আরব বিশ্বে এপস্টাইন ফাইলের প্রভাব যেমন হতে পারে

EPSTAIN

বিশ্ব যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের দামামাসহ বিভিন্ন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে ফাঁস হওয়া কিছু তথ্যে বিশ্ববাসী নড়েচড়ে বসেছে। এই তথ্যগুলো কুখ্যাত জেফরি এপস্টাইনের কেলেঙ্কারি সম্পর্কিত। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টাইন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক, ওয়াল স্ট্রিটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, হলিউড তারকা এবং বিশ্ব অভিজাতদের এক সুতোয় গাঁথতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং নিজের স্বার্থে তাদের ব্যবহার করেছিলেন।

সর্বশেষ এই তথ্য ফাঁসের পর এপস্টাইন কেলেঙ্কারি যে মনোযোগ পেয়েছে, তা এর বৈশ্বিক প্রকৃতি এবং ব্যবসায়িক জগত ও জনসংযোগের (Public Relations) ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া চরম বিচ্যুতিকে স্পষ্ট করে। ‘এপস্টাইন গেট’ বা এই কেলেঙ্কারিকে আমরা প্রধানত চারটি চক্রে বা ভাগে ভাগ করতে পারি:

প্রথম চক্র: এর ভিত্তি হলো জনসংযোগ ও মধ্যস্থতা। এপস্টাইন অর্থের বিনিময়ে এই কাজ করতেন এবং প্রভাবশালীদের ব্যবসায়িক সুবিধা ও বিশেষ ছাড় পাইয়ে দিতেন।

দ্বিতীয় চক্র: এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দু ‘লিটল সেন্ট জেমস’ বা তথাকথিত ‘শয়তানের দ্বীপ’। এখানে এপস্টাইন তার ‘নির্বাচিত অভিজাত’ গোষ্ঠীকে আমন্ত্রণ জানাতেন। সেখানে জমকালো পার্টির আড়ালে চলত সীমাহীন অনাচার, যার প্রধান ‘উপাদান’ ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী এবং নানাবিধ যৌন বিকৃতি।

তৃতীয় চক্র: এটি হলো ‘ভাড়ায় খাটা গোয়েন্দা তৎপরতা’। অর্থাৎ, ওই দ্বীপে যা কিছু ঘটতো, তার সবই গোপনে ক্যামেরাবন্দী করা হতো। এরপর সেই স্পর্শকাতর তথ্যগুলো এপস্টাইন তার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশের সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দিতেন। অনেক বিশ্লেষকই খোলাখুলি বলেছেন যে, এপস্টাইনের সংগ্রহ করা এসব তথ্য শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর হাতে পৌঁছাত।

চতুর্থ চক্র: এটি হলো মতাদর্শগত বা আদর্শিক প্রভাব। লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে যারা যাতায়াত করতেন, তারা নিজেদের ‘পৃথিবীর অভিভাবক’ মনে করতেন। তারা ভাবতেন, তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে উঁচুদরের এবং প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে তারা বিশ্বের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম—যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমস্যাও অন্তর্ভুক্ত। একারণেই আরব বিশ্ব ও ইসরায়েলের কূটনীতির সঙ্গে জড়িত অনেক ব্যক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতি-নির্ধারকরা ছিলেন এই দ্বীপের বিশেষ অতিথি।

এই চারটি চক্র একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। প্রথম চক্রের ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরাই শেষ পর্যন্ত ওই দ্বীপের অতিথি হতেন। আবার প্রথম ও দ্বিতীয় চক্রের ঘটনাগুলোই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য ‘মশলা’ জোগাত এবং এই সবকিছু মিলেই তৈরি হতো তাদের সেই অদ্ভুত মতাদর্শ।

উইকিলিকস বা পানামা পেপারসের মতো এই কেলেঙ্কারিও বৈশ্বিক, তবে এর প্রকৃতি আরও জটিল। কারণ এখানে অর্থ, রাজনীতি, যৌনতা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মতাদর্শ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে

উইকিলিকস বা পানামা পেপারসের মতো এই কেলেঙ্কারিও বৈশ্বিক, তবে এর প্রকৃতি আরও জটিল। কারণ এখানে অর্থ, রাজনীতি, যৌনতা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মতাদর্শ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সহজ কথায়, যৌনতা, আর্থিক দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের মতো নৈতিক স্খলনগুলো এখন রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তবে আরব বিশ্বের কিছু সংবাদমাধ্যম বা লেখক যেমন তাড়াহুড়ো করে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো পশ্চিমা সভ্যতার ওপর দায় চাপাচ্ছেন, তা ঠিক নয়। গুটিকয়েক ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো সভ্যতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেমন অনুচিত, ঠিক তেমনি গুটিকয়েক মুসলিমের হঠকারী আচরণকে কেন্দ্র করে ইসলামকে বিচার করাও অন্যায়।

দ্বিতীয়ত, ওই নথিপত্রে যাদের নাম এসেছে, তাদের সবাইকে এখনই অপরাধী ভাবা ঠিক হবে না। নিছক নাম থাকাটাই অপরাধের প্রমাণ নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের কৃতকর্মের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। তাই সংবাদমাধ্যম বা বিচারিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার আগে চূড়ান্ত রায় দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
তবে জনমতের দৃষ্টিতে, যারা ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপে অতিথি হিসেবে গিয়েছেন, তারা নিঃসন্দেহে সন্দেহের তালিকায় থাকবেন। এমতাবস্থায়, যাদের নাম এসেছে, তাদের উচিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে এপস্টাইনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরন পরিষ্কার করা, যেমনটি অনেকে করেছেন। নীরবতা সন্দেহ দূর করে না, বরং তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং তিনি যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন—উভয়ের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করে।

ধারণা করা হচ্ছে, এই ফাঁস হওয়া তথ্যের প্রভাব পশ্চিমা বিশ্ব এবং আরব বিশ্বে ভিন্ন হবে। পশ্চিমে এটি হয়তো নৈতিক ও আইনি রূপ নেবে। যেমন ব্রিটেনে কিছু লর্ডকে বরখাস্ত করা বা জ্যাক ল্যাং-এর মতো ব্যক্তিদের ব্যাখ্যা দেওয়ার ঘটনা আমরা দেখেছি।
কিন্তু আরব বিশ্বে এর প্রভাব রাজনৈতিক মোড় নিতে পারে। উইকিলিকস হয়তো বড় কোনো গোপন তথ্য ফাঁস করেনি, কিন্তু তা আরব বিশ্বের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং ‘আরব বসন্তের’ বারুদে আগুন দিতে সাহায্য করেছিল। এপস্টাইন কেলেঙ্কারিও একই ধরনের রাজনৈতিক কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।

এপস্টাইন কেলেঙ্কারিকে আকস্মিক মনে হলেও, রাজনীতি ও গোয়েন্দা জগতে ব্ল্যাকমেইল বা স্বার্থ হাসিলের জন্য অনৈতিকতার ব্যবহার নতুন কিছু নয়। যা আমাদের অবাক করেছে তা হলো—এতে জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা, তাদের ক্ষমতা এবং ঘটনাটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি।

আমরা এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের স্থানীয় ঘটনা নিয়ে কথা বলছি না, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক ‘ফেনোমেনন’ বা প্রবৃতি। এপস্টাইন হয়তো এই প্রক্রিয়ার এক অন্ধকার তারকা মাত্র। ভবিষ্যতে ‘কাকতালীয়ভাবে’ এমন আরও কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়া অসম্ভব নয়। কারণ গোয়েন্দা জগতের একাংশ ব্ল্যাকমেইল করার জন্য বা প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য এমন বিকৃত উৎসব ও তার ভিডিও ধারণের ওপর নির্ভর করে।

সবশেষে, ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে কিছুই গোপন থাকে না। একটি ছোট্ট মেমোরি চিপে হাজারো তথ্য রাখা যায় এবং তা সহজেই পাচার করা সম্ভব। তথাকথিত ‘অভিজাতরা’ যতই নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করুন না কেন, তাদের গোপন মুহূর্তগুলো আজ আর নিরাপদ নয়। উপযুক্ত সময়ে তা জনসমক্ষে চলে আসতে পারে।

তাই, যদি বড় কোনো আন্তর্জাতিক ঘটনা একে ধামাচাপা না দেয়, তবে এপস্টাইন কেলেঙ্কারির এই ফাঁস হওয়া তথ্য আরব বিশ্বের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে জোরেশোরে নাড়িয়ে দিতে পারে।

মূল: হাসান আউরিদ, আল জাজিরা।