মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্য অর্ডার করতে ক্লিক করুন

ইরানে কী ঘটছে, বিক্ষোভ ও সরকার পতন নিয়ে যা বলা হচ্ছে 

ছবি : বিবিসি
ছবি : বিবিসি

​ইরানে চলমান এই বড় ধরনের বিক্ষোভ মূলত ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে শুরু হয়েছে। এটি প্রথমে রাজধানী তেহরানের প্রধান বাজারগুলো থেকে শুরু হলেও দ্রুতই দেশের অন্যান্য বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। চলমান বিক্ষোভের মূলে রয়েছে দেশটির নজিরবিহীন অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং সরকারের বৈদেশিক নীতি নিয়ে জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। গত এক বছরে স্থানীয় মুদ্রার ভয়াবহ অবনতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং নতুন বাজেটে কর বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এরই মাঝে দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট উপেক্ষা করে লেবানন বা গাজার মতো আঞ্চলিক যুদ্ধে তেহরানের বিপুল অর্থ ব্যয়কে সাধারণ ইরানিরা সহজভাবে নিতে পারছেন না, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে রাজপথের মিছিলে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ ও ‘আগে নিজের দেশ’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে।

দেশের অভ্যন্তরীণ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সাধারণ ইরানিদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুত অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

​তথ্য যাচাই ও সামাজিক মাধ্যম

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই বিক্ষোভের ব্যাপকতাকে অনেকটা গৌণ করে দেখালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে প্রতিবাদের ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে কিছু ভিডিও বিকৃত করার অভিযোগও রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও বিশ্লেষকদের মতামত নিয়ে একটি বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

​আসলে কী ঘটছে?

​গত রবিবার তেহরানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে ধর্মঘট শুরু করলে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং স্থানীয় মুদ্রার অবনতির ফলে ইরানের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে।

​মঙ্গলবার নাগাদ তেহরানসহ মধ্য ইরানের ইসফাহান ও ইয়াজ্‌দ শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে রাজধানীর বাজার এলাকার ব্যবসায়ীরাও এতে যোগ দেয়। ইরানি সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এই বিক্ষোভ অন্তত ২০টি অঞ্চলে ছড়িয়েছে, যার বেশিরভাগই দেশের পশ্চিমাঞ্চলে।

​বুধবার প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, দক্ষিণ ইরানের ফাসা শহরে বিক্ষোভকারীরা একটি সরকারি ভবনের সামনে জমায়েত হয়ে ঢিল ছুঁড়েছে এবং গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হারানা’ (HRANA) জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে এখন ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ এবং ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’-এর মতো স্লোগান শোনা যাচ্ছে।

প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক চাপ

​আটলান্টিক কাউন্সিলের মানবাধিকার আইনজীবী জিসু নিয়া মনে করেন, বিক্ষোভকারীদের স্লোগান অত্যন্ত স্পষ্ট; তারা কোনো সংস্কার নয়, বরং আমূল পরিবর্তন চাচ্ছে। তার মতে, ইরান বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক – উভয় দিক থেকেই প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে।

​উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, যাতে ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জানিয়েছেন, ইরান পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত তা নস্যাৎ করে দেবে। এমনকি বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে ট্রাম্প।

জনমনে ক্ষোভের কারণ

​গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা দুর্বল হয়ে পড়ায় তেহরানের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। অনেক ইরানি মনে করে নিজের দেশের মানুষ যখন অর্থনৈতিক কষ্টে ধুঁকছে, তখন হিজবুল্লাহর মতো বিদেশি গোষ্ঠীর পেছনে অর্থ ঢালা অযৌক্তিক। বিক্ষোভে ‘গাজা নয়, লেবানন নয়, আমার জীবন উৎসর্গ ইরানের জন্য’ এমন স্লোগানও শোনা গেছে।

​সরকারের প্রতিক্রিয়া

​বৃহস্পতিবার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ হয়, যাতে প্রথমবারের মতো ছয়জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। যদিও সরকার বুধবার শীত ও জ্বালানি সাশ্রয়ের অজুহাতে স্কুল, ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছিল।

​তবে বিক্ষোভকারীদের দাবিকে একেবারে উপেক্ষা না করে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনসহ কিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে। সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে জনগণের জীবনযাত্রার সমস্যার সমাধান করতে না পারলে আমাদের নরকবাস করতে হবে।’

সমাজবিজ্ঞানী আজাদে কিয়ান মনে করেন, দেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন হলো ব্যবসায়ীরা, তাই সরকার তাদের শান্ত করতে কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। তবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি এখনও এ বিষয়ে মুখ খোলেননি।

​বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ কী?

​বিদেশে অবস্থানরত বিরোধী নেতারা এই বিক্ষোভকে স্বাগত জানিয়েছেন। সাবেক শাহ-এর পুত্র রেজা পহলভি ২০২৬ সালকে পরিবর্তনের চূড়ান্ত মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করেছে।

​তবে বিশ্লেষক আজাদে কিয়ান মনে করেন, ২০১৯ সালের পেট্রোলের দাম বৃদ্ধিজনিত বিক্ষোভের তুলনায় বর্তমান আন্দোলনের পরিধি এখনো ততোটা বড় নয়। তাই এই মুহূর্তে শাসনব্যবস্থার পতনের সম্ভাবনা তিনি ক্ষীণ দেখছেন। অন্যদিকে ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষক আরশ আজিজি মনে করেন, এটি ২০২৩ সালের পর সবচেয়ে গুরুতর বিক্ষোভ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন না হলে ইরানকে বারবার এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।