গাজায় ‘আমরা ঠান্ডায় মরে যাচ্ছি’ বাক্যটা এখন কেবল কথার কথা বা লোকমুখে প্রচলিত কোন উক্তি না; বরং প্রতি রাতে অসংখ্য কম্পমান দেহের উপর লেখা এক রক্তাক্ত বাস্তবতা। ভূমধ্যসাগর তীরস্থ গাজায় শীতে বৃষ্টি হয় প্রতিদিনই প্রায়। বৃষ্টির তোড়ে ভিজে যাওয়া পাতার মতো নুয়ে পড়া জীর্ণ তাঁবুর অন্ধকারে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা বাচ্চাদের মৃত্যু দিয়ে প্রতিদিন সেখানে লেখা হয় অসংখ্য নির্মম দাস্তান। মায়েরা সন্তানদের আকড়ে ধরে আছেন তীব্র শীতে বৃষ্টি থেকে একটু বাঁচাতে, বাবারা হন্য হয়ে ছুটছেন ভেজা কম্বলটা নিয়ে, না বৃষ্টি ঠেকানো যায় তা দিয়ে, না শীত।
সাম্প্রতিক নিম্নচাপের শুরুতেই বাস্তুচ্যুতদের শত শত তাঁবু বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। উপত্যকার তাঁবুগুলোতে শীতকালীন দুর্ভোগের সাথে যোগ হয়েছে নতুন আরো এক মর্মান্তিক অধ্যায়। অধ্যায়গুলো পরিপূর্ণ রাহাফ আবু জাজ্জারের মতো সেইসব শিশুদের দিয়ে যারা জীবনের উষ্ণতা পাওয়ার আগেই শীত তাদের থেকে জিন্দেগী ছিনিয়ে নিয়েছে।
প্রতিবারের বৃষ্টিতে মূহুর্তের মধ্যেই বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ আবারো হয়ে পড়ছেন বাস্তুচ্যুত। ভিজে যাওয়া কম্বল আর পনিতে ভেসে যেতে থাকা পোশাকগুলোই সাথে নিয়ে একটু শুকনো জায়গার তালাশে ছুটে বেড়াচ্ছেন এখান থেকে ওখানে। সে কী শীত! যেন মনে হয়, হাড়গুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। তাঁবুগুলো ডুবে যাওয়া দ্বীপের মত দেখায়, পরিবারগুলো পাহাড়ের মত, বৃষ্টির স্রোত থেকে বাঁচতে আকাশকেই তাঁবু বানিয়ে নিয়েছে যেন।
বিভিন্ন সমাজকর্মীদের শেয়ার করা ছবি দেখলে বোঝা যায়, কী নিদারুন করুন অবস্থা বিরাজ করছে সেখানে; সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া তাঁবু, কাঁদা মাটিতে দাঁড়িয়ে শীতে জমে যাওয়া শিশু, অবিরাম জল আর নির্দয় ঠান্ডার মাঝে দিশেহারা পরিবার। দৃশ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বাস্তুচ্যুতদের বিভিন্ন ভিডিও ও সেখানের প্রতিমূহুর্তে বেড়ে চলা দুর্ভোগের কথা বিশ্বকে জানাতে ইউজ করা ‘ঠান্ডায় মরে যাচ্ছি’, ‘গাজা ডুবে যাচ্ছে’ ইত্যকার হ্যাশট্যাগ প্রতিদিন বেড়েই চলেছে।
শীতকালীন বিপর্যয় কেবল তাবুগুলোকে তলিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং ব্যক্তিগত করুণ কাহিনিগুলোতেও এর ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। এমন এক নারীর কথা জানা যায়, যিনি অস্ত্রোপচারের মাত্র একদিন পরেই তার ডুবন্ত তাঁবু থেকে বাসিন্দাদের সাহায্যে রক্ষা পান। পরে তাকে প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে একটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়। এমন একজন দুজন নয়, অসংখ্য।
বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য তৈরি সাধারণ তাঁবুর এক কোনে দাঁড়িয়ে আছেন সায়েদ মেহরে। ঘরহারা, রোগে শোকে ক্লান্ত বাবার সাথে দাঁড়িয়ে আছে অপুষ্টিতে ভোগা তার তিন সন্তান, মাথার উপর একটা ছেড়া কম্বল; বৃষ্টি বা শীত কোনটাই আটকাতে পারছে না নিতান্ত অপ্রতুল সেই কম্বলখানা। কিচ্ছু নেই। তাই না। চরম ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েও এমন উপকরণ দিয়ে উষ্ণতা তৈরির চেষ্টা করছেন বাবা, যার মধ্যে উষ্ণতার লেশমাত্র নেই।
শিবিরের ভেতর থেকে কান্না আর সাহায্যের আকুতি থামেই না কখনো; একেরপর এক আসতেই থাকে। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতকে দেখা যায়, যার তাঁবু সম্পূর্ণরূপে বৃষ্টিতে ভেসে গেছে, তীব্র শীতের মুখে আশ্রয় সামগ্রীর চরম সংকটের সম্মুখীন হয়ে তিনি মানবিক সংস্থাগুলোর কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন জানাচ্ছেন।
শিশুদের কষ্ট তো দেখার মত না। ভিডিও ক্লিপগুলোতে দেখা যায়, শিশুরা জলমগ্ন তাঁবুর ভেতরে বৃষ্টির জল থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে, আর অন্যেরা কাদা-মাটির ওপর দাঁড়িয়ে এক টুকরো শুকনো কাপড় খুঁজছে, যা হয়তো তাদের সামান্যতম নিরাপত্তা বা উষ্ণতার অনুভূতি দেবে। গাজার এক সমাজকর্মী এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি বর্ণনা করে লিখেছেন: ‘আমাদের শিশুরা সারা বিশ্বের সামনে ঠান্ডায় মারা যাচ্ছে… কোন তাঁবু আর শুকনো নেই, একটি উষ্ণ কম্বলও নেই।’
অন্য একজন সমাজকর্মী মন্তব্য করেন: ‘গাজা কেবল এখন আবহাওয়াগত নিম্নচাপেরই সম্মুখীন হচ্ছে না… গাজা এখন একটি বহুমুখী মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি।’
এক নারীর অভিব্যক্তি শোনেন, তিনি ভিডিওতে বলছিলেন—‘বৃষ্টির শব্দ শুনলে আপনাদের কেমন লাগে? নিশ্চয়ই অনুভূতিটা মিষ্টি, তাই না? গাজায় এই অনুভূতিটা ভিন্ন…বৃষ্টির শব্দ গাজার তাবুর মানুষদের জন্য খুবই ভয়ানক। বৃষ্টির ফোটার সাথে সাথে হতাশা বাড়ে এখানে। আপনি চোখের সামনে দেকতে পাচ্ছেন যে, আপনাদের এতদিনের করা তাঁবু বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাচ্ছে, অনুভূতিটা কেমন হবে! বৃষ্টি এখানে আসে শীতের মরণ কামড় দিতে। এবং এই উপলব্ধি দিতে যে, আপনাকে আবারো রাস্তায় দাঁড়াতে হবে এবং আপনার কোন বাড়ি নেই যা আপানকে উষ্ণতার আশ্রয় দেবে।’
তিনি আরো বলেন—‘বৃষ্টি হলেই আমার গতবছরের ডুবে যাওয়ার দুঃসহ ট্রমা জেগে ওঠে। তাঁবুতে শীতের রাতে ডুবে যাওয়া আমাদের মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আমি শীতকাল, এর শব্দ এবং স্মৃতিগুলোকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। আমাদের তাঁবুবাসীর জন্য একটু দোয়া করুন অন্তত, যাদের কোন আশ্রয় নেই। হে আল্লাহ, তাদের কষ্টগুলো লাঘব করুন, রহম করুন তাদের প্রতি, তাদের নাজাত দিন!’
বৃষ্টির কারণে গাজার ১২৫,০০০ এরও বেশি তাঁবু সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা উপত্যকার তাঁবুগুলোর ৯০% এরও বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমাজকর্মী ও ব্লগাররা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবিক সংস্থাগুলোর প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মৌলিক সরঞ্জাম ও সামগ্রী সরবরাহ করা যায়। তারা জোর দিয়ে বলছেন, পরিস্থিতি এখন মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে।
কালকে আবারো নতুন করে বৃষ্টি নামবে গাজায়। শীতকালীন বৃষ্টি। গণহত্যার শিকার ধ্বংসস্তুপের মাঝে বৃষ্টি বর্ষাবে দুর্দশার নতুন মাত্রা। জলবদ্ধতা তাতে যোগ করবে দাড়ি সেমিকোলন। মানুষের কাছে একটু খাবার নেই। প্রচন্ড শীতের সাথে এমন তাঁবু উড়িয়ে নেয়া বৃষ্টি। অসংখ্য অনাথ শিশুদের অনিশ্চিত জীবন। উপত্যকার বাইরে যাওয়ার পথ নাই, আহতদের চিকিৎসার সরঞ্জাম নাই। ট্রমা বুঝতে পারেন? মায়েরা মৃত বাচ্চা জন্ম দিচ্ছেন, জেনোসাইডের অসহনীয় মানসিক যন্ত্রনায়। কেউ বা যারা জীবিত বাচ্চাটাকে দেখাতে পারছেন দুনিয়ার আলো, তারাও পারছেন না বাচ্চাটার প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দিতে। অপুষ্টিতে একটু টিকে গেলেও আবার সেই প্রচন্ড শীত।
গাজা আজকের দুনিয়ায় আমাদের জন্য আল্লাহর পরীক্ষা। পরীক্ষায় আমাদের চেষ্টা কি যথাযথ আছে? গাজার ছোট বাচ্চাটা, বোমায় উড়ে যাওয়া বাবা, সিনওয়ার, দেইফরা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে না তো? কী মনে হয়, মামলায় হেরে গিয়ে জাহান্নামের যে আগুন সে আগুন কি দখলদারদের নিক্ষেপিত ফসফরাসের চেয়ে কম গরম? কয়েকশো গুলিতে ঝাঝড়া হয়ে যাওয়া ছোট্ট শিশু হিন্দের সামনে আমি দাঁড়াতে পারবো তো?











