সিরিয়ার বর্তমান বিচার বিভাগীয় কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত আইনি কাঠামো ভেঙে বিচারব্যবস্থাকে ইসলামি শরীয়াহর ছাঁচে ঢেলে সাজানোর একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দেশটির বর্তমান বিচার বিভাগ। সম্প্রতি সিরিয়ার উচ্চ আদালতের অন্যতম বিচারক মুজাহিদ সুলাইমান এই রূপান্তরের একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, কীভাবে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে ধাপে ধাপে একটি নতুন বিচারিক ব্যবস্থা গড়ার কাজ চলছে।

বিজয় পরবর্তী সময়ে সিরিয়ার বিচার বিভাগের সামনে মূলত তিনটি কঠিন বিকল্পের ছিল। একদিকে ছিল ইদলিবে প্রচলিত পুরোনো ধাঁচের আইন, অন্যদিকে ছিল বাশার আল আসাদ সরকারের রেখে যাওয়া বিদ্যমান আইনি কাঠামো। তবে বিচার বিভাগ এই দুটির কোনোটিই সরাসরি গ্রহণ না করে একটি ‘তৃতীয় পথ’ বেছে নিয়েছে। বিচারক সুলাইমানের মতে, পুরোনো কাঠামো হুট করে পুরোপুরি ভেঙে ফেললে বড় ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারত। তাই তাঁরা বিদ্যমান আইনগুলোকে শরিয়াহর মানদণ্ডে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি মূলত একটি নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
আইন সংশোধনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি প্রতিটি ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছে। পর্যালোচনায় একটি চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, সিরিয়ার বর্তমান দেওয়ানি আইনের প্রায় ৮০ শতাংশ ধারাই হানাফি মাযহাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সরাসরি শরিয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তবে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ধারাকে আইন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে, ফৌজদারি আইনের ৭৫৫টি ধারার মধ্যে মাত্র ৭০টি ধারা শরিয়াহর মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে দণ্ডবিধি বা ‘হদ’ সংক্রান্ত বিষয়গুলোতেই এই পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বর্তমানে মদ্যপান ও ব্যভিচারের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে শরিয়াহর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করা হলেও অন্যান্য জটিল দণ্ডবিধিগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উপযুক্ত পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটির বিচার বিভাগ।

আইন সংস্কারের পাশাপাশি বিচার বিভাগে শুদ্ধি অভিযান চালানো এখন কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ায় প্রায় ১৮০০ বিচারক কর্মরত ছিলেন, যাদের স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন ছিল। বিচার বিভাগীয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই ৪০০ জনেরও বেশি বিতর্কিত বিচারককে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি আলেপ্পোতেও ৫৭ জন বিচারকের বিরুদ্ধে বিশেষ তদন্ত শুরু হয়েছে। এই শূন্যস্থান পূরণে প্রশাসন ২০১২ সালে পদত্যাগ করা সেইসব নীতিবান বিচারকদের ফিরিয়ে আনছে, যাঁরা অন্যায়ের প্রতিবাদে এক সময় সরে দাঁড়িয়েছিলেন। পাশাপাশি মেধার ভিত্তিতে নতুন বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াও জোরালো করা হয়েছে।
বিচারক মুজাহিদ সুলাইমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন যে, বর্তমানে সিরিয়ার কোনো আদালতে ইসলাম বিরোধী বা কুফরি আইন দিয়ে বিচার করা হচ্ছে না। নেতৃত্বের সততা নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যদি তিনি দেখতেন যে শাসকরা শরিয়াহর পথ থেকে সামান্যতম বিচ্যুত হচ্ছেন, তবে তিনি এক মুহূর্তও পদে থাকতেন না। বিচার মন্ত্রণালয়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে তাঁরা একটি ‘প্রশাসনিক জিহাদ’ হিসেবে দেখছেন। প্রতিকূলতা থাকলেও তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সিরিয়ার আইন ব্যবস্থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও শতভাগ শরিয়াহভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তর করা।











