স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার ৩১ বছর

১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৮ হাজারেরও বেশি বসনীয় পুরুষ ও কিশোর গণহত্যার শিকার হয়। তাদের মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলতে বহু গণকবর খনন করা হয়েছিল। এর মধ্যে অনেকগুলো কবর পরবর্তীতেও নতুন করে খনন করা হয়।
সেভ্রেনিৎসা

১৯৯৫ সালের জুলাই। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ১৭ বছরের নেদজাদ আফদিচ ঘুম থেকে জেগে উঠল কামানের প্রচণ্ড গর্জনে। কয়েক বছর আগেও তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল ভূগোল। সেপিউচিনা নামের একটি গ্রামে বড় হওয়া এই কিশোর শিখেছিল মানচিত্র দেখে পথ চিনতে, গাছের গায়ে জন্মানো শৈবাল দেখে দিক নির্ধারণ করতে আর রাতের আকাশে ধ্রুবতারা খুঁজে বের করতে। কিন্তু সেদিন ভূগোল তার কাছে আর কোনো পাঠ্যবইয়ের বিষয় ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আফদিচ বুঝে গেল, তাকে পরিবার ছেড়ে পালাতে হবে। সামনে অপেক্ষা করছে শত কিলোমিটারের দীর্ঘ বনপথ, আর পেছনে ধেয়ে আসছে সার্ব বাহিনী। সে তখনো জানত না, এই যাত্রা শুধু তাকে বাবার কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন করবে না, বরং মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যাগুলোর একটির প্রত্যক্ষ সাক্ষীতে পরিণত করবে।

স্রেব্রেনিৎসার সেই মৃত্যুযাত্রা থেকে হাজার হাজার মানুষ আর কখনো ফিরে আসেনি। কিন্তু আফদিচ বেঁচে ফিরেছিলেন। ৮ হাজারের বেশি বসনিয়ান পুরুষ ও কিশোরের সঙ্গে সেও বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে জীবন রক্ষার দুঃসাহসী অভিযানে পা বাড়ায়। পরবর্তীতে ৪৭ বছর বয়সে নিজের স্মৃতিকথায় আফদিচ লিখেছিলেন, ‘আমি বেঁচে থাকার জন্য ভূগোল পড়িনি, পড়েছিলাম ভালোবেসে!’

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় এই সহিংসতা মূলত ১৯৯২-১৯৯৫ সালের যুদ্ধ চলাকালে সার্ব বাহিনীর নেওয়া ‘ড্রিনা প্রকল্প’ পরিকল্পনার অংশ ছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব সীমান্তবর্তী ড্রিনা নদীর উপত্যকা অঞ্চল থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে সরাসরি সার্বিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। এই লক্ষ্য পূরণে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে স্রেব্রেনিৎসা শহরে এসে এই গণহত্যা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আদালত এই হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ (Genocide) হিসেবে উল্লেখ করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা ও পরিকল্পিত জাতিগত নিধনের সেই কালো অধ্যায় আফদিচের স্মৃতির ভেতর দিয়ে আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এক নতুন রাষ্ট্রের গল্প

বসনিয়া তখন ছিল এক নতুন রাষ্ট্র। যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর ১৯৯২ সালের ১ মার্চ অনুষ্ঠিত গণভোটের মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। সে সময় বসনিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ৪৪% ছিল বসনিয়ান মুসলমান, ৩১% ছিল সার্ব এবং ১৭% ছিল ক্রোয়েশিয়ান। যা বসনিয়াকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রে পরিণত করে।

এই সময়েই বসনিয়ার সার্ব জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য একটি ছায়া-রাষ্ট্র ঘোষণা করে। এর নাম দেয় ‘শ্রপস্কা প্রজাতন্ত্র’ (Republika Srpska)। এটি ছিল একটি কল্পিত রাজনৈতিক সত্তা। এর মাধ্যমে সার্ব রাজনৈতিক নেতারা কথিত ‘নিজেদের স্বার্থ রক্ষার’ অজুহাতে বসনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

স্বাধীনতার মাত্র এক মাস পর, ১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল, সার্বিয়ার প্রত্যক্ষ সহায়তায় বসনিয়ান সার্ব বাহিনী একটি যুদ্ধ শুরু করে। যার মূল লক্ষ্য ছিল, বসনিয়ার ভূখণ্ড দখল এবং অ-সার্ব জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক উৎখাত করা। তখন সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে চলতে থাকে গোলাবর্ষণ, অসংখ্য বেসামরিক নাগরিককে বাধ্য করা হয় ঘরবাড়ি ছাড়তে।

এই আগ্রাসনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে আফদিচের পরিবারের উপরও। তখন আফদিচের পরিবারে ছিল, বাবা আলি, মা টিমা এবং ছোট তিন বোন, ওরা সবাই বয়সে আফদিচের চেয়ে ছোট। যুদ্ধ চলাকালে তাদের একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। প্রথমে নিজ গ্রাম সেবিওচিনা থেকে, এরপর স্রেব্রেনিৎসার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে, আর শেষে এসে ঠাঁই হয় স্লাবোভিচির শরণার্থী শিবিরে।

১৯৯৩ সালে স্রেব্রেনিৎসার একটি স্কুল চত্বরে সার্ব বাহিনী এক ভয়াবহ হামলা চালায়। সেখানে ৫৬ জন নিহত হয়। তাদের বেশিরভাগই ছিল শিশু। এবং আহত হয় আরও ৭০ জনের বেশি। 

এই ঘটনার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক সিদ্ধান্তে স্রেব্রেনিৎসা, আশপাশের গ্রাম ও বসনিয়ার আরও ৫টি শহরকে একত্রে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করে।

জাতিসংঘ দাবি তোলে,

  • বসনিয়ান সার্বদের আধাসামরিক ইউনিটগুলো যেন তাৎক্ষণিকভাবে স্রেব্রেনিৎসার ওপর তাদের সশস্ত্র আক্রমণ বন্ধ করে।
  • সেই সাথে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো (তৎকালীন ‘ফেডারেল রিপাবলিক অব যুগোস্লাভিয়া’) যেন বসনিয়ান সার্ব বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক আহ্বান সত্ত্বেও সার্ব বাহিনীর গোলাবর্ষণ কখনোই থেমে থাকেনি। স্রেব্রেনিৎসা ও তার আশপাশের গ্রামগুলোতে সহিংসতা চলতেই থাকে।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেদজাদ আফদিচ বলেন, ‘তখন আমরা বিশ্বাস করতাম, যুদ্ধ একদিন শেষ হবেই। জাতিসংঘ আছে, ব্লু হেলমেটধারী শান্তিরক্ষী বাহিনী আছে, আমরা নিজেদের বলতাম—অন্ধকার তো চিরকাল থাকতে পারে না। আমরা সবাই নিজের প্রাণ নিয়ে শঙ্কায় ছিলাম। জানতাম, যে কোনো দিন আমাদের মধ্যে একজন নিহত হতে পারে। কিন্তু এরপর যা ঘটেছে, তা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল!’

হামলার সূচনা : ‘ক্রিভায়া-৯৫’ অভিযান

১৯৯৫ সালের ৬ জুলাই ভোরবেলায় স্রেব্রেনিৎসা ঘিরে থাকা পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে শুরু হয় ভয়াবহ হামলা। এটাই ছিল ‘ক্রিভায়া-৯৫ অপারেশন’ এর সূচনা। এটি স্বঘোষিত ‘শ্রপস্কা প্রজাতন্ত্র’ এর প্রেসিডেন্ট রাদোভান কারাডজিচের নির্দেশে পরিচালিত হয়। এই হামলার লক্ষ্য ছিল, স্রেব্রেনিৎসার ঘেরাও করা এলাকাটিকে সম্পূর্ণভাবে দখলে নেওয়া।

স্লাবোভিচির শরণার্থী শিবিরে, কামানের সেই গর্জনে ঘুম ভেঙে যায় আফদিচের। তাৎক্ষণিকভাবেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এখানে আর থাকা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

কারাডজিচের বাহিনী এগিয়ে আসতে থাকলে ৮ বা ৯ জুলাই আফদিচের পরিবার পায়ে হেঁটে সেখান থেকে পালিয়ে যায় পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি জঙ্গলে। তারা ছুটে চলে স্রেব্রেনিৎসার আশেপাশের গ্রামগুলোর দিকে। এটি ছিল তাদের শেষ আশ্রয়ের চেষ্টা।

অন্যদিকে স্রেব্রেনিৎসা শহরের ভেতরে ২১ বছর বয়সী হাজরুদ্দিন মিসিচ নিজ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একই গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পান।

ইতোমধ্যেই তিনি চার ভাইয়ের মধ্যে দুইজনকে হারিয়েছেন। ইদ্রিস (৩৬) নিহত হন ১৯৯৩ সালের ৩ মার্চ, এক স্নাইপারের গুলিতে। আরেক ভাই সিনাইদ (২৩) একই বছর একটি স্কুলে চালানো হামলায় নিহত হন।

স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যার আগেই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করে ফেলা হয়। এই বাহিনী ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে সার্ব আগ্রাসনের মোকাবেলায় গঠন করা হয়েছিল।

এটি গঠিত ছিল মূলত স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দিয়ে। কিন্তু জাতিসংঘ দুই বছর আগেই একটি যুদ্ধবিরতির নামে এই বাহিনীকে অস্ত্রশূন্য করে ফেলে। ফলে তখন তাদের হাতে কোনও কার্যকর অস্ত্র ছিল না। আত্মরক্ষার ন্যূনতম সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলে তারা।

যদিও স্রেব্রেনিৎসায় ডাচ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন ছিল, তবে তারা ‘শ্রপস্কা প্রজাতন্ত্র’ এর ২৫ হাজার সেনার মোকাবেলায় বারবার পিছিয়ে পড়ে। ফলে শহরের প্রান্তবর্তী অঞ্চলগুলো আক্রমণকারীদের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।

১০ জুলাই বসনিয়ান সার্ব বাহিনী স্রেব্রেনিৎসা শহরে প্রবেশ করে সরাসরি হামলা চালায়। সেই মুহূর্তের কথা মনে করে হাজরুদ্দিন মিসিচের মা চিৎকার করে উঠেছিলেন: ‘সার্ব সেনারা শহরে ঢুকে পড়েছে! গুলির খোসা সরাসরি বাড়ির ভেতরেই পড়ছে!’

মিসিচ তৎক্ষণাৎ একটি ব্যাগ গুছিয়ে পালিয়ে যায় নিজের বৃদ্ধ মা জেহা, বাবা সেলিম এবং দুই ভাই হাসান ও সাফওয়াতকে নিয়ে। তারা শহরের ভবনগুলোকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অলিগলির ভিতর দিয়ে পালিয়ে যায়।

স্রেব্রেনিৎসার পতন

পরদিন ১১ জুলাই সকালে মাত্র ১৬ বছর বয়সী এমির বেকতিচ ও তার পরিবার বুঝে ফেলে, ‘এখন আর থাকার উপায় নেই, পালাতেই হবে।’ সেই সকালেই এমিরের বাবা রেজাপ বাড়িতে ফিরে আসেন রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে! তিনি তখন সার্ব বাহিনীর হামলার শিকার এক গ্রামে হতাহতদের সেবা করছিলেন। রেজাপ বলেন, ‘স্রেব্রেনিৎসা আর নেই! এখনই আমাদের চলে যেতে হবে!’

বছরের পর বছর ধরে বোমাবর্ষণ, অনাহার আর অবরোধের পর অবশেষে স্রেব্রেনিৎসার ঘেরাও করা এলাকা ভেঙে পড়ে। সেদিন বিকেল ৪টার দিকে বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নিরাপদ এলাকাটিতে প্রবেশ করেন।

সেখানে ঢুকেই তার সেনারা পুরুষ ও কিশোরদের নারী-শিশু ও বৃদ্ধদের থেকে আলাদা করা শুরু করে। তারা আশ্বাস দেয়, নারী-শিশু ও বৃদ্ধদের আন্তর্জাতিক সংস্থার নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানো হবে।

তখন পুরো এলাকা জুড়ে ছিল প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার ছিল স্রেব্রেনিৎসার স্থানীয় বাসিন্দা। বাকিরা ছিল আশপাশের অঞ্চল থেকে জোরপূর্বক উৎখাত হওয়া বসনিয়ান শরণার্থী।

বসনিয়ানরা তখন দুই দিকে ভাগ হয়ে পালায়। নারী ও শিশুরা আশ্রয় নেয় বুটোচারি নামের এক গ্রামে জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষীদের ঘাঁটিতে। আর ১২ থেকে ১৫ হাজার নিরস্ত্র পুরুষ ও কিশোর পালিয়ে যায় উত্তরের দিকে জঙ্গলের পথ ধরে। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে তুজলা শহর। যেটি সার্বদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল এবং ‘নিরাপদ অঞ্চল’ হিসেবে পরিচিত ছিল।

এমির বেকতিচ ও তার বাবা রেজাপ জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যাওয়া দলের সাথে যোগ দেন। আর তার মা ও বোন রওনা হন জাতিসংঘ ঘাঁটির দিকে।

হাজরুদ্দিন মিসিচের পরিবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার বৃদ্ধ মা-বাবা বুটোচারিতে যান। আর সে ও তার দুই ভাই জঙ্গলের পথে পা বাড়ায়।

আফদিচ পরিবারেও ঘটে একই ঘটনা, আফদিচ, তার বাবা ও চাচা জঙ্গলের পথে, আর তার মা ও তিন বোন আশ্রয় নেন জাতিসংঘ ঘাঁটিতে।

সবাইকে ঘিরে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল,‘আমরা কি আর কখনো একে অন্যকে দেখতে পারব?’

দুই দিন পায়ে হেঁটে যাত্রার পর ১১ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাতটার দিকে আফদিচসহ পালিয়ে আসা হাজারো মানুষ স্রেব্রেনিৎসার নিকটবর্তী ইয়াগলিচ ও শুশানজারি গ্রামে গিয়ে পৌঁছান। গ্রাম দুটি শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 

কিন্তু ওই দুই গ্রামও ছিল তখন সার্ব বাহিনীর বোমাবর্ষণের শিকার। ঘোড়া ও গবাদি পশুগুলো আহত ও নিহতদের বহন করছিল, ভয়ে চিৎকার করে চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিল।

আফদিচ বলেন, ‘সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে, আমি বাবাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম!’ তিনি বলেন, আমি তখন হঠাৎ করে হাজার হাজার অচেনা মানুষের ভিড়ে নিজেকে আবিষ্কার করি! আমি আমার চারপাশে কাউকে চিনতে পারছিলাম না! পথ চলতে চলতে আমি বারবার বাবার নাম ধরে চিৎকার করতাম! কিন্তু বাবাকে আর পাইনি। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে থাকার পরও একাকীত্ব আমাকে সর্বদা গ্রাস করে রাখত।’

এরপর আফদিচ আবার যোগ দেন নিজের সঙ্গীদের সাথে। বসনিয়ার পূর্বাঞ্চলের জঙ্গলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে থাকেন। একমাত্র আশা, তুজলা পৌঁছে বাঁচা যাবে!

মৃত্যুর পথ

তুজলা যাওয়ার পথটি ছিল ঘন বনভূমি দিয়ে ঘেরা। সেখানে বড় বড় ওক, বিচ ও পাইন গাছের পাশাপাশি ছিল শুষ্ক গ্রীষ্মকালীন ফার্ন গাছের পাতা। এটি বসনিয়ার বনভূমির স্থানীয় উদ্ভিদ।

জুলাই মাসে রোদের তাপ ছিল প্রচণ্ড। তাপমাত্রা ছিল ৩৪ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। প্রতি পদক্ষেপেই ছিল মৃত্যু ঝুঁকি। শুকনো পাতার শব্দ কিংবা গাছের ডাল ভাঙার শব্দেও যেকোন সময় সার্ব বাহিনীর কাছে তাদের অবস্থান ফাঁস হয়ে যেতে পারত।

মিসিচ বেকতিচ বলেন, ‘আমরা নীরবে হাঁটছিলাম। শৃঙ্খলার জন্য নয়, বরং চরম ভয়ে। কেউই নিজের মৃত্যু চায় না!’ 

মিসিচ বেকতিচ বলছিলেন, ‘আমি তখন অত্যন্ত ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত ছিলাম। জঙ্গল পাড়ি দেওয়ার আগে আমরা বাড়ি থেকে সামান্য খাবার নিয়ে বের হয়েছিলাম। প্রস্তুতির কোন সময় ছিল না। সেই পথচলা আমার জন্য সহ্য করা প্রায় অসম্ভব ছিল!’

১২ জুলাই রাত। বেকতিচ ও তাঁর বাবা সঙ্গীদের সঙ্গে তুজলা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ‘কামিনিয়েকো ব্রদো’ নামের পাহাড়ের একটি ঝরনার কাছে পৌঁছান। বেকতিচ সেখান থেকে পানি পান করেন। কিন্তু পানি ছিল কাদামাখা। আসলে সেখানে পানি বলতে কিছু ছিল না, ছিল শুধুই কাদা! মুখে সরাসরি মাটি লাগছিল। তারপরও সেটিই ছিল একমাত্র পানীয়।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকায় সার্ব বাহিনী ঢুকে পড়ে এবং ঝরনার কাছে থাকা ১৫-২০ জনকে ধরে নিয়ে ছোট একটি পাহাড়ে ওঠার আদেশ দেয়। সেখানে তাঁদের বসতে বাধ্য করা হয়। এরপরই শুনতে হয় মুহূর্তের মধ্যে জীবন পাল্টে দেওয়া সেই কথা, ‘আপনারা বন্দি!’

বেকতিচ বললেন ‘সেই মুহূর্তে সার্ব সৈন্যরা একটি আলোচনাই করছিল, ‘কিভাবে আমাদের মেরে ফেলা হবে!’ কেউ বলল, ‘এখানেই তাদের মেরে ফেলি!’ অন্যরা বলল, ‘না, ওদের ওই পুকুরের পাড়ে নিয়ে হত্যা করব!’

বেকতিচ তখন ভয়ে ও ক্লান্তিতে বাবার কোলে ঢলে পড়েন। বাবা তাঁকে সান্ত্বনা দেন, ‘যাই হোক না কেন, আমরা একসঙ্গে থাকব! শুধু আমার সঙ্গে থাকো, ঘুমিয়ে পোড়ো না!’ বেকতিচ বাবার কথা শোনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরের দিন দুপুরে বেকতিচ চোখ মেলে দেখে, সে একাকী একটি বিচ গাছের নিচে বসে আছে! তাঁর এখন প্রথম কাজ বাবাকে খুঁজে বের করা। সে ডাক দিয়ে অপেক্ষা করল, কিন্তু বাবা আর ফিরে এলেন না।

এখন তাঁর মাথায় শত শত প্রশ্ন, বাবাকে কে কোথায় নিয়ে গেল? নাকি সৈন্যরা মেরে ফেলেছে? বাবা কি তাকে গাছের পাশে রেখে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন? এত অন্ধকারের মাঝে সে ঘুমিয়েছিল কীভাবে?

বেকতিচ বলেন, ‘সেই রাতে বাবার সঙ্গে আমার আলিঙ্গনই ছিল আমার শেষ স্মৃতি!’

কয়েক দিন একাকী জঙ্গলে কাটানোর পর বেকতিচ যোগ দেন কয়েকজন বসনিয়ানের দলে। তাদের মধ্যে ছিলেন তার চাচা এবং চাচাত ভাইও। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তারা আবার সার্ব সৈন্যদের কাছে ধরা পড়ে এবং তাদের আত্মসমর্পণের আদেশ দেওয়া হয়!

কেউ পালানোর চেষ্টা করলে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। পথ চলতে গিয়ে বেকতিচ দেখেন, তীব্র রোদের মধ্যে পড়ে আছে শত শত লাশ। লাশে যাতে পা না পড়ে, সে জন্য তাকে সতর্ক হয়ে পথ চলতে হয়।

তারপর সবাইকে একটি পাহাড়ের ঢালে সারিবদ্ধ করে বসতে বলা হয়। একজন সার্ব সেনা কমান্ডার ঘোষণা করেন, কিছু তরুণকে মুক্তি দেওয়া হবে। যারা মুক্তি পেতে চাও, তারা দাঁড়িয়ে যাও। অনেক তরুণ উঠে দাঁড়িয়ে যায়। বেকতিচ বলেন, ‘সেই মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারিনি, আসলে কী ঘটছে!’

বেকতিচের চাচা জোরালোভাবে বলেছিলেন, বেকতিচ যেন উঠে চলে যায়। তারা শান্তভাবে কথা বলেছিল, কিন্তু বেকতিচ চেয়েছিল তার চাচার পাশে থাকতে। কারণ, সে একটু নিরাপদ বোধ করছিল। যে পরিস্থিতিই আসুক, সে তার পাশে থাকতে চেয়েছিল।

বেকতিচের মা ও বোন গিয়েছিলেন বুটোচারির জাতিসংঘ শিবিরে। তাঁদের সম্পর্কে তখন তাঁর কোনো খবর ছিল না। বাবা জঙ্গলের ভেতর কোথায় ছিলেন, শত্রুদের হাতে নিহত হয়েছেন নাকি বন্দি, সে ব্যাপারে সে কিছুই জানত না। তখন সে একেবারে একা; শুধু চাচা ও পরিচিত কিছু মানুষের সান্নিধ্য তাকে সামান্য সান্ত্বনা দিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে চাচার জোরাজুরিতে আত্মসমর্পণ করে। 

তারা উপত্যকার নীচে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের দিকে দৌড় দেয়। বেকতিচ শেষ মুহূর্তে একটি বাসে উঠতে সক্ষম হয়। সেখানে অনেক নারী ও শিশু ছিলেন, যারা বুটোচারির জাতিসংঘ ঘাঁটি থেকে তুজলার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন।

একজন নারী তাকে একটি কম্বল দিয়ে ঢেকে দিয়ে বললেন, ‘কিছুই জানতে চেয়ো না!’

‘মৃত্যুর রানি’

১৩ জুলাই বসনিয়ার কামিনিৎস গ্রামের কাছে প্রাতোনাৎস পৌরসভায় সার্ব সৈন্যরা আফদিচের সঙ্গীদের রাস্তা আটকে দেয়। উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে কামিনিৎস গ্রামে সার্ব বাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল।

আফদিচ বলেন, ‘তারা মাইক দিয়ে আমাদের হুমকি দিয়ে বলল, আমরা আত্মসমর্পণ না করলে আমাদের ওপর বোমা বর্ষণ করবে! তারা জেনেভা কনভেনশনের নিয়ম অনুযায়ী আচরণ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। শুরুতে তাদের আচরণ ছিল বিনম্র…তারপর শুরু হলো সবকিছু—আঘাত, লাঞ্ছনা আর অপমান!’

আফদিচ তখন সামনের সারিতে ছিলেন। সেনারা তাঁদের সব মালপত্র ফেলে দিতে বলল এবং পরে তা ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলে জানাল। আফদিচ তাঁর ব্যাগ পেছনে একটি ট্যাংকের কাছে ফেলে যান, যেখানে তাঁর পারিবারিক ছবি ছিল। আফদিচ ওই ট্যাংক এবং আশপাশের সামরিক গাড়িগুলোর কথা আজও ভুলতে পারেননি। সেখানে একটি ট্যাংকের ওপর লেখা ছিল, ‘মৃত্যুর রানি’!

এরপর আরও সৈন্যদের যানবাহন আসে। পরে আসে নীল ও সাদা রঙের পুলিশ বাহিনী, যারা এখনো যুদ্ধপূর্ব সময়ের যুগোস্লাভিয়ার মডেলের গাড়ি ব্যবহার করছিলো। পুলিশ বাহিনী পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন সার্ব সৈন্যরা পুরুষ ও কিশোরদেরকে এক কিলোমিটার দূরের একটি ময়দানে দৌড়ে চলে যেতে আদেশ দেয়। তারা রাস্তা পার হওয়ার সময় সেখানে বুটোচারির শরণার্থীদের একটি বাস দাঁড়িয়ে ছিল।

আফদিচ বলেন, ‘সেখানে আমি এক মেয়েকে দেখলাম, যার সাথে আমি স্কুলে যেতাম! স্পষ্টতই ওই বাসের কয়েকজন নারী আমাদের কয়েকজনকে চিনে ফেলেছে। নারীরা হয়ত তাদের সন্তান, স্বামী বা বাবাদের দেখার কারণে কাঁদছিল!’

এরপর সেনারা আবারো পুরুষ ও কিশোরদেরকে কামিনিৎস গ্রামের দিকে দৌড়ে যেতে আদেশ দেয়। আর তখন বাসগুলো তুজলার উদ্দেশ্যে চলে যায়। তারা ধ্বংস হওয়া স্যান্ডিচি গ্রামের একটি খোলা মাঠে গিয়ে পৌঁছে। এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারা একা নয়, আরও অনেককে আগেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।

পরে আফদিচ যখন পুরনো যুগোস্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন, তখন সে জানতে পারে, সেই মাঠে আসলে কী ঘটেছিলো। একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ পায়, সেখানে রামো সালকিৎচ নামের একজন বসনিয়ান শরণার্থীকে দেখা যায়, সে তার কিশোর ছেলে নেরমিনকে তার কাছে ডাকছে। সেখানে সার্ব সৈন্যরা দাঁড়িয়ে ছিল। পরে ওই বাবা-ছেলে উভয়কেই মেরে ফেলা হয়। সেই ফুটেজটি ছিল স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার বিচারের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

সে রাতে এক সার্ব সেনা বললো, ‘তোমাদেরকে তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, সব ঠিক হয়ে যাবে!’ আফদিচ বলেন, সেই কথায় ছিল তীব্র ব্যঙ্গ ও উপহাস। এরপর সেনারা আমাদেরকে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করায়। আর আহতদেরকে আমাদের সামনের সারিতে দাঁড় করায়। এরপর আদেশ করা হয়, ‘মাটিতে শুয়ে পড়ো! এরপর মাথার পেছনে হাত রেখে তালি দাও!’

আফদিচ বলেন, ‘আমরা সবাই একসাথে যতটা শক্তি ছিল টানা দুই থেকে তিন ঘন্টা তালি দিয়েছিলাম!’ কিন্তু যখন তালি বন্ধ হয়, আহতদেরকে আর সেখানে রাখা হয় না! ‘তাদেরকে পাশের বাড়িতে নিয়ে হত্যা করে ফেলা হয়! তখন মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে!’

মৃত্যুর পথ থেকে ফেরা

আফদিচসহ আরো অনেককে তখন সেনারা গাড়িতে তুলে স্রেব্রেনিৎসার নিকটবর্তী প্রাতোনাৎস শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিয়ে যায়। আফদিচ বলেন, ‘তখন সার্ব সেনারা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আমাদের গালি দিচ্ছিল আর পাথর নিক্ষেপ করছিল!’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি আসলে টারপলিন কাপড়ের একটা ছোট ছিদ্র দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলাম। সেই ছিদ্র আমাকে মৃত্যুর মুখে শ্বাস নিতে সাহায্য করছিল! আমার চারপাশের অনেক মানুষ তখন অচেতন হয়ে পড়ে, তারা শ্বাস নিতে পারছিল না!’

আফদিচ বলেন, ‘সেটা ছিল বাস্তবে একটা জাহান্নাম! সেখানে কোনো পানি ছিল না! তৃষ্ণার তীব্রতা বাড়তেই মানুষ নিজেদের মূত্র পান করতে শুরু করেছিল! তারা চিৎকার করছিল, হাহাকার করছিল, পানি চাচ্ছিল! তারা দরজার কাছে গিয়ে বলছিল, ‘দরজা খুলো!’ বা ‘আমাদের মেরে ফেলো!’ আমরা আর সহ্য করতে পারছি না!’ আফদিচ তখন সময় গোনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানাহার ছাড়া থাকার কারণে মনোযোগ রাখতে পারেননি!

হঠাৎ একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে, তারা তুজলার দিকে নয়; বরং তুজলার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সার্বিয়ার সীমান্তবর্তী বিয়েলিনা শহরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে! সেখানে সার্ব মিলিশিয়াদের অধীনে একটি বন্দি শিবির ছিল।

প্রায় ৫০ কিলোমিটার গাড়ি চালানোর পর ১৪ জুলাই সকালবেলা তারা স্রেব্রেনিৎসা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে পেটকোভিচি নামক এক স্কুলে গিয়ে পৌঁছায়। সেনারা পুরুষদের ট্রাক থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক স্কুলের ভেতরে ঢুকতে বাধ্য করে। সেখানে তারা বন্দিদের রাইফেল ও পাইপ দিয়ে বেধড়ক মারধর শুরু করে। আফদিচ বলেন, ‘সেখানে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা ছিল। তারা সবাইকে দ্রুত মারতে পারছিল না!’

স্কুলের ভেতরে আরো সৈন্য অপেক্ষা করছিল। একজন চিৎকার করে বলল, ‘এই জমি কার?’ আরেকজন উত্তর দিল, ‘এই জমি সার্বদের! সর্বদাই সার্বদের ছিল এবং থাকবে।’ পুরুষদের বাধ্য করা হয় একসাথে সেই বাক্যটি বলতে!

নিচের সারিগুলোতে ভিড় ছিল। দরজা বন্ধ থাকার পরেও নির্যাতনের শব্দ ও চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। আফদিচ ও তার সঙ্গীদের উপর তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সে তার চাচাকে পেয়ে যায়। তখন তারা জানতে পারেন, তারা সেই মাঠে একসাথেই ছিলেন; কিন্তু পরস্পরে দেখা হয়নি।

এ সময়ে কেউ কেউ ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘আমাদেরকে জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বা দরজা দিয়ে বের হয়ে পালানোর চেষ্টা করতে হবে!’ আরেকজন বলল, ‘এভাবে আমাদের কেউ হয়ত বেঁচে যেতে পারে, নইলে সবাইকেই মেরে ফেলা হবে!’

গণহত্যার দৃশ্যপট

পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সেনারা ভেতরে এসে বলল, ‘রেড ক্রস আসছে! তোমরা বন্দি বিনিময়ের জন্য প্রস্তুত হও!’ আফদিচ বলেন, ‘আমরা সবাই তাদের বিশ্বাস করেছিলাম! এমন একটা পরিস্থিতিতে আশা ধরে রাখতে মানুষ যেকোনো কিছুই বিশ্বাস করে!’

সেনারা প্রতিবার একসাথে আমাদের পাঁচ-ছয়জন করে বের করতে শুরু করল। যখন আফদিচের পালা এলো, সে তার চাচাকে সাথে যেতে বলল। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন এবং ভেতরে থেকে গেলেন। তাদের কাপড় খোলার আদেশ দেওয়া হলো। হাতকড়া পরিয়ে তাদের নিচের তলায় নিয়ে যাওয়া হল।

আফদিচ তখন দেখেন, করিডোরে রক্ত! স্কুলের সামনে এবং প্রধান ফটকের কাছে কতগুলো লাশ পড়ে আছে। আফদিচ ভেবেছিলেন, এখানেই হয়ত তাকে হত্যা করা হবে! কিন্তু সেনারা তাকে আরেক দলের সাথে ট্রাকে তুলল। ট্রাক ভরার পর সেনারা গাড়ির ছাদের টারপলিন কাপড়ের উপরেই গুলি চালাতে শুরু করল। তখন চিৎকার আর কান্নার শব্দে আকাশ ভারী হয়ে উঠছিল। দেহগুলো পরস্পরের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছিল। গাড়ি চলতে শুরু করল। আফদিচ তখন কেবল হাঁটু গেড়ে বসে ট্রাকের মাঝে এক পাশ আঁকড়ে রেখেছিল। সেখানে একটু নিরাপদ বোধ হচ্ছিল।

প্রায় মাঝরাতের সময়ে ট্রাক এক জায়গায় গিয়ে থামে। তখন পুরুষ ও কিশোরদের আবার নামার নির্দেশ দেওয়া হল। সেনারা আবার তাদের ধরে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল। আফদিচ তখন বুঝতে পারে, এখন তাদের হত্যা করা হচ্ছে!

আফদিচ বলেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এত সবকিছু ঘটে যাচ্ছে! আমি অন্যদের পেছনে লুকিয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। ভিড়ের মাঝে নিজেকে ছোট করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সবাই তখন একই কাজ করছিল। সবাই চাচ্ছিল অন্যদের আড়াল লুকাতে!’

আফদিচ মানসিকভাবে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করে ফেলেছিল। আফদিচ বলেন, ‘সেই মুহূর্তে আমার একমাত্র ইচ্ছা ছিল এক গ্লাস পানি পান করা! আমার মনে হচ্ছিল, পানির তৃষ্ণায় আমি অচিরেই মারা যাব!’

সামনে তাকিয়ে সে দেখল হাজার হাজার মানুষের ভিড়! এরপর হঠাৎ করে প্রচন্ড আগুন লেগে যায়! আফদিচ ঠিক মনে করতে পারছে না, কখন সে আহত হয়ে গিয়েছে! সবকিছু ছিল বিশৃঙ্খল—আহতদের গগনবিদারী চিৎকার, অন্ধকারের মধ্যে পড়ে থাকা মানুষের লাশ আর লাশ!

অনেক সময় পর হঠাৎ যখন আফদিচের হুঁশ ফিরে আসে তখন তার দেহে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে, ডান হাত ও পিঠে আগুনে পোড়ার মত! বাতাসে গুলির গন্ধ ছড়াচ্ছিল। প্রাণঘাতী গুলি এত কাছ থেকে ছোঁড়া হচ্ছিল যে, নির্মমভাবে মানুষের ভিড় কে করে দিচ্ছিল ছিন্নভিন্ন! আহত মানুষগুলো অসহনীয় যন্ত্রণায় একে একে মারা যাচ্ছিল!

ঘন কুয়াশার মধ্যে আফদিচ কাছে থাকা কিছু সৈন্যের আওয়াজ শুনতে পায়। একজন প্রশ্ন করল, ‘দেখো, কেউ বেঁচে আছে কিনা?’ অন্যজন নির্বিকার কণ্ঠে বলল, ‘সবাই মৃত!’ এরপর কিছুক্ষণ সুনসান নীরবতা। তারপর সৈন্যদের গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল।

একটু দূরে আফদিচ দেখতে পেলো একজন ব্যক্তি এখনও কিছুটা নড়াচড়া করছে! আফদিচ তাকে আস্তে করে ডেকে বললো, ‘তুমি কি ঠিক আছো?’ সে উত্তর দিলো, ‘আমি ঠিক আছি! তুমি এসে আমার বাঁধন খুলে দাও!’ আফদিচ ফিসফিস করে বলল, ‘আমি পারব না… আমি পারব না!’ ওদিকে তার কণ্ঠস্বর ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছিল।

দীর্ঘ সময় পর অবশেষে আফদিচ নিজের সর্বশক্তি নিয়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে সেই ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে গেল। সে অস্বাভাকিভাবে বেঁচে গিয়েছিল! কারণ, সে অন্যান্য লাশের নিচে চাপা পড়ে গুলি থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। আফদিচ তার বাঁধা রশি খোলার মত কিছু পাচ্ছিল না। অবশেষে ব্যথাক্রান্ত শরীর নিয়েই আফদিচ দাঁত দিয়ে এক এক সুতা করে তার বাঁধা রশি কাটতে শুরু করল!

সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর লোকটি দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। আফদিচ ছিলেন মারাত্মক আহত ও রশি দিয়ে বাঁধা। পুরুষ আর কিশোরদের লাশের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে হামাগুঁড়ি দিয়েই তার পাশে গিয়েছিলেন। কিছু কিছু লাশ তখনো উষ্ণ ছিল।

তারা গাছের মাঝে লুকানো একটি কংক্রিটের ড্রেনে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে লোকটি আফদিচের হাতের বাঁধন খুলে দিলেন এবং তাকে কাঁধে তুলে নিলেন। যখন ওই ব্যক্তি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, তখন আফদিচ শুয়ে শুয়ে এক ইঞ্চি করে এগোতে থাকলেন।

সেই জঙ্গলে তারা বন্য আপেল খেয়ে বেঁচে ছিলেন। আফদিচ ছিলেন ক্লান্ত ও রক্তাক্ত। তিনি লোকটির কাছে বারবার অনুরোধ করতেন, ‘অনুগ্রহ করে আমাকে ছেড়ে দাও! নিজেকে বাঁচাও!’ কিন্তু ওই ব্যক্তি সবসময় তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করতেন!

কয়েক দিন ধরে তারা সার্বিয়ান সৈন্যদের টহল এড়িয়ে থাকতে ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গোপনে চলাচল করছিলেন। তারা বসনিয়ানদের পুড়িয়ে ফেলা বাড়িঘর আর অবশিষ্ট ধ্বংসস্তুপের মধ্য দিয়ে চলছিলেন, যে গ্রামগুলো আরও কয়েক বছর আগে ধ্বংস করা হয়েছে।

চলতে চলতে আফদিচ প্রতিবার ক্লান্ত হয়ে পড়লে ওই ব্যক্তি পরের টিলার দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে বলতেন, ‘শুধু ওই টিলাটি! তারপর আমরা বিশ্রাম করব!’

অবশেষে তারা তুজলার নিকটবর্তী বসনিয়ান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছান। আফদিচের অবস্থা ছিল প্রায় প্রাণহীন। পরবর্তীতে তিনি স্মরণ করে বলেন, ‘তখন কেউ আমার ওপর পানি ঢেলে দিলো! আমি যখন বুঝতে পারলাম, ‘আমি বেঁচে গেছি’ তখন আমি কেঁদে দিলাম!’

মিসিচের বেঁচে ফেরার গল্প

মিসিচ, যিনি তার স্রেব্রেনিৎসার ফ্ল্যাটে আক্রমণের সময় বেঁচে গিয়েছিলেন এবং তার দুই ভাই হাসান (৩৬) ও সাফওয়াত (৩৪) কে সাথে নিয়ে ১১ জুলাই ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে পালিয়ে আসা দলে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের বাবা-মা তখনই জাতিসংঘের ঘাঁটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

পালিয়ে আসা এই দলটি এক দুই দিন হেঁটে হেঁটে সম্ভবত সার্বিয়ার সীমান্তবর্তী জভর্নিক পৌরসভায় ক্যামিনিকা গ্রামের কাছাকাছি গিয়েছিল। এবং সেখানেই তারা সার্ব সেনাদের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন।

ক্যামিনিকা ছিল স্রেব্রেনিৎসা থেকে পালানোর পথে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী স্থানগুলোর একটি। সেখানে সার্ব সৈন্যরা বড় বড় ফাঁদ পেতে রেখেছিল এবং শত শত মানুষকে হত্যা করেছিল।

তাদের ওপর বৃষ্টির মত গুলি ছোঁড়া হয়। হাসান দুই হাতেই গুলিবিদ্ধ হয়। বিশৃঙ্খলার মধ্যেই মিসিচ ও তার ভাইয়েরা অবিচল থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সময়ে এসে মিসিচ তার ভাইদের হারিয়ে ফেলেন। এবং সে বেঁচে যাওয়া ছোট আরেকটি দলের সাথে যোগ দেয়। তারা বেশ কয়েকজন আহতদের নিয়ে ঝোঁপঝাড়ের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলেন। এক সময় বৃষ্টি শুরু হয়। তাদের জন্য সেই বৃষ্টি ছিল বড় পাওয়া! কারণ, বৃষ্টির শব্দে তাদের পা ফেলার আওয়াজ ঢেকে যাচ্ছিল।

পথে মিসিচের সাথে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দেখা হয়। যার নাম তার নিহত ভাই হাসানের নামের মতোই, হাসান। ‘তখনই আমি কিছুটা নিরাপত্তা বোধ করলাম! কারণ, আমি আর একা ছিলাম না।’

তবে মিসিচ, হাসান এবং তাদের দল আবারও গোলাগুলির মুখে পড়ে। ক্যামিনিকার ওপরের ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া সংকীর্ণ পথগুলো প্রশস্ত সড়কের সাথে গিয়ে মিলেছে। হাজার হাজার ব্যর্থ মানুষ এ পথ অতিক্রম করেছে। স্থানীয়রা এই পথের নাম দিয়েছিল ‘তেরলা’। মৃত্যু দিয়ে খোদাই করা একটি করুণ পথ!

সার্বিয়ান সেনারা সেখানে অপেক্ষায় ছিল। তারা কিছু মানুষকে যেতে দিয়েছিলো, তারপর মুহুর্মুহু গুলি চালিয়েছিলো। মিসিচ তখন সেখানে হাসানের সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

মিসিচ বলেন, ‘সেখানে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল। এখনও আমার কানে তাদের গুলির কার্তুজ পাল্টানোর শব্দ আসে! তখন হাসান আহত হয়েছিল। হাসান অনুনয় করে বলল, ‘অনুগ্রহ করে, আমাকে ছেড়ে যেও না!’

মিসিচ বলেন, ‘আমি শেষ পর্যন্ত তার কথা রক্ষা করতে পারিনি!’ তবে শেষ পর্যন্ত দুজনই বেঁচে যান।

জুতার ফিতার জন্য আকুতি

তারা যখন তুজলা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ব্রেজিক গ্রামে গিয়ে পৌঁছালো, তখন মিসিচের জুতার অবস্থা ছিল একেবারেই নাজুক। সে ছেঁড়া মোজা পরেই হাঁটছিল, তার পা পুঁজে ফুলে গিয়েছিল। তার কাছে বন থেকে সংগ্রহ করা কিছু বুনো নাশপাতি ছিল। এগুলো এমন ছিল যে, পশুরাও খেতে চাইত না! কিন্তু আমরা চরম ক্ষুধার্ত ছিলাম। আমি এগুলো ফেলতে পারিনি!

মিসিচ ও তার বন্ধু ভাবছিলেন, তারা নিরাপদ জায়গার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। হঠাৎ তখন চারপাশে গুলি চলতে শুরু করল! মিসিচ তার বন্ধুকে বলল, ‘আমরা অনেকদূর চলে এসেছি, কিন্তু আমি জানি না, এবার আর বাঁচতে পারব কিনা!’

একটু দূরেই একটি বাড়ির ছাদের ওপর সার্বীয় সৈন্যরা অবস্থান করছিল। তখন মিসিচ ও তার বন্ধু লম্বা ঘাসের উপরে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে লাগল। এরপর তারা সার্বিয়ান সেনাবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত পরিখায় পড়ে গেল!

সেখানে তারা দুজন আহত বসনিয়ান পুরুষ এবং মুসা নামের একটি ১৬ বছর বয়সী ছেলের সাথে সাক্ষাৎ হয়। মুসার এক পা আহত ছিল। মুসা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার কাছে জুতার ফিতা আছে? বা আমার পা বাঁধার মত কিছু আছে আপনারেদ কাছে?’ মিসিচ উত্তর দিলো, ‘তুমি মনে করেছো, আমার কাছে ফিতা আছে! আমার কাছে তো জুতাও নেই!’

তীব্র ব্যথা ও ভয়ে মুসা চিৎকার করে সার্ব সেনাদের ডেকে বলতে লাগল, ‘আমি আহত! এসো, আমাকে সাহায্য করো!’ সার্ব সেনারা বলল, ‘প্রথমে তোমার অস্ত্র ফেলে দাও!’ মুসা বলল,  ‘আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই! আমি তো বাচ্চা এক ছেলে!’

মিসিচ বলেন, ‘মুসা এখনও ভাবছিল কেউ তাকে সাহায্য করবে! কিন্তু কেউ আসেনি। সেখানেই মুসাকে হত্যা করা হয়। এবং তার লাশ সেখানে পড়ে থাকে।’

সেসময় মিসিচ ও হাসান জীবন বাঁচাতে গোলাগুলির মধ্যেই পালাতে লাগল! হামলার এরিয়া থেকে অনেক দূরে গিয়ে তারা থামল। মিসিচ বলেন, ‘আমার হাতে তখনও নাশপাতি ছিল।’ রাত নামতেই তারা সিদ্ধান্ত নিল, আবার যাত্রা শুরু করার আগে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।

হঠাৎ প্রায় ৩০ মিটার দূরে তারা এক সেনার আওয়াজ শুনতে পান, যিনি তাদের দিকে হাত নেড়ে ডাকছিলেন। মিসিচ বলল, ‘সে হয়ত আমাদের দলের কেউ!’ হাসান জবাব দিল, ‘তুমি মজা করছ? এ তো চেতনিক!’ (চেতনিক হলো সার্বীয় জাতীয়তাবাদী বা আধাসামরিক যোদ্ধা)

মিসিচ আরও বলল, ‘যদি সে চেতনিক হত তাহলে এভাবে হাসত না.. সে তখনই গুলি ছুঁড়ত!’ কিন্তু হাসানের সন্দেহ কাটল না। মিসিচ আবার বলল, ‘সে হাসছে, কোন শত্রু এমনটা করবে না! পরে হাসান সৈন্যের পাশে থাকা তার বন্ধু সাকিবকে চিনে ফেলল। এরা আমাদের সেনা! এরা বসনিয়ান!”

ব্রেজেক শহরের ভূখণ্ড ছিল দুর্গম এবং বিভক্ত। তারা বুঝতেই পারেনি যে তারা বসনিয়া-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চলে এসেছে। তারা দৌড়ে বসনিয়ান সেনাদের কাছে গেল। সেনারা তাদের রুটি দিলো। তারা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলো।

বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা

দিন দিন লুকিয়ে থাকা, পালিয়ে বেড়ানো আর গণহত্যার দৃশ্য দেখার পর আফদিচ ও মিসিচও বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা প্রজাতন্ত্রের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পৌঁছালো। কিছুদিন পরে মিসিচ তার বাবা-মার সাথে আবার তুজলায় মিলিত হন। তারা তার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন!

আহত আফদিচ, যিনি সার্বদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা দিয়ে তাদের ধ্বংস করা গ্রাম, পরিখা ও গণকবর পার হয়ে এক নিরাপদ স্থানে পৌঁছেন। এরপর গ্রামবাসীরা তার ওপর পানি ঢেলে দিলো, তখন তিনি প্রথমবারের মতো কেঁদে ফেলেন! ‘সেই সময় বুঝেছিলাম, আমি বেঁচে গিয়েছি!’

অন্যদিকে বেকতিচ বুটোচারি থেকে একটি বাসে করে তিস্কা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে শহরের একটি দলের সাথে তুজলার নিকটবর্তী কালাদানি এলাকায় পৌঁছেন। বেকতিচ বলেন, ‘যদিও আমি বড় এক দলের সাথে ছিলাম, তবুও নিজেকে একেবারে একা অনুভব করতাম! কিন্তু আমি বেঁচে গিয়েছি!’

২০০৪ সালে প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত সিদ্ধান্ত দেয় যে, স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ড একটি গণহত্যা। দুই সার্বীয় নেতা, রাডোভান কারাদিচ এবং রাতকো মালাদিচকে গণহত্যার জন্য আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে কারাদিচকে এবং মালাদিচকে ২০১৭ সালে।

২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক আদালত স্রেব্রেনিৎসার ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ঘোষণা করেন যে সার্বিয়া এই গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।

১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৮ হাজারেরও বেশি বসনীয় পুরুষ ও কিশোর গণহত্যার শিকার হয়। তাদের মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলতে বহু গণকবর খনন করা হয়েছিল। এর মধ্যে অনেকগুলো কবর পরবর্তীতেও নতুন করে খনন করা হয়।

সে সময় ২৫ হাজারেরও বেশি নারী ও শিশুকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল। রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির (আইসিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ২৫ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হন। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে; কারণ, অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি প্রকাশ করেননি।

২০০৬ সালে বসনিয়া প্রথম যুদ্ধকালীন যৌন নির্যাতনের শিকারদের আইনি স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে যৌন সহিংসতায় জন্ম নেওয়া শিশুদেরকে ২০২২ সালে এসে আইনি স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

আজ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি পরিবার তাদের প্রিয়জনদের লাশ পাওয়ার অপেক্ষায় আছে, যাতে তারা তাদের যথাযথভাবে দাফন করতে পারেন। যাদের লাশ পাওয়া যায়, তাদেরকে বুটোচারি এলাকায় দাফন করা হয়।

গণহত্যা নথিভুক্তকরণ

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আফদিচ হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার দোষীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য দেন। এর পরই তিনি ও তাঁর বোন বসনীয় ভাষায় ‘আমি হেগের সাক্ষী’ নামে একটি বই লেখেন। বইটি ইতিমধ্যে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে এবং বর্তমানে এর আরবি অনুবাদের কাজ চলছে। 

আফদিচ তাঁর বাবা, তিন চাচা, এক ফুফু ও তিন চাচাতো ভাইসহ অনেক আত্মীয়কে হারিয়েছেন। তাঁর মা তিমা ও তিন বোন বেঁচে আছেন। যে পারিবারিক ছবিগুলো তাঁর ব্যাগে ছিল, তা আর ফিরে পাননি। বর্তমানে তিনি স্রেব্রেনিৎসাতেই বসবাস করছেন।

অন্যদিকে মিসিচ তাঁর চার ভাই-বোনকে হারিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন হাসান ও সাফওয়াত। তাঁরা মিসিচের সঙ্গেই পালিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি তাঁর মায়ের পরিবারের ২৪ জন আত্মীয়কেও হারান। পরে সার্ব বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে হাসান নিহত হন। তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর বুটোচারি কবরস্থানে দাফন করা হয়। সাফওয়াত এখনো নিখোঁজ। মিসিচ বর্তমানে সারায়েভোতে শিক্ষকতা করছেন। প্রতিবছর তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের স্রেব্রেনিৎসা ও বুটোচারি স্মৃতিসৌধে নিয়ে যান। 

আর বেকতিচ হারিয়েছেন তাঁর প্রায় ১০ জন আত্মীয়কে। এর মধ্যে রয়েছেন তাঁর বাবা রজব (যাঁর মরদেহ কামিনিকা-জভর্নিকের একটি গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল), তাঁর চাচা এবং তাঁর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া দুই চাচাতো ভাই। তিনিও এখন সারায়েভোতে থাকেন। তিনি ‘এক নিঃসঙ্গ ভোর’ নামের একটি বই লিখেছেন, যা ইতিমধ্যে ইংরেজি ও তুর্কি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা 

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন