কাতারের সাবেক আমির ও দেশটির আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান রূপকার শেখ হামাদ বিন খলিফা আল সানি আর নেই। রোববার (১২ জুলাই) এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে কাতারের আমিরি দিওয়ান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক নেতৃত্বে শেখ হামাদ এমন এক রূপান্তরের সূচনা করেছিলেন, যার ফলে সীমিত প্রভাবের একটি উপসাগরীয় রাষ্ট্র থেকে কাতার পরিণত হয় আঞ্চলিক কূটনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এক শক্তিতে। কাতারে তাঁকে অনেকেই ‘দারিদ্র্যের কবর রচয়িতা’ নামে অভিহিত করেন, কারণ তাঁর নেতৃত্বেই দেশটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন যুগে প্রবেশ করে।
সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়ক
১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি দোহায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হামাদ। কাতারে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট থেকে ১৯৭১ সালে স্নাতক হন। দেশে ফিরে কাতারের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেন এবং ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৭ সালে তিনি যুবরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন। পাশাপাশি জাতীয় পরিকল্পনা ও যুব উন্নয়ন–সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বও দেন। ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন তিনি কাতারের আমিরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপরই দেশটি ব্যাপক অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের পথে হাঁটতে শুরু করে।
আধুনিক কাতারের ভিত্তি নির্মাণ
শেখ হামাদের শাসনামলে কাতারের উন্নয়ন কৌশল গড়ে ওঠে তিনটি প্রধান ভিত্তির ওপর—অর্থনীতি, গণমাধ্যম এবং সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতি।
প্রাকৃতিক গ্যাস খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ, উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার মাধ্যমে কাতারকে বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটিতে পরিণত করা হয়। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (QIA), যা পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে পরিণত হয়।


দেশজুড়ে অবকাঠামো, সড়ক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নগর উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে কাতার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে ওঠে।
শিক্ষা ও গণমাধ্যমে নতুন দিগন্ত
শেখ হামাদের সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘এডুকেশন সিটি’, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস স্থাপন করা হয়। ফলে কাতার মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়।
১৯৯৬ সালে তাঁর উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে আল–জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর একটিতে পরিণত হয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ অবস্থান তৈরি করে।
অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও কূটনৈতিক উত্থান
তাঁর শাসনামলে ১৯৯৯ সালে কাতারে প্রথম পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০০৪ সালে স্থায়ী সংবিধান অনুমোদনের মাধ্যমে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা এবং আইনের শাসন জোরদারের উদ্যোগও নেওয়া হয়।
পররাষ্ট্রনীতিতে শেখ হামাদ কাতারকে মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশল গ্রহণ করেন। ফিলিস্তিন, লেবানন, সুদান ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটে দোহা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ভিন্নমুখী পক্ষগুলোর সঙ্গে সমানভাবে যোগাযোগ রাখার সক্ষমতার কারণে কাতারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে।
ফিলিস্তিন ও লেবাননে সক্রিয় ভূমিকা
ফিলিস্তিন ইস্যুতে শেখ হামাদের অবস্থান আরব বিশ্বে ব্যাপক আলোচিত ছিল। ২০০৯ সালে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় তিনি আরব দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের আহ্বান জানান এবং গাজার পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি আরব সম্মেলনের উদ্যোগ নেন।
২০১২ সালে তিনি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা সফর করেন। অবরোধ শুরুর পর তিনিই ছিলেন গাজা সফরকারী প্রথম আরব রাষ্ট্রনেতা। ওই সফরে অবকাঠামো পুনর্গঠন, হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাতারের সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়।
লেবাননেও ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর পুনর্গঠনে কাতার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক অবকাঠামো নির্মাণে দেশটি অর্থায়ন করে।
আরব বসন্তে বিতর্কিত কিন্তু প্রভাবশালী অবস্থান
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় শেখ হামাদের নেতৃত্বে কাতার বিভিন্ন গণআন্দোলনের প্রতি রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমগত সমর্থন দেয়। মিসরে হোসনি মুবারকের পতনের পর অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সহায়তা দেয় দোহা।
লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কাতার বিদ্রোহীদের স্বীকৃতি দেয় এবং মানবিক সহায়তা পাঠায়। একইভাবে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে আরব লীগের কঠোর অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রেও দোহা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই নীতির কারণে কাতার যেমন আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থান অর্জন করে, তেমনি বিভিন্ন মহলে সমালোচনারও মুখোমুখি হয়।
রেখে গেলেন এক যুগান্তকারী উত্তরাধিকার
শেখ হামাদ বিন খলিফা আল সানির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে প্রায় সর্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে—তাঁর নেতৃত্বেই কাতার অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উত্থান, কূটনৈতিক সক্রিয়তা এবং বৈশ্বিক পরিচিতি লাভ করে।
তাঁর হাত ধরেই ছোট্ট উপসাগরীয় রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি অর্থনীতি ও আরব গণমাধ্যমের অন্যতম প্রভাবশালী কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আধুনিক কাতারের এই রূপান্তরের স্থপতি হিসেবে শেখ হামাদের নাম দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।










