হামাসের সামরিক শাখা ‘ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেড’-এর নতুন মুখপাত্রের আবির্ভাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কাসসামের এই নতুন মুখপাত্রও ধারণ করেছেন সেই বিখ্যাত উপনাম ‘আবু উবায়দা’, যা এতদিন বহন করেছিলেন শহীদ হুজায়ফা আল-কাহলুত রাহিমাহুল্লাহ। তাঁর নাম, কণ্ঠস্বর এবং ভিডিও বার্তার নেপথ্যের গল্প নিয়ে প্রতিটা মহলে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
সোমবার আল-জাজিরায় সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে এই নতুন সামরিক মুখপাত্র জানান, আল-কাসসাম ব্রিগেড তাদের ‘মুজাহিদ কমান্ডার ও চিফ অব স্টাফ মুহাম্মদ সিনওয়ার’ এবং ‘আবু উবায়দা’ হিসেবে পরিচিত মুখপাত্র হুজায়ফা আল-কাহলুত আবু ইব্রাহিমের শাহাদাতের সংবাদ ঘোষণা করছে।
একইসাথে কাসসাম ব্রিগেড তাদের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতার শাহাদাতের খবর নিশ্চিত করেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাফাহ ব্রিগেডের কমান্ডার মুহাম্মদ শাবানা, কমান্ডার হাকাম আল-ঈসা এবং উৎপাদন বিভাগের (ম্যানুফ্যাকচারিং) প্রধান শেখ রায়েদ সাদ।
এর মধ্য দিয়ে নতুন মুখপাত্র তাঁর পূর্বসূরি সেই ‘মুখোশাবৃত’ আইকন অবিসাংবাদিত নেতা হুজাইফা আল কাহলুতের সেই দাস্তানই যেন অব্যাহত রাখলেন, যিনি দীর্ঘ ২১ বছর ধরে সংবাদ সম্মেলন ও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে প্রতিরোধের অদম্য কন্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ও সমাদৃত হয়েছিলেন।
প্রতীকের নয়া শুরুওয়াত এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাক্টিভিস্ট ও নেটিজেনরা নতুন মুখপাত্রের নাম, কণ্ঠস্বর এবং বাচনভঙ্গির অবিকল মিল দেখে বিস্মিত হয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন, এই সাদৃশ্য কি কেবলই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কোন বার্তা?
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের আলোচনায় দুটি প্রধান বিষয় উঠে এসেছে:
প্রথমত, নতুন মুখপাত্রের কণ্ঠস্বর ইচ্ছাকৃতভাবেই শহীদ আবু উবায়দার মতো বাছাই করা হয়েছে। যেন কাসসাম বলতে চাইছে—ব্যক্তির কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধের মারকায আর উৎপাদন টিকে থাকে, থাকবেই; পতাকাবাহী শহীদ হলেও আমাদের প্রতিরোধ-বার্তার সিলসিলা জারি থাকে।
দ্বিতীয়ত, পূর্বসূরির বাচনভঙ্গির এই সচেতন অনুকরণ কোনো মেকি অভিনয় নয়, বরং এটি একই নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার ঘোষণা। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে—আমাদের পতাকা যখন হস্তান্তর হয়, তখন তা মাটিতে পড়ে না; বরং ভিন্ন কণ্ঠস্বরে একই তেজ ও উদ্দীপনা নিয়ে তা উড্ডীন থাকে, স্বাধীনভাবে, অদম্য হয়ে।
অনেকের মতে, এই একই নাম বেছে নেওয়াটা দখলদার শক্তির গালে এক শক্ত চপেটাঘাত। যেন হামাস বলতে চাচ্ছে—একজন আবু উবায়দার শাহাদাত এমন আরও ডজনখানেক আবু উবায়দা তৈরির পথ প্রশস্ত করে। প্রতিরোধ সংগ্রাম এভাবেই চলতে থাকে; এক শহীদের স্থান পূরণ করেন আরেক শহীদ।
যেমন ছিল তার প্রথম বার্তা
অনেক নেটিজেন মনে করেন, নতুন মুখপাত্রের প্রথম আবির্ভাব অত্যন্ত বলিষ্ঠ ছিল। তাঁর উপস্থিতি, ভাষা এবং রাজনৈতিক পরিভাষার চয়ন ছিল নিখুঁত। এটি প্রমাণ করে যে, গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধারা কেবল প্রচারের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সার্বিক অবস্থাতেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।
তাঁদের মতে, নতুন এই মুখপাত্র সামরিক গণমাধ্যমে কোনো আনকোরা ব্যক্তি নন। বরং তিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং আল-কাসসামের শীর্ষ নেতৃত্বের নিবিড় তত্ত্বাবধানেই এই পদের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন, যেমন সংগঠনের অন্যান্য স্তরের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।
পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, নতুন মুখপাত্রের বার্তায় গাজার মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র যেমন উঠে এসেছে, তেমনি প্রতিরোধের রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও প্রকাশ পেয়েছে—যা ছিল খুব মাপামাপা শব্দ বাক্যে অথচ অত্যন্ত অলঙ্কারসমৃদ্ধ ও শাণিত।
নাম যখন কেবল নাম নয়, একটি ‘প্রতীক’
ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা মনে করছেন, নতুন মুখপাত্রের জন্য ‘আবু উবায়দা’ উপনামটি বহাল রাখা একটি অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। প্রতিবার মুখপাত্র পরিবর্তনের সাথে নাম বদল না করে একই নাম রাখাটা সংগঠনের কাঠামোগত দৃঢ়তা ও সাহসের দিকে নির্দেশ করে। এটি শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও একটি অনন্য রীতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
অন্যরা মনে করছেন, এই নামকরণের পেছনে রয়েছে এক লড়াকু মানসিকতা। যেন হামাস বলতে চাইছে—আমাদের কোনো কমান্ডার শহীদ হলে যেমন প্রত্যেকেই নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত, তেমনি মুখপাত্রের অবর্তমানে আমাদের প্রত্যেকেই হয়ে উঠতে পারেন ‘আবু উবায়দা’। এটি ব্যক্তিকে ছাপিয়ে প্রতীককে শাশ্বত করার এক অভাবনীয় প্রয়াস।
বিশ্লেষকদের মতে, আবু উবায়দা নামের এই ‘উত্তরাধিকার’ কেবল কোনো সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয়। এটি সারা দুনিয়াকে উদ্দেশ্য করে দেয়া একটি স্পষ্ট ম্যাসেজ যে, জিহাদ বা প্রতিরোধ কখনো শেষ হয় না। মুখচ্ছবি বা কণ্ঠস্বর পাল্টালেও আযাদির পতাকা অবনমিত হয় না। আল-কাসসাম ব্রিগেড টিকে থাকবে, তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং ‘আবু উবায়দা’ নামটি দখলদারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি ও সমর্থকদের মনে সাহস জোগাতে সর্বদা উপস্থিত থাকবে।
একজন অ্যাক্টিভিস্ট লিখেছেন:
‘কণ্ঠস্বর শহীদ হয়েছে, কিন্তু বেঁচে আছে মূল সুর, সেই চেতনা, সেই দৃঢ়তা… নতুন মুখোশাবৃত আবু উবায়দা আবির্ভূত হলেন, পূর্বসূরিকে স্মরণ করলেন এবং জানিয়ে দিলেন—আমরা ‘আবু উবায়দা’ উপাধিটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। বিশ্বের কাছে বার্তা একটাই, প্রতিরোধ একটি আদর্শ, আর আদর্শের মৃত্যু নেই।’
পরিশেষে বলা যায়, এই নতুন আবির্ভাব বহুবিধ বার্তা বহন করছে। যার সারমর্ম হলো—‘আবু উবায়দা’ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নন; তিনি পরিণত হয়েছেন প্রতিরোধের দাস্তানে, অনন্ত চলমান এক প্রতীকে, স্বাধীনতার সংগ্রামী কোটি জনতার স্মৃতির মণিকোঠায় গেঁথে থাকা এক আইকনে—যিনি ব্যক্তিপরিচয় ছাপিয়ে এখন হয়ে উঠেছেন এক মহান উদ্দেশ্য ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
সূত্র : আল জাজিরা











