আল জাজিরার বিশ্লেষণ

এরদোগানের ক্রমবর্ধমান ইসরায়েল বিরোধী বক্তব্য কি দুদেশের যুদ্ধ অনিবার্য করে তুলছে?

এরদোগানের এই বক্তব্য কেবলই বাগাড়ম্বর বা রাজনৈতিক অলংকার ছিল না। তুরস্ক যে বেশ কিছুদিন ধরেই তার নিরাপত্তা কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনছে, এটি ছিল তারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এ আই নির্মিত ছবি
এ আই নির্মিত ছবি

গত ১০ জুন, জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সংসদীয় দলের বৈঠকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের দেওয়া বক্তৃতা সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তুর্কি প্রজাতন্ত্রের ১০৬ বছরের ইতিহাসে এর আগে কোনো রাষ্ট্রপতি দেশের নিরাপত্তা নিয়ে এমন স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষায় কথা বলেননি। 

ভাষণে তিনি বলেন: ‘সিরিয়া ও লেবানন তুরস্কের ভ্রাতৃপ্রতীম দেশ। দামেস্ক ও বৈরুত হলো ইস্তাম্বুলের সহোদর নগরী। তুরস্কের নিরাপত্তা শুধু হাতায় (তুর্কি সীমান্ত) থেকে শুরু হয় না; বরং এর সূচনা হয় আলেপ্পো, দামেস্ক এবং বৈরুত থেকে। আমাদের ভাইদের দেশে কোনো ধরনের জোরপূর্বক একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া আমরা বরদাশত করব না; এবং তাদের ওপর কোনো আগ্রাসনও সহ্য করব না।

আজ যারা তাদের ভাড়াটে অনুসারীদের লেলিয়ে দিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে ফাঁকা হুমকি দিচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য আমাদের অজানা নয়। তথাকথিত ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’র এই অহেতুক উন্মাদনার শেষ গন্তব্য কী, তাও আমরা জানি। আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা কখনোই তা বাস্তবায়িত হতে দেব না। আমি স্পষ্টভাবে বলছি, কেউ যেন এই জায়নবাদী খুনী চক্রের দালালি করার দুঃসাহস না দেখায়। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে যদি তুরস্ক কিংবা তুর্কি সাইপ্রিয়টদের অধিকারে সামান্যতম হস্তক্ষেপও করা হয়, তাহলে আমাদের প্রতিক্রিয়া হবে সুস্পষ্ট এবং কঠোর।’

এই বক্তব্যের প্রভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। এমনকি একই দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত নই।’ এরপর তিনি এরদোগানের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করে মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যান।

প্রকৃতপক্ষে, এরদোগানের এই বক্তব্য কেবলই বাগাড়ম্বর বা রাজনৈতিক অলংকার ছিল না। তুরস্ক যে বেশ কিছুদিন ধরেই তার নিরাপত্তা কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনছে, এটি ছিল তারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

প্রকৃতপক্ষে, এরদোগানের এই বক্তব্য কেবলই বাগাড়ম্বর বা রাজনৈতিক অলংকার ছিল না। তুরস্ক যে বেশ কিছুদিন ধরেই তার নিরাপত্তা কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনছে, এটি ছিল তারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

এরদোয়ানের বক্তব্যের আগের দিন, ৯ জুন, তার জোটসঙ্গী ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টির নেতা দেভলেত বাহচেলি সংসদে গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন: ‘এই ইস্যুটি হরমুজ প্রণালী থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর, লেবানন থেকে সিরিয়া, উত্তর ইরাক থেকে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগর থেকে সাইপ্রাস পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল নিরাপত্তা সমীকরণ। এর পরিধি সমুদ্রের বাণিজ্যিক পথ থেকে শুরু করে তেল-গ্যাস ক্ষেত্র, পানি নিরাপত্তা অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ লাইন পর্যন্ত বিস্তৃত। ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, জাতিগত ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে উসকে দিতে এই চক্র বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। বর্তমান সামরিক গতিবিধি ও সংকটের শিরোনাম দিয়ে এই সমীকরণকে বিচার করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’

অতীতে তারা ‘সাইকস-পিকট’ চুক্তির মাধ্যমে আমাদের ভূগোলের ধমনী কেটে দিতে চেয়েছিল। ‘বেলফোর ঘোষণা’ দিয়ে ফিলিস্তিনের বুকে বিষাক্ত বীজ বপন করেছিল। ‘সেভ্রে চুক্তি’ দিয়ে তুর্কি জাতির কাফন বোনার চেষ্টা হয়েছিল। মুসেল থেকে কিরকুক, আলেপ্পো থেকে জেরুজালেম, সাইপ্রাস থেকে পশ্চিম থ্রেস—আমাদের মাতৃভূমির প্রতিটি ইঞ্চি নিয়ে ষড়যন্ত্রের ছক কষা হয়েছিল। কিন্তু চক্রান্তকারীরা একটা বিষয় ভুলে গেছে: তুর্কি জাতিকে এত সহজে কোণঠাসা করা যায় না; গোটা বিশ্ব একাট্টা হয়ে দাঁড়ালেও তুর্কি জাতিকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব।’

বাহচেলির বক্তব্যের পরপরই, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অ্যাডমিরাল জাকি আকতুর্ক একটি যুদ্ধজাহাজে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে স্থিতিশীলতা নষ্ট করার সব প্রচেষ্টা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। দক্ষিণ সাইপ্রাসের গ্রিক প্রশাসন ও ফ্রান্সের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তুর্কি সশস্ত্র বাহিনী উত্তর সাইপ্রাস তুর্কি প্রজাতন্ত্রের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও সদিচ্ছা রাখে।

তুরস্কের নিরাপত্তা ধারণার পরিবর্তন

দীর্ঘদিন ধরে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি আতাতুর্কের বিখ্যাত ‘অহিংসা নীতি’ দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। এই কারণে তুরস্ক তার আশেপাশের অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তুরস্ক উপলব্ধি করে যে, তার আশপাশে সংঘটিত ঘটনাগুলোর মূল্য তাকে বারবার চড়া দামে দিতে হয়েছে। একে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্য, বলকান ও ককেশাসের ঘটনাবলি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে এবং পরবর্তীকালে এই সক্রিয়তা আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

গত পাঁচ বছরে আঙ্কারা ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত অঞ্চলগুলোতে তার উপস্থিতি ও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। সিরিয়া ও ইরাকে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে তুরস্ক নিজ ভূখণ্ডের নিরাপত্তা-ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।

লিবিয়ার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেকে একজন প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নাগোরনো-কারাবাখ যুদ্ধে তুরস্কের পরোক্ষ ভূমিকা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছে। একই সাথে বলকান এবং আফ্রিকাতেও তুরস্ক তার সামর্থ্য অনুযায়ী অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে।

এসব পদক্ষেপ তুরস্কের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নীতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। আর গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা আঙ্কারাকে নতুন এক নিরাপত্তা কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

তুরস্কের দৃষ্টিতে ইসরায়েল এখন সরাসরি হুমকি

ইসরায়েলের লাগামহীন ও নৃশংস আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্য যখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, তখন তুরস্কের নীতিনির্ধারক ও জনসাধারণের মধ্যে এই আলোচনা প্রবল হচ্ছে যে, ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে খোদ তুরস্ক। কাতারের মতো একটি মধ্যস্থতাকারী ও শান্তিপূর্ণ দেশের ওপরও যখন ইসরায়েল চড়াও হতে পারে, তখন তারা যে কাউকেই লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে—এই ধারণা এখন তুর্কি সমাজে বদ্ধমূল।

তবে এই বিশ্বাস নিছক অনুমান থেকে জন্মায়নি; সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব ও ক্রমাগত বোমাবর্ষণ, লেবাননে আগ্রাসন এবং সবশেষে গ্রিস ও দক্ষিণ সাইপ্রাসের গ্রিক প্রশাসনের সাথে ইসরায়েলের সামরিক চুক্তিকে তুরস্ক জল ও স্থল পথে নিজেদেরকে অবরুদ্ধ করার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই তুরস্ক ইসরায়েলি সম্প্রসারণ ঠেকানোর চেষ্টা করছে। এমনকি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আঞ্চলিক জলসীমার বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেও আঙ্কারা শিগগিরই জবাব দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা সীমান্ত এখন অনেক দূর বিস্তৃত

সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, তুরস্কের জন্য নিরাপত্তার সংজ্ঞা এবং হুমকির সীমানা এখন আর প্রথাগত ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের লেবানন ফ্রন্ট, ভূমধ্যসাগরের সাইপ্রাস দ্বীপ, মাগরিব অঞ্চলের লিবিয়া, ককেশাসের কারাবাখ পর্বতমালা, বলকানের বসনিয়া ও কসোভো, উত্তরের কৃষ্ণ সাগর এবং আফ্রিকার সোমালি উপকূল—এই সমস্ত অঞ্চল এখন তুরস্কের নতুন নিরাপত্তা মানচিত্রের অংশ।

এসব অঞ্চলে কোনো ভারসাম্য পরিবর্তনকারী পদক্ষেপ তুরস্ক তার নিজস্ব স্বার্থ ও নিরাপত্তার ওপর হুমকি হিসেবে গণ্য করবে এবং প্রয়োজনে তার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না।

স্বভাবতই, কিছু দেশ তুরস্কের এই নীতিকে ‘আগ্রাসী ও প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ হিসেবে দেখছে, যার শীর্ষে রয়েছে ইসরায়েল। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো তুরস্ককে একটি ‘সম্ভাব্য শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে চিত্রিত করতে শুরু করেছে। ইউরোপের ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, গ্রিস ও দক্ষিণ সাইপ্রাসও একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। যদিও স্পেন, ইতালি, ব্রিটেন, ক্রোয়েশিয়া ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী।

সব মিলিয়ে বলা যায়, তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা এখন আর কেবল কূটনৈতিক বাকযুদ্ধের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর এক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই দ্বন্দ্ব কোন দিকে গড়ায়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ শক্তির এই সংঘাতের গল্প মাত্র শুরু হলো।

সূত্র: আল জাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে অনুবাদ।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন