সারায়েভো অবরোধ ছিল বসনিয়া যুদ্ধের (১৯৯২-১৯৯৬) সময় বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোর উপর বসনীয় সার্ব বাহিনীর চালানো প্রায় ৪৩ মাসব্যাপী এক ভয়াবহ অবরোধ, যা আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে কোনো রাজধানী শহরের দীর্ঘতম অবরোধ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯২ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এই অবরোধে প্রায় ১১,০০০ মানুষ নিহত হয়, যাদের মধ্যে ১,০০০ এরও বেশি ছিল শিশু। এবং এটি যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন ও জাতিগত সংঘাতের এক মর্মান্তিক অধ্যায়ও বটে।
সারায়েভো এই চার বছরব্যাপী অবরোধের যে অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছে, সেটা ১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসার ভয়াবহ গণহত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই হত্যাযজ্ঞে আট হাজারেরও বেশি বসনীয় মুসলিম পুরুষ, শিশু ও নারী শহিদ হন, যাকে ইউরোপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কিন্তু আজ যে তথ্য সামনে আসছে, তাতে মনে হচ্ছে এই ট্র্যাজেডি আসলে ছিল এক দীর্ঘ ও ভয়াবহ অন্ধকার ইতিহাসের একটি অধ্যায় মাত্র। সেই ধারাবাহিকতা এখনও শেষ হয়নি, স্মৃতিগুলো এখনও রক্তাক্ত। আর সেই শুকনো ক্ষতগুলোর মাঝেই ভেসে উঠছে এক অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় অপরাধের ছায়া, যা পরে পরিচিতি পায় ‘স্নাইপার ট্যুরিজম’ নামে। তিন বছর আগে এই শব্দটি প্রথম শোনা গেলেও আজ তা মানব বিবেকের গালে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত হিসেবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ফিরিয়ে আনছে সারায়েভোর আকাশজুড়ে আতঙ্কের কালো ছায়া হয়ে নেমে আসা সেই দিনগুলোর স্মৃতি।
গত নভেম্বর মাসে ইতালির মিলান শহরের প্রসিকিউটর অফিস একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু করেছে। কিছু বিত্তশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগে বলা হয়, শখের বশে মানুষ মারার নেশায় তারা যুদ্ধের সময় সার্বিয়ায় যেত। সেখানে সার্ব সেনাদের প্রহরায় মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সারায়েভোর নিরস্ত্র মুসলিম নাগরিকদের ওপর তারা স্নাইপিং বা লক্ষ্যভেদ প্র্যাকটিস করত। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সফরগুলো ছিল এক ধরণের পেইড এন্টারটেইনমেন্ট বা বিনোদনমূলক ভ্রমণ। একটি সুস্থ পৃথিবীতে এমনটা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। নিরপরাধ মানুষের শরীরকে যারা স্রেফ লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল, তাদের সেই ঠান্ডা মাথার মরণখেলার বলি হয়েছিলেন প্রায় ১১ হাজার বসনীয় নাগরিক।
এই ভয়ঙ্কর অভিযোগগুলো থেকে প্রমাণিত, কীভাবে একজন বসনীয় শিশু, নারী কিংবা পুরুষ কেবল বিত্তশালীদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। যারা কেবল নিজের লক্ষ্যভেদের দক্ষতা যাচাই করতে বা বিকৃত লালসা মেটাতে সেখানে যেত, তাদের কাছে সেই মানুষগুলোর জীবনের কোনো মূল্য ছিল না। সারায়েভোর সেই দুঃসময়ে একজন বসনীয় নাগরিক ছিলেন কেবল একটি চলন্ত লক্ষ্যবস্তু, যারা কেবল বেঁচে থাকার জন্য ছুটছিলেন।
’সারায়েভো সাফারি’: যেখান থেকে শুরু পর্দার আড়ালের সেই পৈশাচিকতা
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই ‘হিউম্যান সাফারি’ বা মানুষ শিকারের সেই অন্ধকার গল্পের প্রথম সূত্রপাত ঘটে, বিগত কয়েক দশক ধরে যা কেবল ফিসফাস আকারে শোনা যেত। তখন বসনীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকা সমাজের তথাকথিত ভদ্র ও সফল ব্যবসায়ী কিছু ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ্যে আসে। তারা ছিল দূরদেশ থেকে আসা খুনি, যারা সার্ব সেনা ও ভাড়াটে যোদ্ধাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নব্বইয়ের দশকের যুদ্ধের অন্যতম ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধে অংশ নিয়েছিল।
সেই সময় সারায়েভোতে ‘আল জাজিরা ডকুমেন্টারি ডেইজ’-এ প্রথম প্রদর্শিত হয় ‘সারায়েভো সাফারি’ নামক একটি ডকুমেন্টারি। আল জাজিরা বলকানসহ একাধিক অংশীদারের সহযোগিতায় প্রযোজিত এবং স্লোভেনিয়ান ফিল্ম সেন্টারের সহায়তায় নির্মিত পরিচালক মীরান জুপানিচ-এর এই ডকুমেন্টারি দর্শকদের জন্য ছিল নৈতিক ও মানবিক দিক থেকে এক গভীর ধাক্কা। এতে দেখানো হয় কীভাবে ইউরোপের ধনী ব্যক্তিরা সার্ব সৈন্যদের টাকা দিয়ে বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় মানুষ শিকারের তথাকথিত অধিকার কিনে নিয়েছিল।

পরিচালক জুপানিচ বলেন, যখন তিনি প্রথম এসব গল্প শোনেন, তখন বিশ্বাসই করতে পারেননি যে, মানুষের মনে এত বিশাল পরিমাণ ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতা বাস্তবে থাকতে পারে। ইউরোপীয় বিত্তশালীদের হাতে নিহতরা কেবল সাধারণ নাগরিক ছিলেন, যারা বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা হয়ে উঠেছিলেন বিনোদনের খোঁজে আসা বিদেশি স্নাইপারদের একেকটি শিকার।
এই ডকুমেন্টারিতে তুলে ধরা হয় আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে দীর্ঘতম অবরোধ হিসেবে পরিচিত সারায়েভো অবরোধের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। এতে দেখানো হয় কিছু ইতালীয় ধনকুবের সার্ব সেনাদের ক্যাম্পে গিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দিত কেবল স্নাইপিংয়ের আনন্দ উপভোগ করার জন্য। তাদের কাছে যুদ্ধ ছিল একটি মঞ্চ আর বসনীয় নাগরিকরা ছিল সেই মঞ্চের নিষ্প্রাণ পুতুল।
ডকুমেন্টারিটি প্রকাশের পরপরই ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ২০২২ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে। তবে রাজনৈতিক জটিলতা আর যুদ্ধের পুরোনো ক্ষতের কারণে প্রায় তিন বছর ধরে সেই তদন্তের কোনো দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়নি। তবে গল্পটি সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। দীর্ঘদিন ধামাচাপা পড়ে থাকার পর মিলান প্রসিকিউটর অফিসের হাত ধরে এই ফাইলটি পুনরায় উন্মোচিত হয়েছে। এবার তদন্তটি নতুন মোড় নিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করছে।
৩০ বছর পর বিচারের ডাক
চলতি বছরের নভেম্বর মাসে ইতালীয় সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক ইজিও গাভাজিনি মিলানের পাবলিক প্রসিকিউটরের দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি নিজের দেশের একাধিক নাগরিকের বিরুদ্ধে সারায়েভো অবরোধ চলাকালে নিষ্ঠুরতা ও ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। এই অভিযোগ হঠাৎ করে উত্থাপিত হয়নি। সাবেক সারায়েভো সিটি মেয়র বেনিয়ামিনা কারিচের দেওয়া নথির ওপর ভিত্তি করেই গাভাজিনি মামলাটি প্রস্তুত করেন। এই প্রসঙ্গে কারিচ গত আগস্ট মাসে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারণ, ২০২২ সালে একই নামের একটি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তিনি ‘সারায়েভো সাফারি’ নামের সেই ভয়াবহ মানব-শিকারের কাহিনি শুনে গভীরভাবে নাড়া খান।
কারিচ বলেন, মানুষকে যে জঙ্গলে-সাফারিতে শিকার করা প্রাণীর মতো তাড়া করা হয়েছিল, এই ধারণা তিনি কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারেননি। তার মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিত ও অর্থায়িত একটি সংগঠিত অপরাধ। একজন আইনজীবী, একজন নাগরিক এবং পরে একজন মেয়র হিসেবে নিজের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পাবলিক প্রসিকিউশনের কাছে অভিযোগ দাখিল করেন। পরবর্তীতে আমেরিকান ফায়ার ফাইটার জন জর্ডানের সাক্ষ্যও এতে যোগ করা হয়, যিনি জাতিসংঘ বাহিনীর হয়ে কাজ করার সময় বিদেশি শিকারিদের অবরুদ্ধ সারায়েভোতে আসার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। হেগের (নেদারল্যান্ডসের গুরুত্বপূর্ণ শহর) আন্তর্জাতিক বিচার আদালত তার এই সাক্ষ্যকে নিজেদের নথিতে স্বীকৃতি দিয়েছে।
চলতি বছর কারিচ সারায়েভোতে অবস্থিত ইতালীয় দূতাবাসের মাধ্যমে মামলার পুরো ফাইলটি ইতালীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। এর ফলে তদন্তটি এখন মিলানে স্থানান্তরিত হয়েছে। সেখানে প্রসিকিউশনের ইতালির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নথি ও সাক্ষীদের অ্যাক্সেস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সাবেক মেয়র কারিচ নিজের সাক্ষ্য দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের ওপর গুলি চালানোর জন্য টাকা দেওয়ার মতো পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে কোনো সভ্য দেশ চুপ থাকতে পারে না।’
তিনি আরও জানান, বসনিয়া ও ইতালির সরকারের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। যাতে ইতালীয় হোক বা বিদেশি— যেকেউ এই অপরাধে জড়িত থাকলে তাকে চিহ্নিত করা যায়।
তবে ন্যায়বিচারের পথ মোটেও সহজ নয়। গাভাজিনি জানান, বসনিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে তিন বছর আগে তদন্তটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর সার্বিয়াতে তো এই ফাইল খোলা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই গাভাজিনি ইতালীয় বিচার ব্যবস্থাকেই একমাত্র ভরসা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ‘আমরা এমন সব বিত্তশালীদের কথা বলছি যারা ট্রিয়েস্টে থেকে মানুষ শিকার করতে যেত এবং ফিরে এসে এমন ভাব করত যেন কিছুই হয়নি।’ তিনি ধারণা করেন, অন্তত ১০০ থেকে ২০০ ইতালীয় নাগরিক এই নৃশংসতায় সরাসরি জড়িত ছিল। এছাড়া আরও কিছু বিদেশীও এতে যুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন রুশ লেখক এদুয়ার্দ লিমোনভ, যাকে ভিডিও ফুটেজে সারায়েভোর পাহাড়ি এলাকা থেকে বেসামরিক মানুষের দিকে গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে।
উল্লেখ্য, ট্রিয়েস্টে ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক শহর, যা ইতালি, স্লোভেনিয়া ও অস্ট্রিয়ার সংস্কৃতির এক মিলনস্থল।
ফ্যাসিবাদী আবরণে এলিট-শ্রেণী
গাভাজিনি ও সাবেক মেয়রের ভাষ্যমতে, অভিযুক্তরা মূলত উগ্র ডানপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী ধনী ব্যক্তি। তারা ইতালির ট্রিয়েস্টে থেকে সারায়েভোর পাহাড়ি অঞ্চলে যেত কেবল মানুষ মারার রোমাঞ্চ নিতে। সূত্র জানায়, এই ধনীরা ডেথ-সাফারি বা মরণখেলায় অংশ নিতে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করত, যার পরিমাণ ছিল ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ইউরো পর্যন্ত। এমনকি শিকারের ধরন অনুযায়ী দামের তারতম্য হতো; পুরুষ বা নারীর চেয়ে শিশুদের মারার মূল্য ছিল অনেক বেশি। যেন একটি শিশু বা নারীর জীবন কোনো তালিকার সংখ্যা মাত্র, রক্ষা পাওয়ার মতো কোনো প্রাণ নয়। এখানে মানুষের প্রাণ ছিল স্রেফ কেনাবেচার পণ্য।
‘সারায়েভো সাফারি’ ডকুমেন্টারিতে সাক্ষ্য ও নথিপত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে, ডেথ-সাফারিতে অংশগ্রহণকারীরা কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে আসেনি; বরং তাদের একমাত্র তাড়না ছিল উত্তেজনা বা অ্যাডভেঞ্চার। অবরোধ চলাকালে বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো প্রকৃতপক্ষেই যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু এর সঙ্গে যখন হত্যা-পর্যটনের উপাদান যুক্ত হয়, তখন তা পরিণত হয় ইতিহাসের এক জঘন্যতম বাণিজ্যে— যেখানে কোনো বৈধ সামরিক লক্ষ্য ছাড়াই নিরীহ মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয় কেবল প্রাণঘাতী বিনোদনের জন্য।
এই এলিট স্নাইপাররা মূলত সেসব রাস্তায় ওত পেতে থাকত, যেখান দিয়ে বসনিয়ার সাধারণ মানুষ খাবার বা পানি সংগ্রহের জন্য যাতায়াত করতেন। সেসব রাস্তা পার হওয়ার সময় তারা বিত্তশালী শিকারিদের গুলিতে মুহূর্তেই প্রাণ হারাতেন বা আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতেন। গবেষণা বলছে, প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১৫ জন মানুষ স্নাইপারদের শিকারে পরিণত হতেন। কেউ নিহত, কেউবা গুরুতর আহত। আর সারায়েভোতে নিহত মোট শিশুদের ১০ শতাংশই মারা গেছে এই স্নাইপারদের গুলিতে। আধুনিক ইতিহাসে এর চেয়ে জঘন্য অপরাধ ও ভয়াবহ পরিসংখ্যানের নজির মেলা ভার।
শিশু, নারী ও পুরুষ – সবাই যখন সমানভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তখন এই অপরাধগুলো রূপ নেয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে নৃশংস উদাহরণে। এখানে মানুষের যন্ত্রণা হয়ে ওঠে পণ্য, যার মূল্য নির্ধারিত হয় বয়স ও লিঙ্গের ভিত্তিতে। এই অপরাধগুলোর পেছনে একটি সাম্প্রদায়িক দিকও ছিল। কারণ, এতে মুসলিমরাই ছিল প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ফলে এই ঘটনাগুলো কেবল পাশবিকতাই নয়; বরং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানুষের মর্যাদাকে লুণ্ঠন করার এক জঘন্য বহিঃপ্রকাশ।
বৈশ্বিক ব্যর্থতা ও গণমাধ্যমের নীরবতা
এই নৃশংস অপরাধগুলোর প্রায় ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতিসংঘের কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যেন মানবতার বিবেক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। একটি জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো ইতিহাসের জঘন্যতম ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃশ্য উপেক্ষা করে চলেছে বিশ্ব। বিত্তশালী স্নাইপারদের হাতে বসনিয়ার মানুষ যখন নিছক খেলনায় পরিণত হয়েছিল, তখনও তথাকথিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার বুলি আওড়ানো বৈশ্বিক সংগঠনগুলো তাদের চিরাচরিত নীরবতায় চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
এই আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা কেবল উপেক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পরিকল্পিত মিডিয়া ব্ল্যাকআউট। এই ভয়াবহতাগুলোকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, যেন বেসামরিক মানুষের জীবন নথিভুক্ত করার বা বলার মতো কোনো মূল্যই রাখে না। এই বিশ্ব কেবল তাই দেখে, যা তার রাজনৈতিক সমীকরণ ও স্বার্থের অনুকূলে যায়। আর তাদের রাজনীতি ও স্বার্থের আড়ালে চাপা পড়ে যায় হাজারো নিরপরাধ মানুষের পবিত্র জীবন।
সারায়েভোর এই উপেক্ষাকে আজকের গাজা, আল-ফাশের, সানা, দামেস্ক, বাগদাদ, লিবিয়া বৈরুত ও আরাকানের বাস্তবতা থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একচোখা দৃষ্টিতে দেখা বিশ্বের সামনে সে একই যন্ত্রণা, একই রক্তপাত বারবার ফিরে আসে, কিন্তু তা তাদের তথাকথিত মানবাধিকার সত্তাকে নাড়া দেয় না। পশ্চিমের দ্বিচারিতা ও সিলেক্টিভ জাস্টিস বা বেছে বেছে ন্যায়বিচার করার প্রবণতা এখানেও স্পষ্ট। মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো দেশগুলোর আসল চেহারা সারায়েভোর পাহাড়ে ভালোভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
অনুপস্থিত ন্যায়বিচার: দায় কার?
এই বিশ্বাসঘাতকতার পুরো দায় শুধু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাঁধে চাপিয়ে দিলে সত্যের একটি দিক অস্বীকার করা হবে। বসনিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থাও এই দীর্ঘ নীরবতার জন্য দায়ী। নিজ দেশের মানুষের হাহাকার, নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ কেন এতদিন তাদের কানে পৌঁছেনি, সেই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
পুরো তিন দশক কেটে গেছে। এই সময়ে প্রমাণ জমা হয়েছে, একের পর এক সাক্ষ্য মিলেছে, অপরাধের বেদনাদায়ক জটগুলো খুলে গেছে, তবুও কেন সেই ফাইলগুলো ধুলোধূসরিত অবস্থায় পড়ে ছিল? দীর্ঘ সময় ধরে অসহায় অপেক্ষা, কয়েকজন ধনীর বিকৃত শখের বলি হয়ে যাওয়া হাজারো বসনীয় মানুষের জীবন হত্যাকাণ্ড বা পঙ্গুত্বে শেষ হলেও, তা কোনো মামলায় রূপ নেওয়ার যোগ্য নয়, এমনকি বিবেক দিয়ে পড়ার মতো একটি লাইনও নয়! কেন স্বজাতিদেরও এত অবহেলা? হাজারো মানুষের রক্ত আর মায়েদের চোখের পানির কি কোনো মূল্য নেই?
তিন বছর আগে নীরবতায় আঘাত করা সেই ডকুমেন্টারি যদি না আসত, তবে হয়তো এই ইতিহাস চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যেত। সেই ডকুমেন্টারিটিই প্রথম আশার আলো দেখায়। কিন্তু বিচারের গতি যেন ভুক্তভোগীদের যন্ত্রণার চেয়েও ধীর, মায়েদের দীর্ঘশ্বাসের তুলনায় আরও ভারী। মনে হচ্ছে কেউ একজন চাইছে এই সত্যগুলো কবরেই রয়ে যাক।
এদিকে মিলান যদি নতুন করে তদন্ত শুরু না করত, তবে হয়তো এই সত্য চিরতরেই হারিয়ে যেত। এটি বসনীয় কর্তৃপক্ষের অক্ষমতা বা নীরব সম্মতির এক চরম দৃষ্টান্ত। যেন তারা মেনে নিয়েছিল, তাদের সন্তানদের রক্ত প্রশ্নহীনভাবে বাতাসে লেগে থাকুক কোনো জবাব ছাড়াই, কোনো জবাবদিহি ছাড়াই। এমনকি ত্রিশ বছরের অপেক্ষার তিক্ততা লাঘব করার মতো ন্যায়বিচারের একটি শব্দ ছাড়াই।
শেষ সুযোগ
আজ যখন মিলান থেকে ন্যায়বিচারের দাবি উঠছে, তখন মনে হচ্ছে ইতিহাস আরও একবার সুযোগ দিচ্ছে। বসনিয়া সরকারের কাছে এটি সম্ভবত শেষ সুযোগ তাদের হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের, ভেঙে পড়া ন্যায়বিচারের কাঠামো কিছুটা হলেও জোড়া লাগানোর।
বর্তমানে যা ঘটছে, তা কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, এটি সত্যের লড়াই। বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার লড়াই—
সারায়েভোর রাস্তায় যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তারা আজও বিচার চাইছেন। তারা এখনও অপেক্ষায় আছেন তাদের হত্যাকারীদের নাম প্রকাশের, তাদের অপ্রকাশিত গল্পগুলো সত্যের আলোতে বলার; ফিসফিসে গুজব কিংবা ক্ষণস্থায়ী কোনো প্রামাণ্যচিত্রে নয়।
বর্তমানে ব্যাপক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার আগ্রহ থাকা এই তৎপরতায় এখন প্রশ্ন হলো: বসনিয়া কি এই লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে? তারা কি তাদের নাগরিকদের নৈতিক ঋণ শোধ করবে? তারা কি পারবে অবশিষ্ট সুযোগটুকু কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মর্যাদা কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করতে? কোনো কন্ঠস্বর ছাড়া, আইনজীবী ছাড়া, আশ্রয় ছাড়া তিন দশক ধরে একা ফেলে রাখা সন্তানদের সামনে নৈতিক দায়মোচনের এই সুযোগ কি কাজে লাগাবে বসনিয়া? নাকি আবারও নীরব থেকে নিজেদের অপমানিত করবে?
যদিও অনেক দেরি হয়ে গেছে, তবুও এই তদন্তটি বসনিয়ার জন্য নিজের দিকে তাকানোর একটি সুযোগ। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার, তারা কি কেবল শিকার হয়েই থাকবে নাকি অধিকার আদায়কারী হিসেবে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াবে? যথোপযুক্ত প্রমাণ ও সাক্ষ্যসমেত, এমনকি অপরাধে জড়িত নিজেদেরই কিছু লোকের ভেতর থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দৃঢ় কণ্ঠে নিজেদের অধিকার আদায়ের এখনই সময়।
বসনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই মামলায় শক্তভাবে যোগ দেয়, তবে সেটি হবে এক ঐতিহাসিক প্রায়শ্চিত্ত। ইউরোপীয় আদালতে জমা দেওয়া প্রতিটি নথি আর প্রতিটি সাক্ষ্য হবে সেই দীর্ঘ খামখেয়ালি ও ব্যর্থতার ইতিহাসের বিরুদ্ধে এক একটি প্রতিবাদ। পাশাপাশি নিজেদের দীর্ঘ নীরবতার পাপমোচনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ, যা তিন দশক ধরে একপাশে হেলে থাকা ন্যায়বিচারের পাল্লায় কিছুটা হলেও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে।
আর যদি তারা আবারও পিছিয়ে যায় বা দ্বিধায় পড়ে, তবে সেটি হবে সেই একই বেদনাদায়ক দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি, ভুক্তভোগীদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ইতিহাস বসনিয়াকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিয়েছে তার কলঙ্ক মোছার, এখন দেখার বিষয় তারা এই সুযোগ গ্রহণ করে কি না।
আরবি থেকে অনূদিত














