মিডল ইস্ট আই

ট্রাম্পের ‘পল্টিতে’ যেভাবে ভেঙে যাচ্ছে নেতানিয়াহুর বৃহত্তর ইসরায়েল গঠনের স্বপ্ন

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, হোয়াইট হাউজে বসে থাকা ইসরায়েলের ‘সর্বকালের সেরা বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেই আজন্ম লালিত স্বপ্নটিকে এক ঝটকায় ভেঙে দিলেন।
নেতানিয়াহু ট্রাম্প

বিগত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতগুলো সামরিক ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, তার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এই ছায়াযুদ্ধের পরিণতি সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী। আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন বা সিরিয়ায় মার্কিন আগ্রাসনের খতিয়ান আমরা দেখেছি। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে সমীকরণটি ছিল ভিন্ন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের আরেকটি ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ চক্রান্ত নস্যাৎ করে ইরান কেবল নিজের সার্বভৌমত্বই রক্ষা করেনি, বরং এই অঞ্চলের মুসলিম পরিচিতির ওপর নেমে আসা এক বড় আঘাতকে রুখে দিয়েছে।

ইরানকে কাবু করতে না পারার এই ব্যর্থতা মূলত ইসরায়েলের একটি দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। আর সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি ছিল, একটি নতুন ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ (গ্রেটার ইসরায়েল)-কে কেন্দ্র করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়া। এটাই ছিল ‘আব্রাহাম চুক্তি’র আসল উদ্দেশ্য। আর যখন এই অঞ্চলের পরাশক্তি সৌদি আরব এই মার্কিন-ইসরায়েলি ফাঁদে পা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন এর বিকল্প হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, হোয়াইট হাউজে বসে থাকা ইসরায়েলের ‘সর্বকালের সেরা বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেই আজন্ম লালিত স্বপ্নটিকে এক ঝটকায় ভেঙে দিলেন।

ট্রাম্পের পিছুটান ও ইসরায়েলের হাহাকার

নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যে বিপজ্জনক গোলকধাঁধায় টেনে নিয়েছিলেন, তা থেকে নিজের গা বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসা ট্রাম্পের জন্য খুব একটা কঠিন ছিল না। তবে নেতানিয়াহুর জন্য ট্রাম্পের এই ইরান নীতির আকস্মিক পরিবর্তন এক চরম বিপর্যয় নিয়ে এসেছে, যার ক্ষত ইসরায়েলকে আগামী কয়েক প্রজন্ম ধরে বইতে হতে পারে।

এই যুদ্ধের জেরে মার্কিন মুলুকে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পারদ নেমেছে তলানিতে। সামনেই মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে কাঁপছে ট্রাম্পের দল। ট্রাম্প চেয়েছিলেন একটি ঝটিকা ও সস্তা বিজয়। কিন্তু ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট যখন দেখলেন যে মুসলিম বিশ্বের এই প্রতিপক্ষ এত সহজে মাথা নোয়াবার নয়, তখনই তিনি মানসিকভাবে এই যুদ্ধ থেকে পিছু হটেন।

ইসরায়েলের মূলধারার সামরিক বিশ্লেষকরাও এই সত্যটি এখন অকপটে স্বীকার করছেন। ইসরায়েলি চ্যানেল ১৩-এর সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড স্পষ্ট বলেছেন, এই যুদ্ধ পুরো পাশা উল্টে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে আমেরিকার কাঁধে ভর দিয়ে ইসরায়েল নিজেকে এই অঞ্চলের অঘোষিত সম্রাট ভাবত, আর এখন ইরানই মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দৈনিক হারেৎজ-এর আমোস হারেল লিখেছেন, ট্রাম্পের এই পিছুটান ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, হোয়াইট হাউজে বসে থাকা ইসরায়েলের ‘সর্বকালের সেরা বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেই আজন্ম লালিত স্বপ্নটিকে এক ঝটকায় ভেঙে দিলেন।

হতাশ নেতানিয়াহুর ক্ষতস্থানে নুনের ছিটা দিয়ে ট্রাম্প খোদ নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ‘ইরানের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকলে ইসরায়েল দুই ঘণ্টাও টিকত না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে ইসরায়েল নামে কোনো কিছুই থাকত না।’

ক্ষয়ে যাওয়া বিশ্বাসযোগ্যতা

গাজায় ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা পশ্চিমা বিশ্বের মনস্তত্ত্বে এতদিন ধরে পুষে রাখা এই মিথ্যাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে যে, ‘ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র শান্তিকামী দেশ’। ঠিক তেমনি, ইরানের ওপর এই ব্যর্থ হামলা মার্কিন প্রশাসনের কাছে সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে ইসরায়েল এখন একটি ‘বিষাক্ত ব্র্যান্ড’। আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’ (Aipac) এখন খোদ ডেমোক্র্যাটদের কাছেই এক অস্বস্তির নাম। উদীয়মান মার্কিন রাজনীতিকরা এখন ইসরায়েলি লবির টাকা নিতে কুণ্ঠাবোধ করছেন। খোদ রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই আলোচনা জোরালো হচ্ছে যে, ইসরায়েল নিজের স্বার্থে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে জিম্মি করে রেখেছে।

মুসলিম বিশ্বের নতুন সমীকরণ

এই ভূ-রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে ইরান কিন্তু একটি প্রধান আঞ্চলিক মুসলিম শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে। তারা তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ক্ষেপণাস্ত্র বহর অক্ষত রেখেছে, যা মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে প্রমাণিত হলো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (Axis of Resistance)-কে একটি একক এবং কার্যকর ইউনিটে পরিণত করেছে। ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর মতো মুসলিম প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সাথে তেহরানের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে। বৈরুতের রাজপথে এখন খামেনেইর পোস্টারে লেখা হচ্ছে ‘ধন্যবাদ’। এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশের কাছে বার্তা গেছে যে, পশ্চিমা ও জায়নবাদী আগ্রাসনের মুখে তারা একা নয়।

অন্যদিকে, এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটন যে তাদের নিরাপত্তার চিরস্থায়ী গ্যারান্টি দেবে, সেই ঔপনিবেশিক মরীচিকা ভেঙে গেছে। কাতার, ওমান বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, ইসরায়েলি আধিপত্যবাদের চেয়ে প্রতিবেশীদের সাথে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও আঞ্চলিক কূটনীতি বজায় রাখা অনেক বেশি নিরাপদ। তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এখন ওয়াশিংটনের মর্জির চেয়ে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সদিচ্ছার ওপর বেশি নির্ভরশীল।

অবিনশ্বর ফিলিস্তিন ও অবশ্যম্ভাবী পিছুটান

আঞ্চলিক কূটনীতিতে হেরে গিয়ে উগ্র ও রক্তাক্ত নেতানিয়াহু এখন ফিলিস্তিনিদের ওপর তাঁর হিংস্রতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন, এটাই স্বাভাবিক। ইসরায়েল আজ একটি ‘সিরিয়াল কিলার’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারা যত বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করছে, নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে পড়ে তাদের আরও বেশি রক্তক্ষয়ী হতে হচ্ছে।

তবে ইতিহাস সাক্ষী, উগ্র মতাদর্শ বা আধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে একটি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করা যায় না। গাজা ও লেবাননের মুসলিম জনতা দেখিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো যেকোনো নিপীড়ন সহ্য করার মতো ইস্পাতকঠিন। গাজা ভাঙবে না, গাজার মানুষ নিজেদের স্বজনদের কবরের ওপর দাঁড়িয়েও নিজেদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে।

আজ থেকে এক শতাব্দী আগে মুসলিম উম্মাহর বুক চিরে মধ্যপ্রাচ্যে যে কৃত্রিম জায়নবাদী ভূখণ্ড চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ফাটলের মুখোমুখি। অন্তহীন যুদ্ধ আর ভূখণ্ড গ্রাসের যে আত্মঘাতী খেলায় ইসরায়েল মেতেছিল, তারা খুব শীঘ্রই বুঝতে পারবে যে তারা তাদের সামরিক সামর্থ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। পবিত্র ভূমিতে ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারের এই উগ্র ও অহংকারী প্রজেক্টটিই হয়তো আগামী দিনে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।

মিডল ইস্ট আই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন