সুদমুক্ত আফগানিস্তান

সুদ বর্জনের অর্থনৈতিক ধাক্কা কতটা সামলাতে পারবে তালেবান ?

সুদ বন্ধ হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংক নিয়ে ভীতি কেটেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরায় আমানত রাখার পরিমাণও আগের চেয়ে বাড়তে শুরু করেছে।
ChatGPT Image May 16, 2026, 09_05_33 PM

অর্থনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল আফগানিস্তান। বিশ্বজুড়ে প্রচলিত সুদি ব্যবস্থাকে বিদায় জানিয়ে দেশটি এখন প্রবেশ করেছে সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের যুগে। 

২০২৫ সালের শেষভাগে এসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে—আফগানিস্তান এখন পুরোপুরি সুদমুক্ত একটি দেশ। কাবুল ব্যাংকসহ দেশের সবকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন আর গতানুগতিক সুদি ব্যবস্থায় চলছে না; বরং পরিচালিত হচ্ছে ইসলামি শরিয়াহর পরিপূর্ণ নীতিমালা মেনে।

মুরাবাহা, মুশারাকা কিংবা ইজারা—এই শব্দগুলো এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। আফগানিস্তানের ব্যাংকগুলো এখন সরাসরি এই শরিয়াহভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে লেনদেন করছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানিয়েছেন, ‘সুদি প্রথার দিন এখন শেষ।’

মজার বিষয় হলো, সুদ বন্ধ হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংক নিয়ে ভীতি কেটেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরায় আমানত রাখার পরিমাণও আগের চেয়ে বাড়তে শুরু করেছে।

২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে এই নতুন যাত্রার শুরু। ২০২২ সালে পুরো অর্থনীতিকে ইসলামি মডেলে রূপান্তরের কাজ শুরু হলেও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার চাপ।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। স্বাধীনতার পর আফগানিস্তানের ওপর যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেটিই মূলত এই আমূল পরিবর্তনের পথকে প্রশস্ত করেছে। বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যোগসূত্র না থাকায় কোনো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বাধা ছাড়াই অভ্যন্তরীণভাবে এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বিশ্ববাজারের সাথে তাল মেলাবে কীভাবে?

প্রশ্ন উঠতে পারে, বর্তমানের এই সুদনির্ভর বিশ্বব্যবস্থায় একটি দেশ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে কতটা টিকে থাকতে পারবে? বিশেষ করে চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে আফগানিস্তানের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে কৌতুহল থাকাটাই স্বাভাবিক। তামা, লিথিয়াম আর সোনার মতো বিপুল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার রয়েছে আফগানিস্তানে; যা কিনতে চীন মুখিয়ে আছে। বিনিময়ে তারা দিচ্ছে দেশ পুনর্গঠনের ভারী যন্ত্রপাতি আর শক্তিশালী অবকাঠামো।

বাস্তবতা হলো, আফগানিস্তান এখন আর কোনো আন্তর্জাতিক সুদি ঋণ গ্রহণ করছে না। বরং তারা লেনদেনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে হাঁটছে। চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য চলছে মূলত ‘নগদ বিক্রয়’ এবং খনি উত্তোলনের ক্ষেত্রে ‘লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি’র (Profit and Loss Sharing) ভিত্তিতে। অর্থাৎ, এখানে ব্যাংক ঋণের চেয়ে সরাসরি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অবশ্য চীনের কাজে যে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, তার কারণ মূলত তাদের চিরাচরিত সতর্কতা। বেইজিং প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত হিসাব কষে এগোয় এবং বর্তমানে চীন নিরাপত্তার অজুহাতে কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে।

আফগানিস্তানের এই উদাহরণ আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সদিচ্ছা থাকলে একটি দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি বদলে ফেলা যায়। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে বড় পরিসরে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। 

কাবুলের এই উদ্যোগ মূলত একটি ‘ইসলামি সাধারণ বাজার’ (Islamic Common Market) গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে এমন একটি অর্থনৈতিক জোট গঠন করতে পারে, তবেই এই সুদমুক্ত ব্যবস্থা বিশ্বমঞ্চে এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। 

আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা থেকে সামষ্টিক স্বপ্নের পথে

আফগানিস্তানের এই বাস্তবমুখী অর্জন—বিশ্বজুড়ে বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও—একটি বড় প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। প্রশ্নটি হলো: কেন এখন পর্যন্ত সুদনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো একটি শক্তিশালী ‘ইসলামি অর্থনৈতিক ব্লক’ গড়ে তোলা সম্ভব হলো না?

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান দীর্ঘ দিন ধরে এই অভাবটি পূরণের কথা বলছেন। ২০২৫ সালের ইস্তাম্বুল সম্মেলনেও তিনি মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর জোর দাবি জানান। এরদোগান একটি রূঢ় সত্য আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন—বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতিতে মুসলিমদের অবদান মাত্র ১০ শতাংশের আশেপাশে। যদিও ২০২৫ সাল নাগাদ ইসলামি অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, কিন্তু সুদভিত্তিক বিশাল বিশ্ববাজারের তুলনায় এই সংখ্যাটি এখনো নগণ্য। সুদের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক সংকট থেকে মুক্তি পেতে একটি নৈতিক ও শক্তিশালী ‘ইসলামি বিকল্প’ আজ সময়ের দাবি।

১৯৬৯ সালে জাতিসংঘের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন’ (OIC)। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশক পার হলেও এই জোটের কার্যক্রম যেন স্থবির হয়ে আছে। সংস্থার সদর দপ্তর এবং এর পরিচালনাকারী পক্ষগুলোর সদিচ্ছা ও সক্ষমতার অভাবকে এই ব্যর্থতার বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে এই জোটের সদস্য দেশগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি জোটটিকে পঙ্গু করে রেখেছে। ‘ইসলামি সাধারণ বাজার’ গড়ার আলোচনা কেবল টেবিল বৈঠকেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সংকীর্ণ নিজস্ব স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে খোদ মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হচ্ছে।

আক্ষেপের বিষয় হলো, উপসাগরীয় দেশগুলো মুসলিম বিশ্বের ভেতরে বিকল্প বাজার থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল রপ্তানি করছে অমুসলিম দেশগুলোতে এবং বিনিময়ে সেখান থেকেই উৎপাদিত পণ্য আমদানি করছে। এছাড়া বৈশ্বিক ‘সুইফট’ (SWIFT) সিস্টেমের ওপর এই দেশগুলোর প্রবল নির্ভরশীলতা মূলত এক প্রকার লজ্জাজনক পরাধীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে।

অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো ঋণের জালে পিষ্ট হচ্ছে। পাকিস্তানের মতো দেশগুলো যখন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, তখন অনেক ক্ষেত্রে ধনী মুসলিম দেশগুলোও নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উচ্চ শুল্ক ব্যবস্থার চাপে দরিদ্র দেশগুলোর নাভিশ্বাস উঠলেও তা শেষ পর্যন্ত কারোরই কোনো দীর্ঘমেয়াদি উপকার বয়ে আনছে না।

সময়ের কিছু জরুরি প্রশ্ন

একটি কঠিন সত্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে আফগানিস্তান। তারা প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা থাকলে কেবল গুটিকয়েক ‘ইসলামি উইন্ডো’ বা ‘মুরাবাহা’ চুক্তির ওপর নির্ভর না করে একটি রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য পূর্ণাঙ্গ ইসলামি অর্থব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এর অর্থনৈতিক সুফলও এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাস্তব। এই প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের জন্য নিচের প্রশ্নগুলো তোলা এখন সময়ের দাবি:

  • অভ্যন্তরীণ রূপান্তরে দ্বিধা কেন: যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি মডেল রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য কল্যাণকর বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেখানে অন্য মুসলিম দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি এই মডেলে রূপান্তর করতে কেন এখনো দ্বিধাবোধ করছে? কেবল নামমাত্র কিছু ইসলামি সেবা চালু রাখাই কি যথেষ্ট?
  • ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা ও অনীহা: তুলনামূলকভাবে ধনী মুসলিম দেশগুলো কেন এখনো ডলারের আধিপত্যের কাছে নতিস্বীকার করে আছে? নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো এবং যৌথ শিল্পায়নের মাধ্যমে কেন তারা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয় তৈরিতে অনীহা দেখাচ্ছে?
  • নৈতিক বিকল্প নাকি শক্তিশালী প্রতিযোগী?: লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগিভিত্তিক (Profit and Loss Sharing) এই অর্থনীতি কেন এখনো কেবল একটি ‘নৈতিক বিকল্প’ হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে? অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের সমন্বয় থাকলে এটি বিশ্বের বুকে একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক মডেলে পরিণত হতে পারত। কেন সেই সুযোগ বারবার হাতছাড়া করা হচ্ছে?

মুক্তির লড়াইয়ে ঐক্যই শেষ কথা

আফগানরা আবারও একটি ধ্রুব সত্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করেছে—সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও স্থানীয় পর্যায়ে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে এই সাফল্যকে কেবল একটি দেশের গণ্ডিতে আটকে না রেখে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর সামষ্টিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় রূপ দিতে হলে প্রয়োজন অটুট ঐক্য এবং সর্বাত্মক কাঠামোগত সংস্কার।

এখন বড় প্রশ্নটি হলো—যে উম্মাহকে পবিত্র কোরআনের সরাসরি নির্দেশে সুদ বর্জনের আদেশ দেওয়া হয়েছে, তারা কি এই অনিবার্য মুক্তির লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে? নাকি তারা সেই পুরনো সুদনির্ভর ব্যবস্থার কক্ষপথেই ঘুরপাক খেতে থাকবে, মহাজাগতিক নিয়ম অনুযায়ী যার চূড়ান্ত পরিণতি নিশ্চিত পরাজয়?

আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ (*) فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ – البقرة. 

‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা বর্জন করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও। আর যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই; তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।’ (সুরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯)

*মতামত লেখকের নিজস্ব

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন