২০২৫ সালের শুরুর দিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘকে বাধ্য হয়ে খাদ্য রেশন অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে, এর ফলে রেশন দাঁড়িয়েছে মাথাপিছু মাসে প্রায় ছয় ডলারে। এই পরিসংখ্যান যেমন নির্মম, ঠিক তেমনি এর প্রতি বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়াও ছিল নীরব ও শীতল। এক দশক আগেও এমন খবর বিশ্বব্যাপী সংবাদেপত্রের শিরোনাম হতো এবং মানবিক উদ্বেগ ও সহানুভূতির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু এখন বিশ্বের নানাবিধ সংকটের চাপে বিষয়টি আজ নিঃশব্দে ইস্যুর ভিড়ে হারিয়ে গেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্য গার্ডিয়ান এই বৈশ্বিক নীরবতার মানবিক প্রতিক্রিয়াকে তুলে ধরে। কক্সবাজারের নিকটবর্তী শরণার্থী শিবিরে থাকা এক রোহিঙ্গা বলেন, আমরা সব আশা হারিয়ে ফেলেছি। তার এই সংক্ষিপ্ত বাক্য শুধু হতাশা নয়; বরং ক্লান্তি ও অসহায়ত্বের মাঝে আটকে থাকা পুরো সংকটের স্পষ্ট বর্ণনা। প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা এখনও অনিশ্চয়তার কারাগারে বন্দি, নিজ দেশের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত, আর নির্বাসিত জীবনে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ থেকেও নিরাশ। যে মানবিক সংকট একসময় আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্র ছিল, তা এখন পরিণত হয়েছে নিছক প্রশাসনিক ফাইল, পরিসংখ্যান এবং অনুদান সংকটের মতো আমলাতান্ত্রিক এক রুটিনে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স সতর্ক করে বলেছে, তহবিল ঘাটতি এখন সরাসরি মানুষের প্রাণঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের ভাষায়, ‘রোহিঙ্গা সংকটের কোনো সমাপ্তি নেই’ এই ধারণা থেকে তৈরি হয়েছে দাতাদের অনীহা (Donor fatigue)। এই পরিবর্তন শুধু নৈতিক নয়, ভাষাগতও। যেই সংকটকে একসময় সংবাদমাধ্যম ‘গণহত্যা’ ও ‘নির্বাসন’ হিসেবে উল্লেখ করত, সেখানে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি’ এবং ‘সম্পদ ঘাটতি’-এর মতো আমলাতান্ত্রিক বাক্যবন্ধ। প্রতিটি শব্দের এই পরিবর্তনই ইঙ্গিত করে, কীভাবে একটি অস্বাভাবিক ও বেদনাবিধুর সংকট দৈনন্দিন ও সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
মার্কিন রাজনৈতিক প্রতিবেদক এম জে লি তার ২০২১ সালের ‘Media Influence on Humanitarian Interventions’ গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, মিডিয়া কাভারেজ সরাসরি মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে প্রভাবিত করে। আর যখন ক্যামেরা সরে যায়, তখনই সহায়তা এবং তহবিলও কমে আসে। রোহিঙ্গা সংকট এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে ট্র্যাজেডি একসময় শত শত ক্যামেরা ও বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের লেন্সে শতাব্দীর অন্যতম নৃশংসতা হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছিল, তা আজ রূপ নিয়েছে নিস্তব্ধ, অব্যক্ত, ও অদৃশ্য পরীক্ষায়।
মিডিয়ার ক্লান্তি ও বিস্মৃতির রাজনীতি
গবেষক এম এস আল-জামানের ২০২৪ সালের গবেষণা ‘Global Media Sentiments on the Rohingya Crisis’-এ দেখানো হয়েছে, ২০১৮ সালের পর থেকে কীভাবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক মিডিয়া কাভারেজ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের নজর সরে গেছে ইউক্রেন, গাজা, সুদানসহ অন্য যুদ্ধ ও সংঘাতের দিকে। অন্যদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক মিডিয়া রোহিঙ্গাদের ক্রমশ ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ ও ‘বোঝা’ হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। এই তথ্যসমূহ এমন এক প্রক্রিয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে, যাকে যোগাযোগ তত্ত্বে বলা হয় ‘Compassion Fatigue’ বা একধরনের সহানুভূতির অবসাদ, অর্থাৎ যেখানে একই ধরনের বেদনার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সহানুভূতির মাত্রা কমে আসে।
সংকটের শুরুর দিকে টেলিভিশনের পর্দা জুড়ে ছিল দগ্ধ গ্রামের ছবি, আতঙ্কে পালানো পরিবারের নিঃসহায় মুখ আর নির্যাতনের নানাবিধ চিত্র। তখন গল্পের কাঠামো ছিল পরিষ্কার অর্থ্যাৎ ভুক্তভোগী কারা, অত্যাচারী কারা, আর নৈতিক দায় কোথায়, এসবের নিরপেক্ষ বর্ণনা। পুরো বিশ্বের মানুষের চোখেমুখে তখন ছিল প্রতিক্রিয়ার হৃদয়িক তাড়না। কিন্তু যখন সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলো, সমাধানের পথ অনিশ্চিত হয়ে গেল, তখন দর্শক ও পাঠকের মনোযোগ থিতিয়ে আসতে শুরু করল। গল্প তার আবেদন হারাল এবং বেদনা যেন হয়ে উঠল পুনরাবৃত্ত বাস্তবতা।
২০২৩ সালে প্রকাশিত সেজ (SAGE) জার্নালের একটি বিশ্লেষণ ‘ভিজ্যুয়াল থিমস অ্যান্ড ফ্রেমস অফ দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস’ (Visual Themes and Frames of the Rohingya Crisis)-এ উল্লেখ করা হয়েছে, বহু এনজিও রিপোর্ট ও সংবাদ ফিচারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বারবার একই ধরনের আর্কাইভ ছবি ব্যবহৃত হচ্ছে। যে ছবি একসময় বিশ্বকে হতবাক করে দিত, এখন তা হয়ে গেছে নিছক পরিচিত দৃশ্য, বেশ চেনা, পুনরাবৃত্ত ও প্রভাবশূন্য। নতুন খবর আর ক্লিকের প্রতিযোগিতায় ভরা এই মিডিয়ার দুনিয়ায়, একই বিষয় বারবার ঘুরে ফিরে সামনে এলে মানুষের আগ্রহ আর উদ্বেগ জাগরূক থাকে না।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই বিস্মৃতিকে আরো উসকে দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার নীতিমালা কঠোর করেছে, শরণার্থীদের চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছে, শিক্ষা কার্যক্রম সীমিত করে দিয়েছে। অন্যদিকে সংঘাত এড়াতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতি সংস্থা (আসিয়ান-ASEAN) মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে এখনও আলোচনার অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। কূটনৈতিক বিবৃতিগুলোতে গণহত্যাকে ‘প্রত্যাবাসন রশদ’ (প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনাগত প্রক্রিয়া) হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ভাষা এখানে বেদনাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে, আর আমলাতন্ত্র ক্ষোভকে গিলে ফেলেছে।
এটাকে নিছক অবহেলা বলা চলে না, এটি বরং কাঠামোগত বিস্মৃতি (structural forgetting)। এখানে প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া কাঠামো এবং রাষ্ট্র, সবাই-ই একটি নৈতিক জরুরি সংকটকে ব্যবস্থাপনার কাগজপত্রে রূপান্তরিত করে উপকৃত হচ্ছে। রোহিঙ্গারা বিশ্বের চোখে আর শোকের ‘বিষয়বস্তু’ নয়; তারা এখন মানবিক রক্ষণাবেক্ষণ নামক নিস্তেজ একটি বলয়ে অবস্থান করছে। যেখানে সংকট আছে, কিন্তু উত্তরণের পথ নাই।
মানবিক পক্ষাঘাত এবং দুর্ভোগের আমলাতান্ত্রিকীকরণ
২০২৫ সালে প্রকাশিত এম আর হাওলাদারের Springer আর্টিকেলে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘মানবিক শাসনব্যবস্থার গবেষণাগার’ হিসেবে। যেখানে প্রতিটি রেশন, প্রতিটি নিবন্ধন, এমনকি শরণার্থীদের প্রতিটি চলাচলও নিয়ন্ত্রিত হয় প্রশাসনিক বিধি-নিষেধের মাধ্যমে। একসময় ত্রাণের অর্থ ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন, তা এখন হয়ে গেছে নিয়ন্ত্রণ ও আটকে রাখার হাতিয়ার। জাতিসংঘ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছে, তাদের কার্যক্রম জীবন টিকিয়ে রাখে, কিন্তু মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে পারে না। ২০২৫ সালের মার্চে রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই স্বীকারোক্তির প্রতিধ্বনি শোনা যায়— ‘মানবিক সংস্থাগুলো অগ্রগতি করছে না, কেবল স্থিতাবস্থা বজায় রাখছে।’
রেশন কার্ড এখন হয়ে গেছে পাসপোর্টের বিকল্প; মানুষ আর ব্যক্তি নয়, যেনবা ডেটা-পয়েন্টে রূপান্তরিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকেই গবেষকরা বলেন ‘দুর্ভোগের আমলাতান্ত্রিকীকরণ’ (bureaucratization of suffering)। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুঃখ-দুর্দশা ধীরে ধীরে নৈতিক ও মানবিক আহ্বান থেকে রূপান্তরিত হয়ে কাগজপত্র, তালিকা, অনুমতি ফরম এবং টেবিল-ফাইলের ভিতরে আটকে গেছে।
মিডিয়ার নীরবতা এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে। যে সংকটের কোনো স্পষ্ট সমাধান নেই, তা সংবাদ শিরোনাম থেকে নাই হয়ে যায়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতিদিন নতুন আপডেট আসে, গাজা একদম বাস্তব মুহূর্তে লাইভ ফিডে সামনে আসে, কিন্তু কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো দিনের পর দিন অপরিবর্তিত অবস্থায় স্থবির হয়ে আছে। সম্পাদকরা সেখানে ন্যারেটিভ মুভমেন্ট দেখেন না, আর তাই কাভারেজও কমে যায়।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, মিয়ানমার সীমান্তে নতুন করে আবারও রোহিঙ্গা পুশব্যাক শুরু হয়েছে এবং কয়েকজনকে সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি আটক করেছে। কিন্তু ক্রমাগত স্পটলাইটে না থাকায় এসব নির্যাতন এখন কেবল এনজিও প্রতিবেদনগুলোর ফুটনোটে সীমাবদ্ধ।
স্থানীয় ও আঞ্চলিক চিত্রায়ন
ইসলাম ও হাসান তাঁদের ২০২১ সালের গবেষণা ‘দ্য রোহিঙ্গা রিফিউজি ইন দ্য বাংলাদেশি প্রেস’ (The Rohingya Refugee in the Bangladeshi Press)-এ দেখান, ২০১৭ সালে নির্বাসনের পর প্রথম তিন বছরের মধ্যেই বাংলাদেশি মিডিয়ার রোহিঙ্গা-বর্ণনা সহানুভূতি থেকে সন্দেহে রূপ নেয়। প্রথমদিকে সংবাদ কাভারেজে ছিল মানবিক জরুরি পরিস্থিতির আহ্বান। কিন্তু ২০২০ সালে এসে শিরোনাম হয়, ‘নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি’, ‘পরিবেশগত ক্ষতি’, এবং ‘অর্থনৈতিক চাপ’ এই শব্দগুলো। এই পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় বক্তব্যের সমানে সমানে চলতে থাকে। জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকায় নীতিনির্ধারকেরা জোর দেন জাতীয় চাপ ও আন্তর্জাতিক উদাসীনতার দিকে। মিডিয়াও স্বাভাবিকভাবেই সেই ধারা অনুসরণ করে। যখন সরকার কোনো জনগোষ্ঠীকে সমস্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, তখন মিডিয়াও প্রায়শই সেটাই অনুসরণ করে, কখনও কখনও অবচেতনভাবেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে আল-জামানের বিশ্লেষণও সেই একই ধারা দৃশ্যমান। যেমন, আসিয়ান-সংযুক্ত সংবাদমাধ্যমগুলো অপরাধীদের সরাসরি নাম উল্লেখ করা এড়িয়ে যায়। এর পরিবর্তে তারা ‘জাতিগত উত্তেজনা’এর মতো নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করে। এই ভাষাগত কৌশল হয়তো কূটনৈতিক সুবিধা দেয়, কিন্তু পাশাপাশি অপরাধীদের জবাবদিহিতা থেকে মুক্তির পথ খোলে দেয়।
একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকটের গল্পটি হয়ে উঠেছে এক প্রকার ভূ-রাজনৈতিক ওয়ালপেপার, যা সর্বদা সামনে উপস্থিত থাকে, কিন্তু নজরে আসে কদাচিৎ। ফলে এর স্থায়িত্বই মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। সরকার, দাতা সংস্থা আর দর্শক— সবাই এই মিথ্যা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে সুবিধা নেয়। এখানে স্থিরতাকে সাফল্য বলে মনে হলেও তা আসলে বিভ্রম মাত্র।
মনোযোগের নৈতিকতা
প্রশ্ন শুধু এটা নয় নয় যে, কেন বিশ্বের সহানুভূতি ম্লান হয়ে আসে। বরং এর থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নীরবতার নৈতিক শূন্যতা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। যখন বিশ্ব চোখ বন্ধ করে ফেলে, তখন নিপীড়করা আরও নিশ্চিন্তে নিঃশ্বাস নেয়। এম জে লির গবেষণায় দেখা গেছে, মিডিয়া কাভারেজ কমে এলে আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর বিচারও ধীর হয়ে যায়। রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলাও এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) প্রক্রিয়াগত জটিলতায় আটকে আছে। যে নৈতিক দায়বোধ একসময় বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল, সেটা আজ প্রায় নিঃশেষিত।
দ্য গার্ডিয়ানের ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রকাশিত শেষ লাইনটি যেন তীব্র আঘাতের মতো ছিল—‘আমরা সব আশা হারিয়ে ফেলেছি’। বস্তুত আশা হলো স্বীকৃতি পাওয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি জাতিগোষ্ঠী সকলের চোখে নাই হয়ে যাওয়া মানে দুবার অবহেলিত হওয়া। একবার সহিংসতায়, আরেকবার উদাসীনতায়।
সূত্র: আরকে নিউজ











