাব
মক্কা চুক্তিকে শুধু ইরানকে মোকাবিলার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে সৌদি আরবের নিজস্ব নিরাপত্তা-চাহিদার বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায়। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিরাপত্তা-নির্ভরতার পাশাপাশি রিয়াদ এখন আঞ্চলিকভাবেও নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’র বিশ্লেষণেও এমন ইঙ্গিত রয়েছে। তাদের মতে, চুক্তিটি তেহরানের জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা। তবে তেহরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিও এর বার্তা রয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেও আঞ্চলিক শক্তির নতুন সমীকরণের বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সৌদি আরবের আরও কিছু নিরাপত্তাগত উদ্বেগও যুক্ত। মার্কিন নিরাপত্তা-গ্যারান্টির ওপর রিয়াদের আস্থা কমে আসা, ইয়েমেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, ইসরায়েলের আঞ্চলিক তৎপরতা নিয়ে সৌদি আরব ও তুরস্কের উদ্বেগ এবং ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানোর আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে জোটটির পেছনে ইরানের বাইরেও বেশ কিছু হিসাব রয়েছে।
কট্টরপন্থীদের চোখে মক্কা চুক্তি
ইরানের কট্টরপন্থী মহল অবশ্য চুক্তিটিকে ভিন্নভাবে দেখছে। কট্টর রক্ষণশীল সংবাদপত্র ‘কেহান’-এর সম্পাদক হোসেইন শারিয়াতমাদারির বক্তব্যে এর স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। তাঁর মতে, চুক্তিটি মূলত ইরানকে লক্ষ্য করেই করা হয়েছে এবং এর পেছনে রয়েছে এই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্য।
চুক্তিতে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শারিয়াতমাদারি। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ভবিষ্যতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর যুক্তি, ইরানবিরোধী হিসেবে বিবেচিত একটি জোটে পাকিস্তানের যোগ দেওয়ায় তেহরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব কমাতে দেশটির সম্ভাব্য কূটনৈতিক ভূমিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থাৎ, ইরানের কট্টরপন্থী অংশের কাছে মক্কা চুক্তি কোনো সাধারণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগ নয়। তারা এটিকে তেহরানকে লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা একটি কাঠামো হিসেবেই দেখছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের অংশগ্রহণকে তারা দেশটির সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার জন্যও নেতিবাচক বলে মনে করছে।
নিরাপত্তার সমীকরণে ইরানকে রাখার দাবি
কেউ আবার বলছেন, ইরানকে বাদ দিয়ে কার্যকর ও টেকসই কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। এই অবস্থান থেকে ভবিষ্যতে তেহরানকে এ ধরনের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে আসছে।
ইরানের ‘তাসনিম’ সংবাদমাধ্যম তুরস্কের ভেতর থেকে আসা কিছু সতর্কবার্তা তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরান ও ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে কোনো ইসলামি নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। একই সঙ্গে তুরস্কের এমন একটি মতও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বলা হচ্ছে, নতুন এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে ইরানকে ঘিরে ফেলা।
এই বক্তব্য তেহরানের জন্যও একটি যুক্তি তৈরি করে। যদি লক্ষ্য সত্যিই একটি বিস্তৃত ইসলামি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তাহলে ইরানের মতো বড় একটি আঞ্চলিক শক্তিকে বাইরে রেখে তা কতটা কার্যকর হবে—এই প্রশ্ন তোলা যায়। ইরানের জনসংখ্যা, সামরিক সক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় বৈশ্বিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তেহরান যে অভিজ্ঞতাকে দেখছে, সেটিও এখানে বিবেচনায় আসে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তেহরান চাইতে পারে, ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগটি শুধু তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত হোক। অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্যও এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতে ইরান নিজেও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। আর তা সম্ভব না হলেও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সমঝোতার মাধ্যমে এর সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খোলা থাকতে পারে। এতে সংঘাত ও পারস্পরিক বৈরিতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকবে।
চুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়
চুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়েও ইরানি গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। ‘ইরনা’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তিন দেশের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার এক নয়। সৌদি আরবের প্রধান উদ্বেগ ইয়েমেন ও ইরানকে ঘিরে। তুরস্কের হিসাব সিরিয়া, কুর্দি প্রশ্ন ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে। আর পাকিস্তানের নিরাপত্তা-চিন্তার বড় অংশ ভারত ও দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনাকে ঘিরে। তিন দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে একক সামরিক নেতৃত্ব না থাকাও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা করলেও ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অবস্থান নেবে—এমনটা নিশ্চিত নয়। তেহরানের সঙ্গে দুই দেশেরই নিজস্ব সম্পর্ক ও স্বার্থ রয়েছে। ফলে এই জোটকে দ্রুত একটি ঐক্যবদ্ধ ইরানবিরোধী সামরিক কাঠামোয় পরিণত করা সহজ হবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়িও চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, বিদেশি চুক্তির ওপর নির্ভর করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তিনি রিয়াদকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তি নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম মহলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কেউ এটিকে ইরানবিরোধী উদ্যোগ হিসেবে দেখছে, কেউ আবার এর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। আর চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ও অগ্রাধিকার কীভাবে সমন্বিত হয় তার ওপর। সে কারণে এর চূড়ান্ত প্রভাব এখনই নির্ধারণ করা কঠিন।


