ইসরায়েলের গণহত্যা কিছুটা কমে এলেও দখলদার বাহিনীর নিক্ষেপ করা অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলাবারুদের দুঃস্বপ্ন এখনো প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে গাজার মানুষকে। আবাসিক এলাকা, সড়ক ও কৃষিজমির ধ্বংসস্তূপে এগুলো ছড়িয়ে থাকায় উদ্ধার ও পরিষ্কার কার্যক্রম পরিণত হয়েছে প্রাণঘাতী ঝুঁকির কাজে।
গত কয়েক মাসে এসব অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের কারণে ঘটা বহু বিস্ফোরণের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে ।
জাতিসংঘের ত্রাণ ও তথ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, গাজা উপত্যকায় অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের পরিমাণ এখন ৭ হাজার টনেরও বেশি। সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব গোলাবারুদ গাজার প্রায় ৪০ শতাংশ আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার টনের বেশি পাওয়া গেছে উত্তর গাজার বেইত হানুন, বেইত লাহিয়া ও জাবালিয়া এলাকায়।
গাজায় মাইন অপসারণ দলগুলো একই সঙ্গে কয়েকটি জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে। পরিস্থিতি এমন যে তাদের কাজ এখন বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন মানবিক কার্যক্রমগুলোর একটি। এর প্রধান কারণ ইসরায়েলের আরোপ করা কড়াকড়ি; এতে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না। পাশাপাশি আরেকটি বড় বাধা হলো—ফিলিস্তিনিদের বিস্ফোরক অদ্য,,, পসারণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা।
গাজা পরিণত হয়েছে ‘ডেথ জোনে’
গাজার গণমাধ্যম কার্যালয়ের মহাপরিচালক ইসমাইল আল থাওয়াবতা বলেন, পুরো গাজা উপত্যকায় ছড়িয়ে আছে বিপুল পরিমাণ অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ, যা মানুষের জীবনের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে।
‘সফা’ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আল থাওয়াবতা জানান, প্রাথমিক সরকারি তদন্তে দেখা গেছে প্রায় ২০ হাজার রকেট, বোমা ও ভারী গোলাবারুদ ধ্বংসস্তূপের নিচে-উপরে এবং মাটির ভেতরে ছড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, অবিস্ফোরিত এই গোলাবারুদ প্রতিটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এলাকাকে কার্যত ডেথ জোনে পরিণত করেছে। এতে সাধারণ মানুষ, ত্রাণকর্মী ও পুনর্গঠন কার্যক্রম সবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বর্তমানে হাজার হাজার অবিস্ফোরিত গোলা, রকেট, বিমান থেকে নিক্ষেপ করা বোমা, ক্লাস্টার বোমা, আর্টিলারি শেল, রকেট এবং নির্দেশনাব্যবস্থার অংশসহ বড় আকারের বিস্ফোরক বস্তু ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে। এসবের কারণে নিয়মিতই ঘটছে হতাহতের ঘটনা।
জাতিসংঘ জানায়, দুই বছরের গণহত্যার পরে অবশিষ্ট থাকা এসব বিস্ফোরকের কারণে এখন পর্যন্ত ৫৩ জনের বেশি মানুষ শহিদ এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। ত্রাণ সংস্থাগুলোর ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
আল থাওয়াবতা জানান, অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ঝুঁকি তৈরি করছে। সামান্য নড়াচড়াতেই এসব বস্তুর বিস্ফোরণের আশঙ্কা রয়েছে, ফলে ছিটকে পড়া শার্পনেলে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, বিস্ফোরকদ্রব্য ছড়িয়ে থাকায় সম্পদের ক্ষতি, চিকিৎসা ও ত্রাণকর্মীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের নিরাপদে ঘরে ফেরা, চলাচল, কাজ ও চাষাবাদের স্বাভাবিক অধিকারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি জানান, শিশু, বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং প্রতিদিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজতে বের হওয়া শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধাবশেষ পুরো অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। পুনর্গঠন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও বড় বাধা তৈরি করছে।
ইসরায়েলি বিধিনিষেধ
আন্তর্জাতিক প্রকৌশল সহায়তা পাওয়া না গেলে গাজায় পড়ে থাকা সব অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক সামগ্রী অপসারণে ২০ থেকে ৩০ বছর লেগে যেতে পারে। এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন’।
গাজা সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরের মহাপরিচালক ইসমাইল আল থাওয়াবতা বলেন, ধ্বংসস্তূপে ছড়িয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ বোমা-গোলাবারুদ, ভবনের ভাঙা অংশের সঙ্গে মিশে থাকা বিস্ফোরক, মাটির নিচে বা ধ্বংসাবশেষে লুকিয়ে থাকা গোলাবারুদ সব মিলিয়ে শনাক্তকরণ ও অপসারণ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। এসব নিষ্ক্রিয় করতে প্রয়োজন সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের দক্ষতা, এবং নিরাপদ অপসারণ কৌশল। কিন্তু স্থানীয় সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
তিনি বলেন, বিস্তৃত জরিপ পরিচালনা এবং অপসারণ কাজ করতে হলে উন্নত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ দল, সুনির্দিষ্ট মানচিত্র ও ভৌগোলিক জরিপ, স্থানীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজন। এসব কিছু না থাকলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
থাওয়াবতা জানান, অপসারণের সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞ দলের প্রবেশে বাধা, চলাচল ও উপকরণ পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং সাধারণ মানুষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দখলদার বাহিনী নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অজুহাত দেখিয়ে এসব প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জরিপ ও বিশেষজ্ঞ দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠনের পথ কার্যত বন্ধ করে দিচ্ছে।
তিনি মনে করেন, জাতিসংঘসহ বিশেষায়িত সংস্থার দলগুলোর দ্রুত প্রবেশ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রযুক্তিগত যন্ত্রাংশ, জ্বালানি ও খুচরা যন্ত্রপাতির প্রবেশ সহজ করা মানুষের জীবন রক্ষা ও নিরাপদভাবে ভূমি পুনরুদ্ধার শুরু করার জন্য জরুরি।
থাওয়াবতার মতে, চলমান এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষের ওপর থাকা আইনগত ও মানবিক দায়িত্ব পালনে স্পষ্ট অবহেলারই উদাহরণ।
গুরুতর হুমকি
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হাশদ’-এর প্রধান সালেহ আবদুল আতি বলেন, গাজা উপত্যকায় এখন ২০ হাজারের বেশি অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ পড়ে আছে, যা বেসামরিক মানুষের জীবনের জন্য গুরুতর হুমকি। বিশেষ করে শিশুদের জন্য, যারা ইতিমধ্যে এসব বিস্ফোরণে ব্যাপকভাবে হতাহত হয়েছে।
‘সফা’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এসব অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ শুধু তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি করছে না, যুদ্ধপরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিপদের কারণে বহু মানুষ ঘরে ফিরতে পারছে না। ধ্বংসস্তূপ সরানো, অবকাঠামো মেরামত কিংবা পুনর্নির্মাণ সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।
আতির মতে, বর্ষার পানির সঙ্গে গোলাবারুদ মিশে ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। এতে বিস্ফোরণের আশঙ্কা বাড়ছে এবং গোলাবারুদ শনাক্ত বা নিষ্ক্রিয় করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাব, বিশেষজ্ঞ দলের স্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনি বলেন, এই অবস্থায় বাস্তুচ্যুত মানুষের ওপর ঝুঁকি বাড়ছে, ত্রাণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং মৌলিক সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। শিশু ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যে আছে।
আতি মনে করেন, মানবিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো এখন জরুরি। এসব গোলাবারুদ নিরাপদে শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে পারলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমও গতি পাবে। এতে বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবিক পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে।
কয়েক দিন আগে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়, গাজায় অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ যুদ্ধপরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি। বোমাবর্ষণ থেমে যাওয়ার পরও এগুলো বেসামরিক মানুষকে হত্যা ও পঙ্গু করে চলেছে।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করেছে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে ধ্বংসস্তূপের নিচে। দখলদার বাহিনী যে বোমাগুলো ফেলেছে, তার অনেকগুলোর ভেতর ডিলেইড ফিউজ বা বিলম্বিত বিস্ফোরণব্যবস্থা বসানো ছিল—যাতে সেগুলো ভবনের ভেতর ঢুকে বা মাটির নিচে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এতে উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও মারাত্মক হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সফা











