আল জাজিরার কলাম

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি যেভাবে ট্রাম্পের উপরই উল্টে দিলেন আহমাদ আশ শারা 

আহমাদ আশ-শারার দৃঢ়, স্পষ্ট ও অনমনীয় অবস্থান ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে কার্যত বানচাল করে দিয়েছে।
আহমাদ আশ শারা

লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর পরিবর্তে সিরিয়ার সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দামেস্ক থেকে বৈরুত হয়ে ওয়াশিংটন পর্যন্ত এই বক্তব্য নিয়ে নানারকম প্রশ্ন উঠেছে। কী কারণে ট্রাম্প এমন একটি অবাস্তব প্রস্তাব উত্থাপন করলেন? অথবা সিরিয়াকে লেবাননের সাথে জড়িয়ে ফেলার উদ্দেশ্যই বা কী? অথচ রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন।

জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েলের চেয়ে সিরিয়া এই কাজটি ভালোভাবে করতে পারবে। সে কারণেই তিনি নাকি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনীর পরিবর্তে সিরিয়াকে এই দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু এই যুক্তি মূলত তার অদূরদর্শিতা এবং সিরিয়া ও লেবানন উভয় দেশের প্রতি অবজ্ঞাকেই প্রকাশ করে। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস, বিশেষত আসাদ শাসনামলের বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর প্রতি তার অজ্ঞতাকেও তুলে ধরে।

প্রত্যাখ্যানের সুর

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মধ্যে অনেকেই মার্কিন কূটকৌশলের প্রতিফলন দেখতে পান। বিশেষ করে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক সম্পাদিত হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র যেন নতুন সিরিয়াকে আরও বিস্তৃত আকারে আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনার অংশ করে তুলতে চায়।

বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতিও অনেকটা সে দিকেই ইঙ্গিত করে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে সাজাতে চায়, যাতে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের হাশদ আশ-শাবি এবং অনুরূপ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব কমে আসে। 

তবে মার্কিন এই পরিকল্পনার বিপরীতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আশ-শারার বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি লেবাননে যেকোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এমন পদক্ষেপ সিরিয়াকে এক গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে। লেবানন সংকটে জড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে নতুন সিরীয় প্রশাসন পূর্ণ সচেতন। ফলে তারা এব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়।

দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত কাটিয়ে ওঠা দেশটি নতুন কোনো সংঘাতের দ্বার খুলতে চায় না। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং সামাজিক নিরাপত্তার পুনরুদ্ধারই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

একই সুর ধ্বনিত হয়েছে লেবাননের পক্ষ থেকেও। বৈরুত ট্রাম্পের এই প্রস্তাবকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। লেবানন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্পূর্ণভাবে লেবানন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেছে, এটি সিরিয়াকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একটি অন্তহীন যুদ্ধে ঠেলে দেবে, যা আঞ্চলিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার পাশাপাশি লেবাননের অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি ও শান্তিকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে।

বিজ্ঞাপন

শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের বক্তব্য সমালোচনার মুখে পড়েছে। কয়েকজন সিনেটর এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় সিরিয়ার পক্ষে এমন ভূমিকা পালন করা আদৌ সম্ভব কি না। তারা ট্রাম্পের এই প্রস্তাবকে ‘বাস্তবতাবর্জিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েলও বিষয়টিকে স্বস্তির চোখে দেখেনি। দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক মহলের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আসাদ সরকারের পতনের পর নতুন সিরিয়ার প্রতি ইসরায়েলের যে গভীর অবিশ্বাস ও বৈরিতা রয়েছে, তা এখনও অব্যাহত। ফলে সিরিয়াকে এমন একটি ভূমিকায় দেখতে তারা প্রস্তুত নয়।

লেবাননের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের রূপরেখা

সিরিয়া, লেবানন এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তাতে এটি স্পষ্ট যে, লেবাননে সিরিয়ার যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত সংঘাতের জন্ম দেবে, যার আগুন দুই দেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দামেস্ক এখনও নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিকসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই ট্রাম্পের পাতা এই ফাঁদে পা দেওয়ার কোনো অবকাশ সিরিয়ার নেই।  

আহমদ আশ-শারা ইতোমধ্যে নতুন সিরিয়ার সাথে লেবাননের সম্পর্কের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তার প্রশাসন লেবাননের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক ও ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। হিজবুল্লাহ অতীতে আসাদ সরকারের পক্ষে যুদ্ধ করে সিরিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও, তার প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো ইচ্ছা আপাতত তাদের নেই। বরং তারা দুই দেশের বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জটিলতাগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন।

ট্রাম্পের হিসাব-নিকাশ

ট্রাম্প হিজবুল্লাহকে দুর্বল বা নির্মূল করার মাধ্যমে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস করতে চান, যাতে তেহরানের সঙ্গে তার আলোচনার অবস্থান শক্তিশালী হয়। তার ধারণা, হিজবুল্লাহ ইরানি প্রভাবের সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাই এর শক্তি খর্ব করা অপরিহার্য।

সম্ভবত ট্রাম্প মনে করেছেন, সিরিয়ার নতুন প্রশাসন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে এবং হিজবুল্লাহর চলাচল সীমিত করেছে। এই সাফল্য ট্রাম্পকে উৎসাহিত করেছে। লেবাননের অভ্যন্তরে হিজবুল্লাহর সমকক্ষ কোনো শক্তি না থাকায় তিনি সিরিয়াকে এই দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন, কারণ সিরিয়ার সঙ্গে লেবাননের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং ঐতিহাসিক প্রভাবেরও কিছু বিষয় আছে।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারকরাও লেবানন প্রশ্নে নতুন কোনো কৌশল খুঁজছেন বলে মনে হয়। সিরিয়া ও লেবাননবিষয়ক মার্কিন দূতদের বক্তব্যেও তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মার্কিন বিশেষ দূত টম বারাক একবার মন্তব্য করেছিলেন, ‘হিজবুল্লাহর অস্ত্র প্রশ্নের সমস্যার সমাধান না হলে লেবানন অস্তিত্ব সংকটে পড়বে এবং আবার বৃহত্তর বিলাদুশ-শামের অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

চাপ সৃষ্টির কৌশল

সম্ভবত ট্রাম্প নিজেও জানেন যে, সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক এবং ইরানসহ প্রায় সব আঞ্চলিক শক্তিই তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবে। তবুও তিনি এটিকে একটি চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। যাতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষকেই যুদ্ধবিরতি এবং একটি স্থায়ী নিরাপত্তা চুক্তিতে আসতে বাধ্য করা যায়।

এমনও হতে পারে, নেতানিয়াহুর ক্রমাগত যুদ্ধংদেহী অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল ট্রাম্পের উদ্দেশ্য। কারণ লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযান আলোচনার পথকে জটিল করে তুলছে। তাই ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি হিজবুল্লাহর অস্ত্র সমস্যা সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং একটি অর্থহীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। তাই আহমাদ আশ শারা কে দায়িত্ব দেওয়াই ভালো।

পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্প সিরিয়ার নতুন প্রশাসনকে মার্কিন আঞ্চলিক স্বার্থের সমীকরণ ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার বানাতে চান, যাতে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত সুবিধা লাভ করতে পারে। তবে ট্রাম্পের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ মোটেও মসৃণ নয়। আহমাদ আশ-শারার দৃঢ়, স্পষ্ট ও অনমনীয় অবস্থান ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে কার্যত বানচাল করে দিয়েছে।

আল জাজিরা আরবি থেকে অনূদিত

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন