দীর্ঘ ৩০ মাস ধরে চলা যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে গাজা আজ এক বিধ্বস্ত জনপদ। ইরান বনাম ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সেই ‘চল্লিশ দিনের যুদ্ধে’ গাজার আলাদা কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। আসলে গাজা ততদিনে মৃত্যু আর ধ্বংসস্তূপের নিচে এতটাই পিষ্ট যে, বড় কোনো লড়াইয়ে শামিল হওয়ার মতো শক্তি তাদের অবশিষ্ট ছিল না। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের যে আগুন ছড়িয়েছে, এটি ছিল তার শুরু মাত্র, তবে নিশ্চিতভাবেই শেষ নয়।
যুদ্ধের শুরু থেকেই একটি বিষয় পরিষ্কার ছিল, গাজা উপত্যকাকে এই বৃহত্তর আঞ্চলিক লড়াইয়ের বাইরে রাখতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি বিশেষ তৎপরতা চলছিল। আরও স্পষ্টভাবে বললে, পরিস্থিতিকে ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের সেই স্থবির অবস্থায় আটকে রাখার এক নিরন্তর চেষ্টা দেখা গেছে।
তবে ইসরায়েলি অভিধানে ‘স্থিতাবস্থা’ বলতে আদতে কিছু নেই। ফিলিস্তিনিদের ওপর তাদের দখলদারিত্বের প্রতিটি দিন মানেই নতুন কোনো হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসলীলা আর বসতি সম্প্রসারণ। গাজায় যুদ্ধের তীব্রতা হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু রক্তপাত থামেনি। গাজা, পশ্চিম তীর এবং অধিকৃত জেরুজালেমে দখলদারদের তণ্ডবলীলা চলছেই। ফিলিস্তিনের প্রতিটি প্রান্তে জনজীবন আজ শ্বাসরুদ্ধকর।
বর্তমানে রাজনৈতিক যোগাযোগগুলো নিছক লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। ‘রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’ এখনো টিকে আছে—কেবল এটুকু প্রমাণ করতেই যেন দায়সারা কিছু আলাপ-আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ শেষ হলেও দ্বিতীয় ধাপের শুরুতে এসে সব তৎপরতা যেন পুরোপুরি থমকে গেছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যু বিশ্বমঞ্চের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে। পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে সংহতি সমাবেশ আর গণমাধ্যমের গুটিকয়েক বিশেষ বুলেটিন না থাকলে বোঝার উপায় থাকতো না যে—গাজা, জেরুজালেম কিংবা পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি কতটা দুঃসহ হয়ে উঠেছে।
ফিলিস্তিনি ও তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের মনে এই নীরবতা এখন গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের ভয় হচ্ছে, গত দুই বছরের যে মানবিক বিপর্যয় আর সাহসিকতার গল্প বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে ছিল, তা কি তবে গুরুত্ব হারাচ্ছে? একদিকে জাতিগত নিধন ও উচ্ছেদের ট্র্যাজেডি, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের মহাকাব্য—সবই কি তবে আঞ্চলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে হারিয়ে যাবে?
উপেক্ষা ও স্থবিরতার মাঝে গাজা
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে টানা দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্ব এখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই যুদ্ধবিরতি কেবল মূল তিন পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইরানের ভাষায় ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স)-এর প্রতিটি অংশের জন্যই এই চুক্তি কার্যকর হবে। বিশেষ করে লেবাননের জন্য এটি এক বিশাল স্বস্তি; কারণ সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি আবারও এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, যা ২০০৬ সালের জুলাই যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের সেই ৬৬ দিনের রক্তক্ষয়ী স্মৃতিকে নতুন করে উসকে দিয়েছিল।
তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, ইরানের ‘১০ দফা’ কিংবা আমেরিকার ‘১৫ দফা’—কোনো উদ্যোগেই গাজার পরিস্থিতির কোনো উল্লেখ নেই। অথচ যুদ্ধরত পক্ষগুলো এই পয়েন্টগুলোকেই ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’র মূল ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। গত ১০ এপ্রিল আলোচনার প্রথম পর্ব কিছুটা হোঁচট খেলেও বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে দ্বিতীয় পর্বের অপেক্ষায় আছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া এই সংলাপ একটি টেকসই ও চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত দুই মাস ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচিত সেই ‘২০ দফার গাজা শান্তি উদ্যোগ’ নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা নেই। অথচ প্রস্তাবটি প্রকাশের পরপরই তা নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবে রূপান্তরিত হয়। এমনকি রাজনৈতিক এবং সংবাদমাধ্যমের আলোচনা থেকে হারিয়ে গেছে ‘ওয়ার্ল্ড পিস কাউন্সিল’-এর নামও। খোদ ট্রাম্প এই কাঠামোটিকে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। গাজাকে ঘিরে এই রহস্যজনক নীরবতা এবং শান্তি প্রস্তাবগুলোর হঠাৎ আড়ালে চলে যাওয়া কি নতুন কোনো সংকটের পূর্বাভাস? এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
অনেকেই আশা করেছিলেন, পারস্য উপসাগরের দুই তীরে শান্তি ফেরাতে ‘ওয়ার্ল্ড পিস কাউন্সিল’ বা বিশ্ব শান্তি পরিষদ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কারণ, এই যুদ্ধের তিন প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ—পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্কের শীর্ষ নেতারাই ছিলেন এই কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কিন্তু প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যবধান ঘুচিয়ে সংস্থাটি আজ যেন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। সম্ভবত এর পেছনে এক পরিকল্পিত কৌশল কাজ করছে। আর সেটা হলো, যুদ্ধের এই মহাপ্রলয়ের আড়ালে গাজাকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে রাখা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে পুরোপুরি হিমাগারে পাঠিয়ে দেওয়া।
বিশ্ব শান্তি পরিষদে গাজার প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ মাঝে মাঝে কিছু বিচ্ছিন্ন বৈঠক করছেন বা বিবৃতি দিচ্ছেন। তিনি না থাকলে আজ গাজার যুদ্ধ কিংবা শান্তি নিয়ে কথা বলার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হতো।
আসলে বিশ্বের নজর এখন অন্যদিকে। সবাই যেন এই যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপরই সব বাজি ধরে বসে আছে। বর্তমান পরিস্থিতি কারোরই অজানা নয়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগামহীন শক্তির দাপট আর উন্মাদনা ফিলিস্তিনিদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। তাদের সামনে এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। ইসরায়েলিরা ঠিক যতটুকু এবং যেভাবে চাইবে, তিলমাত্র হেরফের না করে হয়তো সেই ‘সমাধান’ই এখন ফিলিস্তিনিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হবে।
চারদিকে যখন যুদ্ধের দামামা আর চরম উত্তেজনা, ঠিক তখনই শোনা যাচ্ছে ভিন্ন এক সুর। বিশ্ব শান্তি পরিষদে গাজার প্রতিনিধি ও ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের সাবেক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ সম্প্রতি একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছেন। উদ্দেশ্য, অক্টোবরের চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন করা। তবে এই প্রস্তাব গাজার মানুষের জন্য সত্যিই কোনো আশা বয়ে আনবে, নাকি এটিও নিছক এক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
নিকোলাই ম্লাদেনভের খসড়া প্রস্তাবের শুরুতেই জুড়ে দেয়া হয়েছে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের কঠোর শর্ত। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ইসরায়েল যে চুক্তির প্রথম ধাপ বারবার লঙ্ঘন করেছে এবং গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়টি সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে । এমনকি গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা থেকে দখলদার সেনা সরানোর বিষয়েও নেই কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাপটকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর একটি একতরফা ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
বাস্তবতা হলো, গাজার সীমান্ত পথগুলো এখনো রুদ্ধ; কাটেনি দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। এমনকি মুমূর্ষু রোগীরাও চিকিৎসার জন্য উপত্যকা ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, গাজার জন্য প্রস্তাবিত ‘টেকনোক্র্যাট’ সরকার ইসরায়েলি ‘ভেটো’র কারণে উপত্যকায় প্রবেশই করতে পারেনি। ফলে এটি কার্যত একটি ‘নির্বাসিত সরকারে’ পরিণত হয়েছে, যার কোনো প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা কার্যকারিতা নেই।
যুদ্ধবিরতির এই ছয় মাসেও সাড়ে সাতশর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। দখলদার বাহিনী তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ অতিক্রম করে গাজার আরও অন্তত ৫ শতাংশ এলাকা নতুন করে দখল করে নিয়েছে। চুক্তিতে নির্ধারিত ত্রাণের অর্ধেকেরও কম (মাত্র ৪০ শতাংশ) ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে নির্বিচারে অপহরণ ও গ্রেপ্তার। এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের মদদপুষ্ট মিলিশিয়াদের লেলিয়ে দিয়েছে, যাতে তাদের তথাকথিত ‘নৈতিক সেনাবাহিনী’ যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছিল, এই ভাড়াটে বাহিনী তা চূড়ান্ত করতে পারে। অথচ ম্লাদেনভ সাহেবের নজর এই মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নেই; তাঁর সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রে এখন কেবল প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে সেই ‘চল্লিশ দিনের যুদ্ধের’ ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময় সবসময় এই বর্বরতা ও আধিপত্যকামী শক্তির অনুকূলে থাকে না। আঞ্চলিক শান্তি আলোচনার টেবিলে ফিলিস্তিন আজ দৃশ্যত অনুপস্থিত থাকলেও, নিজের ভাগ্য বদলানোর সক্ষমতা ফিলিস্তিনিরা এখনো হারিয়ে ফেলেনি।
ইসলামাবাদ আলোচনার মূল সূচিতে ফিলিস্তিন ইস্যু সরাসরি না থাকলেও ৭ অক্টোবর-পরবর্তী পরিস্থিতি একটি সত্যকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে। আর তা হলো, ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে এই অঞ্চলে টেকসই শান্তি বা স্থিতিশীলতা অসম্ভব।
ফিলিস্তিন সমস্যাকে আড়ালে রেখে আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে চেষ্টা, তা কখনোই সফল হবে না। বিশেষ করে তথাকথিত ‘সভ্যতার সংঘাত’ আর নির্মূলের তত্ত্বে ভর করে যে চরম ফ্যাসিবাদী ও বর্ণবাদী ঢেউ উঠেছিল, তা এখন ভাঙতে শুরু করেছে।
থমকে যাওয়া পরিস্থিতি ও ফিলিস্তিনি ঐক্যের সংকট
পরবর্তী কোনো ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আরব এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর এখন একটিই লক্ষ্য— কীভাবে এই ‘ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি’কে একটি ‘সুদৃঢ় ও চূড়ান্ত শান্তিতে’ রূপ দেওয়া যায়। তবে এই পথটি যে অসংখ্য সংশয় আর পাহাড়সম চ্যালেঞ্জে ঘেরা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এত সব প্রতিকূলতার মাঝেও আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে ‘মধ্যস্থতাকারী ত্রয়ী’র (পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্ক) পুনরায় সক্রিয়তা। তাদের পেছনে আটটি আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রের জোটের (G8) যে জোরালো সমর্থন রয়েছে, তা শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কায়রো ও আঙ্কারার ঐকান্তিক সহযোগিতায় পাকিস্তানি কূটনীতি যেভাবে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি অর্জনে সফল হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এদিকে দোহা যুদ্ধের ছাই ঝেড়ে ফেলে আবারও চিরচেনা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ফিরতে শুরু করেছে।
তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সেই স্থবিরতা কাটানো, যা যুদ্ধের এই কয়েক সপ্তাহে তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। এই জড়তা ফিলিস্তিনি রাজনীতির দুই প্রধান পক্ষ—ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (ফাতাহ) এবং হামাস—উভয়কেই সমানভাবে গ্রাস করেছে।
আজ যখন একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি—অন্তত ন্যূনতম কিছু সাধারণ দাবির ভিত্তিতে হলেও—দুর্ভাগ্যবশত সেই সম্ভাবনা এগিয়ে যাওয়ার বদলে যেন আরও পিছিয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ৭ অক্টোবর থেকে আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিন ইস্যুটি যেসব ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, তা অভ্যন্তরীণ বিভেদ কমানোর বদলে ফাটলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এমন অবস্থায় এখন কেবল একনিষ্ঠ ফিলিস্তিনি কর্মী এবং তাঁদের অকৃত্রিম বন্ধুদের ওপরই ভরসা রাখা যায়। তাঁরাই পারেন একটি অভিন্ন ও শক্তিশালী ফিলিস্তিনি অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে, যা ফিলিস্তিনের জাতীয় ও ইসলামি আন্দোলনের মধ্যকার এই দুর্ভাগ্যজনক দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে সক্ষম হবে।
গাজার আকাশ যখন যুদ্ধের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, দখলদার ইসরায়েল তখন এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। তাদের হিসাব-নিকাশে ভূমি দখল, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ আর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি উপড়ে ফেলার চেয়ে বড় কোনো অগ্রাধিকার নেই। যুদ্ধের ডামাডোলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের সাথে সাথে তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ (ইয়েলো লাইন) সম্প্রসারিত করেছে, যাতে এই বিধ্বস্ত উপত্যকায় একটি স্থায়ী সীমান্ত রেখা চাপিয়ে দেওয়া যায়। তারা একদিকে প্রতিরোধ যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের ওপর সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে গাজা পরিচালনার জন্য গঠিত ‘জাতীয় কমিটি’কে উপত্যকায় ফিরতে বাধা দিয়ে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভূমিকাকে পুরোপুরি স্থবির করে দিয়েছে।
পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনের ‘তাণ্ডব’ থেমে নেই। এলাকা ‘সি’ এবং ‘বি’-এর বড় অংশ গিলে খাওয়ার পর দখলদারদের কুদৃষ্টি এখন এলাকা ‘এ’-এর ওপর। উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডব আর জেরুজালেমকে অবরুদ্ধ করে রাখার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের জীবনকে করে তোলা হয়েছে দুর্বিষহ। ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা একযোগে ৩৪টি নতুন বসতি স্থাপনের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার অনেকগুলোই পশ্চিম তীরের একেবারে অভ্যন্তরে অবস্থিত।
তবে নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী সরকার সবচেয়ে বিপজ্জনক চালটি চেলেছে আল-আকসা মসজিদ নিয়ে। ইসলামের প্রথম কিবলা টানা ছয় সপ্তাহ ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে, যা এর ইতিহাসে দীর্ঘতম এবং এক নজিরবিহীন ঘটনা। এর পাশাপাশি, ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর ও অমানবিক আইনও পাস করেছে তারা।
সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, এসব চরম উস্কানির বিপরীতে ইসরায়েলকে কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে যেমন কোনো জোরালো গণআন্দোলন গড়ে ওঠেনি, তেমনি আরব বা মুসলিম বিশ্ব থেকেও আসেনি কোনো কার্যকর প্রতিরোধ। আন্তর্জাতিক মহলের এই রহস্যজনক নীরবতা ইসরায়েলকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে এবং তাদের পরবর্তী ঔপনিবেশিক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে বাড়তি সাহস জোগাচ্ছে।
এখন যেহেতু অন্তত ইরান সীমান্তে কামানের গর্জন স্তিমিত হয়েছে, তাই ফিলিস্তিনিদের জন্য এটাই উপযুক্ত সময় নিজেদের অবহেলা আর বিস্মৃতির ধুলো ঝেড়ে ফেলার। বর্তমানের এই স্থবিরতা কাটিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেই লড়াইয়ের পথ হতে হবে অটল ধৈর্য, ইস্পাতকঠিন সংকল্প এবং সব ধরনের কার্যকর প্রতিরোধের এক সুসমন্বিত রূপ।
সূত্র : আরবি থেকে অনূদিত













