মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্য অর্ডার করতে ক্লিক করুন

তিউনিসীয় বিপ্লবের আর কিছু কি অবশিষ্ট আছে?

tunisia

তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকার ১৭ই ডিসেম্বর বিপ্লব দিবস পালনের ওপর জোর তাগাদা দিচ্ছে, যাতে সরকার প্রমাণ করতে পারে যে তারা সেই গণবিপ্লবেরই ধারক। কিন্তু এই উদযাপন এবং এর সাথে জড়িত স্লোগানগুলো আসলে দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করে দিচ্ছে। বিপ্লব আজ বাস্তব রাজনৈতিক চর্চা থেকে দূরে সরে গিয়ে নিছক একটি স্লোগানে পরিণত হয়েছে। একসময় তিউনিসীয় বিপ্লবকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এক বিপ্লব মনে করা হতো, আরব বিশ্বে যা স্বপ্ন জাগিয়েছিল একটি গণতান্ত্রিক আগামীর। কিন্তু অন্যান্য বিপ্লবের মতো এটিও এখন আটকে গেছে ক্ষমতার কোন এক ঘোর চক্রে, কোন অন্ধগলিতে। তিউনিসিয়ার পরিস্থিতি আবারও অধিকার ও আযাদির সেই পুরোনো সংগ্রামী অবস্থানে ফিরে গেছে, ২০১৪ সালে গঠিত নয়া সংবিধানের মাধ্যমে যা নিশ্চিত হয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন। বহুত্ববাদ ও ভিন্নমতকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি মুক্ত সমাজ গড়ার প্রচেষ্টা ছিল সেই সংবিধানে। আজ বিপ্লবের ১৪ তম বর্ষে এসে তিউনিসীয় বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা কতটুক অবশিষ্ট আছে?

বিপ্লবের চৌদ্দতম বার্ষিকীতে জনগণের মনে বিপ্লব এখনো জীবন্ত। যদিও এর উদযাপনের তারিখ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে—কেউ বিপ্লব শুরুর দিন ১৭ই ডিসেম্বরকে বিপ্লব দিবস হিসেবে পালন করতে চান, আবার কেউ ১৪ই জানুয়ারি জাইনুল আবেদিন বেন আলীর পলায়নের দিনটিকে বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত হিসেবে বিপ্লবের দিবস হিসেবে দেখেন। এই দুই তারিখের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন এবং বহুদলীয় ব্যবস্থা মুছে ফেলার মাধ্যমে এমন এক একচ্ছত্র ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করেছে, যা স্পষ্টতই স্বৈরতন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।

তিউনিসিয়ার রাজনীতির দিকে তাকালে বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি বিগত দিনের রাজনৈতিক ‘এলিট’ বা অভিজাতদের পুঞ্জীভূত ভুলেরই ফসল। আজমি বিশারার মতে, এখানে ‘এলিট’ বলতে সর্বদা উন্নত বা সভ্য বোঝায় না, বরং প্রভাব ও মর্যাদাকে বোঝায়। তাই বিগত বছরগুলোতে ক্ষমতা দখলকারী শক্তিগুলোর মধ্যকার স্বার্থের সংঘাত ও বৈপরীত্য বোঝা বর্তমান সংকট বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

মনে রাখা প্রয়োজন, গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের শুরুতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে নজর দেওয়া হলেও, সামাজিক সমস্যাগুলোই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। আজমি বিশারা তাঁর ‘দ্য গ্লোরিয়াস তিউনিসিয়ান রেভোলিউশন’ (২০১১) বইয়ে সতর্ক করেছিলেন যে, ‘বিশৃঙ্খলার ভয়ই তিউনিসিয়া বা অন্যত্র প্রতিবিপ্লব এবং পুরনো শাসকের ফিরে আসার প্রধান দরজা হিসেবে ব্যবহার হয়।’ আর এই বিশৃঙ্খলা তৈরির হাতিয়ার ছিল দিনদিন উত্তপ্ত হতে থাকা সামাজিক সমস্যাগুলো। একদিকে ছিল নিজেদের দাবি আদায়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আন্দোলন, আর অন্যদিকে ছিল উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ ও আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর দাবিতে বিশৃঙ্খল অবস্থান কর্মসূচি।

রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতাদর্শগত পার্থক্য সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের ওপর পুরনো শাসকদের অনুসারীদের প্রভাব বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলেছে, বিশেষ করে ২০১১ সালের শীতকালে যে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক দাবিগুলো স্লোগানে উঠে এসেছিল তা এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে ব্যাপক। গণমাধ্যমের স্বৈরাচারের পক্ষের একটা অংশ নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে জনমতকে বিপ্লবের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের একাংশ ভাবতে শুরু করেছিল যে, বিপ্লব থেকে সরে আসলেই হয়তো আর্থ-সামাজিক সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা দ্রুতই প্রমাণ করেছে যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়ার পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট দ্বিগুণ হয়েছে। দেশটি যেন আবার শূন্য বিন্দুতে ফিরে যাচ্ছে, একদিকে ক্ষুব্ধ রাজপথ, অন্যদিকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত সরকার।

রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি এবং গণমাধ্যমের নেতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ থমকে গেছে। এর ফলে পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, আবারও রাজনৈতিক বিচার ও দমন-পীড়ন ফিরে এসেছে। বর্তমান দৃশ্যপট যেন এক গ্রিক ট্র্যাজেডি—যেখানে বিপ্লব উদযাপিত হচ্ছে ইতিহাসে, কিন্তু বাস্তবে মঞ্চায়িত হচ্ছে প্রতিবিপ্লবের নিকৃষ্ট এজেন্ডা। এই পরিস্থিতি ‘তিউনিসীয় ব্যতিক্রম’ (Tunisian Exception)-এর মিথ ভেঙে দিয়েছে এবং আবারও সেই পুরোনো বিতর্ক সামনে এনেছে—আরব বিশ্বে কি আদৌ গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব, নাকি এ অঞ্চলের মানুষকে ‘প্রাচ্যদেশীয় স্বৈরাচারী’ মানসিকতার অধীনেই থাকতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম?

আমাদের আশঙ্কা, তিউনিসিয়ায় এখন বিপ্লবের স্মৃতি ছাড়া হয়তো এর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

সূত্র : আল আরাবি আল জাদিদ, মূল: সামির হামদি