আমি জানি, আপনাদের অনেকেই ফুটবল ভালোবাসেন। চিন্তা নেই, ফুটবল নিয়ে নসিহত করে আমি আপনাদের মেজাজ খারাপ করতে আসিনি। আমার কাছে ফুটবল ভক্ত-অভক্ত সবার ভালো লাগার মত একটা গল্প আছে। সেটা শোনাতেই এসেছি।
একচুমুক অপমান
একবার ভাবুন তো, আপনি একজন স্পোর্টস ট্যুরিস্ট (ক্রীড়া পর্যটক)। অনেক টাকা খরচ করে ফ্লাইটের টিকিট কেটেছেন, টুর্নামেন্ট চলাকালীন সময়ের জন্য হাজার হাজার ডলার সাথে নিয়েছেন। আর হ্যাঁ, ভিসা আদৌ পাবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা নিয়ে লম্বা লাইনে অপেক্ষার প্রহর তো আছেই। কিন্তু এত কিছুর পর যখন আপনি হোস্ট (আয়োজক) দেশে পৌঁছালেন, তখন আপনার সাথে এমন আচরণ করা হলো যেন আপনি সেখানে ভিক্ষা করতে গেছেন!
‘তুমি তো শুধু খেলা দেখতে এসেছো, আবার ফিরে যাবে। তোমার হোটেলের বুকিং কোথায়? ভিসা আছে তোমার কাছে? এই ছেলে, তোমার সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলো দেখাও তো!’ আর ওমা! যদি দেখা যায় আপনি ফিলিস্তিন বা এই ধরনের কোনো ইস্যুর সমর্থক, তাহলেই আপনাকে সোজা উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে আপনার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আপনার সব টাকা জলে!
আর এই ঘটনা যে শুধু আপনার মতো সাধারণ দর্শকের সাথে ঘটবে তা নয়, দলের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হলেও একই দশা হতে পারে, যেমনটা হয়েছিল ইরাকি খেলোয়াড় আয়মান হুসেইনের সাথে। এমনকি পুরো ম্যাচের রেফারির ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটতে পারে, যেমনটা ঘটেছিল সোমালি রেফারি ওমর আরতানের সাথে। কয়েক বছর আগেও এমনটা শোনা অসম্ভব ছিল। তখন ‘মানবাধিকার’ নামের একটা বস্তু পৃথিবী নামক জঙ্গলে এক্সিট করত, অন্তত লোকদেখানো ভদ্রতা ছিল। সবাই ভয় পেত এই ভেবে যে, ‘না না, এমনটা করা ঠিক হবে না, লোকে বলবে আমরা তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতিতে আঘাত করেছি।’
কিন্তু এরপর এমন একজন এলেন যিনি পুরো খেলার নিয়মই বদলে দিলেন! শুধু ফুটবলের নিয়ম নয়, তিনি পুরো পশ্চিমাদের বলে দিলেন, ‘লোকদেখানো মানবতা অনেক তো হলো, এবার থামো! আমরা মানবতা নামক মানবীয় প্রবৃত্তিকে আর প্রশ্রয় দিবো না!’ তিনি এই বিশ্বকে মানতে বাধ্য করলেন যে এখানে প্রথম, দ্বিতীয় বা সপ্তম শ্রেণির মানুষ বলে একটা বিভাজন আছে।
তিনি বোঝালেন, আরে ভাই, আপনাদের সমস্যা কী? আপনারা যদি তাদের ৩০টা জুতার বাড়িও মারেন, আর শেষমেশ যে সামান্য জিনিসের জন্য তারা এত অপমান সহ্য করে এখানে এসেছে সেটা তাদের হাতে ধরিয়ে দেন, তবে তারা আপনাদের সব মাফ করে দেবে। ওই যে ভিসার ব্যাপারটা, আপনি যদি তাকে ঢুকতে দেন, তাহলে সে রোদে পোড়া আর অপমান, সব ভুলে গিয়ে উল্টো ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলবে। এমনকি যে দর্শক টিভিতে বিনা পয়সায় খেলা দেখার জন্য বসে আছে, সেও তার নিজের ভাইদের পুড়িয়ে মারা যুদ্ধের অর্থায়নের কথা ভুলে যাবে, যদি ম্যাচটা তাকে স্রেফ ফ্রি-তে দেখতে দেওয়া হয়। এমনকি তাদের রাজা-বাদশা, প্রেসিডেন্টরাও ক্ষমতার গদি টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে নিজেদের দেশের মানুষের সামনে অপমানিত হতে রাজি। তারাও আপনাকে ক্ষমা করে দিয়ে ‘ইউর গ্রেইস’ বা ‘মহামান্য’ বলে ডাকবে। এত কিছুর পর কেউ যদি এসে বলে যে ‘ধর্ম হলো সাধারণ মানুষের আফিম’, তাহলে বলতে হয়, আরে ধুর ভাই; সাধারন মানুষ না শুধু, আমি, আপনি, আমরা সবাই-ই এই আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে আছি!
একটি রক্তিম ফুটবল আর কিছু জম্বি
চারদিকে যখন অজস্র কান্না আর আর্তনাদ, তখন আপনি যত চেষ্টাই করুন না কেন, সেগুলো তখন চাপা কান্না হয়েই থেকে যায়। তা সে নির্যাতনের কষ্টই হোক, বা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের। বাস্তবে কয়েকটি শব্দের চেয়ে খুব বেশি জায়গা সে আর্তনাদগুলো পায় না। এই মূহুর্তে আপনি কি কিছু শুনতে পাচ্ছেন? না, পাচ্ছেন না! কারণ তীব্র উল্লাস আর করতালির নিচে আপনি নিজেই সেই আর্তনাদ লুকিয়ে ফেলেছেন। চাবুকের আঘাত আর বৈদ্যুতিক শকের শব্দ গিলে খেয়েছে স্টেডিয়ামের চিৎকার। এই কৌশল অনেকবারই সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে সবচেয়ে বিখ্যাত সম্ভবত ৭৮-এর আর্জেন্টিনার ঘটনা।
এর ঠিক দুই বছর আগের কথা। ১৯৭৬ সাল। আর্জেন্টিনার সেনাবাহিনী তখন অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। এর নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলা। তিনিই ‘ডার্টি ওয়ার’ বা ‘নোংরা যুদ্ধ’ শব্দটির জন্ম দিয়েছিলেন। যে কেউ, হোক সে ছাত্র, সাংবাদিক, শ্রমিক বা ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, সরকারের সামান্য বিরোধিতা করলেই তাকে গুম করে দেওয়া হতো। তারা শুধু জেলে বন্দী করতো না, তাদের ভাষায় এগুলোকে বলা হতো ‘দেসাপারেসিদো’ (Desaparecido), যার মানে হলো ‘গুম’ বা জোরপূর্বক নিখোঁজ করা। যে পদ্ধতি তার বেশ কয়েকবছর পর বাংলা মুলুকের এক চরম স্বৈরাচারী বাদশাহ প্রবাদতূল্য নৃশংসভাবে এপ্লাই করেছিলেন। তো আর্জেন্টিনায় এভাবে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল। প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য উড়ন্ত বিমান থেকে অনেককে জীবন্ত অবস্থায় মহাসাগরে ফেলে দেওয়া হতো, যাতে কোনো লাশ না পাওয়া যায় আর কাউকে জবাবদিহি করতে না হয়। পুরো দেশ তখন ফুঁসছে। স্বজনরা তাদের সন্তানদের খুঁজছে। অবস্থা এমন ছিল যে, বন্দীশিবিরে ছেলের বেঁচে থাকার খবর পেলেও বাবা-মা স্বস্তিতে উপরওয়ালার শুকরিয়া আদায় করতো।
আর ঠিক এই সময়, যখন সারা বিশ্ব আর্জেন্টিনাকে বয়কট করছে এবং দেশে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন এমন একটি ঘটনা ঘটল যা পুরো দৃশ্যপট বদলে দিল এবং সব ভুলিয়ে সবাইকে দাঁড় করিয়ে দিল জাদুকরী ফুটবলের সামনে।
১৯৬৬ সালে, অর্থাৎ ১২ বছর আগেই আর্জেন্টিনা ফিফার এই বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পেয়েছিল। ফলে এটি ছিল একটি বহুল প্রতীক্ষিত ইভেন্ট। কিন্তু যখন ১৯৭৮ সাল এল, তখন বিলিয়নিয়ার ক্লাব মালিক আর মিলিয়নিয়ার খেলোয়াড়রা নিজেদেরকে দুটি পথের সামনে দাঁড় করানো অবস্থায় পেলেন, তারা কি ব্যবসাকে বেছে নেবেন, নাকি আর্জেন্টিনার রাস্তায় জমে থাকা রক্তকে? ক্ষমতা আর অর্থের যে চিরস্থায়ী প্রেমবন্ধন, তার তো আর কোনো কালেই ব্রেকাপ হয় না! তাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গিয়ে পড়ল ব্যবসার পাল্লায়। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাক্সারিয়াস বিমানগুলো দল আর সমর্থকদের নিয়ে আর্জেন্টিনার দিকে উড়াল দিল। শুরু হলো উন্মাদনা।
স্টেডিয়ামের পরেই ‘না-মানুষ’দের চিড়িয়াখানা
উদ্বোধনী ম্যাচের ভেন্যু ছিল দেশের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম ‘এল মনুমেন্টাল’। আর এই স্টেডিয়াম থেকে মাত্র দুই রাস্তার ব্যবধানেই ছিল ‘নেভাল মেকানিক্স স্কুল’ (ESMA)। সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই জায়গাটি হয়ে উঠেছিল গুম ও নির্যাতনের অন্যতম প্রধান বন্দীশিবির। অর্থাৎ, আপনি গ্যালারিতে বসে যখন গোলের আনন্দে হাততালি দিচ্ছেন, তখন আপনার থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরেই মানুষের ওপর অমানবিক নির্যাতন চলছে, তাদের হত্যা করা হচ্ছে! উপরে ফুটবলের উন্মাদনা, আর নিচে রক্ত। এই থিওরিতেই যেন উৎসব আর আর্তনাদ একাকার হয়ে গিয়েছিল। সব ক্যামেরার লেন্স তখন স্টেডিয়ামের ভেতরে, তারা সম্প্রচার করছে টুর্নামেন্টের জাঁকজমক, আতশবাজির ঝলকানি আর সমর্থকদের আনন্দাশ্রু।


অথচ স্টেডিয়ামের ঠিক বাইরে, ‘প্লাজা দে মেয়ো’ নামক একটি স্কয়ারে মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা একদল নারী নীরবে চক্কর দিচ্ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের হাতে তাদের নিখোঁজ হওয়া সন্তান বা আত্মীয়ের ছবি। তাদের বলা হতো ‘মাদার্স অফ দ্য প্লাজা দে মেয়ো’। তারা নিঃশব্দে হাঁটছিলেন আর খুঁজছিলেন এমন কোনো ক্যামেরা, যা তাদের এই হাহাকার ফুটবল-পাগল বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে। কিন্তু বিশ্ব তখন মশগুল ফুটবল খেলায়। ‘কীসের সাদা রুমাল আর কীসের মাথা ব্যথা! এসব দিয়ে আমার কী হবে!’—এমনটাই ছিল যেন সবার মনোভাব।
জেনারেল ভিদেলা প্রতিটি খুঁটিনাটি খুব সাবধানে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। স্টেডিয়ামের প্রতিটি উল্লাসের শব্দ তাকে আশ্বস্ত করছিল যে, পরিস্থিতি তার হাতের মুঠোয়। এই বন্দিশিবিরের আর্তনাদের চেয়ে ফুটবলের আওয়াজ যে অনেক বেশি জোরালো, তা তিনি প্রমাণ করে ছেড়েছেন। বেঁচে ফেরা বন্দীরা পরে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তারা যখন প্রথম এই প্রবল হর্ষধ্বনি শুনতে পান, তারা ভেবেছিলেন হয়তো দেশের মানুষ জেগে উঠেছে এবং তাদের এই নারকীয় যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করতে আসছে। কিন্তু দিনের পর দিন যখন একই উল্লাস শোনা যেতে লাগল আর কেউ তাদের উদ্ধার করতে এল না, তখন তারা বুঝতে পারলেন যে এগুলো ফুটবল জয়ের উল্লাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এরপর তাদের জীবন দুই দিক থেকেই আরও বেশি নরক হয়ে উঠল। প্রথমত, তারা সব আশা হারিয়ে ফেললেন। তারা বুঝলেন, যাদের আশায় তারা বেঁচে ছিলেন, তারা আসলে তাদের জন্য শোকাহত তো নয়ই, বরং ফুর্তিতে মেতে আছে। দ্বিতীয়ত, ভিদেলা যখন নিশ্চিত হলেন যে এই নিখোঁজ মানুষগুলোর কথা আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না, তখন তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। তিনি যেন তাদের প্রতি উপহাস করে বলছিলেন, ‘এদের জন্যই তো তোমরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলে, তাই না?’
ভিদেলা খুব ভালো করেই জানতেন যে, তার দেশের নিখোঁজ মানুষদের নিয়ে সারা বিশ্বে, বিশেষ করে ইউরোপে আলোচনা চলছে এবং বিশ্বকাপ বয়কটের ডাকও উঠেছে। তাই তিনি কী করলেন? তিনি এই টুর্নামেন্টের নাম দিলেন ‘ওয়ার্ল্ডকাপ অফ পিস’ বা ‘শান্তির বিশ্বকাপ’! একবার ভাবুন, যে মানুষটার হাত নিজের দেশের মানুষের রক্তে রঞ্জিত, সে তার টুর্নামেন্টের নাম দিচ্ছে ‘শান্তির টুর্নামেন্ট’! তিনি বিশ্বকে বোঝাতে চাইলেন যে, যারা দেশটাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল সেই সন্ত্রাসীদের দমন করে তিনি শান্তি এনেছেন। এই বিশ্বকাপকে তিনি তার ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেন। তিনি বিশ্বকে দেখালেন, আর্জেন্টিনা একটি সুখি আনন্দিত এবং ঐক্যবদ্ধ দেশ।
আর মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনাগুলো যারা নিজেদের চোখে দেখেছিলেন এবং ১৯৮১ সালের আগে মারা গেছেন, তারা এই বিশ্বাস নিয়েই মারা গেছেন যে ভিদেলা আসলেই ভালো মানুষ ছিল, কারণ মিডিয়া তাদের এটাই বিশ্বাস করিয়েছিল! এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ‘১৯৮১ সালই কেন?’ দাঁড়ান, বলছি। তাড়াহুড়ো করবেন না।
দ্য গেইম হ্যাকার
তো, এই প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণাকে পুরোপুরি সফল করতে হলে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জেতাটা জরুরি ছিল। আর এখানেই আসে বিখ্যাত আর্জেন্টিনা বনাম পেরু ম্যাচের গল্প। ফাইনালে ব্রাজিলের জায়গা দখল করতে হলে আর্জেন্টিনাকে সেই ম্যাচে অন্তত চার গোলে জিততে হতো। ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, এটা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। পুরোটাই নির্ভর করছিল খেলোয়াড়দের দক্ষতা আর ভাগ্যের ওপর। কিন্তু ভাই, এমন একটা ম্যাচ তো আর শুধু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না!
তাহলে তারা কী করল? শুনুন, কেউ সরাসরি ঘুষ দেওয়ার ঘটনা ধরতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু অভাবী আর্জেন্টিনা সরকার যখন ম্যাচের ঠিক আগে পেরুতে ৩৫,০০০ টন গম পাঠায়, আর ঠিক একই সময়ে আর্জেন্টিনার সেন্ট্রাল ব্যাংক, যে কিনা সাধারণ মানুষের ওপর ট্যাক্সের বোঝা চাপাচ্ছিল, তারা পেরুর আটকে থাকা ৫০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেয়; আর স্বয়ং ভিদেলা যখন ম্যাচের আগে পেরুর খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমে ঢুকে তাদের সাথে ‘কুশল বিনিময়’ করেন… এরপর যখন ম্যাচ শুরু হয় আর আর্জেন্টিনা পেরুকে ৬-০ গোলে হারিয়ে দেয়, তখন আর বুঝতে কি কিছু বাকি থাকে?
কী, অবাক হচ্ছেন? ভাই, পৃথিবীটা এখন ছোট হয়ে গেছে। আপনি চাইলে ইন্টারনেটে খুঁজে দেখতে পারেন। হ্যাঁ, ৬-০! এর কয়েকদিন পর আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শিরোপা জেতে এবং ভিদেলা নিজ হাতে ট্রফি তুলে দেন। অর্থাৎ, লোকটি তার ভাবমূর্তি শুধু ধুয়ে পরিষ্কারই করেনি, রীতিমতো শুকিয়ে, ইস্ত্রি করে গায়েও জড়িয়ে নিয়েছে! ৭৬-এর রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান আর ৭৮-এ রক্ত শুকিয়ে দেওয়া বিশ্বকাপ। এই খুনি স্বৈরশাসক যখন ভাবলো যে, ‘যাক, সব ঝামেলা শেষ, ক্ষমতা এখন পুরোপুরি আমার হাতে’, ঠিক তার তিন বছর পর, ১৯৮১ সালে তার পায়ের তলার মাটি কেঁপে ওঠে। চরম দম্ভ আর ক্ষমতার অহংকারের মাঝেই তার পতন ঘটে। এই স্বৈরশাসকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, তাকে সেই বন্দিশিবিরেই (ESMA) পাঠানো হয়েছিল, যেখানে সে নিরপরাধ মানুষদের আটকে রাখতো। পার্থক্য হলো, তারা একসময় আলোর মুখ দেখেছিল, কিন্তু সে ওই সেলেই পচে মরেছে। ২০১৩ সালে তাকে তার সেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত এবং যারা তাকে সমর্থন করেছিল তাদের সবার জন্য এক বিশাল কলঙ্ক হয়ে।
টুইট-ক্ষমতার দাপট
হ্যাঁ, আমি জানি আপনি এখন কী ভাবছেন। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি এখন লম্বা লেকচার দেব যে, আমরা কীভাবে উল্লাস করে গাজার মানুষদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছি। না ভাই, এসব কথা অনেক বলা হয়েছে, এখন এগুলো পুরনো হয়ে গেছে। আমি অন্য একটা পয়েন্টে আসতে চাই, যেটা বর্তমান (২০২৬) বিশ্বকাপ নিয়ে। আপনার কি মনে হয়, আমেরিকা বা ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার সুযোগ ফিফা বা পুরো বিশ্বের কাছ থেকে কীভাবে পেয়েছে? এটা কি লটারির মাধ্যমে হয়েছে? না ভাই! আচ্ছা, আমিই বলছি, একটু ফ্লাশব্যাক করে ২০১৮ সালে ফিরে যান।


২০১৮ সালে যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক নির্ধারণের জন্য ফিফায় ভোটাভুটি হচ্ছিল, তখন দুটি পক্ষ ছিল। একদিকে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ বিড, আর অন্যদিকে মরক্কোর একক বিড। মরক্কোর অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলেও তারা দারুণ প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং তাদের সুযোগও বেশ উজ্জ্বল ছিল। ঠিক তখনই ট্রাম্প টুইটারে একটি টুইট করেন। তিনি লেখেন, ‘যেসব দেশকে আমরা সবসময় সমর্থন দিয়ে আসছি, তারা যদি আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দেয়, তবে তা খুবই লজ্জার হবে। তারা যদি আমাদের সমর্থন না-ই করে, তবে আমরা কেন তাদের সমর্থন করব?’
ভাই, এটা সরাসরি হুমকি! পরিষ্কার ভাষায় এর মানে হলো: ‘যে মরক্কোকে ভোট দেবে সে আমার শত্রু, এবং এর জন্য তাকে মূল্য চোকাতে হবে, তা সে অনুদানই হোক বা সাহায্য সংস্থা।’ ফিফা নিজেও এই হুমকিতে চমকে গিয়েছিল। কারণ এটি ছিল নিরপেক্ষতার নিয়মের সরাসরি লঙ্ঘন এবং ভোটের আগে দেশগুলোকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা। কিন্তু ওই যে শুরুতে বললাম না, সাধারণ সমর্থকদের সাথে যেমন আচরণ করা হয়, ট্রাম্প সকল দেশের সাথেও ঠিক একই আচরণই করেছিলেন। শেষমেশ ২০১৮ সালে মস্কোতে ভোটাভুটি হয় এবং ট্রাম্পের আমেরিকা জিতে যায়। ভিদেলা যেভাবে সত্তরের দশকে নিজের ভাবমূর্তি পরিষ্কার করতে ফিফাকে ব্যবহার করেছিল, এখানেও সেই একই লাঠির ব্যবহার হয়েছে। আর ফিফার কথা যদি বলেন? যে ফিফা ৭৮-এ ভিদেলার অপরাধ দেখেও না দেখার ভান করেছিল, তারা ২০১৮ সালেও ট্রাম্পের টুইট দেখে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। অথচ আইন অনুযায়ী, শুধু ওই একটি টুইটের জন্যই আমেরিকার বিড বাতিল করে আয়োজক হওয়ার অধিকার সাথে সাথে মরক্কোকে দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।
লাস্ট চ্যাপ্টার
যাই হোক, আমি আর কথা বাড়াবো না। আপনি হয়তো এর মধ্যেই মূল বিষয়টা ধরে ফেলেছেন। আমরা সবাই জানি যে সোশ্যাল মিডিয়া ফ্রি, কারণ এখানে আমরা নিজেরাই হলাম ‘প্রোডাক্ট’ বা পণ্য। দর্শকদের ছাড়া মার্ক জাকারবার্গের প্ল্যাটফর্মে কেউ কোটি কোটি ডলার খরচ করে বিজ্ঞাপন দিত না। জাকারবার্গ এবং বিজ্ঞাপনদাতা, উভয়ের পকেট ভারী করতে আমাদের সেখানে থাকাটা খুব জরুরি। ফুটবলের দুনিয়াতেও ঠিক একই ব্যাপার ঘটে। একদল বিলিয়নিয়ার ক্লাবের মালিক, তারা মিলিয়ন ডলার দিয়ে খেলোয়াড় কেনেন। আর সবার ওপরে বসে থাকা রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা মিডিয়াকে ব্যবহার করে এই ইভেন্টগুলোকে এমনভাবে সাজায় যাতে আরও বেশি দর্শক আকৃষ্ট হয়।
বিলিয়নিয়াররা তো ব্যবসা করে পকেট ভরবেই, টুর্নামেন্টের পর খেলোয়াড় আর এজেন্টরাও চুক্তির মাধ্যমে কামিয়ে নেবে। আর উপরের ক্ষমতায় থাকা লোকগুলো এসব হতে দেয় কেন? কারণ এসবের মাধ্যমে আসল ফায়দাটা তো তারাই লুটে নেয়। তারা আপনার মনে একটা মেকি জাতীয়তাবাদের বেলুন ফুলিয়ে দেয়। উদ্দীপ্ত গানে গানে আপনার মগজে ডোপামিনের বন্যা বইয়ে দেয়, আর আপনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশ জিতেছে, আমাদের ছেলেরা পেরেছে!’ ঠিক যে উল্লাসের শব্দ ভিদেলার বন্দিশিবিরের আর্তনাদগুলোকে গিলে খেয়েছিল, সেই একই উল্লাস আজ গিলে খায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব আর বন্দিদের কষ্টগুলোকে, গিলে খায় ফিলিস্তিনকে, কবর দিয়ে দেয় সোমালিয়াকে। আর এই সাজানো ‘জাতীয়তাবাদী’ উৎসবের মাঝে কেউ যদি প্রতিবাদ করে, তবে তাকে বলা হয় বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী, না-মানুষ! বলা হয়, সে নাকি মানুষের আনন্দ সহ্য করতে পারছে না!
না, ভাই, করেন আনন্দ করুন, তবে ইকটু তো পরিমিতভাবে করেন। মনে রাখবেন, দুনিয়াতে আপনার আসল জয় হলো আপনার নিজের ব্যক্তিগত সাফল্য। আপনার দেশের আসল শক্তি হলো তার উৎপাদিত খাবার, তার অস্ত্র, আর আপনার পকেটে থাকা টাকা। এই আনন্দটা জমিয়ে রাখুন স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর একটা সম্মানজনক জীবনের জন্য, ঠিক যেমনটা ওই দেশগুলোর মানুষরা ভোগ করে, যারা আপনাকে শুরুতে অপমান করতে চেয়েছিল। তাদের দেশে এসব নিশ্চিত করেই তারা আপনাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।
আপনি তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক নন। যারা আপনাকে অপমান করে, তাদের হাতে নিজের টাকা তুলে দেবেন না। একজন মুসলিম হিসেবে আপনার আত্মসম্মান ও মর্যাদা এমন হওয়া উচিত নয় যে, তারা যখন আপনাকে খুশি হতে বলবে, কেবল তখনই আপনি খুশি হবেন। এইটুকুই বলার ছিল।
শেষটা করছি একটা আরবী কবিতা দিয়ে,
سَكَّنُوا لَنَا عَسْكَرَنَا، وَعَسْكَرُوا لَنَا
نَيَّمُونَا الْيَوْمَ بِحَالَةٍ سَهَّرْنَا اللَّيْلَ بِطُولِهِ
قَلَّبُوا حَالَ الدُّنْيَا يَا بَا، وَالْمَعْدُولُ يِقَلِّبُوهُ
عَسْكَرُ التَّبَسْكُلِيتِ مَسْخَرْنَا، وَمَسْخَرُوا لَنَا عَسْكَرَنَا
তারা আমাদের সৈন্যদের বসিয়ে রেখেছে, আর আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অন্যদের প্রহরা। তারা আমাদের সারাটা দিন ঘুম পাড়িয়ে রাখল, অথচ সারা রাত জাগিয়ে রাখল এক অস্থিরতায়। তারা পৃথিবীর নিয়ম-কানুন সব উল্টে দিয়েছে, সোজা যা কিছু ছিল, তার সবটাই বাঁকা করে ফেলেছে। এই ‘ছেলেমানুষী’ দাপট আর ক্ষমতা আমাদের তামাশার বস্তুতে পরিণত করেছে, আর আমাদের রক্ষকদেরই তারা বানিয়ে ফেলেছে আমাদেরই দমনের হাতিয়ার।











