মালিতে যে ভূমিকম্প শুরু হয়েছে, তার প্রভাব আমরা আগামী কয়েক বছরে পুরো উত্তর আফ্রিকায় দেখতে পাব

প্রখ্যাত আলজেরীয় বিশ্লেষক রেজা আবু দেরা। ছবি : সংগৃহীত
প্রখ্যাত আলজেরীয় বিশ্লেষক রেজা আবু দেরা। ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে ফ্রান্সের বিদায় এবং রাশিয়ার ‘ওয়াগনার’ বাহিনীর উপস্থিতির মাঝে মালির ভূমিপুত্রদের জাগরণ এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে জর্ডান ভিত্তিক জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘ইয়ারমুক টিভি’ (Yarmouk TV)-এর জনপ্রিয় পডকাস্ট অনুষ্ঠান ‘আল-ক্বনাত আত-তাসিয়া’ (The Ninth Studio)-তে সম্প্রতি উপস্থিত হয়েছিলেন প্রখ্যাত আলজেরীয় বিশ্লেষক রেজা আবু দেরা। উপস্থাপক আলা আল-দিনের নেওয়া এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটির বাংলা সংস্করণ মধ্যপ্রাচ্যের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

আলা আল-দিন: সুধী দর্শক, আসসালামু আলাইকুম। আল-ক্বনাত আত-তাসিয়া‘-এর আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাদের স্বাগতম। এই স্টুডিওতে মালির পরিস্থিতি নিয়ে যিনি প্রথম আলোকপাত করেছিলেন, তিনিই আমাদের আজকের অতিথি- বিশিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষক জনাব রেজা আবু দেরা। রেজা ভাই, আপনাকে স্বাগতম।

রেজা আবু দেরা: আপনাকেও ধন্যবাদ। আজকে আমরা মালি এবং এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আলা আল-দিন: আপনি আগেও মালির পরিস্থিতির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। বর্তমানে মালি কেবল একটি আঞ্চলিক অস্থিরতার নাম নয়, বরং এটি পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষমতার মানচিত্র বদলের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্রোহীদের রাজধানী অভিমুখে অগ্রযাত্রা আর সামরিক জান্তার অসহায়ত্ব- সব মিলিয়ে কি আমরা কাবুলের পতনের মতো কোনো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখতে যাচ্ছি? দীর্ঘ ৭০ বছরের বৈদেশিক নির্ভরতা আর অভ্যন্তরীণ শাসনের ব্যর্থতা কি মালিকে এক বড় বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

রেজা আবু দেরা: দেখুন ভাই, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মুসলিম বিশ্বের তিনটি প্রধান কৌশলগত স্নায়ুকেন্দ্র বা ‘ভাইটাল নার্ভ’-এ বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। এই পরিবর্তনগুলো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ১. প্রথমটি ছিল ২০২১ সালে আফগানিস্তানে আমেরিকার পরাজয়। এটি একটি বিশ্ব কাঁপানো ‘জিও-মিলিটারি’ শক ছিল, যা পশ্চিমা লিবারেল আটলান্টিক ব্লকের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে। ২. দ্বিতীয়টি হলো ২০২৪ সালে সিরিয়ায় আসাদ শাসনের পতন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লড়াইয়ের মাধ্যমে ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি ব্যবস্থার অবসান ঘটল। ৩. আর বর্তমানে আমরা যা দেখছি, তা হলো মালির পরিবর্তন। একে আমি ‘আফ্রিকার আন্দালুস’ বা ‘আফ্রিকার কুদস’ (জেরুজালেম) বলি। এটি উম্মাহর সেই অবহেলিত অংশ, যাকে আমরা দীর্ঘ ১৫০ বছর ধরে ভুলে ছিলাম।

আলা আল-দিন: (বিস্মিত হয়ে) আপনি মালিকে সিরিয়া বা আফগানিস্তানের সমপর্যায়ে নিয়ে আসছেন! অনেকে হয়তো বলতে পারেন, কোথায় সিরিয়া আর কোথায় মালি? মালির গুরুত্ব আসলে ঠিক কোথায়?

রেজা আবু দেরা: দেখুন, আফগানিস্তানের ধাক্কাটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এর ফলে পুতিন ইউক্রেনে প্রবেশের সাহস পেয়েছেন, চীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকাকে টেক্কা দিচ্ছে। এমনকি আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলোও এখন ওয়াশিংটনকে আগের মতো মানছে না। আর সিরিয়ার ঘটনায় একটি আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িক প্রজেক্টের অবসান হয়েছে।

কিন্তু আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, বর্তমানে মালিতে যা ঘটছে, কৌশলগত দিক থেকে তা সিরিয়ার ঘটনার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।

আলা আল-দিন: সিরিয়ার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ? আপনি কি এটি বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলছেন, নাকি ফ্রান্সকে তাড়ানোর পর থেকে যা ঘটছে তার কথা বলছেন?

রেজা আবু দেরা: ২০২২ থেকে ২০২৬, এই চার বছর ধরে যা ঘটছে তা একই সুতোয় গাঁথা। এটি মুসলিম উম্মাহর ‘দক্ষিণ কৌশলগত করিডোর’ (Southern Strategic Corridor)। এতদিন এই অঞ্চলটি ফরাসি ও রুশদের একক প্রভাব বলয়ে ছিল। এখানকার মানুষ এখন তাদের নিজস্ব পরিচয়, ধর্ম ও গোত্রীয় ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ফিরে পেতে চাইছে।

আলা আল-দিন: ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে এর সম্পর্ক কী?

রেজা আবু দেরা: ইউক্রেন এখন এমন এক বধ্যভূমি যেখানে রুশ প্রজেক্ট আর ইউরোপীয় প্রজেক্ট, উভয়েরই অস্তিত্ব সংকটে। ইউক্রেনে যে পক্ষ জিতবে, তারাই পুরো ‘ইউরেশিয়া’ (ইউরোপ ও এশিয়া) অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করবে। আর ঠিক এই সময়েই আফ্রিকার মালিতে যে ভূ-কম্পন শুরু হয়েছে, তা পশ্চিমা বিশ্বের ‘দক্ষিণ দুয়ার’ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আফগানিস্তান বিশ্বকে অস্থির করে দিয়েছে, তুফান আল-আকসা উম্মাহকে জাগিয়েছে, সিরিয়া পূর্ব বলয় থেকে মুক্তি দিয়েছে, আর মালির এই আগুন পশ্চিম আফ্রিকার বাকি অংশকে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলমুক্ত করার অনুপ্রেরণা যোগাবে।

আলা আল-দিন: এটি আমাদের কাছে একদমই নতুন একটি দৃষ্টিভঙ্গি। আপনি মালিকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য এত বড় মোড় পরিবর্তনকারী মনে করছেন এবং ‘আফ্রিকার কুদস’ বা জেরুজালেম হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আজকের এই মানচিত্রের প্রেক্ষাপটে আপনি বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

রেজা আবু দেরা: ধন্যবাদ ভাই। বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য আমি একটি উদাহরণ দিচ্ছি। (মানচিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে) এই মানচিত্রটি দেখুন এবং কল্পনা করুন এমন একজন মানুষের কথা, যে দীর্ঘ ১৫০ বছর ধরে বেঁচে আছে। কিন্তু এই দীর্ঘ দেড় শতাব্দী ধরে সে তার শরীরের হাত-পা বা অন্য কোনো অঙ্গের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেনি। তার চেতনায় সে ছিল কেবল একটি মস্তিষ্ক আর ধড়; সে জানত না বাহু, আঙুল বা পায়ের ব্যবহার কী।

এখন ভাবুন, হঠাৎ একদিন সে পূর্ণ সচেতনভাবে তার প্রতিটি অঙ্গের অস্তিত্ব টের পেতে শুরু করল। সেই মানুষটির মানসিক অবস্থা তখন কেমন হবে? গত ১০০ বছরে মুসলিম উম্মাহর অবস্থাও ঠিক এমন ছিল। আফ্রিকার এই বিশাল মুসলিম জনপদ সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অবচেতন ছিলাম।

আলা আল-দিন: আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে এটি কেবল ফ্রান্স-রাশিয়ার ক্ষমতার লড়াই বা কোনো সাধারণ সামরিক অভ্যুত্থান নয়? আপনি কি একে একটি বৃহত্তর ‘সভ্যতার রূপান্তর’ হিসেবে দেখছেন?

রেজা আবু দেরা: একদম ঠিক। ফ্রান্স-রাশিয়া বা আমেরিকা-চীনের যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আফ্রিকায় চলছে, সেটি ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি অংশ মাত্র। কিন্তু তার চেয়ে বড় সত্য হলো; উম্মাহ আজ তার শরীরের একটি দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত অংশের অস্তিত্ব নতুন করে টের পাচ্ছে। সাহেল আফ্রিকা সম্পর্কে আমরা কতটুকুই বা জানি?

কে জানে ‘কানাম’ (Kanem) খেলাফতের কথা, যা টানা ৯ শতাব্দী স্থায়ী হয়েছিল? কিংবা ৪শ বছর টিকে থাকা গৌরবোজ্জ্বল মালি সাম্রাজ্যের কথা? সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে দীর্ঘতম খেলাফতগুলো ছিল আফ্রিকায়। উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং ওসমানীয় খেলাফতের মোট সময়কাল একত্রিত করলেও সেটি এই আফ্রিকান খেলাফতগুলোর ১০৩২ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসের সমান হবে না। আমরা কোনো সামান্য বিষয় নিয়ে কথা বলছি না বরং, আমরা ১০৩২ বছরের এক বিশাল ইতিহাসের কথা বলছি।

আলা আল-দিন: ১০৩২ বছর! এটি তো অবিশ্বাস্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কেন মালি বা কিদালকে (Kidal) আজ চিনি না? ভৌগোলিক দূরত্ব কি আমাদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, না কি অন্য কিছু?

রেজা আবু দেরা: দেখুন, উত্তর মালির এই ‘কিদাল’ শহরটি ৪শ বছর ধরে মুসলিমদের রাজধানী ছিল। সেখানে ছিল তৎকালীন ইসলামি বিশ্বের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এক সময় মক্কা, আল-আজহার কিংবা কাইরুয়ানের জাইতুনা থেকে মানুষ মালিতে আসত জ্ঞান অর্জনের সন্ধানে। আজ থেকে মাত্র ২০০ বছর আগেও মালি ছিল বিশ্বের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু ফরাসি উপনিবেশবাদ বা ‘ইস্তিদমার’ (উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞ) এমনভাবে এই ইতিহাস মুছে দিয়েছে যে, আমরা ভুলেই গেছি আমাদের শরীরের এই অঙ্গটি অস্তিত্বশীল। মুসলিম উম্মাহ একসময় এক সুতোয় গাঁথা ছিল, কিন্তু যখন একে ভাগ করা হলো, তখন তা করা হয়েছিল তিনটি প্রধান কৌশলগত করিডোর অনুযায়ী।

আলা আল-দিন: সেই করিডোরগুলো কী কী?

রেজা আবু দেরা: আমরা যদি এই সভ্যতাগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট না বুঝি, তবে ক্ষমতার ভারসাম্যের এই লড়াই আমরা কখনোই ব্যাখ্যা করতে পারব না। আসুন, আমরা দ্বিতীয় মানচিত্রটির দিকে লক্ষ্য করি, যাতে দর্শকরা বুঝতে পারেন মুসলিম উম্মাহর সাথে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কেন মালির এই জাগরণ পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

রেজা আবু দেরা: (মানচিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে) আলা ভাই, বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের ইতিহাসের সেই ‘কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ (Network of Strategic Control) দেখতে হবে যা আজ আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনি কি মধ্য এশিয়ার ‘গোল্ডেন হোর্ড’ বা সোনালী বাহিনীর কথা শুনেছেন? মস্কোর শাসকরা যাদের টানা ২৭০ বছর কর দিতে বাধ্য হতো! ভারতের ১০০০ বছরের খেলাফত কিংবা আফ্রিকার সোনজাই ও তিম্বাকতু সাম্রাজ্য, এগুলো কিন্তু কোনো রূপকথা নয়।

আলা আল-দিন: আপনি বলতে চাচ্ছেন এই কেন্দ্রগুলোই একসময় বিশ্ব শাসন করত? 

রেজা আবু দেরা: একদম তাই। এই কেন্দ্রগুলো একসময় পৃথিবীকে শাসন করত। তারা এমন এক ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত কাঠামো (Demography) তৈরি করেছিল যাদের বিশ্বাস, ইবাদতের ভাষা এবং আইন বা শরিআহ ছিল এক ও অভিন্ন। ইবনে বতুতার যুগে একজন মুসলিম মালিতে জন্ম নিয়ে আজহারে পড়াশোনা করতেন, বাগদাদে বিচারপতির দায়িত্ব পালন করতেন এবং খোরাসানে গিয়ে শাসন করতেন—এটিই ছিল আমাদের শক্তির আসল ভিত্তি।

আলা আল-দিন: এই অখণ্ড শক্তি কীভাবে খণ্ডবিখণ্ড হলো? আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব কী?

রেজা আবু দেরা: ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যখন এই অঞ্চল দখল করল, তারা পুরো মুসলিম বিশ্বকে তিনটি প্রধান ‘কৌশলগত করিডোর’ বা ‘সিল্ক রোড’-এ ভাগ করে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিল:

১. উত্তর করিডোর (Northern Corridor): আফগানিস্তান থেকে ভারত পর্যন্ত এই প্রাচীন রেশম পথটি রাশিয়া এবং তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হলো। ২. সামুদ্রিক করিডোর (Marine Corridor): আটলান্টিক থেকে সুয়েজ খাল ও আরব সাগর হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এই নৌপথটি দখল করল ব্রিটেন, যা বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতির মূল ধমনী। ৩. দক্ষিণ করিডোর (Southern Corridor): এটি হলো সাহেল আফ্রিকা বা মহাদেশের অভ্যন্তরীণ পথ, যার নিয়ন্ত্রক ছিল ফ্রান্স।

আলা আল-দিন: তাহলে বর্তমানে কি এই তিনটি পথেই বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি?

রেজা আবু দেরা: ঠিক তাই! ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। আফগানিস্তানের ঘটনায় ‘উত্তর করিডোর’ কেঁপে উঠেছে। ‘তুফান আল-আকসা’ এবং সিরিয়ার পরিস্থিতিতে ‘সামুদ্রিক করিডোর’ আজ উত্তাল। আর বর্তমানে মালি ও লিবিয়ার ঘটনাবলির মাধ্যমে ‘দক্ষিণ করিডোর’ তার শিকল ভাঙছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটি করিডোর এখন তার প্রকৃত মালিকদের ডাক দিচ্ছে। এটি কোনো সাময়িক শূন্যতা নয় যে, এক পরাশক্তি চলে গেলে অন্য কেউ এসে দখল করবে; বরং এটি হলো ভূমিপুত্রদের নিজের সম্পদ ও পথের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার লড়াই।

আলা আল-দিন: রেজা ভাই, বিশ্লেষকরা হয়তো বলবেন; সশস্ত্র কিছু গোষ্ঠী কিদালের (Kidal) মতো একটি শহর দখল করলেই কি তাকে এত বড় বৈশ্বিক বিপ্লব বলা যায়? আপনি কি একে একটু অতিরঞ্জিত করে দেখছেন না?

রেজা আবু দেরা: (হেসে) আপনি যদি পশ্চিমা একাডেমিকের চশমা দিয়ে দেখেন, তবে আপনার কাছে একে ‘অতিরঞ্জিত’ মনে হওয়া স্বাভাবিক। পশ্চিমা থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বলে, ‘ফ্রান্স চলে গেছে, রাশিয়া সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে’। যেন এখানকার মানুষগুলো নিজস্ব কোনো সত্তাহীন, কেবল কীটপতঙ্গ বা দাবার ঘুঁটি!

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরাও অনেক সময় এই একই পশ্চিমা পরিভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু সত্য হলো, এটি ‘শূন্যস্থান পূরণ’-এর লড়াই নয়; এটি ভূমিপুত্রদের জেগে ওঠার গল্প। তারা যখন কিদাল জয় করতে যাচ্ছে, তারা আসলে তাদের ৪০০ বছরের পুরনো রাজধানীকে ফিরে পাওয়ার মিশন শুরু করতে যাচ্ছে। এই সত্যটি আমাদের অনুধাবন করতে হবে।

আলা আল-দিন: অনেক বিশ্লেষক বলছেন ফ্রান্স চলে যাওয়ার পর রাশিয়ার ‘ওয়াগনার’ বাহিনীর প্রবেশ মালিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে। কিন্তু আপনি একে অন্যভাবে দেখছেন। কেন?

রেজা আবু দেরা: দেখুন, যখন এক বিদেশি দখলদারকে হটিয়ে আরেক বিদেশি ভাড়াটে খুনি বাহিনীকে আনা হয়, তখন পশ্চিমা পণ্ডিতরা একে ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বলেন। কিন্তু যখন সেই মাটির সন্তানেরা নিজেদের ভূমি ও সম্পদ উদ্ধারে লড়াই করে, তখন বলা হয় ‘মালি বিশৃঙ্খলার দিকে যাচ্ছে’।

আমার প্রশ্ন হলো, মালি কি আগে খুব শান্তিতে ছিল? ফরাসিরা কি সেখানে সমৃদ্ধি এনেছিল? দশকের পর দশক ধরে তারা মালিকে দারিদ্র্যের অতলে ডুবিয়ে রেখেছে। অথচ মালি এবং পুরো সাহেল আফ্রিকায় যে পরিমাণ স্বর্ণের মজুদ আছে, তা দিয়ে আগামী ১০০০ বছর এই অঞ্চলটি অনায়াসে চলতে পারবে। রাশিয়ার ওয়াগনার বাহিনী সেখান থেকে প্রতি মাসে ১০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের স্বর্ণ কেবল বেতন হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে। মালির মানুষ দারিদ্র্যে ধুঁকছে, অথচ তাদের মাটির নিচে স্বর্ণের খনি!

আলা আল-দিন: আপনি কিদাল শহরটিকে বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই শহরটি দখল করা কি কেবল একটি সামরিক বিজয়?

রেজা আবু দেরা: একদমই নয়! কিদাল জয় করা একজন ফিলিস্তিনির জন্য কুদস বা জেরুজালেম মুক্ত করার মতোই পবিত্র ও আবেগপূর্ণ বিষয়। কিদাল ছিল সেই খেলাফতের রাজধানী যা ১০৩২ বছর টিকে ছিল।

যারা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে কিদাল জয় করছে, তাদের মনে নিজেদের হারানো ঐতিহ্য ও রাজধানী উদ্ধারের চেতনা কাজ করছে। এই মানুষগুলো মরুভূমির সন্তান, যাদের আধুনিক পশ্চিমা ভোগবাদ বা তথাকথিত ‘মডার্নিজম’ বশ করতে পারেনি। তাদের কলিজাটা এখনো স্বাধীন।

আলা আল-দিন: কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তো এদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বা ‘চরমপন্থী’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে। আল-কায়েদার সাথে এদের সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

রেজা আবু দেরা: (হেসে) এটি নিছক অপপ্রচার। পশ্চিমা গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ীই ২০০৭ সালের পর সেই পুরনো আল-কায়েদার অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে। বর্তমানে যারা লড়ছে, তারা এই মাটির সন্তান। যখন সামরিক জান্তা রাশিয়ার মাফিয়াদের সাথে হাত মেলায়, তখন কেউ প্রশ্ন তোলে না। কিন্তু যখন মালির ইসলামি, জাতীয়তাবাদী এবং সেকুলার গোষ্ঠীগুলো দেশের স্বাধীনতার জন্য একজোট হয়, তখনই সেটা ‘ভয়ংকর জোট’ হয়ে যায়!

আমি আজ একটি বড় দাবি করছি, সাহেল আফ্রিকার মানুষের মধ্যে বর্তমানে যে স্তরের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা সিরিয়া, মিশর বা ইরাকের মানুষের চেয়েও অনেক বেশি প্রখর।

আলা আল-দিন: (বিস্মিত হয়ে) এটি তো অনেক বড় দাবি! এর পক্ষে আপনার প্রমাণ কী?

রেজা আবু দেরা: আমি দুটি বিষয় দিয়ে এটি প্রমাণ করতে পারি। প্রথমত, সেখানকার সেকুলার ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোও এখন বুঝতে পেরেছে যে, ইসলামি আদর্শ ছাড়া মালির মুক্তি সম্ভব নয়। গত ৭০ বছরের জাতীয়তাবাদ তাদের কেবল বিভক্তই করেছে। দ্বিতীয়ত, তারা বুঝেছে কেবল ‘শরিআহ’ই পারে বিভিন্ন বিবাদমান গোত্রের মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগে আমরা দেশ মুক্ত করব, তারপর ক্ষমতা ভাগাভাগি করব। আমেরিকা, রাশিয়া বা ফ্রান্সের দালালি করার চেয়ে নিজেরা মিলেমিশে থাকা অনেক ভালো। এই পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিপক্বতা সত্যিই অভাবনীয়।

একবার আমি একটি লাইভ অনুষ্ঠানে ‘আজওয়াদ’ প্রতিনিধি এবং ইসলামি গোষ্ঠীর মুখপাত্রের সাথে কথা বলছিলাম। আমি তাদের বললাম: ভাই, আপনারা ফ্রান্সের চেয়েও আড়াই গুণ বড় একটি এলাকা স্বাধীন করতে যাচ্ছেন! পুরো ফ্রান্সকে আপনারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেও আরও একটি ফ্রান্স আর একটি বেলজিয়াম বাড়তি থেকে যাবে। আসলে দীর্ঘদিনের পরাধীনতা আমাদের নিজেদের ভূখণ্ডের বিশালতা সম্পর্কে অচেতন করে রেখেছে।

ভাবুন তো, সাহেল আফ্রিকা অঞ্চলে বর্তমানে কোনো স্বৈরাচারী কেন্দ্রীয় শাসন নেই। সেখানকার মানুষ প্রথমবারের মতো তাদের খনিজ সম্পদ ও মাটির অধিকার বুঝে পাচ্ছে। আমরা প্রায় ৯০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে কথা বলছি। পুরো ইউরোপ মহাদেশের আয়তন যেখানে ১১ লক্ষ বর্গকিলোমিটার, সেখানে আমরা প্রায় একটি মহাদেশের সমান ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা করছি! আমি তাদের বললাম, নিজেদের মধ্যে না লড়ে এলাকাগুলো ভাগ করে নিন এবং শরিয়াহর অধীনে ঐক্যবদ্ধ হোন। ২০২৪ সালে তারা এই পরামর্শ গ্রহণ করেছিল এবং ২০২৬ সালে আজ আমরা তার সুফল দেখছি।

আলা আল-দিন: কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কি ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের অভিযোগ নেই? বিদেশি শক্তির কোনো সমর্থন কি এখানে কাজ করছে না?

রেজা আবু দেরা: দেখুন, ছায়াযুদ্ধের বিভিন্ন স্তর থাকে। তবে বর্তমানে মালির পরিস্থিতি ভিন্ন। বিদেশি শক্তিগুলো এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটে এতই জর্জরিত যে, তারা নতুন কোনো বড় জোটে জড়াতে পারছে না। আমেরিকা বর্তমানে ইরানে বড় কোনো সৈন্যবাহিনী পাঠানোর সাহস পায় না, তাদের মোতায়েনকৃত সৈন্যসংখ্যাও অনেক কমে এসেছে। ফ্রান্স ২০১৩ সালে যেভাবে ইউরোপীয় জোট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আজ তারা একজন জিন্দা সৈন্য পাঠানোর ক্ষমতা রাখে না। তারা কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু আফ্রিকার ভূমিপুত্রদের পুনর্জাগরণ ঠেকাতে পারছে না। আজ ফিলিস্তিন, সিরিয়া কিংবা মালি, সবখানেই ছাইচাপা আগুন থেকে মুসলিমরা জেগে উঠছে।

আলা আল-দিন:  ডামাডোলের এই পরিস্থিতিতে আলজেরিয়ার ভূমিকা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্রোহীদের সমর্থন দেওয়া বা মধ্যস্থতা করার বিষয়ে। এ ক্ষেত্রে আলজেরিয়ার অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

রেজা আবু দেরা: আলজেরিয়া আসলে নিজেই একটি ফাঁদে পড়ে গেছে। তারা তাদের সামরিক দর্শনের (Military Doctrine) আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত আলজেরিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান শত্রু ছিল ‘ফ্রান্স’। এটি যদি বজায় থাকত, তবে আজ মালি বা পুরো সাহেল আফ্রিকার দৃশ্যপট ভিন্ন হতো। আলজেরিয়া আজ ৯টি দেশের একটি বিশাল ব্লকের নেতৃত্বে থাকত এবং কোনো বিদেশি শক্তির সেখানে ঢোকার সাহস হতো না।

আলা আল-দিন: সামরিক দর্শনের এই পরিবর্তন কীভাবে আলজেরিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করল?

রেজা আবু দেরা: আলজেরিয়ার স্বাধীনতার ইশতেহারে স্পষ্ট বলা ছিল, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত কুদস বা জেরুজালেম মুক্ত না হবে, ততক্ষণ আলজেরিয়ার স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না।’ তারা আলজেরিয়াকে পুরো উত্তর আফ্রিকার স্বাধীনতার চালিকাশক্তি মনে করত। কিন্তু পরবর্তীতে ফরাসি মদদপুষ্ট কিছু কর্মকর্তার প্রভাবে সেনাবাহিনীর এই দর্শনে পরিবর্তন আনা হয়। তারা ফ্রান্সের বদলে মরক্কোকে ‘প্রথাগত শত্রু’ এবং ইসলামপন্থীদের ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।

এই পরিবর্তনের ফলে তারা মরক্কোকে কোণঠাসা করতে গিয়ে ফ্রান্সের কাছাকাছি চলে যায়। এতে করে তারা নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব হারায় এবং সাহেল আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে তাদের সেই ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সম্পর্কটি ছিন্ন হয়ে যায়। আজ মালির যুবকরা যা করছে, তা আসলে সেই হারানো আদর্শেরই প্রতিফলন, যা আলজেরিয়া একসময় ধারণ করত।

আলজেরিয়া যখন ফ্রান্সের সহায়তায় মরক্কোকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করল, মরক্কো তখন বসে থাকেনি। তারা পালটা আমেরিকা, ব্রিটেন এমনকি ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সাথে জোট বাঁধল। একদিকে আলজেরিয়ার বর্তমান সামরিক জান্তা মরক্কোকে শ্বাসরুদ্ধ করতে চাইছে, অন্যদিকে মরক্কো ইসরায়েলি প্রভাবে পুরো দক্ষিণ অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে চাইছে। এই দুই দেশের রেষারেষিতে মালির মতো দেশগুলো এখন বৈশ্বিক পরিবর্তনের দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আলা আল-দিন: কিন্তু এই লড়াইয়ে রাশিয়া বা পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা কী? আপনি কি কোনো ‘পর্দার আড়ালের সমঝোতা’ দেখছেন?

রেজা আবু দেরা: অবশ্যই। এখানে একটি বড় ধরনের ‘প্যাকেজ ডিল’ বা বিনিময় হয়েছে। আমেরিকা, ব্রিটেন এবং রাশিয়ার মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি হয়েছে; তা হলো ‘লিবিয়ার বিনিময়ে সিরিয়া’। অর্থাৎ, রাশিয়াকে সিরিয়া থেকে প্রভাব কমিয়ে লিবিয়া হয়ে সেনেগাল পর্যন্ত এই দক্ষিণ করিডোরে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। আর এই চুক্তির ফলেই ‘ওয়াগনার’ বাহিনী আফ্রিকার ছয়টি দেশে তাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এর মাঝে আজওয়াদ (Azawad) বা মালির মাটির মানুষেরা আসলে পরাশক্তিগুলোর এই হিসাব-নিকাশের বলি হতে যাচ্ছিল।

আলা আল-দিন: আপনি আলজেরিয়ার সামরিক দর্শনের পরিবর্তনের কথা বলছিলেন। যদি বিদ্রোহী যোদ্ধারা মালির রাজধানী দখল করে নেয়, তবে কি আলজেরীয় সেনাবাহিনী সরাসরি সেখানে হস্তক্ষেপ করবে?

রেজা আবু দেরা: এটি একটি বড় প্রশ্ন। গত কয়েক বছর আগে আলজেরিয়া তাদের সংবিধানে একটি সংশোধনী এনেছে, এটির মাধ্যমে তারা তাদের দেশের বাইরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। এর আগে আলজেরিয়ার নীতি ছিল সীমানার বাইরে যুদ্ধ না করা। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর ঘোর বিরোধী, কারণ এতে ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।

আলজেরিয়ার বর্তমান সেকুলার সামরিক নেতৃত্ব ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’-এর দোহাই দিয়ে তাদের সীমান্তে কোনো ‘ইসলামি ইমারাত’ বা শরিআহ-ভিত্তিক শাসন মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। তারা আজওয়াদ বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছিল কেবল একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ বেষ্টনী তৈরির জন্য, যাতে মালির মূল ভূখণ্ডের ইসলামি প্রভাব আলজেরিয়ায় ঢুকতে না পারে।

আলা আল-দিন: তাহলে আজওয়াদ বিদ্রোহী এবং ইসলামি যোদ্ধাদের (JNIM) মধ্যকার বর্তমান জোটকে আপনি কীভাবে দেখছেন? তাদের লক্ষ্য কি এখন এক?

রেজা আবু দেরা: আজওয়াদ বিদ্রোহীরা এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে। তারা একদিকে আলজেরিয়াকে হারাতে চায় না, অন্যদিকে মালির মুক্তির জন্য ইসলামি যোদ্ধাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প নেই। তবে আশার কথা হলো, মালির ইসলামি যোদ্ধাদের বর্তমান ভাষা বা অবস্থান আগের আল-কায়েদা বা আইএসের মতো উগ্র নয়। তারা অনেক বেশি নমনীয়, জাতীয় ঐক্যে বিশ্বাসী এবং আফ্রিকার মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তারা শরিআহ্‌’র প্রশ্নে আপসহীন, কিন্তু কৌশলগত ঐক্যে অত্যন্ত বাস্তববাদী।

আলা আল-দিন: মালির এই পুরো পরিস্থিতিকে আপনি এক কথায় কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রেজা আবু দেরা: দেখুন, ফ্রান্সকে যেভাবে মালি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তা প্যারিসের জন্য ছিল চরম লজ্জাজনক। ফ্রান্স এখনো সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। এখন ফ্রান্স ও আলজেরিয়া উভয়েই রাশিয়ার সেই ‘ভাড়াটে সাফল্য’ নষ্ট করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সত্য হলো, মৌরিতানিয়া থেকে চাদ পর্যন্ত পুরো সাহেল অঞ্চলের ‘তুয়ারেগ’ বা আজওয়াদরা বুঝে গেছে যে, আলাদা আলাদা গোত্র হয়ে থাকলে তারা কেবল শোষিতই হবে। যখনই তারা ইসলামি আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই তারা রাজধানীর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছে। এই ঐক্যই এখন পশ্চিম আফ্রিকার ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

আলা আল-দিন: একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আলজেরিয়া তো রাশিয়ার কৌশলগত মিত্র। তাহলে আলজেরিয়া কেন মালিতে রুশ সমর্থিত সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে? এটি কি স্ববিরোধী নয়?

রেজা আবু দেরা: এটি বোঝার জন্য আপনাকে আলজেরিয়া-রাশিয়া সম্পর্কের সমীকরণটি বুঝতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া উত্তর আফ্রিকায় যা কিছু করত, তা আলজেরিয়াকে কেন্দ্র করেই করত। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সিরিয়া সংকটের পর রাশিয়া যখন কোণঠাসা হয়ে পড়ল, তারা আলজেরিয়াকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি মালির সামরিক জান্তার সাথে চুক্তি করে ফেলল।

আলজেরিয়া এতে নিজেকে ‘পিঠে ছুরিকাঘাত’ করা হয়েছে বলে মনে করছে। তারা রাশিয়াকে ব্যবহার করে মরক্কোকে ঘেরাও করতে চেয়েছিল, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মরক্কো এবং রাশিয়া মিলে উল্টো আলজেরিয়াকেই ঘিরে ফেলছে। এখন আলজেরিয়া বিদ্রোহীদের উসকে দিয়ে রাশিয়াকে চাপে ফেলতে চাইছে, যাতে রাশিয়া আবার আলজেরিয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই নোংরা খেলায় রাশিয়া বা আলজেরিয়া কেউ জিতছে না। লাভ হচ্ছে কেবল মালির মাটির সন্তানদের। তারা এই সুযোগে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করছে।

আলা আল-দিন: আপনি বলছেন আলজেরিয়া বা মরক্কো কেউ এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না?

রেজা আবু দেরা: মরক্কো অনেক চতুরতার সাথে আমেরিকার অংশীদার হিসেবে ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’-এর কার্ড খেলছে, কিন্তু দিনশেষে তারাও আতঙ্কিত। আলজেরিয়ার সমস্যা হলো তাদের সেনাবাহিনী গত ৩০ বছর ধরে কেবল ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না। তাদের মগজে কেবল সন্ত্রাসবাদের জুজু ঢুকে আছে। তারা বুঝতেই পারছে না যে বিশ্ব বদলে গেছে। আফগানিস্তানে কী হয়েছে, সিরিয়া বা সাহেল আফ্রিকায় কী ঘটছে, এসব থেকে তারা শিক্ষা নেয়নি।

আলা আল-দিন: আপনি একটু আগে একটি বিশাল দাবি করেছেন, মালির এই আগুনের শিখা মিশর, আলজেরিয়া এবং মরক্কোতেও পৌঁছাবে। এটি কীভাবে সম্ভব? এই দেশগুলো তো সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে অনেক স্থিতিশীল।

রেজা আবু দেরা: (দৃঢ়তার সাথে) এই পরিবর্তন কেবল সম্ভব নয়, এটি নিশ্চিত। মালিতে যে ভূমিকম্প শুরু হয়েছে, তার প্রভাব আমরা আগামী কয়েক বছরে পুরো উত্তর আফ্রিকায় দেখতে পাব। ২০২২ সালে যখন ফ্রান্সকে মালি থেকে তাড়ানো হয়েছিল, তার ফলাফল আমরা আজ ২০২৬ সালে এসে দেখছি।

মনে রাখবেন, ইসলামি আদর্শের এই যে পুনর্জাগরণ, তা সীমানা মানে না। মিশর, আলজেরিয়া এবং মরক্কো- এই তিনটি দেশই বর্তমানে স্থিতিশীল মনে হলেও ভেতর থেকে তারা পরিবর্তনের অপেক্ষায় ধুঁকছে। মালির এই বিজয় পুরো অঞ্চলের অবদমিত মানুষের মনে এই একটি বার্তা দিচ্ছে, বিদেশি শক্তি বা তাদের দালালদের হারানো সম্ভব।

আলা আল-দিন: এটি তো অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর একটি বিশ্লেষণ! মিশর বা আলজেরিয়ার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রে কীভাবে এই ঢেউ আছড়ে পড়বে, তা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। দর্শকদের অনুরোধ করছি, এই রোমাঞ্চকর আলোচনা মিস করবেন না।

রেজা আবু দেরা: ধন্যবাদ। বিষয়টি সত্যিই অনেক গভীর চিন্তার দাবি রাখে।

রেজা আবু দেরা (Reda Abou Draa) একজন বিশিষ্ট আলজেরীয় কৌশলগত বিশ্লেষক, গবেষক এবং লেখক। বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলের সামরিক ডকট্রিন, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর তার অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে তাকে আধুনিক আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূ-রাজনৈতিক চিন্তক মনে করা হয়। এই সাক্ষাৎকারে তিনি মালির বর্তমান সংকটকে কেবল একটি গৃহযুদ্ধ হিসেবে নয়, বরং ইসলামি সভ্যতার হারানো ‘দক্ষিণ করিডোর’ পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক মহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। 

পরবর্তী অংশ মধ্যপ্রাচ্যের জুন প্রিন্ট সংখ্যায় পড়বেন। 

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন