ইসলামি ইমারত আফগানিস্তানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ আফগান টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলন, ইসলামি ইমারত পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর আফগানিস্তানে দীর্ঘদিনের অস্থিরতার অবসান ঘটেছে এবং দেশ এখন স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার পথে এগোচ্ছে।
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আফগান জনগণ ও মুজাহিদিনরা বিশ বছরের পশ্চিমা দখলদারত্বের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বর্তমানে সব আফগান ইসলামি ব্যবস্থার অধীনে ঐক্য, শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইসলামি ইমারত পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি হেরাত প্রদেশের কথা উল্লেখ করে বলেন গত চার বছরে শুধু হেরাতেই উৎপাদনমুখী কারখানার সংখ্যা ১৫০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০–তে পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, গত চার অর্থবছরে দেশের জাতীয় বাজেট ইসলামি ইমারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজস্ব থেকেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এটাকে তিনি আফগান অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
শরণার্থী প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, গত বসন্তকাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ লাখ আফগান শরণার্থী দেশে ফিরে এসেছে। ইসলামি ইমারত এই প্রত্যাবর্তনকারী নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন খাতে উন্নত সেবা দিতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদার হয়েছে।
সামাজিক সহায়তা কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে তিনি বলন, গত এক বছরে দরিদ্র, এতিম ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের মধ্যে নগদ সহায়তা হিসেবে মোট ১২০০ কোটি আফগানি বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি মাসে নিজস্ব বাজেট থেকে ১০ লাখ ৪০ হাজার সরকারি কর্মচারীর বেতন পরিশোধ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ফেরত আসা শরণার্থীদের মধ্যে স্পিন বোলদাক সীমান্তপথ দিয়ে প্রবেশ করা পরিবারগুলোর কথাও উল্লেখ করে বলেন, ইসলামি ইমারত তাদের জন্য বিনা খরচে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে নিজ নিজ পৈতৃক এলাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে।
বিচারব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, বিচারিক কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে দণ্ডবিধি স্পষ্ট করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই দণ্ডবিধিতে উল্লেখিত শাস্তিগুলো ইসলামি শরিয়াহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, দণ্ডবিধি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই এবং যারা হুদুদ ও ইসলামি দণ্ডবিধি সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা এটি সহজেই বুঝতে পারবেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা শক্তিশালী ও জনগণের জন্য সন্তোষজনক। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি সাম্প্রতিক ঈদুল আজহার সময় দুই লাখ মানুষের বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এটি দেশের সার্বিক নিরাপত্তার প্রতিফলন।
পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ইসলামি ইমারত আফগানিস্তান সব দেশের সঙ্গে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও, ভালো ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রও হয়তো বুঝতে পেরেছে যে আফগানিস্তানে কূটনৈতিকভাবে অনুপস্থিত থাকা তাদের স্বার্থে নয়।
তিনি আরও বলেন, ওয়াখান করিডোর নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে এবং এ বিষয়ে উভয় পক্ষ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রশাসনিক কাঠামো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলামি ইমারতের প্রশাসনে বর্তমানে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার সরকারি কর্মচারী কাজ করছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই আগের সরকারের সময়কার কর্মচারী। তাঁর মতে, উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমিরুল মুমিনিন হেবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাহর পক্ষ থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব অর্পণের ঘোষণাকে তিনি এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সবশেষে জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ইসলামি ইমারত আফগানিস্তান জাতীয় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের ন্যায্য প্রত্যাশা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামি নীতিমালা ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে জনসমস্যা সমাধানে কাজ করা হচ্ছে। তিনি জানান, চলতি ও আগামী অর্থবছরের জন্য ৫০০টি বড় ও ছোট উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ প্রকল্প ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।











