তুরস্ক–পাকিস্তান নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য জোট গঠনের বাস্তবতা কতদূর?

সৌদি আরব, মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্কের এই নতুন মেরুকরণ কেবল একটি জোট নয়, বরং এটি ইসরায়েলের একক আধিপত্য রুখে দেওয়ার এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত রক্ষাকবচ। 
ছবি : এ আই দ্বারা তৈরি
ছবি : এ আই দ্বারা তৈরি
A- A+

ইসরায়েলের মোকাবিলায় তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের নেতৃত্বে একটি ‘সুন্নি জোট’ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা, তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুরস্কসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোর মাঝে এক গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন বলয় থেকে বেরিয়ে একটি স্বতন্ত্র ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির যে আকাঙ্ক্ষা, এই সম্ভাব্য জোটের ধারণা মূলত তারই প্রতিফলন—বিশেষ করে বর্তমান বাস্তবতায়, যখন মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে ইসরায়েলি প্রভাব দিবালোকের মতো স্পষ্ট। 

ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে তুরস্ক, মিশর ও পাকিস্তানের মধ্যে তৈরি হওয়া এই ত্রিপক্ষীয় মেরুকরণ এখন ইসরায়েলি নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্রগুলোর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলি থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এখন প্রকাশ্যেই একটি সম্ভাব্য ‘সুন্নি অক্ষ’ (Sunni Axis) নিয়ে বিশ্লেষণ করছে। তাদের আশঙ্কা, এই জোট ভবিষ্যতে ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘শিয়া জোট’-এর চেয়েও শক্তিশালী ও জটিল প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা ইসরায়েলের জন্য এক নতুন ও কঠিন সমীকরণ তৈরি করবে।

টেকনিওন (Technion)-এর ডিসিশন সায়েন্স অনুষদের অধ্যাপক ড. বোয়াজ গোলানি এই ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, এই নতুন ‘অক্ষে’র নেতৃত্ব দেওয়া এবং ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার প্রশ্নে পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা চলছে। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে মিশর, ইরাক বা ইরান যে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ও তুরস্ক সেই স্থানটিই নিতে চাইছে।

ড. গোলানির মতে, তুরস্ক (৮.৫ কোটি জনসংখ্যা) এবং পাকিস্তান (২৪ কোটি জনসংখ্যা)—উভয়ই সুন্নি প্রধান বিশাল রাষ্ট্র; যাদের শাসনব্যবস্থায় সামরিক প্রভাব অত্যন্ত জোরালো এবং যাদের রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী সেনাবাহিনী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই দুটি দেশই ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।

ইসরায়েলি পত্রিকা ‘মাআরিভ’ (Ma’ariv)-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই গবেষক গত ২৫ বছরে এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার পর থেকে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১০ সালের ‘মারমারা’ ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে এবং তুরস্ক ইসরায়েল থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ স্থবিরতার পর সম্পর্কে কিছুটা উন্নতির আভাস মিললেও, বর্তমান গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষিতে এরদোয়ান ইসরায়েলের ওপর পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং এমনকি সামরিক অভিযানের হুমকিও প্রদান করেন।

অন্যদিকে পাকিস্তান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশটি কখনোই ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বরাবরই ইসরায়েলের বিরোধী অবস্থান নিয়েছে ইসলামাবাদ। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার পাকিস্তান, যার লক্ষ্য চীনকে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ইসরায়েল সম্পর্কে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি দেশটির বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য উল্লেখ করেন। সেখানে ইসরায়েলকে ‘মানবজাতির জন্য অভিশাপ’ বলা হয়েছে এবং ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ‘ক্যান্সার সদৃশ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য দায়ীদের কঠোর ভাষায় নিন্দা জানানো হয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মিশর, ইরাক বা পরবর্তীকালে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত কেবল ফিলিস্তিন ইস্যু বা মুক্তির স্লোগানে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এর মূলে ছিল এই অঞ্চলে ইসরায়েলের ‘উপনিবেশবাদী ভূমিকা’। ইসরায়েল মূলত আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব জাতীয় সত্তা গঠন এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। উদাহরণস্বরূপ, মিশরের সঙ্গে সংঘাতের মূল কারণ ছিল প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসেরের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের সাহসী সিদ্ধান্ত। এর জের ধরে ইসরায়েলের উস্কানিতে মিশরের ওপর যে ‘ত্ৰিশক্তি আক্রমণ’ চালানো হয়, তা-ই মূলত পরবর্তী একাধিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। একইভাবে, ১৯৮১ সালে ইরাকের পারমাণবিক চুল্লিতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ইসরায়েল সংঘাতের এক নতুন অধ্যায় তৈরি করেছিল।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে ইসরায়েলের অনড় অবস্থান এবং ইরানের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভূমিকা একটি বিষয়কে স্পষ্ট করে দেয়।আর সেটা হলো আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে ইরানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ইসরায়েলের স্বার্থের সরাসরি সংঘাত। ইসরায়েল চায় না এই অঞ্চলের কোনো শক্তি টেকসইভাবে মাথা তুলে দাঁড়াক। ফলে দেশগুলো যাতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে না পারে, সেই পরিস্থিতি বজায় রাখাই তাদের মূল কৌশল। বিশেষ করে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী সরকারের আমলে এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে নিজেদের একক আধিপত্য সুনিশ্চিত করা।

ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনই সম্ভবত উপসাগরীয় দেশগুলোকে, বিশেষ করে সৌদি আরবকে নতুন করে হিসাব মেলাতে বাধ্য করেছে। ইরানের পাল্টা হামলা এবং ইরাকের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পরিণতি থেকে রিয়াদ এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে, আমেরিকার সহায়তায় ইরানকে কোণঠাসা করার ইসরায়েলি কৌশলের মূল উদ্দেশ্য আসলে এই অঞ্চলে নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিশ্চিত করা। এই বাস্তব উপলব্ধি থেকেই সৌদি আরব এখন তুরস্ক-পাকিস্তান-মিশর অক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধের জোরালো উদ্যোগকে সমর্থন জানানোর দিকে ঝুঁকছে।

হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলাম বিভাগের গবেষক ড. এলাদ গিলাদি ‘হারেৎজ’ (Haaretz) পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই সম্ভাব্য জোট নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ফ্রন্ট খোলার পরিকল্পনায় মগ্ন, তখন উপসাগরীয় দেশগুলো রিয়াদে বসে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সক্রিয় আলোচনা করছে। এই আলোচনার লক্ষ্য কেবল বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মোকাবেলা নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা—যা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হবে না।

সৌদি আরব, মিশর ও পাকিস্তানকে নিয়ে তুরস্কের যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতার উদ্যোগটি মূলত এই অভিন্ন উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। রিয়াদ এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে যে, নিরাপত্তার প্রশ্নে এককভাবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করা আর নিরাপদ নয়। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি উদ্ধৃতি এই গবেষক তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও পরিষ্কার করে দেয়: ‘এই অঞ্চলের দেশগুলোকে হয় ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হবে, নয়তো বাইরের শক্তিগুলো এমন সমাধান চাপিয়ে দেবে, যা কেবল তাদের নিজস্ব স্বার্থকেই রক্ষা করবে।’ 

মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাই তুরস্ক ও সমমনা দেশগুলোকে এক সুতোয় গেঁথেছে। মার্কিন নীতিতে ইসরায়েলি প্রভাব এখন এতটাই প্রকট যে, এই অঞ্চলের দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই মার্কিন বলয় ভাঙতে মরিয়া। সৌদি আরব, মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্কের এই নতুন মেরুকরণ কেবল একটি জোট নয়, বরং এটি ইসরায়েলের একক আধিপত্য রুখে দেওয়ার এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত রক্ষাকবচ। 

সূত্র : বিভিন্ন আরবি প্রতিবেদন অবলম্বনে

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন