কাসসাম ব্রিগেডের নতুন মুখপাত্রের বিবৃতি, যা যা বললেন 

আর জেনে রাখুন, আরব ও মুসলিমরা যখন নিজের ভাইদের ওপর চলা জুলুমের ব্যাপারে নীরব থাকে, তখন মূলত তাদের নিজেদের পালা আসার অপেক্ষাই করতে হয়।
ছবি : কাসসাম ব্রিগেড
ছবি : কাসসাম ব্রিগেড

হামাসের সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেড তাদের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কমান্ডারের শাহাদাতে শোক প্রকাশ করেছে। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী ও নৃশংস আগ্রাসন চলাকালে চালানো বিমান হামলায় তাঁরা শহিদ হন।

কাসসাম ব্রিগেডের নবনিযুক্ত মুখপাত্রের পক্ষ থেকে দেওয়া এই বিবৃতিতে তারা তাদের প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আস সিনওয়ার (আবু ইব্রাহিম), রাফাহ ব্রিগেডের কমান্ডার মুহাম্মদ শাবানা (আবু আনাস), জ্যেষ্ঠ নেতা হাকাম আল আইসা (আবু উমর), যুদ্ধ সরঞ্জাম উৎপাদন শাখার প্রধান রায়েদ সা’দ (আবু মুয়াজ) এবং কাসসাম ব্রিগেডের দীর্ঘদিনের সুপরিচিত মুখপাত্র আবু উবায়দার শাহাদাতের খবর নিশ্চিত করেছে।

শোক বার্তার মূল অংশ:

সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের সম্মানিত করেন এবং পাপিষ্ঠ ও অপরাধী জালেমদের চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করেন। সেই আল্লাহর প্রশংসা করছি যিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে অল্প এবং পৃথিবীতে তোমাদের দুর্বল মনে করা হতো।’ আরও বলেছেন, ‘মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে; তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে আর কেউ প্রতীক্ষায় আছে।’

দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের সংগ্রামী নবি স.-এর ওপর, যিনি আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে কষ্ট সহ্য করে ধৈর্য ধরেছেন। অতঃপর মহান রব্বুল আলামিন তাঁকে বিজয় ও শক্তি দান করেছেন।

আপনাদের ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আমরা আপনাদের অভিবাদন জানাই আত্মমর্যাদা ও গৌরবের এই ভূমি থেকে; জিহাদ, শাহাদাত, পবিত্রতা ও আভিজাত্যের ভূমি থেকে। আমরা গাজার গর্বিত সন্তান হতে পেরে এবং এখানকার মহান, ধৈর্যশীল ও ইমানদার মানুষদের জন্য গর্ববোধ করি, যারা নবিদের উত্তরাধিকারী এবং মুহাম্মদ সা.-এর সুযোগ্য উত্তরসূরি। হে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, হে আল্লাহর বাছাইকৃত বান্দাগণ! যারা নিজেদের সত্যের পথে অবিচল রেখেছেন, আপনাদের ধৈর্যের জন্য আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক; আপনাদের এই পরিণাম কতই না শ্রেষ্ঠ।

শান্তি বর্ষিত হোক গাজার মাটি, পানি, আকাশ ও বাতাসের ওপর। শান্তি বর্ষিত হোক এখানকার পুরুষ, নারী ও শিশুদের ওপর; শান্তি বর্ষিত হোক এখানকার বীর যোদ্ধাদের ওপর।

স্বজন হারানো, বন্দিত্ব, জখম এবং বাস্তুচ্যুতির যে অসীম যন্ত্রণা আপনারা সহ্য করছেন, তার বিনিময়ে আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আজ যারা তীব্র অভাব আর শীতের প্রকোপে জীর্ণ তাঁবু ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমাদের সালাম। আপনাদের শরীর ক্লান্ত হতে পারে, কিন্তু আপনাদের আত্মা, বিশ্বাস এবং আল্লাহর ওপর ভরসা শত্রুদের ও ষড়যন্ত্রকারীদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী, যারা আপনাদের কষ্টে আনন্দ পায় এবং আপনাদের পতনের অপেক্ষায় থাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের সেই আশা কখনোই পূর্ণ হবে না।

আপনারাই মর্যাদা এবং এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সূচনা। আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের বিষয় যে, আমাদের যোদ্ধাদের রক্ত তাদের পরিবারের সদস্যদের রক্তের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কাসসামের নেতারা এবং তাঁদের পরিবার ত্যাগের মিছিলে সবার আগে দাঁড়িয়েছেন। আমরা আপনাদের অংশ এবং আপনারাও আমাদেরই অংশ। আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় হাসিমুখে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ উৎসর্গ করেছি। আমরা নিশ্চিত, আল্লাহ আমাদের এই ত্যাগ বিফলে যেতে দেবেন না এবং এই পবিত্র রক্ত বৃথা যাবে না। আপনাদের রবের ওপর আস্থা রাখুন, জালেমদের পতন অনিবার্য, সময় যতই লাগুক না কেন। আল্লাহ জালিমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মোটেও গাফেল নন।

গাজা, কুদ্‌স, পশ্চিম তীর, দখলকৃত ভূখণ্ড এবং শরণার্থী শিবিরে থাকা আমাদের প্রিয় দেশবাসী; আমাদের মহান উম্মাহর সদস্যগণ এবং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষেরা! গত মার্চ মাসে শত্রুরা যখন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে পুনরায় তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে, তখন শাহাদাত বরণকারী একদল বীর সেনানী ও দেশপ্রেমিক যোদ্ধাদের রক্তঝরা বিদায়ের খবর আমরা আজ অত্যন্ত গর্বের সাথে জানাচ্ছি।

আমরা এখানে বিশেষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি কাসসামের সেই ধন্য নেতাদের, যারা যুদ্ধের ময়দানে এবং কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমে নিজেদের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় অকুতোভয় বীর হিসেবে শাহাদাত বরণ করেছেন।

১. শহিদ কমান্ডার মুহাম্মদ আস সিনওয়ার (আবু ইব্রাহিম):

তিনি ছিলেন শহীদ আবু খালেদ আদ দাইফের যোগ্য উত্তরসূরি এবং কাসসাম ব্রিগেডের বর্তমান প্রধান সেনাপতি। অত্যন্ত সংকটে এবং প্রতিকূল সময়ে তিনি এই বাহিনীর হাল ধরেছিলেন। তুফানুল আকসা অভিযানের সময় তিনি অপারেশন শাখার প্রধান হিসেবে ৭ই অক্টোবরের ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া গাজার প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি সম্মুখ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কয়েক দশকের এক বর্ণাঢ্য সংগ্রাম শেষে মর্যাদার সাথে তিনি শাহাদাত বরণ করলেন।

২. শহিদ কমান্ডার মুহাম্মদ শাবানা (আবু আনাস):

রাফাহ ব্রিগেডের এই সাহসী কমান্ডার আবু ইব্রাহিম আস-সিনওয়ার ও অন্যান্য নেতাদের সাথে একই কাফেলায় যুক্ত হয়েছেন। তিনি ছিলেন আবু শামালা ও আল-আত্তারের মতো কিংবদন্তি নেতাদের ছায়াসঙ্গী। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে রসদ সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদান ছিল। ‘গিলাদ শালিত’ বন্দি অপারেশন থেকে শুরু করে তুফানুল আকসা পর্যন্ত রাফাহর প্রতিটি বিজয়ে তাঁর ছোঁয়া ছিল।

৩. শহিদ কমান্ডার হাকাম আল ঈসা (আবু উমর):

একজন বিনয়ী ও খোদাভীরু মুজাহিদ, যিনি লেবানন ও সিরিয়া হয়ে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে আমানত নিয়ে এসেছিলেন। তিনি কাসসামের প্রশিক্ষণ বিভাগ এবং সামরিক কলেজগুলোর দায়িত্ব পালন শেষে সর্বশেষ সমরাস্ত্র শাখার প্রধান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

৪. শহিদ শেখ রায়েদ সাদ (আবু মুয়াজ):

কাসসামের উৎপাদন শাখার প্রধান এবং সাবেক অপারেশনাল কমান্ডার। তিনি নিজের মেধা দিয়ে শূন্য থেকে কাসসামের সমরাস্ত্র শিল্প গড়ে তুলেছিলেন। বুলেট থেকে বন্দুক, রকেট থেকে ড্রোন, সবকিছুই তাঁর নেতৃত্বে ফিলিস্তিনিদের হাতে তৈরি হয়েছে। ৭ই অক্টোবরের বিজয় ও পরবর্তী প্রতিরক্ষা যুদ্ধে এই অস্ত্রের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

সবশেষে, আমরা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি সেই কণ্ঠস্বরকে, যা গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে এক প্রেরণার নাম ছিল:

৫. শহিদ কমান্ডার আবু উবায়দা (হুজাইফা সামির আবদুল্লাহ আল কাহলুত):

কাসসাম ব্রিগেডের বিশ্বখ্যাত মুখপাত্র এবং উম্মাহর জাগ্রত কণ্ঠস্বর। লাল কুফিয়া জড়ানো যে মুখোশধারী মানুষটি কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও প্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের স্পন্দন, যিনি যুদ্ধের চরম ভয়াবহতার মাঝেও সম্মুখ সমর থেকে তাঁর জনগণকে সুসংবাদ দিতেন ও ধৈর্য ধরার সাহস জোগাতেন। শত্রু ও মিত্র উভয়ই তাঁর অটল ও স্পষ্ট ভাষণের অপেক্ষায় থাকত।

আজ আমরা তাঁর আসল নাম ও পরিচয়সহ তাঁকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরছি। তিনি হলেন হুজাইফা সামির আবদুল্লাহ আল-কাহলুত (আবু ইব্রাহিম)। দীর্ঘ দুই দশক শত্রুদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে এবং মুমিনদের হৃদয় শীতল করে তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। কাসসামের গণমাধ্যম ব্যবস্থাকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ৭ অক্টোবরের বীরত্বগাথাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। হুজাইফা কাহলুত চলে গেলেও তিনি আমাদের জন্য ‘আবু উবায়দা’ নামটি এক চিরস্থায়ী উপাধি হিসেবে রেখে গেছেন। তাঁর দেখানো পথেই আমরা এগিয়ে যাব।

গাজার এই পবিত্র মাটিতে আমাদের নেতা ও সাধারণ মানুষের যে রক্ত ঝরছে, তা সবার জন্য এক চূড়ান্ত প্রমাণ। এটি পুরো উম্মাহকে জেগে ওঠার এবং ফিলিস্তিন ও আল-আকসার পাশে দাঁড়ানোর ডাক দিচ্ছে। গাজা তার সাধ্যমতো সবকিছু উৎসর্গ করেছে এবং বিজয় বা শাহাদাত না আসা পর্যন্ত আমাদের এই পতাকা হাতছাড়া হবে না।

টানা দুই বছরের নৃশংস যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এই সময়ে আমরা কাসসাম ব্রিগেড পুনরায় অঙ্গীকার করছি, আমরা আমাদের আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হব না।

আমরা কাসসাম ব্রিগেডস টানা দুই বছর ধরে চলা গণহত্যা শেষে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণার পর দুই মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়া এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে, নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট করে জানাচ্ছি, 

প্রথমত: সাতই অক্টোবর ছিল জুলুম, নিপীড়ন, অবরোধ এবং আমাদের আকসা ও আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসনের মুখে এক বজ্রধ্বনির বিস্ফোরণ। যা অতিক্রম করেছিল সব রেড লাইন। উপেক্ষা করেছিল সব দাবি। পদদলিত করেছিল সতর্কবার্তা এবং সব চুক্তি ও সমঝোতাকে।

তুফান এসেছিল পথ সংশোধন করতে এবং যে ইস্যুটি ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিল, তাকে আবার সামনে নিয়ে আসতে। তুফান এসেছিল উম্মাহ ও বিশ্বের স্বাধীনচেতা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে; দখলদার নাৎসি শাসনের নিষ্ঠুরতা, স্যাডিজম, অপরাধযজ্ঞ ও গণহত্যাকে উন্মোচিত করতে। দখলদারিত্বকে ন্যায়বিচার থেকে পলাতক এক অপরাধীতে পরিণত করতে। আমাদের মহান জনগণ তাদের অবিচলতা ও আত্মত্যাগপূর্ণ দৃঢ়তায় শত্রুর সব পরিকল্পনাই ব্যর্থ করে দিয়েছে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি থেকে শুরু করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও মৃত্যুফাঁদ পেরিয়ে শরণার্থী শিবির পর্যন্ত যুদ্ধের সব লক্ষ্য ভেস্তে দিয়েছে।

দখলদাররা গাজাবাসীর ভেতর থেকে প্রতিরোধের চেতনা কেড়ে নিতে পারেনি; বরং প্রতিটি ফিলিস্তিনি ঘরে একেকটি করে প্রতিশোধের আগুন উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছে। শক্তি প্রয়োগ করেও তারা তাদের বন্দিদের উদ্ধার করতে পারেনি, তারা ফিরে গেছে কেবল বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে বীর ‘ইউনিট অব দ্য শ্যাডো’ তাদের আগলে রেখেছিল।

দ্বিতীয়ত: দুই মাসেরও বেশি সময় আগে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি এবং বিশ্বের জালিম শক্তিগুলোর চোখের সামনে, প্রকাশ্যেই গাজা ভূমিতে যে রক্তের অবিরাম স্রোত বয়ে চলছিল তার থেমে যাওয়া—এ সবকিছুই আমাদের জনগণের দৃঢ়তা, তাদের আত্মত্যাগ এবং প্রতিরোধযোদ্ধাদের অবিচল সাহসিকতারই ফল।

আর যদি শত্রুকে অবাধ সুযোগ দেওয়া হতো, যদি তারা আমাদের জনগণ ও প্রতিরোধযোদ্ধাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র নতজানুতা বা আত্মসমর্পণের চিহ্ন দেখতে পেত, তবে মানুষ, পাথর ও বৃক্ষ—কিছুই রেহাই পেত না। গণহত্যার এই ধ্বংসযজ্ঞ তারা কখনোই থামাত না।

যুদ্ধ বন্ধের পর থেকে লাল রেখা অতিক্রম করে সংঘটিত অসংখ্য আগ্রাসন ও লঙ্ঘনের পরও প্রতিরোধ আন্দোলন তাদের ওপর অর্পিত সব অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করেছে। আমাদের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে, যাতে দখলদার শক্তি মিথ্যা অজুহাত তৈরি করে আবারও রক্তপাতের পথে ফিরে যাওয়ার সুযোগ না পায়। একই সঙ্গে আমরা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি, তাদের অপরাধের জবাব দেওয়ার অধিকার আমাদের একটি মৌলিক ও অত্যাবশ্যক অধিকার।

আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আহ্বান জানাই, দখলদার শক্তির লাগাম টানতে, তাদের আগ্রাসন বন্ধ করতে এবং স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতি পূর্ণাঙ্গভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে বাধ্য করতে। 

পাশাপাশি যাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা, তাদের প্রতি অনুরোধ, দখলদারদের নিরস্ত্রীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিন, যা আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাতে এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর আগ্রাসনে ব্যবহৃত হয়েছে ও এখনও হচ্ছে। শত্রুপক্ষ যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভাঙার জন্য দুর্বল ও মিথ্যা অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে আলোচনায় নিয়ে আসা হালকা ফিলিস্তিনি অস্ত্র নিয়ে অযথা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে এই বাস্তবতার দিকেই মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

আমাদের জনগণ আত্মরক্ষার জন্য লড়ছে এবং যত দিন দখলদারিত্ব থাকবে, তত দিন তারা তাদের অস্ত্র ত্যাগ করবে না। তারা কখনো আত্মসমর্পণ করবে না, এমনকি নখ দিয়ে পর্যন্ত লড়ে যাবে। আত্মসমর্পণের বদলে শাহাদাতকে বেছে নেওয়া রাফাহ ও তার বীর, দৃঢ়চেতা মানুষগুলোই তার সর্বোত্তম সাক্ষ্য ও প্রমাণ।

তৃতীয়ত: গাজার ওপর দখলদার বাহিনীর আগ্রাসন ও যুদ্ধবিরতির প্রকাশ্য লঙ্ঘনের পাশাপাশি, আল আকসা মসজিদ, পশ্চিম তীর ও বন্দিদের বিরুদ্ধে তাদের আগ্রাসন ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। আল আকসার পবিত্রতা পদদলিত করা, পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে আমাদের মানুষদের উচ্ছেদ, সেখানকার রাস্তায় দখলদার বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য এবং দখলদার সরকারের দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করতে চাওয়া সংযুক্তিকরণ (অ্যানেক্সেশন) প্রকল্প সম্পন্ন করার প্রচেষ্টা সবই এর প্রমাণ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের বীর বন্দীদের ওপর চালানো নৃশংস আগ্রাসন এবং বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইন প্রণয়ন। এই আগ্রাসনসহ অন্যান্য অপরাধ আমাদের জনগণের সন্তানদের জন্য এর মোকাবিলা করা অপরিহার্য করে তোলে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের সব মুক্তিকামী মানুষকে একটি বার্তাই দেয়, দখলদার শক্তির আগ্রাসন থামেনি। তাই তাদের আন্দোলনও থামা উচিত নয়; বরং গণভিত্তিক, রাজনৈতিক ও আইনীভাবে তা অব্যাহত ও আরও তীব্র হতে হবে, যাতে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে না পারে।

এবং কৃতজ্ঞতার অংশ হিসেবে আমরা শ্রদ্ধা জানাই ইয়েমেন, লেবানন, ইরাক ও ইরানের বীরদের, জর্দানের মুক্তিকামী মানুষসহ অন্যান্য দেশের সবাইকে—যাঁরা আমাদের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অবরোধ এবং মিছিল, কর্মসূচি ও সুমুদ ফ্লোটিলা আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সব মুক্তিকামী মানুষের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।

চতুর্থত: আমরা আমাদের উম্মাহর সন্তানদের প্রতি আহ্বান জানাই, গাজাকে উদ্ধার করুন। সেখানে কামানের শব্দ কিছুটা স্তিমিত হলেও গাজা এখনো চরম দুর্ভোগে আছে। তাকে সাহায্য করা, তার কষ্ট লাঘব করা আপনাদের ওপর কর্তব্য, আর আপনারা তা করতে সক্ষম। তারা যখন গণহত্যার শিকার হচ্ছিল তখন অনেকেই তাদের একা ছেড়ে দিয়েছিল। গণহত্যা শেষে এখনও গাজার মানুষের জন্য আপনাদের এতো কম প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়।

আর জেনে রাখুন, আরব ও মুসলিমরা যখন নিজের ভাইদের ওপর চলা জুলুমের ব্যাপারে নীরব থাকে, তখন মূলত তাদের নিজেদের পালা আসার অপেক্ষাই করতে হয়। এই সময়ে উম্মাহর দায়িত্ব হলো এক কাতারে দাঁড়িয়ে তাদের প্রথম শত্রুর মুখোমুখি হওয়া। যে প্রতিদিন তার মানচিত্রে উম্মাহর কোনো না কোনো রাজধানী যোগ করছে, এবং যে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে সে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার প্রবেশদ্বার বানাতে চায়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো লেবানন ও সিরিয়া এই দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের ওপর তার অব্যাহত আগ্রাসন।

এখানে সিরিয়ায় আমাদের আপনজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো জরুরি, যাঁরা একা হয়ে পড়ার পরও নিজেদের দেহ দিয়ে জায়োনিস্ট আগ্রাসনের মোকাবিলা করেছেন। তাঁদের এই অবস্থান আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরে। তাই হে ইসলামি উম্মাহ, জেগে উঠুন এবং উপলব্ধি করুন, এই ফুলে-ফেঁপে ওঠা শত্রু আসলে কতটা ভঙ্গুর, যে গাজার মাটিতেই বারবার অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে।

জেনে রাখুন, দখলদারিত্বের শরৎকাল শুরু হয়ে গেছে। অষ্টম দশকের অভিশাপ তার ওপর নেমে এসেছে। আজ আরেকটি সংঘর্ষ তার ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে, ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে তার কাঠামো। এসবই আল্লাহর ইচ্ছায় তার পতনের সুসংবাদ। শিশু, নারী ও নিরপরাধ মানুষের রক্তের অভিশাপ, ফসলফলাদি ও মানবতা ধ্বংসের ভয়াবহ পরিণতি তাকে তাড়া করতেই থাকবে—যতক্ষণ না সব সৃষ্টি তাকে প্রত্যাখ্যান করে, এমনকি পাথর ও গাছও।

মানুষের সমর্থন থেকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, সমর্থকদের বন্ধন ছিন্ন হওয়া, ব্যাপক অবিচারের পর তার পতনের সূচনা—সবকিছুই তার পরিণতি নিকটবর্তী হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এটাই তার দম্ভ চূর্ণ হওয়ার, তার ঔদ্ধত্য ভেঙে পড়ার এবং আখিরাতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আলামত।

এবং সেই প্রতিশ্রুতির আলোতেই আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত প্রত্যেকের বিচার হবে। যারা শত্রুর সঙ্গে সমন্বয় করেছে, স্বাভাবিকীকরণ প্রকল্প ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, দখলদারের সহযোগী হয়ে তার দালাল হতে রাজি হয়েছে—সবাই বিচারের মুখোমুখি হবে। কারও পরিণতি হবে লাঞ্ছিত হয়ে পথের ধারে পড়ে থাকা, আর কেউ নিহত হবে। কয়েক সপ্তাহ আগে এই অপরাধের নেতৃত্ব দেওয়া লোকদের যে পরিণতি হয়েছিল, সেটিই তার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

সবশেষে, হে আমাদের আপন মানুষ, হে আমাদের জাতি, হে গাজার মহান জনগণ আপনারা গাজার অটল পাহাড়ের মতোই দৃঢ়। আপনারা আমাদের পিতা-মাতা, আমাদের ভাই-বোন ও সন্তান, আমাদের সংগ্রামী পরিবার ও শার্দূল জতি। আমরা আপনাদেরই সন্তান, এটাই আমাদের গর্ব। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় আপনাদের কপালে চুমু দিই, মাথা নত করে সম্মান জানাই এবং অঙ্গীকার করি, আপনাদের ত্যাগের প্রতি আমরা সর্বদা বিশ্বস্ত থাকব।

যেমন আমরা একসঙ্গে দুঃখ ও যন্ত্রণা ভোগ করেছি, তেমনি একসঙ্গেই দখলদারের ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন জীবন গড়ে তুলব। আমরা আহতদের সেবাযত্ন করব, শোকাহতদের মাথায় স্নেহের হাত রাখব। আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা রেখে বলছি, আপনাদের কোনো ত্যাগই বৃথা যাবে না।

আল আকসার প্রতিরক্ষার সংগ্রামে অংশীদার করে আল্লাহ আপনদের প্রতিটি ঘরকে সম্মানিত করেছেন। তিনি আপনদের হৃদয়ে ধৈর্য দান করেছেন, তাঁর অনুগ্রহে আপনাদের ঘিরে রেখেছেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনদের জন্য এক বিশেষ অনুগ্রহ। কারণ আপনারাই রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর প্রিয়জন, সত্যের পথে জ্বলন্ত অঙ্গার আঁকড়ে ধরা সেই মানুষ—যারা সহায়তা না পেলেও সত্য থেকে সরে আসে না।

আপনারাই সেরা মুরাবিত, আর আপনাদের শ্রেষ্ঠ রিবাত আসকালান। তাই গভীর বেদনার মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পূর্ণ অধিকার আপনাদের আছে। আল্লাহ আপনাদের বেছে নিয়েছেন ও মনোনীত করেছেন—তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও নববী সুসংবাদের যোগ্য হিসেবে, যা পৃথিবীর প্রতিটি মুসলমান কামনা করে। আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা-ই সর্বোত্তম ও চিরস্থায়ী।

সেদিন বলা হবে, ‘ধৈর্যশীল মুমিনদের জন্য সুসংবাদ।’ তখন মনে হবে, তারা যেন কখনোই দুঃখ-কষ্টের স্বাদ নেয়নি। জেনে রেখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিতও হবে না। ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেওয়া হবে সীমাহীনভাবে।

আর আল্লাহ তাঁর কাজে প্রবল ক্ষমতাবান; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। এটি এক জিহাদ—হয় বিজয়, নয়তো শাহাদাত।

সূত্র: আল জাজিরা