সুদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের যুদ্ধ

সুদ ছাড়া অন্য কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা আসেনি।
মধ্যপ্রাচ্য

আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। আর যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই; তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।’ (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৮-২৭৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদকে সাতটি ধ্বংসাত্মক কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে দূরে থাকো।’ জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, সেগুলো কী? তিনি বললেন: ‘আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া কোনো প্রাণ হত্যা করা, এতিমের মাল ভক্ষণ করা, সুদ খাওয়া, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং সতী-সাধ্বী মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া।’

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত সকল পক্ষকে অভিশাপ দিয়েছেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত: ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, দাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীকে লানত করেছেন এবং বলেছেন— তারা সবাই সমান অপরাধী।’

সুদ একটি প্রাচীন অপরাধ এবং এটি জাহেলিয়াতের অন্যতম নিদর্শন। বিদায় হজের ভাষণে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেছিলেন: ‘জাহেলিয়াতের সমস্ত সুদ আজ থেকে রহিত করা হলো। আমাদের সুদের মধ্যে প্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ রহিত করছি, এর পুরোটাই বাতিল।’

আধুনিক যুগে সুদের এক নতুন রূপ আবির্ভূত হয়েছে, যা হলো ব্যাংক বা বাণিজ্যিক সুদ। এটি বর্তমানে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে। সুদের ভয়াবহতা আড়াল করতে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্যাংক প্রফিট’ বা ‘ব্যাংক মুনাফা’। এই প্রথা যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল-আজহার শরীফের ‘ইসলামিক রিসার্চ একাডেমি’ থেকে প্রথম সম্মিলিত ফতোয়া জারি করা হয়। সেখানে ৩৫টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধি এবং প্রথিতযশা আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের ফতোয়া ছিল: ‘ব্যাংকের এই মুনাফাই হলো মূলত সুদ (রিবা), এবং মুসলিম দেশগুলোর উচিত এর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’ এরপর ওআইসি (OIC) এর ফিকহ একাডেমি এবং রাবেতাতুল আলম আল-ইসলামীও একই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বর্তমানে সুদের বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নবীজির সেই হাদীসটি বাস্তব রূপ নিয়েছে: ‘মানুষের ওপর এমন এক সময় আসবে যখন সবাই সুদ খাবে। যে খাবে না, তার গায়েও সুদের ধোঁয়া লাগবে।’

এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতির মাঝেও ‘ইসলামিক ইমারাহ অব আফগানিস্তান’ সুদের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। তারা ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সকল লেনদেন থেকে সুদের চিহ্ন মুছে ফেলেছে। এই শৃঙ্খল ভাঙতে তাদের প্রায় তিন বছরের কঠোর পরিশ্রম ও গবেষণার প্রয়োজন হয়েছে। কারণ সামরিক দখলের চেয়েও অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব অনেক বেশি জটিল ও শিকড়প্রোথিত। কিন্তু আফগানদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও ধৈর্য তাদের এই লড়াইয়ে বিজয়ী করেছে। সর্বোচ্চ নেতা শায়খ হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নির্দেশ ছিল স্পষ্ট: ‘আমাদের কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর স্বীকৃতিই বড় কথা। শরীয়াহ বিরোধী যা কিছু আছে তা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।’

আফগানরা আল-কুরআনের এই আয়াতকে মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়েছে: ‘যদি জনপদের মানুষগুলো ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম।’ (সূরা আল-আরাফ: ৯৬)। এর সুফলও তারা পেতে শুরু করেছে। তাদের দেশে খনিজ সম্পদ ও তেলের খনি আবিষ্কৃত হচ্ছে।

‘ব্লুমবার্গ’ রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে আফগান মুদ্রার মান অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন ও পশ্চিমা অবরোধ এবং ব্যাংকে আটকে রাখা ৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়াই তাদের অর্থনীতির এই উন্নতি বিস্ময়কর।

অনেকে যুক্তি দেন যে, অবরোধের মুখে থাকায় তাদের বিশ্ব অর্থনীতির সাথে সম্পর্ক নেই বলে তারা সুদ বন্ধ করতে পেরেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা যদি শুধু পার্থিব স্বার্থ খুঁজত, তবে তারা আফিম ও মাদক চাষ বন্ধ করত না। মার্কিন দখলের সময় আফগানিস্তান মাদক উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম ছিল, যা বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। যা জাতিসংঘও স্বীকার করেছে।

সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে আফগানিস্তান আজ বাকি মুসলিম বিশ্বের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যারা নিজেদের মুদ্রা ও ভাগ্যকে ডলারের সাথে বেঁধে রেখেছে—যার নিয়ন্ত্রণ এখন স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে—তাদের জন্য আফগানদের এই বিজয় একটি শক্তিশালী বার্তা। সত্য ও মিথ্যার এই লড়াইয়ে আফগানরা আবারও প্রমাণ করেছে যে, আল্লাহর ওপর ভরসা করলে অসম্ভভকেও সম্ভব করা যায়।

মূল লেখা : ড. মুহাম্মদ আস সগির, একজন চিকিৎসক এবং ইসলামি অ্যাক্টিভিস্ট, যিনি অনলাইনের মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াহ এবং মুসলিম উম্মাহর জাগরণ নিয়ে কাজ করছেন।

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন