হামাস নেতার চতুর্থ ছেলে শহিদ। বললেন, আমার সন্তানদের রক্ত ফিলিস্তিনি জনগণের রক্তের চেয়ে দামী নয়।

ইয়াহহিয়া সিনওয়ারের শাহাদাতের পর আন্দোলনের দিকনির্দেশনা ও কূটনৈতিক লড়াইয়ে তিনি এখন এক কেন্দ্রীয় স্তম্ভ।
খলিল আল হাইয়া.jpg (1)

ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে শোক আর প্রতিরোধ যখন একাকার হয়ে যায়, তখন সেই মানচিত্রের এক উজ্জ্বল ও অবিচল প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন ড. খলিল আল-হাইয়া। গাজায় হামাসের এই শীর্ষ নেতা ও যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারীর জীবনে ব্যক্তিগত বিয়োগব্যথা কোনো নতুন ঘটনা নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে চলা এক অবিরাম দহন। সম্প্রতি ইসরায়েলি হামলায় তাঁর চতুর্থ পুত্র আযযাম আল হাইয়ার মৃত্যুর খবর সেই দীর্ঘ শোকগাঁথায় যোগ করল নতুন এক অধ্যায়।

ফিলিস্তিনিদের কাছে খলিল আল-হাইয়া কেবল একজন ঝানু রাজনীতিবিদ বা দক্ষ কূটনীতিক নন; তিনি এমন এক জননেতা, যিনি যুদ্ধের ময়দান আর আলোচনার টেবিলের মধ্যবর্তী দূরত্বকে নিজের পরিবারের রক্ত দিয়ে ঘুচিয়ে দিয়েছেন। আজাম আল-হাইয়ার শাহাদাতের খবর আসার পর হালের গণমাধ্যমে যখন তাঁর নাম বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, তখন দৃশ্যপটে ভেসে উঠছে এক পাহাড়সম ধৈর্যশীল মানুষের অবয়ব। গণমাধ্যমের সামনে তাঁর প্রতিটি উপস্থিতিই যেন এক শক্তিশালী বার্তা, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাঁর সন্তানের মৃত্যু ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের শোকের চেয়ে আলাদা কিছু নয়।

ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস

খলিল আল-হাইয়ার রাজনৈতিক জীবনের সমান্তরালে চলেছে তাঁর পরিবারের ওপর নেমে আসা একের পর এক আঘাত। ২০০৭ সালে শুজাইয়া এলাকায় তাঁর বাড়িতে প্রথম বড় ধরনের হামলা চালায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। সে সময় তাঁর পরিবারের অন্তত ৮ জন সদস্য প্রাণ হারান। ২০১৪ সালের স্থল অভিযানের সময় আবারও তাঁর বসতভিটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই হামলায় প্রাণ হারান তাঁর পুত্র ওসামা, পুত্রবধূ হালা এবং তাঁদের দুই সন্তান খলিল ও উমামা। একই বছরে হারান আরেক পুত্র হামজাকে, যিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের একজন কমান্ডার ছিলেন। এমনকি ২০২৫ সালে কাতারে আলোচনারত প্রতিনিধি দলের ওপর হামলায় প্রাণ হারান তাঁর আরেক সন্তান হুমাম।

আজ চর্তুথ পুত্র আজামকে হারিয়ে খলিল আল-হাইয়া আবারও সেই পুরনো অবস্থানেই অনড়। তাঁর মতে, দখলদার বাহিনী মনে করে নেতাদের পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পাল্টে দেওয়া যাবে, কিন্তু বাস্তবে এটি প্রতিরোধের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে।

নেতৃত্ব ও ত্যাগের সমন্বয়

১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া এই নেতা হামাসের অভ্যন্তরে ধাপে ধাপে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের সদস্য হওয়া থেকে শুরু করে বর্তমানে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর উপ-প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াহহিয়া সিনওয়ারের শাহাদাতের পর আন্দোলনের দিকনির্দেশনা ও কূটনৈতিক লড়াইয়ে তিনি এখন এক কেন্দ্রীয় স্তম্ভ।

ফিলিস্তিনি বিশ্লেষকদের মতে, খলিল আল-হাইয়ার এই ব্যক্তিগত ক্ষতি তাঁকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। গাজায় নেতৃত্ব মানে কোনো সুযোগ-সুবিধা নয়, বরং ত্যাগের এক চরম পরীক্ষা।

রাজনৈতিক টেবিলে তাঁর প্রতিটি দাবি বা শর্ত এখন আর কেবল সাংগঠনিক অবস্থান নয়, বরং নিজের সন্তানদের হারানো এক পিতার অটল অধিকার হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ

হামাসের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করা ইসরায়েলের এক ধরনের ‘রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’। কিন্তু খলিল আল-হাইয়া বরাবরই বলে আসছেন, ‘আমার সন্তানদের রক্ত ফিলিস্তিনি জনগণের রক্তের চেয়ে দামী নয়।’ তাঁর এই বক্তব্য কেবল আবেগ নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন। যেখানে নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের ভাগ্য একই সুতোয় গাঁথা।

ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক অভিযান ও নেতাদের ব্যক্তিগত লক্ষ্যবস্তু বানানোর নীতি কি আলোচনার টেবিলে হামাসকে নরম করবে? খলিল আল-হাইয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও বারবার ফিরে আসার ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার যে সংস্কৃতি ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে বিদ্যমান, আল-হাইয়া এখন সেই সংস্কৃতিরই সবচেয়ে জীবন্ত উদাহরণ। রক্তভেজা এই জনপদে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে, ব্যক্তিগত শূন্যতা রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণ নয়, বরং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নতুন চালিকাশক্তি।

সূত্র : সাফা নিউজ এজেন্সি

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন