যেমন দেখে এলাম আহমাদ আশ-শারাকে 

সদ্য আল-জাজিরায় প্রচারিত আহমদ আশ-শারার বহুল আলোচিত টেলিভিশন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েই তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ পান  সৌদি সাংবাদিক ও লেখক আলি আল-জফিরি। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা, আহমাদ আশ-শারাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ এবং নতুন সিরিয়াকে ঘিরে নিজের পর্যবেক্ষণ নিয়েই তিনি লিখেছেন এই দীর্ঘ নিবন্ধ। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, ঘটনাবর্ণনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মিশেলে এতে উঠে এসেছে আহমাদ আশ-শারার নেতৃত্ব, তাঁর চিন্তার বিবর্তন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখকের ভাবনা। 
Screenshot 2026-08-03 204503

দামেস্কের আল-মায্জা এলাকায় বাসা থেকে মসজিদে যাওয়ার পথে একটি সরু গলি পড়ে। দুই পাশের ভবনের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া গাছের ছায়ায় ঢাকা সেই পথ ধরেই সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ আশ-শারা প্রায় প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে মসজিদে যেতেন।

সেদিন আমিও তাঁর সঙ্গে হাঁটছিলাম। মসজিদের পথে যেতে যেতে হঠাৎ লাজুক এক হাসি নিয়ে আবু মুহাম্মদ আমার দিকে ফিরে বললেন,

‘জানেন, এক সময় এই পথটার নাম ছিল ‘প্রেমিকদের গলি’।’

কথাটিতে ছিল এক অদ্ভুত বিদ্রূপ, যেন সেই বিদ্রূপই তাঁর পরবর্তী জীবনের দীর্ঘ পথচলার নীরব সঙ্গী হয়ে থেকেছে।

কৈশোরে, যখন অধিকাংশ তরুণের মন থাকে জীবনকে উপভোগ করার স্বপ্নে বিভোর, তখন সুদর্শন এই দামেস্কের তরুণকে তাড়িয়ে বেড়াত এক ভিন্ন বোধ—দায়িত্ব।

আহমদ আশ-শারার জীবন ও রাজনৈতিক যাত্রা বুঝতে হলে এই একটি শব্দই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দায়িত্ব। 

তবে এটি প্রচলিত অর্থে কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দায়িত্ব ছিল না। এটি ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস, আদর্শিক অঙ্গীকার এবং সাংগঠনিক চেতনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক দৃষ্টিভঙ্গি। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় যে বৈশ্বিক জিহাদি ধারার উত্থান ঘটে, পরে আল-কায়েদা তাকে একটি সুসংগঠিত আদর্শিক রূপ দেয়। সেই আদর্শই পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহু মুসলিম তরুণকে জিহাদি আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করে। আহমদ আশ-শারাও ছিলেন সেই প্রজন্মের একজন।

এই আদর্শ ও দায়িত্ববোধের টানেই একসময় তিনি দামেস্ক ছেড়ে ইরাকে যান, পরে ফিরে আসেন সিরিয়ার সীমান্তাঞ্চলে। প্রায় আড়াই দশকের দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ পেরিয়ে তিনি কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, সেই আদর্শই কি তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হয়ে উঠেছিল? এর উত্তর আজও অজানা।

গত ২৫ জুলাই তাঁর সঙ্গে আমার সাত ঘণ্টারও বেশি সময় কাটে। উদ্দেশ্য ছিল তাঁর একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার নেওয়া। গত বছর থেকে একাধিকবার পিছিয়ে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সেটি সম্ভব হয়। গত রোববার আল-জাজিরা সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব প্রচার করে। দ্বিতীয়, আরও ব্যক্তিগত পর্বটি প্রচার হবে আগামী রোববার রাতে। (এই রোববার দ্বিতীয় পর্ব প্রচারিত হয়েছে।)

তাঁর সঙ্গে দেখা করার আগে কয়েকজন আমাকে সতর্ক করেছিলেন। সবচেয়ে মৃদু সতর্কতাটি এসেছিল আমাদের দুজনেরই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে। তিনি বলেছিলেন, নেতার ‘মোহে’ যেন না পড়ি।

তাঁর আশঙ্কা ছিল, সেই ‘মোহ’ আমার পেশাগত নিরপেক্ষতা ও সাক্ষাৎকারের বস্তুনিষ্ঠতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে আমার মতো একজনের ক্ষেত্রে, যিনি সিরিয়ার বিপ্লবের কঠিন বছরগুলোতেও তাঁর প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন, আর আজ মুক্ত দামেস্কে এসে সেই বিপ্লবের নেতার মুখোমুখি। 

বিকেল পাঁচটায় পিপলস প্যালেসে (কাসর আশ-শাব) আহমদ আশ-শারার কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তাঁর আগমনের পর প্রাসাদটি যেন সত্যিই ‘জনগণের প্রাসাদে’ পরিণত হয়েছে। আগে এমন ছিল না।

তাঁর সঙ্গে দেখা করে বুঝলাম, সতর্কবার্তাগুলো একেবারে অমূলক ছিল না। তাঁর আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও বিনয় এমনই যে, সহজেই বোঝা যায় কেন বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী নেতা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। ।

ট্রাম্পের মুগ্ধতা শুধু আহমদ আশ-শারা ব্যক্তিত্বে সীমাবদ্ধ নয়। সম্ভবত তাঁর চিন্তার ধরন, বিষয়কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনাও ট্রাম্পকে আকৃষ্ট করেছে।

ট্রাম্পের এই মুগ্ধতার কথা আমি প্রশংসা হিসেবে বলছি না। বরং আহমাদ আশ-শারার একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে চাই। আমার মনে হয়েছে, তিনি জানেন কী করছেন। কী করবেন, কখন করবেন এবং কীভাবে করবেন—এ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট পরিকল্পনা আছে। সিরিয়ার স্বাধীনতার সময় আমরা তার কিছুটা আভাস পেয়েছি। আমার বিশ্বাস, সামনে আসা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতেও সেই পরিকল্পনার ছাপ দেখা যাবে। 

আহমদ আশ-শারার সঙ্গে দেখা হলে প্রথমেই তাঁর আন্তরিকতা ও সম্মানবোধের পরিচয় মেলে। তবে তিনি কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য কথা বলেন না। আবার প্রশ্নের সীমারেখার মধ্যেও নিজেকে আবদ্ধ রাখেন না।

তাঁর কথা শুনতে শুনতে মনে হয়, এই ভাবনার বীজ রোপিত হয়েছিল ইরাকের বুকা কারাগারে। ইদলিবে তা আরও পরিণত হয়েছে, আর আজ দামেস্কে এসে যেন পূর্ণতা পেয়েছে।

তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি শব্দ—‘দায়িত্ব’। ‘প্রেমিকদের গলি’ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা আল-মায্জার আল-আকরাম মসজিদে বসে তিনি বারবার সেই দায়িত্ব নিয়েই ভাবতেন। বছরের পর বছর এই দায়িত্ববোধই তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

তাতে তাঁর সঙ্গে আপনার কথোপকথনের গুরুত্ব কমে না। বরং মনে হয়, আপনি এমন একজনের সামনে বসে আছেন, যিনি জানেন তিনি কোথায় যেতে চান। সেখানে পৌঁছাতে কী করতে হবে, কখন করতে হবে, কীভাবে করতে হবে—সবকিছু নিয়েই তাঁর স্পষ্ট ধারণা আছে। তাই আপনার অনেক প্রশ্ন বা সমালোচনার উত্তর যেন তিনি আগেই ভেবে রেখেছেন।    

তিনি খুঁটিনাটি নিয়ে সময় নষ্ট করেন না। এসব বিষয়ের শেষ নেই, জটিলতাও কম নয়। তাঁর দৃষ্টি থাকে মূল বিষয়ের দিকে। তাই কখনও কিছু ত্রুটি উপেক্ষা করেন, কখনও ইচ্ছাকৃতভাবেই মেনে নেন। কখনও কৌশলগত কারণে, কখনও এই উপলব্ধি থেকে যে সবকিছু একসঙ্গে বদলানো যায় না। কিছু পরিবর্তনের জন্য সময়ের অপেক্ষা করতেই হয়।

আমার মনে হয়েছে, সঠিক সময় বেছে নেওয়ার শিল্প তিনি খুব ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন।  

তাহলে কি আমিও সেই নিষিদ্ধ সীমা অতিক্রম করেছি? আমিও কি আশ-শারার ব্যক্তিত্বের মোহে পড়েছি? 

হয়তো। 

তবু আশ-শারাকে নিয়ে আমার লেখার সমালোচনায় ওঠা দুটি আপত্তির কথা এড়িয়ে যেতে চাই না। প্রথমটি, বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে তাঁকে ‘বিপ্লবের নেতা’ বলেছিলাম। দ্বিতীয়টি, গণতন্ত্রের প্রভাব কমে যাওয়া নিয়ে আমার মন্তব্য এবং নতুন সিরিয়ার পরিচয় সম্পর্কে আশ-শারার অবস্থান।  

পিপলস প্যালেস থেকে আমরা একসঙ্গে আল-মায্জার উদ্দেশে রওনা হই। গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি নিজেই। আত্মবিশ্বাসী, একেবারেই স্বাভাবিক। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করলে তাঁর বহর বিস্ময়করভাবে ছোট। দামেস্কের অলিগলি তিনি তাঁর অনেক নিরাপত্তাকর্মীর চেয়েও ভালো চেনেন—এমনটাই মনে হলো। কখনো কখনো তো নিরাপত্তা দলকেও পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।  

কথোপকথনের শুরুতে কখনও তাঁকে ‘জনাব প্রেসিডেন্ট’, কখনও ‘শায়খুনা’ বলে সম্বোধন করেছি। তবে সময়ের সঙ্গে সেই আনুষ্ঠানিকতা ঝরে গেছে। শেষ পর্যন্ত সম্বোধন এসে ঠেকেছে ‘আবু মুহাম্মদ’ কিংবা ‘তাল উমরুক’-এ—উপসাগরীয় আরব সমাজে সম্মানিত বা বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে যেভাবে সম্বোধন করা হয়।  

আশ-শারার চালচলন, কথাবার্তা, চেহারা—সবকিছুতেই আরব উপদ্বীপের মানুষদের স্বভাব ও সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। পিপলস প্যালেস থেকে আল-মায্জায় যাওয়ার পথে আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিগত আলাপ হয়েছিল, তা প্রকাশ করার মতো নয়। অবশ্য তাতে গোপনীয় কিছু ছিল না। শুটিং লোকেশনে পৌঁছানো পর্যন্ত সেটি ছিল দুজন মানুষের স্বাভাবিক, বন্ধুসুলভ কথোপকথন।  

পুরো সফরে আমার সবচেয়ে উপভোগ্য সময় ছিল সেই পথটুকু। এতটাই স্বাভাবিকভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম যে, একসময় ভুলেই গিয়েছিলাম, ড্রাইভিং সিটে বসা মানুষটিই একসময়ের আবু মুহাম্মদ আল-জাওলানি। আজকের প্রেসিডেন্ট আহমদ আশ-শারা। 

আশ-শারার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, তিনি একই সঙ্গে নেতা, রাষ্ট্রপতি ও বন্ধুর মতো কথা বলেন। অন্তত আমার কাছে তাঁর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা চোখে পড়েনি। মনে হয়েছে, তিনি এমনই। 

আল-মায্জায় কী ঘটেছিল, তাঁর শৈশবের স্কুল, মসজিদ আর বাড়িকে ঘিরে সেই গল্প আপাতত দ্বিতীয় পর্বের জন্যই তুলে রাখছি। সেই পর্বজুড়েই থাকবে ওই অভিজ্ঞতার বিস্তারিত। সেখানে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই আশ-শারাকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হতে দেখা যাবে।  

এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে দেখেছি, কীভাবে মানুষের ভিড় বাড়ছিল। মানুষের বিস্ময়, আনন্দ আর আবেগ, কোনোটাই অভিনয় নয়। মসজিদের মুসল্লি, পাড়ার যুবক, নারী, শিশুরা সবাই যেন মুহূর্তটিকে নিজের করে নিতে চাইছিল।

সবচেয়ে বেশি মনে আছে সেই মিসরীয় শ্রমিকের কথা। তিনি শুধু আশ-শারার সঙ্গে করমর্দনের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু আশ-শারা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই লোকটি প্রায় কেঁদে ফেলেন। 

আরেকটি বিষয় আমাদের সবার চোখে পড়েছিল। টানা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁটা, ছবি তোলা, তারপর মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়া—কোথাও তাঁর মধ্যে ক্লান্তি বা বিরক্তির ছাপ দেখিনি। 

আমি সহকর্মীদের বলেছিলাম, যুদ্ধের ময়দানে দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব আর সংগ্রামের জীবনই হয়তো মানুষকে এমন সহনশক্তিই দেয়। 

তবে এই উচ্ছ্বসিত জনসমর্থন নিয়েও আমার একটি শঙ্কা আছে। ভয় হয়, শেষ পর্যন্ত যদি আমরা আবার ব্যক্তি–পূজার সংস্কৃতিতেই ফিরে যাই। আরব বিশ্বের বহু বিপর্যয়ের পেছনে এই সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে। এই সংস্কৃতিই একের পর এক স্বৈরশাসকের জন্ম দিয়েছে। কারণ, তারা কখনো জানতে পারেনি মানুষ আসলে কী ভাবছে। আবার অনেক সময় মানুষকেও সেই কথা বলার সুযোগ দেয়নি।

আল-মায্জায় দীর্ঘ শুটিং শেষে আমরা আবার একসঙ্গে গাড়িতে উঠলাম। গন্তব্য কাসিয়ুন পাহাড়। শুরু হলো ‘আবু মুহাম্মদ’-এর সঙ্গে আরেক দফা সেই উপভোগ্য আলাপ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাননীয় প্রেসিডেন্ট, সন্ধ্যা নেমে এসেছে। তারপরও কাসিয়ুনে যাওয়ার এত আগ্রহ কেন?’

সিরিয়া মুক্ত হওয়ার দিন আশ-শারা তিনটি জায়গায় গিয়েছিলেন উমাইয়া মসজিদ, আল-মায্জায় তাঁর বাড়ি এবং কাসিয়ুন পাহাড়।

কাসিয়ুন থেকে পুরো দামেস্ক এক নজরে দেখা যায়। হয়তো সেই দামেস্কও, যার দায়িত্বের ভার তিনি বছরের পর বছর বয়ে বেড়িয়েছেন।

দামেস্ককে নিয়ে আমাদের প্রিয় বন্ধু ও সিরিয়ার সংস্কৃতিমন্ত্রী মুহাম্মদ ইয়াসিন সালেহ তাঁর এক কবিতায় লিখেছেন,

ভালোবাসি তোমায়
তুমিই আমার ঠিকানা, তুমিই আমার আশ্রয়।

তোমার রূপে আজও বিস্ময় জাগে,
প্রতিবার চোখ মেললেই মনে হয়
এই বুঝি প্রথম দেখলাম তোমায়।

হে শাম, সুবাসে ভরা পৃথিবীর ফুল,
হে খাপছাড়া উমাইয়া তরবারি।

তোমার জন্যই লড়েছি জীবনভর,

ফিরে এসে দেখি,

আমি আর আগের সেই মানুষটি নই।

আরও একবার গন্তব্যের পথ ঠিক করে দিলেন প্রেসিডেন্ট নিজেই। কাসিয়ুন পাহাড়ে আমরা ঠিক কোথায় যেতে চাই, নিরাপত্তারক্ষীদের চেয়ে যেন তিনিই ভালো জানতেন।

পাহাড়ের চূড়ায়, সামনে পুরো দামেস্ক। তাঁর ইমামতিতে আমি মাগরিবের নামাজ আদায় করি। সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় ধরা কঠিন।

চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সিরিয়ার গত দেড় দশক। ফিরে আসছিল একের পর এক স্মৃতি। রক্তপাত, ধ্বংস, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ সারি, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া শিশুদের মুখ। মনে পড়ছিল সেই অসহায়ত্ব, সেই অপমান। যার সাক্ষী আমরা সবাই।

এই সবকিছুর মাঝেও আহমদ আশ-শারা দাঁড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। চেহারায় প্রশান্তির ছাপ, চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। আর আমার কানে যেন ভেসে আসছিল প্রয়াত নাদের শালিশের সেই পঙ্‌ক্তিগুলো,  

রাত একদিন ফুরোবে,

ভোর এসে সরিয়ে দেবে সব অন্ধকার।

সত্য আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে,

উড়বে তার শুভ্র পতাকা।

ভোরের আলামত তো দেখা দিয়েছে,

প্রান্তরে আর নেই লাত, উজ্জা কিংবা হুবাল। 

গত ৮ ডিসেম্বরের সকালে দামেস্কে যেন নতুন সূর্য উঠেছিল। সেদিন উমাইয়া মসজিদে দেওয়া ভাষণে আশ-শারা বলেছিলেন,

‘আল্লাহর অনুগ্রহে শৃঙ্খল ভেঙেছে, নির্যাতিতরা মুক্তি পেয়েছে। আমরা শামের কাঁধ থেকে অপমান ও লাঞ্ছনার ধুলো ঝেড়ে ফেলেছি। আর সিরিয়ার সূর্য আবারও উদিত হয়েছে।’

কাসিয়ুন পাহাড়ে বসে বারবার একটি প্রশ্নই আমাকে তাড়া করছিল, আহমদ আশ-শারা আসলে কীভাবে এই পথ পাড়ি দিলেন?

ইরাকের কারাগারে বছরের পর বছর তিনি কীভাবে টিকে ছিলেন? কীভাবে এমন এক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এলেন, যেখানে ধর্ম ও বাস্তবতা নিয়ে বিভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন ছিল অসংখ্য মানুষ, অথচ তিনি সেই স্রোতে ভেসে যাননি? 

কীভাবে তিনি এমন একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, যার পথ তাঁর বিশ্বাস, তাঁর স্বপ্ন আর তাঁর নিজের ‘দায়িত্ববোধ’-এর সঙ্গে কখনোই মেলেনি? তারপর কীভাবে নিজেকে আইএস থেকে, এমনকি আল-কায়েদার উত্তরাধিকার থেকেও আলাদা করলেন?

এরপর কীভাবে তিনি সিরিয়ার ভেতরের ক্ষমতার লড়াই, সংকীর্ণ রাজনীতি আর ছোট ছোট স্বার্থের সংঘাত পেরিয়ে সামনে এগোলেন?

কীভাবে তিনি বিশ্বের প্রায় সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুললেন? কীভাবে পুরোনো সেই ভাবনাকেই নতুন ভাষায় তুলে ধরলেন? আর কেন সে কারণেই কেউ কেউ তাঁকে পশ্চিমাদের সহযোগী, এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট বলেও অভিযুক্ত করল?

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কই–বা কীভাবে সামলালেন? সহযোগিতা করেও কীভাবে নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা ধরে রাখলেন? অথচ আজও অনেকে মনে করেন, ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযান ছিল তুরস্কের সিদ্ধান্ত। সত্য হলো, শুরু থেকেই তুরস্ক এই অভিযানের পক্ষে ছিল না। বরং তারা হাইআতু তাহরীরিশ শামকে অভিযান থেকে বিরত থাকতে বলেছিল। আলেপ্পো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ পর্যন্তও তাদের সেই অবস্থান বদলায়নি।

আর কীভাবে আশ-শারা তাঁদের সামলাচ্ছেন, যারা একসময় ধ্বংস আর নৃশংসতার জন্য দায়ী ছিল, অথচ আজ তাঁকেই রাষ্ট্র পরিচালনার পাঠ দিচ্ছে? আবার যাঁদের রাজনৈতিক চিন্তা কখনো সফল হয়নি, তাঁরাও আজ উপদেশ দিতে এসেছেন।  

আরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। যুদ্ধ আর জিহাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে উঠে আসা একজন মানুষ কীভাবে এত দ্রুত এক সময়ের শত্রু দেশগুলোর আস্থা অর্জন করলেন?

সেদিনের দীর্ঘ আলাপ শেষে আমার মনে হয়েছে, আশ-শারা মূলত সমঝোতার রাজনীতি করেন। তবে তাঁর বিশ্বাস, সেই সমঝোতায় তিনি কখনো মৌলিক নীতিতে ছাড় দেন না।

তিনি জানেন কোথায় অনড় থাকতে হয়, আর কোথায় সময়ের সঙ্গে বদলাতে হয়। সুযোগ যতটুকু, ততটুকু এগিয়ে যান। আরবদের একটি পুরোনো প্রবাদ আছে, এত শক্ত হয়ো না যে ভেঙে যাও, আবার এত নরমও হয়ো না যে সবাই তোমাকে চেপে ধরে। আমার মনে হয়েছে, আশ-শারা এখন পর্যন্ত সেই ভারসাম্যই ধরে রেখেছেন।   

সিরিয়ার বিপ্লবের সেই সময়টির কথা মনে পড়ে, যখন আন্দোলন অসংখ্য গোষ্ঠী, দল ও রাজনৈতিক কাঠামোয় ভাগ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দেশের মানুষ এতটা বিভক্ত ছিল না। অথচ দেশ ও স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছিল তারাই। 

আশ-শারাকে নিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। বিশেষ করে দেশের বাইরে থাকা বিপ্লবীদের একটি অংশ তাঁর সমালোচক ছিল। কেন ছিল, সে আলোচনা অন্য প্রসঙ্গ।

তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, সবকিছুর বিরোধিতা করতে করতে তাঁরা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে গেছেন।

আশ-শারার পথচলায় তিনটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দেখায় এগুলো আলাদা আলাদা মনে হতে পারে। কিন্তু এই তিনটিই তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। 

প্রথমত, তিনি আইএসকে সামরিকভাবে পরাজিত করেন এবং তাদের প্রধান শক্তিকে ভেঙে দেন। তবে তাদের আদর্শ ও বিচ্ছিন্ন অনুসারীরা রয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, তিনি সিরিয়া থেকে আল-কায়েদার আদর্শ, সংগঠন ও প্রভাব সরিয়ে দেন।

তৃতীয়ত, তিনি মুক্তাঞ্চলে একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন। নরম ও কঠোর, দুই ধরনের কৌশলে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে এক ছাতার নিচে আনেন। তারপর ‘রদউল উদওয়ান’ অভিযানের নেতৃত্ব দেন। সেই অভিযানের মধ্য দিয়েই সিরিয়া স্বাধীন হয়। পতন ঘটে শুধু আসাদ শাসনের নয়, তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থারও।

এসবের পরও যদি তাঁকে ‘বিপ্লবের নেতা’ বলা না যায়, তাহলে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের কাছে ‘বিপ্লবের নেতা’ হওয়ার মানদণ্ড আসলে কী? 

তবে একটি কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। ‘বিপ্লবের নেতা’ কথাটি আমি ব্যবহার করেছি একটি নির্দিষ্ট সময় ও প্রেক্ষাপটের জন্য। এটিকে সর্বজনীন বা চূড়ান্ত কোনো উপাধি হিসেবে বলিনি। কিন্তু কেউ কেউ আমার বক্তব্যকে সেভাবেই পড়েছেন। 

সিরিয়ার বিপ্লব যখন গতি হারাতে শুরু করেছে, আন্তর্জাতিক সমর্থন কমে আসছে, আর সন্দেহ দেখা দেয় বিপ্লবের সাফল্য নিয়েই, তখনই আবু মুহাম্মদ আল-জোলানির মধ্যে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন শুরু হয়। বদলে যায় তাঁর চিন্তা, ভাষা আর রাজনীতির ধরন। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ ছিল ইদলিব। পরে সেই অভিজ্ঞতাই সিরিয়া মুক্তির ভিত্তি হয়ে ওঠে। 

এ কথা বলার উদ্দেশ্য কাউকে বড় করে দেখানো বা কোনো উপাধি দেওয়া নয়। বরং আশ-শারা ও তাঁর সহযোদ্ধাদের সেই অভিজ্ঞতা, তাঁদের চিন্তার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক পথের রূপান্তর না বুঝলে আজকের সিরিয়াকেও পুরোপুরি বোঝা যাবে না। 

এ কারণে ভিন্নমত থাকতেই পারে। কেউ কেউ আমার সঙ্গে দ্বিমতও পোষণ করতে পারেন। আশা করি, তাঁরা বিষয়টি এই প্রেক্ষাপটেই দেখবেন। আমি ‘বিপ্লবের নেতা’ কথাটি ব্যবহার করেছি সিরিয়ার বিপ্লবের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আশ-শারার ভূমিকা বোঝাতে। পুরো বিপ্লবের একচ্ছত্র বা সর্বজনীন নেতা হিসেবে নয়। বিষয়টি আমার কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট। তাই এ নিয়ে অযথা বিতর্কেরও খুব একটা কারণ দেখি না।

আমি আশ-শারাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁর চোখে নতুন সিরিয়ার পরিচয় কী?

তিনি শুধু বললেন, ‘সিরিয়ার পরিচয় হবে সিরিয়াই।’  

এর বেশি কিছু বলেননি। কোনো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও দেননি। প্রথমে এই উত্তরকে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে প্রশ্নও জাগে, সিরিয়াকে কি বাইরে থেকে কেউ বলে দেবে, তার পরিচয় কী হবে?

আমার মনে হয়েছে, তাঁর মনোযোগ এখন অন্য জায়গায়। চারদিকের হুমকির মধ্যে সিরিয়াকে কীভাবে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করানো যায়, সেটিই তাঁর প্রধান চিন্তা। এখন তাঁর প্রধান ভাবনা ভূরাজনীতি, বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ আর রাষ্ট্র গঠন। 

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে এ পর্যন্ত আশ-শারার অবস্থান আমার কাছে যথেষ্ট সংযত মনে হয়েছে। অনেকে যেমন আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি রাষ্ট্রের ওপর কোনো ধর্মীয় কর্মসূচি চাপিয়ে দেননি। বরং কুর্দিদের এমন কিছু অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন, যেগুলো থেকে তারা আসাদ আমলে বঞ্চিত ছিল। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধেও ছিলেন কঠোর।

অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রতিক্রিয়া মোটের ওপর সংযত ছিল। ভুল হয়েছে, সীমা লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু নতুন সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্যকে নিয়ে যে প্রতিশোধপরায়ণতার আশঙ্কা ছিল, সরকারের সামগ্রিক অবস্থান তা অনেকটাই ঠেকিয়ে রেখেছে।

আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, আশ-শারা এমন একটি সিরিয়া গড়তে চাইছেন, যেখানে সব সিরিয়ানেরই জায়গা থাকবে। শুধু তারা ব্যতিক্রম, যাদের হাত সিরিয়ার মানুষের রক্তে রঞ্জিত। অন্তত এখন পর্যন্ত নতুন সিরিয়ার পরিচয় এটাই। এর বেশি কিছু খুঁজে অকারণে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আমি দেখি না।

দামেস্কে আমি যা দেখেছি, ক্ষমতার কেন্দ্রের মানুষদের আচরণ আর প্রেসিডেন্ট আশ-শারার সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অনেক তরুণ সিরিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছি। নতুন সিরিয়াকে নিয়ে তাঁদের স্বপ্ন সীমাহীন।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর পরিকল্পনা আর সামনে এগোনোর পথ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতেও বাস্তবতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। অবশ্য আগামীকাল কী হবে, তা কেউই জানে না।

দামেস্কে যাওয়ার আগে আমার মনে নানা আশঙ্কা ছিল। ভেবেছিলাম, হয়তো এমন এক সিরিয়াকে দেখব, যে দীর্ঘ যুদ্ধ, হতাশা আর ভাঙনের ভারে ক্লান্ত। এমন আশঙ্কা অমূলকও ছিল না। বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এমন বাস্তবতা অনেক দেশেই দেখা যায়।

কিন্তু দামেস্কে কাটানো পাঁচটি দিন আমার সেই ধারণা অনেকটাই বদলে দিয়েছে। বরং মনে নতুন এক আশার জন্ম দিয়েছে। মনে হয়েছে, সিরিয়া যদি এই পথ ধরে এগোতে পারে, তাহলে শুধু নিজেই ঘুরে দাঁড়াবে না; দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, ধ্বংস আর আধিপত্যের রাজনীতিতে আটকে থাকা পুরো অঞ্চলকেও নতুন একটি পথ দেখাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন