সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক পিটার বেইনার্ট

ইসরায়েলই বর্তমানে ইহুদিদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক পিটার বেইনার্ট
মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক পিটার বেইনার্ট

পিটার বেইনার্ট। কট্টর জায়নবাদী পরিবারে বেড়ে ওঠা তার। বাবা-মা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্ম নেওয়া তার দাদি বিশ্বাস করতেন, ইহুদিদের জন্য পৃথিবীতে ইসরায়েলই একমাত্র নিরাপদ দেশ। পিটার নিজেও মনে-প্রাণে আমেরিকান; নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। কখনও অন্য কোথাও যাওয়ার চিন্তা করেননি, নেই ইসরায়েলি নাগরিকত্বও। তবে দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন একজন ধর্মপ্রাণ ইহুদি হিসেবে। প্রতিদিন প্রার্থনা করা, সিনাগগে যাওয়া আর ইহুদি রাষ্ট্রকে শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিশ্বাস করা ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে ত্রিশের কোঠায় পৌঁছাতেই এই দীর্ঘদিনের বিশ্বাসে ফাটল ধরতে শুরু করে, যা চল্লিশে এসে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এখন তিনি মনে করেন, ইসরায়েলই বর্তমানে ইহুদিদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। সেই অবস্থান থেকেই তিনি ‘এক রাষ্ট্র’ সমাধানের ডাক দিয়েছেন, যেখানে ফিলিস্তিনি ও ইহুদিরা সমান অধিকারে পাশাপাশি বসবাস করবে। তার প্রবল বিশ্বাস, একমাত্র সমতাই বয়ে আনতে পারে প্রকৃত নিরাপত্তা। মি. পিটার যুক্তি দেন, ইহুদিবিদ্বেষ (Anti-Semitism) আর জায়নবাদবিরোধিতা (Anti-Zionism) এক কথা নয়; তা যদি হতো, তবে বহু ইহুদিই আজ নিজেদের ধর্মবিদ্বেষী হিসেবে গণ্য হতেন।

‘জুইশ কারেন্টস’ (Jewish Currents) ম্যাগাজিনের সম্পাদক এবং ‘বেইনার্ট নোটবুক’ নিউজলেটারের প্রতিষ্ঠাতা পিটার বেইনার্ট এই তাত্ত্বিক অবস্থান তুলে ধরেছিলেন ‘তুফানুল আকসা’র পাঁচ বছর আগে। তার সেই চিন্তারই পূর্ণ রূপ ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক বই: (Being Jewish After the Destruction of Gaza: A Moment of Reckoning)-এ। এটিই তার প্রথম কাজ যা আরবিতে অনূদিত হয়েছে। আবদুল মজিদ আল-মুহাইলমির অনুবাদে কয়েকমাস আগে মিশরের ‘আল-কুতুব খান’ থেকে বইটি প্রকাশিত হয়।

পিটার বেইনার্ট মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের ভাষা হিসেবে আরবির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে ইহুদি সমাজের অভ্যন্তরীণ বিতর্কগুলো যেমন অন্যদের কাছে স্পষ্ট হবে, তেমনি তিনিও ব্যক্তিগতভাবে আরবি লেখা পড়ে এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন।

নিজের বইয়ে বেইনার্ট সুতীক্ষ্ণ যুক্তিতে সব অভিযোগ খণ্ডন করেছেন এবং প্রচলিত পরিভাষাগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অজুহাত হিসেবে ইহুদি ধর্মকে ব্যবহার করার ঘোর বিরোধিতা করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ‘স্বদেশে ফেরার অধিকার’ (Right of Return)-এর কথা জোরালোভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, ইসরায়েল রাষ্ট্রটি এমন সব মানুষের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ করে চলেছে, যাদের জীবন আমাদের মতোই মূল্যবান। তিনি বিশ্বাস করেন, মানবিক মর্যাদা এক পরম ও শর্তহীন মূল্যবোধ এবং যেকোনো সরকার, রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেইনার্ট আরও মনে করেন, ইসরায়েল বর্তমানে একগুঁয়েমি ও গুণ্ডামির পথ বেছে নিয়েছে এবং রাষ্ট্রটি এখন অনেকটা পূজনীয় মূর্তিতে পরিণত হয়েছে; অথচ মূর্তিপূজা বর্জন করাই হলো ইহুদি পরিচয়ের মূল ভিত্তি। হামাস প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো, হামাস কোনো মূল সমস্যা নয়; কারণ তারা যদি আজ চলেও যায়, তবে সহজেই অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের জায়গা দখল করে নেবে।

বেইনার্টের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই হলো নিজের অবস্থান পর্যালোচনা করা এবং ভুল বা ভুল ধারণার কথা স্বীকার করে নিয়ে আগের অবস্থান থেকে সরে আসা। উদাহরণস্বরূপ, তার সম্পাদনায় ‘নিউ রিপাবলিক’ (The New Republic) সাময়িকী ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী এক সম্পাদকীয়তে তারা লিখেছিল: ‘আমরা অনুতপ্ত, কিন্তু লজ্জিত নই।’ বেইনার্ট তার ২০১০ সালে প্রকাশিত বই ‘দ্য ইকারাস সিনড্রোম: এ হিস্ট্রি অফ আমেরিকান অ্যারোগেন্স’-এ ইরাক আক্রমণকে সমর্থন করার ভুলটি অকপটে স্বীকার করেছেন।

পিটার বেইনার্ট আজও একজন ধর্মপ্রাণ ইহুদি, কিন্তু তার চিন্তাধারা স্বজাতির অনেকের চেয়েই আলাদা। তিনি বেশ ভালোভাবেই জানেন, একজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার কারণে তিনি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ভোগ করেন। আর এই সুযোগটিই তাকে কোনো চাকরি হারানো বা তাৎক্ষণিক পরিণতির ভয় ছাড়াই বিতর্কিত বিষয়গুলোতে মুখ খোলার সাহস দেয়। 

আপনি ৭ই অক্টোবরের ঘটনাকে নাৎসি গণহত্যা বা রুশ ইহুদি নিধনের (Pogroms) সাথে তুলনা করতে অস্বীকার করেছেন। বরং আপনি একে তুলনা করেছেন ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে আমেরিকার আদিবাসী বা আফ্রিকানদের সংগ্রামের সাথে। নিজের জাতির মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে এমন অবস্থান নেওয়া বড় সাহসের কাজ। এর জন্য আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কী মূল্য দিতে হয়েছে?

আমি যে মূল্য দিচ্ছি, তা কোনোভাবেই সেইসব মানুষের ত্যাগের সাথে তুলনীয় নয় যারা তাদের পরিবার, প্রাণ কিংবা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। হ্যাঁ, অনেকে আমার লেখার তীব্র বিরোধিতা করেন এবং প্রায়ই তা আমাকে সরাসরি জানান। মাঝেমধ্যে কিছু বন্ধুও হারিয়েছি। কিন্তু গাজা বা পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের তুলনায় আমি অনেক বেশি নিরাপদ এবং সুবিধাজনক জীবন যাপন করছি। এমনকি আমার নিজ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষের চেয়েও আমি ভালো আছি। আমি আসলে যা হারিয়েছি, তার চেয়ে যে সম্পর্কগুলো নতুন করে পেয়েছি সেগুলোকে বেশি মূল্য দেই।

আমি মনে করি, যেকোনো সমাজে যখন ভয় বা বিপদের আবহ তৈরি হয়, তখন মানুষ তাদের প্রতি খুব কঠোর হয়ে ওঠে যারা যথেষ্ট সংহতি দেখাচ্ছে না বলে মনে হয়। এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। দুর্ভাগ্যবশত আমেরিকান ইহুদি সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, অন্য ইহুদিদের সাথে সংহতি প্রকাশের মানেই হলো যেকোনোভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া। এই সমীকরণটি অত্যন্ত ভুল এবং বেদনাদায়ক। আমি বিশ্বাস করি, ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা এবং ইসরায়েলি ইহুদিদের নিরাপত্তা একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। ইসরায়েলি ইহুদিদের নিরাপদ রাখার একমাত্র উপায় হলো ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা।

কিন্তু অনেক আমেরিকান ইহুদি মহলে ইসরায়েল বা জায়নবাদের সমালোচনাকে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষ বা ইসরায়েলি ইহুদিদের জীবনের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা হয়। একারণেই আমার বা অন্য কোনো ইহুদি সমালোচকের প্রতি তারা চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাদের ধারণা, ৭ই অক্টোবরের আমরা আমাদের জাতির পাশে দাঁড়াচ্ছি না। তাদের চোখে এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সাথে একাত্ম হওয়াই হলো সংহতি। কিন্তু আমার মতে, রাষ্ট্রই আসলে অনেক ক্ষেত্রে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি উভয়ের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানুষ তখনই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকে যখন সবাই নিষ্ঠুর দমনের পরিবর্তে আইনের চোখে সমান অধিকার নিয়ে বাঁচার সুযোগ পায়।

আপনার বইয়ে আপনি খুব কড়া শব্দ বা পরিভাষা ব্যবহার করতে অনীহা দেখিয়েছেন বলে মনে হয়। যেমন, আপনি লিখেছেন ‘হামাস যোদ্ধা’, এমনকি বইয়ের শিরোনামে গাজার ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ (Genocide) না বলে ‘তাদমির’ বা ‘বিধ্বস্ত’ করা বলেছেন। এর কারণ কী?

আমি কোন শব্দ ব্যবহার করছি, সে বিষয়ে খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করি। আমি অনেক জায়গায় গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছি। তবে বইটিতে তা করিনি, কারণ আমি যখন লেখাটি শেষ করি, তখন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা কিংবা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ জেনোসাইড স্কলারস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতিবেদনে গাজার ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেনি। বই প্রকাশের পর এই প্রতিবেদনগুলো সামনে এসেছে।

আর সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) শব্দটির ক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে ইচ্ছাকৃত সহিংসতা চালানোই সন্ত্রাস। সেই হিসেবে ৭ই অক্টোবর ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো হামলাগুলো সন্ত্রাসবাদ। তবে আমি একে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল যুদ্ধাপরাধ বলতে বেশি পছন্দ করি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আপনি যদি দখলদারিত্বের অধীনে থাকেন, তবে আপনার শক্তি প্রয়োগের বা সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অধিকার আছে, তা সে পশ্চিম তীর হোক বা ইউক্রেন। কিন্তু আপনার বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা করার কোনো অধিকার নেই।

আমার মতে, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে সমান বা ন্যায়সঙ্গত নয়। মানুষ খুব কমই রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কর্মকাণ্ডকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে বর্ণনা করে। এই শব্দটি মূলত ফিলিস্তিনি, মুসলিম বা যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেই বেশি ব্যবহৃত হয়। অথচ গত বছরের বসন্তে ইসরায়েল সরকার যখন প্রায় দুই মাস গাজার খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন তারাও বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করেই সেই সহিংসতা চালিয়েছিল। যেহেতু এই শব্দটির ব্যবহার বৈষম্যমূলক, তাই আমি এটি এড়িয়ে চলাই শ্রেয় মনে করি। আমি বরং সরাসরি সেই কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন কি না, তা বলতেই পছন্দ করি।

যখন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্দোলন ও বিক্ষোভে উত্তাল ছিল, তখন কি আপনি সেই আন্দোলনের অংশ ছিলেন? আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের হয়ে কাজ করেছেন?

হ্যাঁ, আমি বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি এবং শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পগুলোতে বক্তব্য রেখেছি। এসব সংগঠনের বেশিরভাগই ছিল শিক্ষার্থীদের দল, তবে মাঝেমধ্যে তারা আমার মতো বয়স্ক কাউকে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানাত। তবে কোনো আন্দোলন সামগ্রিকভাবে ন্যায্য হলেও সেখানে এমন কিছু স্লোগান বা কর্মকাণ্ড থাকতে পারে যা সমালোচনার যোগ্য। মাঝেমধ্যে আমি কিছু বিষয়ে একমত হতে পারিনি; যেমন কিছু স্লোগান হিতে বিপরীত হতে পারে বলে আমার মনে হয়েছে।

তা সত্ত্বেও আমেরিকার এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমি এক অসাধারণ সংহতি দেখেছি। ফিলিস্তিনি, মুসলিম, কৃষ্ণাঙ্গ, এবং ইহুদি শিক্ষার্থীরা একটি মৌলিক দাবিতে একাত্ম হয়েছিল। তা হলো, আমেরিকান হিসেবে তাদের দেওয়া টিউশন ফি বা ট্যাক্সের টাকা যেন গাজার একটি জনপদকে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত না হয়। আমি মনে করি, এটি আমেরিকার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ছাত্র আন্দোলনগুলোর ঐতিহ্যেরই একটি অংশ।

আপনি একটি জায়নবাদী পরিবারে বড় হয়েছেন, অথচ এখন বলছেন ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ আর সম্ভব নয় এবং একটি ‘অ-ইহুদি একক রাষ্ট্র’ গঠনের ডাক দিচ্ছেন—যা কয়েক দশক ধরে আলোচিত একটি প্রস্তাব। আপনি যখন চল্লিশের কোঠায় পৌঁছালেন এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটালেন, তখন আক্ষরিক অর্থেই তাদের প্রতি আপনার আগের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বলেছেন, ‘আপনি বুঝতে পেরেছেন আপনি কতটা অমানবিক ছিলেন’। আপনার কি মনে হয় আপনি সত্য বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছেন? নাকি ‘কখনও না আসার চেয়ে দেরিতে আসা ভালো’ মনে করেন?

আমি যদি এই সিদ্ধান্তে আরও আগে পৌঁছাতে পারতাম! জীবনে মানুষ অনেক কিছু আগে না করার বা আগে বুঝতে না পারার জন্য অনুশোচনা করে— এটি অনিবার্য। কিন্তু যখন আপনার হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটে, তখন ভবিষ্যতের জন্য সেই অনুযায়ী কাজ করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। আমি মনে করি, আমার বেড়ে ওঠা ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু ইহুদির বেড়ে ওঠার একটি চিরচেনা ধরণ। যারা এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি বা অ-ইহুদি, তাদের জন্য এটি বোঝা খুব জরুরি যে, কেন জায়নবাদের ধারণাটি অনেক ইহুদির কাছে এত আকর্ষণীয় ছিল।

জায়নবাদের কট্টর সমালোচক এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ‘দ্য কোয়েশ্চেন অফ প্যালেস্টাইন’ বইয়ে একটি বিষয় খুব আবেগপূর্ণভাবে লিখেছেন; তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কেন ইহুদিরা জায়নবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রচলিত একটি বয়ান ছিল, ইহুদিরা রাষ্ট্রহীন এক জাতি। আর রাষ্ট্রহীনতার সেই অভিজ্ঞতা ছিল মূলত নিপীড়নের। ১৯৪০-এর দশকে জার্মানিতে এবং পরে পূর্ব ইউরোপে সেই অভিজ্ঞতা গণহত্যায় রূপ নেয়।

তাই ইহুদিদের একাংশ যদি এর প্রতিক্রিয়ায় বলে বসে, ‘আমাদের নিরাপত্তার একমাত্র পথ হলো এমন একটি রাষ্ট্র যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করব, যেখানে শাসন আমাদের হাতে থাকবে’, তবে তা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। কিন্তু অবশ্যই এই রাষ্ট্রটি (ইসরায়েল) গঠিত হয়েছে অন্য একটি জাতির বিনিময়ে এবং এখনও সেই জাতির ওপর নিপীড়ন চালিয়েই এটি টিকে আছে, যাকে আমি একটি নৈতিক অপরাধ বলে মনে করি। আমি এও বিশ্বাস করি, ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা বয়ে আনে না। কারণ, একটি রাষ্ট্র তখনই সবার জন্য নিরাপদ হয় যখন তার নাগরিকদের সমানভাবে দেখা হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রেও তো একই নীতির লড়াই চলছে, তাই না? সেখানেও এমন কিছু মানুষ আছে যারা আমেরিকাকে একটি ‘শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ বানাতে চায়, যেখানে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানরা আইনগতভাবে প্রাধান্য পাবে আর বাকিরা হবে কেবল ভিনদেশি অতিথি।

ইরাক যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে আপনি প্রকাশ্যে আপনার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। আপনার বিচারে আগের ভুলটি কোথায় ছিল? আর আপনার পাঠকরাও কি আপনার এই পরিবর্তনের সঙ্গে একাত্ম হবে বলে আপনি বিশ্বাস করেছিলেন?

আমার পরিবর্তন এবং অবস্থানগুলো মূল্যায়ন করার পূর্ণ অধিকার মানুষের রয়েছে। কেউ যদি আমার আগের ভুল অবস্থানগুলোর কারণে আমাকে ভবিষ্যতে অনির্ভরযোগ্যচ মনে করেন, তবে আমি তাদের দোষ দেব না। আমার দ্বিতীয় বই ‘দ্য ইকারাস সিনড্রোম’-এ আমি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সেই সময়কাল নিয়ে আলোচনা করেছি। আমার মতো একদল আমেরিকান তখন দেখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধে জড়িয়ে সফল হচ্ছে। যেমন বসনিয়া বা কসোভোর মতো দেশে সার্বীয়দের জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেছিল। আমাদের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি মিলোসেভিচের নৃশংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে কেন নয়? নির্বাসিত কিছু ইরাকি বুদ্ধিজীবীও এই মতকে সমর্থন দিয়েছিলেন; যেমন কানান মাকিয়া যুক্তি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরাকিদের এই শাসন থেকে মুক্তি দেবে।

ইতিহাসও আমাদের বিভ্রান্ত করেছিল। উপসাগরীয় যুদ্ধের আগে ইরাকের পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল, তাই আমরা ভুলভাবে ধরে নিয়েছিলাম তারা সেটি পুনরায় শুরু করেছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকেই সেই ভুল ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, ইরাক আক্রমণ হয়তো ইরাকিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং আরও স্বাধীনতা বয়ে আনবে। এগুলোই আমাকে ভুল পথে পরিচালিত করার প্রভাবক ছিল। আর আমার দ্বিতীয় বইয়ে আমি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছি কেন সেই চিন্তাটি ভুল ছিল।

আপনার সাম্প্রতিক বইয়ে আপনি ইসরায়েলকে একটি পূজনীয় মূর্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন; যেন এটি এমন এক ঈশ্বর যার কোনো কাজ নিয়েই কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? আর গাজায় চলমান এই নিধনে পশ্চিমা বিশ্বের এই নীরব সম্মতি বা অংশীদারত্বকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের প্রতি পশ্চিমা সমর্থনের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। জার্মানির ক্ষেত্রে যেমন হলোকাস্ট বা ইহুদি নিধনের জন্য তাদের তীব্র অপরাধবোধ। অর্থাৎ, ইউরোপীয় ও পশ্চিমাদের কাছে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়াটা অনেকটা সেই ঐতিহাসিক পাপের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের কারণ হলো, উভয় দেশের ইতিহাসের এক অদ্ভুত মিল। দুটিই হলো ‘সেটলার কলোনি’ বা বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, যারা একটি ভূমিকে ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’ হিসেবে গণ্য করে সেখানকার আদিবাসীদের ধ্বংস করেছে। উত্তর আমেরিকায় এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের চেয়েও ভয়াবহ ছিল। এমনকি আমেরিকার অনেক শহরের নাম বাইবেলের শহরগুলোর নামে রাখা হয়েছে, এর মাধ্যমে এটি বোঝানো হয় যে, তাদের ভূমি দখল ছিল এক ধরণের ‘বাইবেলীয় বিজয়’-এর প্রতিফলন।

এ কারণেই অনেক আমেরিকান খ্রিস্টান জায়নবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ব্রিটেনের ইতিহাসেও এমনটা দেখা যায়; এমনকি বেলফোর ঘোষণার পেছনেও ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের সমর্থন ছিল। এছাড়া স্নায়ুযুদ্ধের সময় ইসরায়েল ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্বস্ত মিত্র।

আর ‘মূর্তিপূজা’ বা ‘সোনার বাছুর’ তৈরির বিষয়ে বলব—ইহুদি ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী ঈশ্বর ছাড়া অন্য যেকোনো কিছুকে পূজা করাই হলো মূর্তিপূজা। রাষ্ট্র মানুষের তৈরি একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র; তাই একে অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না। রাষ্ট্র মানুষের বিকাশে সাহায্য করে বলেই তার উপযোগিতা আছে, কিন্তু এর নিজস্ব কোনো শাশ্বত বা ঐশ্বরিক মূল্য নেই। আমি আমার বইয়ে এই যুক্তিটিই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে জায়নবাদকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আর বইয়ে আপনি যে ‘সাংস্কৃতিক জায়নবাদ’-এর কথা বলেছেন, সেটিই বা কী?

১৯৪৮ সাল থেকে জায়নবাদ এমন এক রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ হিসেবে কাজ করছে যা ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের আলাদা চোখে দেখে। এটি ইহুদি সার্বভৌমত্বের ওপর এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে ফিলিস্তিনিরা হয় বিতাড়িত নতুবা দাসে পরিণত হয়েছে। আমি এই রাজনৈতিক জায়নবাদের ঘোর বিরোধী। আমি কোনো রাষ্ট্রকে ‘ইসলামিক’, ‘হিন্দু’ বা ‘খ্রিস্টান’ রাষ্ট্র হিসেবে দেখার পক্ষপাতী নই; ঠিক তেমনি ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ ধারণাতেও আমার সায় নেই। আমি বিশ্বাস করি রাষ্ট্রের চোখে সব মানুষ সমান।

তবে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের আগে ‘সাংস্কৃতিক জায়নবাদ’ নামে একটি বিকল্প ধারা ছিল। মার্টিন বুবার, হান্না আরেন্ডট বা আলবার্ট আইনস্টাইন বিভিন্ন সময়ে এটি সমর্থন করেছিলেন। তাদের কাছে জায়নবাদ মানে কোনো আলাদা রাষ্ট্র গঠন নয়, বরং একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অর্থাৎ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে হিব্রু ভাষা ও সংস্কৃতি বিকশিত হবে, কিন্তু শাসনব্যবস্থা হবে সবার জন্য সমান। এই ধারাটি আইনের চোখে সাম্যের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু ১৯৪৮-এর পর এই আদর্শটি হারিয়ে যায় এবং উগ্র রাজনৈতিক জায়নবাদ প্রাধান্য পায়।

আপনি কি নিজেকে এই অর্থে একজন জায়নবাদী মনে করেন?

আমি মনে করি ‘সাংস্কৃতিক জায়নবাদ’ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। একজন ইহুদি হিসেবে এটি আমাদের শেখায় কীভাবে এই ভূমিতে হিব্রু ভাষা ও ইহুদি ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটিয়েও সবার সঙ্গে সমান অধিকারে বসবাস করা সম্ভব। বিশ শতকের প্রথমার্ধে সাংস্কৃতিক জায়নবাদীরা ঠিক এই ভাবনাটিই প্রচার করেছিলেন। আইনি সমতার ভিত্তিতে এই ভূখণ্ডে ইহুদি পরিচয়ে বাঁচার অর্থ কী হতে পারে, তা নিয়ে ইসরায়েল এবং বিশ্বের সকল ইহুদিদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

দুই মাস আগে আপনি সরাসরি ইসরায়েলিদের সঙ্গে কথা বলার তাগিদে তেল আবিব ইউনিভার্সিটিতে বক্তব্য দিতে গিয়েছিলেন, যার ফলে আপনি বেশ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হন। আপনার বিচারে সেই পরিস্থিতির ভুল মূল্যায়ন কোথায় ছিল?

আমি ইসরায়েলিদের সঙ্গে কথা বলার জন্য একটি তীব্র তাগিদ অনুভব করছিলাম, তাই যখন আমন্ত্রণটি পেলাম, আমি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি এখনও বিশ্বাস করি ইসরায়েলিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা জরুরি। তবে তেল আবিব ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার ভুলটি ছিল সেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচন করা; কারণ গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

ইসরায়েলিদের সঙ্গে কথা বলাটা ভুল নয়, কিন্তু ইসরায়েলি নিপীড়নের সহযোগী কোনো প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ না হয়েও তাদের সঙ্গে যোগাযোগের অন্য পথ ছিল। পরে বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে আমি বুঝতে পেরেছি, এই ধরনের অংশগ্রহণ আসলে শান্তিপূর্ণ ‘বয়কট’ (BDS) আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই ক্ষতির তুলনায় সেখানে কথা বলার সুফল ছিল খুবই সামান্য। তাই আমার উচিত ছিল আন্দোলনের নীতিমালা ভঙ্গ না করে যোগাযোগের অন্য পথ খুঁজে নেওয়া। আমি যদি আগে থেকেই এসব আলোচনা ও উপসংহারে পৌঁছাতে পারতাম, তবে ভালো হতো।

আপনাকে দেখে মনে হয়, আপনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতে বা ভুল স্বীকার করতে একদমই দ্বিধা করেন না…

আমি যখন প্রভাবশালী লেখক বা চিন্তাবিদদের কথা ভাবি, দেখি যে তারা অনেকেই বিশ্বের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের মত পরিবর্তন করেছেন। আমি মনে করি, যখন নতুন কোনো সত্য সামনে আসে, তখন নিজের সঙ্গে সৎ থাকলে আগের অবস্থানগুলো পুনর্বিবেচনা করতেই হয়।

আমার ‘দ্য ইকারাস সিনড্রোম’ বইয়ে আমি এমন কিছু আমেরিকান চিন্তাবিদকে নিয়ে লিখেছি যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছিলেন তারা ভুল ছিলেন। আমি যদি এমন কেউ হতাম যার সব মত সবসময় সঠিক হয়, তবে ভালো লাগত। কিন্তু আমি এখনও শিখছি, প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ আমাকে বিস্মিত করে এবং আমার জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে দেয়। এখন আমি কি সব অগ্রাহ্য করে কেবল জেদের বশে একটি ভুল অবস্থানেই অনড় থাকব? লেখক হিসেবে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমি যেন আমার অবস্থানকে সবচেয়ে জোরালো যুক্তিতে তুলে ধরতে পারি।

এমনও তো হতে পারে, ‘এক রাষ্ট্র সমাধান’ ধারণাটি পুরনো হয়ে গেছে এবং এটি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পাবে না… তবে কি সামনে আরও অন্ধকার সময় আসছে? গাজা গণহত্যার পর প্রতিরোধের ধরণই বা কেমন দেখছেন?

কোন সমাধানটি আসলে সম্ভব হবে, তা আমি জানি না। কারণ আমি তো ইসরায়েল বা ফিলিস্তিনে থাকি না। তবে আমার মূল নীতি হলো, সেখানে কয়টি রাষ্ট্র হবে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো সেই ভূমিতে বসবাসরত প্রতিটি মানুষকে সমান চোখে দেখতে হবে; কারো জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা থাকবে না। আমি আসলে যা করার চেষ্টা করছি তা হলো আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনা। বড় বড় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে সেখানে যা ঘটছে তা বর্ণবাদ (Apartheid) এবং গণহত্যার শামিল; আর এই নিপীড়নের পেছনে আমেরিকার যে সমর্থন রয়েছে, তা বন্ধ হওয়া জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, আমেরিকানদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ইসরায়েলকে দেওয়া নিঃশর্ত অস্ত্র সহায়তা বন্ধে চাপ সৃষ্টি করা। আমেরিকার এই জোগান ছাড়া ইসরায়েল গাজায় যা করেছে, তা করতে পারত না।

আপনার কি মনে হয় এই বিষয়ে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আনা আসলেই সম্ভব?

আমি মনে করি এখানে একটি সুযোগ রয়েছে এবং সেই চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে একটি কার্যকর আইন রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘লেহি আইন’ (Leahy Law)। এই আইন অনুযায়ী, যেসব বিদেশি সামরিক ইউনিট গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত, তাদের অস্ত্র সরবরাহ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আইনত নিষিদ্ধ। যদি এই আইনটি ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করছে, তার অনেকগুলোই অবৈধ বলে গণ্য হবে এবং সেগুলো আর পাঠানো সম্ভব হবে না।

আমার ধারণা, মার্কিন সিনেটের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট সদস্য এই ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক। যদি যুক্তরাষ্ট্রে একজন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তবে এই নীতিগুলো কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন পদক্ষেপ নেয়, তবে ইউরোপও হয়তো একই পথ অনুসরণ করবে। এটি একটি সম্ভাবনা, তবে এর বিপরীতটিও হতে পার। আমেরিকা হয়তো আরও বেশি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যেখানে অবাধ নির্বাচন বা এই ধরণের গণতান্ত্রিক চর্চাই আর টিকে থাকবে না।

আপনি আপনার বইয়ে বলেছে— ‘ঐতিহাসিক অবিচার হয়তো পুরোপুরি মেটানো সম্ভব নয়, কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রচেষ্টা যত বেশি আন্তরিক হবে, প্রকৃত সমঝোতার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।’ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের (যারা আদিবাসীদের উৎখাত ও বাস্তুচ্যুত করেছিল) তুলনাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন সব মানুষের হাতে যারা অন্য জায়গা থেকে এসে সেখানকার আদিবাসীদের সরিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সত্য নয়; অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা এবং কানাডার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ইতিহাসের গভীরে গেলে এমন আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। তবে আমি এখানে কিছু পার্থক্য দেখি। জায়নবাদী আন্দোলনের মধ্যে সুস্পষ্ট ‘সেটলার কলোনিয়াল’ বা ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনের বৈশিষ্ট্য ছিল। এমনকি থিওডোর হার্জল নিজে এবং জাবোটিনস্কির মতো জায়নবাদী নেতারাও এটি স্বীকার করেছেন।

একই সঙ্গে এটি ছিল একদল নিপীড়িত মানুষের আশ্রয় খোঁজার আন্দোলন। এটি যেমন একধারে ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপন ছিল, তেমনি ছিল ইউরোপে অনিরাপদ হয়ে পড়া ইহুদিদের জন্য একটি শরণার্থী আন্দোলন। তাদের অনেকে নিজের চোখের সামনে পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন হতে দেখেছেন এবং ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকেই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বিপরীতে যারা যুক্তরাষ্ট্রে বসতি স্থাপন করতে এসেছিলেন তাদের অনেকে আশ্রয়ের খোঁজে এলেও তারা ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে আসা ইহুদিদের মতো ততটা অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে বা বিপদে ছিলেন না।

আরেকটি পার্থক্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক ছিল। সেখানে আদিবাসীরা এখনও টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত যুক্তরাষ্ট্রে তাদের এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে যে তারা রাজনৈতিক প্রতিরোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

হয়তো পরিস্থিতির ভিন্নতাও এর একটি কারণ। আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে অন্য জায়গায় কী ঘটছে তা সরাসরি দেখা যায়। হয়তো সবকিছু সত্ত্বেও এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা বা বাধা রয়ে গেছে, যা উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকিয়ে দিচ্ছে..

আমি মনে করি এই মুহূর্তের জন্য এটি একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই আগের চেয়ে আলাদা কোনো পৃথিবীতে বাস করছি নাকি করছি না? উনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে যা করা সম্ভব হয়েছিল, তা কি বর্তমান যুগে অসম্ভব? নাকি এখনও তা করা সম্ভব? এটি একটি বড় এবং অমীমাংসিত প্রশ্ন।

সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত লেখকের সকল ধরনের বক্তব্যের সাথে মধ্যপ্রাচ্য ম্যাগাজিনের একমত হওয়া জরুরি নয়। 

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন