কে সেই মহীয়সী নারী, যিনি ছিলেন শহিদ আবু উবায়দার অনুপ্রেরণা 

আবু উবায়দা শহিদ হওয়ার ৯ মাস পর, আল জাজিরা  খুঁজে পেল ওনার ৬ সদস্যের পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্যকে।
শহিদ আবু উবায়দা
শহিদ আবু উবায়দা

গাজায় ইসরায়েলি বিমান থেকে ফেলা একটি প্রচারপত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ইসরা। কাগজের ওপরে লেখা কাসসামের মুখপাত্রকে চেনা যাবে এমন কিছু তথ্য। যদি কেউ তার খোঁজ দিতে পারে তবে তাকে দেয়া হবে মোটা অংকের টাকা—সেই প্রলোভনও ঝুলে আছে প্রচারপত্রের নিচে। ইসরা ছোট একটি কাঁচি তুলে নিলেন। কাঁপাকাঁপা হাতে ছবির চারপাশটা সযত্নে কাটলেন, তারপর সেটি টানিয়ে দিলেন তাঁর এক চিলতে আশ্রয়কেন্দ্রের জীর্ণ দেয়ালে, যার আয়তন টেনেটুনে ১২ বর্গমিটারও হবে না। ছবির এই দীপ্ত মানুষটিকে বিশ্ববাসী চেনে সামরিক মুখপাত্র ‘আবু উবায়দা’ হিসেবে, তবে ইসরার কাছে তিনি কেবল তাঁর হৃদয়জুড়ে থাকা তার জীবনসঙ্গি স্বামী ‘হুজাইফা’।

ছোট্ট ছেলে ইয়ামান মায়ের কাণ্ড দেখছিল নিশ্চুপে। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ছবিটির দিকে, যেন ওটাই বাবার সাথে তার সম্পর্কের শেষ সূত্র। ফিসফিস করে বলছিল, ‘বাবা… বাবা…’। মনে মনে ইসরা বলছিলেন, ‘তাঁকে যেন কখনো ভুলে যেও না ইয়ামান।’ মাসের পর মাস স্বামীকে এক নজর দেখতে না পারার সে যে কী তীব্র তিয়াস লুকিয়ে আছে ইসরার মনে, ইসরা ছাড়া সেটা কেউ জানে না। শুধু একবার তাঁর মুখটা ছুঁয়ে দেখার আকুলতায় এক একটা দিন রাত গুজরান হচ্ছিল দীঘল কোন বছরের মত।

ছবির পাশেই তিনি সেঁটে দিয়েছিলেন কিছু দোয়া লেখা কাগজ, যদি তাতে মনটা একটু শান্ত হয়। চারপাশের সবকিছুই তো ভয়ের বার্তা নিয়ে আসছিল। হুজাইফার বাহুডোরে যে নিরাপত্তা তিনি পেতেন, তা এখন সুদূর অতীত। না আছে পাশে দাঁড়ানোর মতো পরিবার, না আছে খবরের কোনো মাধ্যম। পৃথিবীর খবর তিনি জানেন না, পৃথিবীও জানে না তাঁর খবর। ইসরায়েলের তাবৎ গোয়েন্দা আর প্রযুক্তি যে মানুষটির পিছু নিয়েছে, তাঁর স্ত্রীর জন্য এমন বিচ্ছিন্নতা খুব স্বাভাবিকই যেন।

যুদ্ধবিরতির সাক্ষাৎ

এক বছরেরও বেশি সময় পর, স্বামীর কণ্ঠস্বর ও এক পলক দেখার জন্য তাঁর দীর্ঘ তৃষ্ণার অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কাগুজে কলমের সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো, উত্তর ও দক্ষিণ গাজার মাঝের বাধা সরে গিয়ে সীমানার কাঁটাতার মুছে গেলে খানিকটা দূর হলো হৃদয়ে সারাক্ষণ ধুকপুক করতে থাকা ভীতি। দীর্ঘ তৃষ্ণার্ত হৃদয় যেন বহু মাস পর ফিরে পেল তার হারানো প্রশান্তি।

দক্ষিণ গাজায় পৌঁছানো প্রথম এক দল যাত্রীদের মধ্যেই ছিলেন হুজাইফা। চার সন্তানের জন্য হাত ভরা উপহার। দীর্ঘ এ বিচ্ছেদে যায়তুন গাছের মত ধৈর্যশীল প্রিয়তমা স্ত্রীকে একটু পুরষ্কার দিতে তার জন্যও একটা সুন্দর উপহার নিয়ে এসেছেন বুকপকেটে—ভারী সুন্দর একজোড়া সোনার দুল। দুলের প্রতিটা জোড়া যেন ভালোবাসার উষ্ণতায় মোড়ানো কোন সুতোয় বাঁধা; যুদ্ধের দীর্ঘ দাস্তানে হুজাইফা যা হারিয়ে ফেলেছিলেন মনের কোন বিপ্লবী শহরে। দুলটা বুকপকেট থেকে বুকে যেন ধিকধিক করে জ্বালাচ্ছিল সেই স্ফুলিঙ্গ, ২০ বছর আগে যেটা খুব শান্তভাবে জ্বলে উঠেছিল হুজাইফার হৃদয়ের অন্দরে; ইসরা তখন ১৭ বছরের কিশোরি। হুজাইফার তত্ত্বাবধানেই তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন, এরপর সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে মেধার সাক্ষর রেখে স্নাতক শেষ করেন।

আমৃত্যু তোমার সাথে

হুজাইফার সাথে সাক্ষাতের পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে ছেড়ে যেতে চাননি ইসরা। যুদ্ধ আবার শুরু হলে তিনি আর বিচ্ছেদের তিক্ত স্বাদ নিতে রাজি হলেন না। প্রতি মুহূর্তেই তাঁর হৃদয়ের আরজি ছিল: ‘তোমার সাথেই থাকব চিরকাল, এই দুনিয়ায় মওত অব্দি।’ ইসরা তাঁর সেই ওয়াদা রেখেছিলেন, একসাথেই রবের জান্নাতের দিকে শুরু করেছিলেন তাদের অনন্ত মহাকালের যাত্রা।

আবু উবায়দা ঘরের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি

আবু উবায়দা শহিদ হওয়ার ৯ মাস পর, আল জাজিরা  খুঁজে পেল ওনার ৬ সদস্যের পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্যকে। প্লাটিনামের রড বসানো ক্ষতবিক্ষত পা মেলে বসে আছেন ১৮ বছরের ইব্রাহিম। ফ্যাকাশে মুখাবয়বে অনিদ্রার ছাপ, মস্তিষ্কে এখনো দগদগে সেই ভয়াবহ আক্রমণের স্মৃতি; কিছুতেই হয়তো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন না তিনি। ইব্রাহিম, সেই মুখোশধারী মানুষটির জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান। বাকিরা ছিলেন—দুই বোন লায়ান (১৫) ও মিনাতুল্লাহ (১২) এবং দুই ভাই ইব্রাহিম ও ইয়ামান (৭)।

আল জাজিরা প্রশ্ন করল, ‘কীভাবে এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে তুমি সুস্থ অবস্থায় বেরিয়ে এলে?’

ম্লান হেসে ইব্রাহিম উত্তর দিলেন, ‘ইশ! যদি এর উত্তরটা আমি জানতাম।’

ইব্রাহিমের মনে বারবার উঁকি দিত নানা দৃশ্যপট—হয়তো সে একাই মারা যাবে, নয়তো শুধু বাবা শহীদ হবেন, কিংবা সবাই একসাথে চলে যাবে। কিন্তু গল্পের শেষটা যে এমন অপ্রত্যাশিত হবে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। হামলার রাতে স্বপ্নে দেখেছিল, সে আকাশে পাঁচটি গুলি ছুড়ছে। কে জানত, এর ব্যাখ্যা হবে—তার ঘরের পাঁচটি প্রাণ আসমানের রবের উদ্দেশ্যে সফর করবে আর সে একা পড়ে থাকবে জমিনে!

মহাকালের বিপ্লবীর অন্তিম মুহূর্ত

জীবন ওলট-পালট করে দেয়া সেই আখেরি মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে ইব্রাহিম বলছিলেন: ‘বেগুন দিয়ে তৈরি একটা সাধারণ খাবারই ছিল আমাদের শেষ খাবার। বাবা নিজ হাতে কাঠ জ্বেলে সবার জন্য খাবারটা প্রস্তুত করেছিলেন।’

আসরের নামাজ শেষে সবাই যখন একত্র হলেন, ইসরা তখন কোরআন হাতে সুরা বাকারা তেলাওয়াত করছেন। ছোট ভাই ইয়ামান ইব্রাহিমের হাত আঁকড়ে ধরে তার গা ঘেঁষে বসে আছে। ঠিক তখনই তাদের মাথার ওপর আছড়ে পড়লো ইসরাইলি বোমা। বিস্ফোরণের তীব্র আঘাতে ছিটকে গেল সবাই, ইয়ামান উড়ে গেল কয়েক মিটার দূরে। ইব্রাহিম ছিটকে পড়লেও জ্ঞান হারাননি, গুরুতর জখমে নড়াচড়ার শক্তিহীন পড়ে রইলেন ধ্বংসস্তুপের মাঝে। দূর থেকে কেবল ক্ষীণস্বরে বলছিলেন: ‘কালিমা পড়ো ভাই আমার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো…’, কিন্তু কোনো সাড়া এল না। তিনি বুঝলেন, ভাইটি তাঁর তৎক্ষনাৎ শহীদ হয়ে গেছে। বারবার ডাকার পরও যখন কেউ সাড়া দিল না, তখন তিনি নিশ্চিত হলেন—তাঁর স্বপ্নই সত্যি হয়েছে। পরিবারের পাঁচজনই জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে গেছেন, এখানে এই দুনিয়ায় বেঁচে আছেন কেবল তিনি একা, এর বাইরে কোথাও কেউ নেই; শুধু ধ্বংসস্তুপ, স্বপ্নভঙ্গের গান, বিষণ্ন ভায়োলিন।

ইব্রাহিম আল জাজিরাকে বলেন, ‘বাবার সাথে থাকার ঝুঁকিটা আমরা জানতাম, তবু তাঁর উপস্থিতিতে অদ্ভুত এক নিরাপত্তা অনুভব করতাম সবাই।’ তিনি একটু থামলেন, যেন অনুভূতির থলে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন, তারপর বললেন, ‘সেই প্রশান্তির কথা ভাবলে আমি অবাক হই। অথচ যখন আমরা তাঁর থেকে দূরে থাকতাম, তখনই ভীষণ ভয় পেতাম।’

বোমাবর্ষণ যখন তীব্র হত, তখনকার বলা বাবার কথাগুলো ইব্রাহিমের হৃদয়ে গেঁথে আছে। বাবা ছোটদের সান্ত্বনা দিয়ে ভীতি কাটানোর জন্য বলতেন: ‘সবচেয়ে বেশি কী-ইবা হতে পারে? আমরা সবাই একসাথে শহিদ হবো? মৃত্যু তো যন্ত্রণাদায়ক নয় আমাদের জন্য, আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের মুহূর্তে মৃত্যু আমাদের জন্য এক সুন্দর তোহফা, আমাদের জন্য স্বাগতিক বার্তা।’

কোরআনের আবহে গড়া পরিবার

ইসরা ও তাঁর স্বামী তাঁদের সন্তানদের গড়ে তুলেছিলেন কোরআনের হাফেজ হিসেবে; তাঁদের তিন সন্তানই কোরআন হিফজ করেছেন। যুদ্ধের ডামাডোলে সন্তানরা যখন ঘরে আটকা, সেই সময়টাকে ইসরা কাজে লাগিয়েছিলেন নিপুণভাবে। যুদ্ধের প্রথম মাসেই তিনি ছেলে ইব্রাহিমকে কোরআন হিফজ করান। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে মেয়ে লায়ান হিফজ সম্পন্ন করেন। ছোট মেয়ে মিন্নাও পুরো যুদ্ধজুড়েই কোরআন মুখস্থ করেছেন এবং শেষও করেছেন।

মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইব্রাহিম বলেন, ‘তিনি কখনো তাহাজ্জুদ ছাড়তেন না। প্রতি রাতে আমরা শুনতাম, তিনি আমাদের ও বাবার জন্য উচ্চস্বরে দোয়া করছেন। তিনি আমাদের সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও সময়মতো নামাজ আদায়ে তাগিদ দিতেন। দ্বীনের পরিপন্থী কোনো বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর।’

যুদ্ধের দিনগুলোতে আবু উবায়দা সন্তানদের সাথে ফিসফিস করে কথা বলতেন, পাছে গোয়েন্দা ড্রোন তাঁর কণ্ঠস্বর ধরে না ফেলে। সেই অতি নিচু স্বরেই তিনি সন্তানদের আল্লাহর সুন্দর নামগুলোর (আসমাউল হুসনা) ব্যাখ্যা শোনাতেন। প্রতিদিন দুটি করে নাম নিয়ে তিনি গভীর আলোচনা পর্যালোচনা করতেন এবং প্রতিটি আলাপচারিতায় ও পরিস্থিতিতে তাদের মনে গেঁথে দিতেন বিশুদ্ধ আকিদার পাঠ।

নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো শৈশব

বছর কয়েক আগে থেকেই ইব্রাহিম বাবার সামরিক অবস্থান ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছিলেন। মা ইসরা তখন থেকেই সন্তানদের শিখিয়েছিলেন মা-বাবার নিরাপত্তা রক্ষায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কীভাবে গ্রহণ করতে হয়; যেমন বিশেষ নিরাপদ ফোন ব্যবহার করা, যার ক্যামেরা ঢাকা থাকে এবং ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ থাকে—ইত্যাকার আরো নানা বিষয়াদি।

আবু উবায়দার সন্তানদের প্রথম যে শিক্ষাটি দেওয়া হয়েছিল, তা হলো ‘সরাসরি অস্বীকার করা’। বিশেষ করে দখলদার বাহিনী যখন তাঁর নাম ও ছবি প্রকাশ করল, তখন বাবার নামের সাথে নিজেদের সম্পর্ক গোপন রাখাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। ইব্রাহিম বলেন,‘প্রায়ই আমাকে প্রশ্নের ফাঁদে ফেলা হতো। যখনই আমার নাম বা পরিচয় জানতে চাওয়া হতো, আমি অস্বীকার করতাম। এমনকি আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও আমি বাবার সাথে আমার সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছি।’

সামরিক মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই আবু উবায়দা নিয়মিত বাসস্থান পরিবর্তন করতেন। পরিস্থিতি একটু শান্ত থাকলে পরিবারটি চলাফেরা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে খানিক স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারত। কিন্তু যুদ্ধ বা সংঘাতের সময় তারা মেনে চলতেন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

পদে পদে আল্লাহর নুসরাত

ইব্রাহিম জানান, তাঁর বাবা বেশ কয়েকবার গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে ফিরেছেন। এর মধ্যে কয়েক বছর আগে একবার অপহরণের চেষ্টাও হয়েছিল। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ও রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে এই যুদ্ধের সময়। ইসরায়েলি সৈন্যরা ঠিক সেই ভবনেই অবস্থান করছিল যেখানে আবু উবায়দা ছিলেন। টানা ১৪ দিন তিনি সেখানে অবরুদ্ধ ছিলেন, আখেরি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সৈন্যরা তাঁকে স্পর্শ না করেই চলে যায়। ইব্রাহিম বলেন, ‘বাবা আমাকে এই গল্পটি শুনিয়েছিলেন। শত্রুর ডেরায় থেকেও নিরাপদে থাকা এবং আল্লাহ তাদের চোখ অন্ধ করে দেয়া—এটা বাবার জন্য ছিল এক বিরাট কারামাত।’

অনন্য এক দম্পতি

বাবা-মায়ের সম্পর্কের গভীরতা বর্ণনা করতে গিয়ে ইব্রাহিম বলেন, ‘তাঁদের সম্পর্কটা সাধারণ ছিল না, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নিপুণ বোঝাপড়ার এক অনন্য বন্ধন ছিল তাদের মধ্যে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তাঁদের চিন্তাভাবনার এত মিল দেখে আমি অবাক হতাম।’

পাশে থাকা আবু উবায়দার মা অর্থাৎ ইব্রাহিমের দাদিও এই কথায় সায় দিলেন। আল জাজিরাকে তিনি বললেন, হুজাইফার সাথে ইসরার ২০ বছরের সংসারে তিনি কখনো একে অপরের বিরুদ্ধে একটিও অভিযোগ শোনেননি। পরিবারের মধ্যে তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল সত্যিই চোখে পড়ার মতো। আবু উবায়দার মা জানান, ছেলে হুজাইফার বিয়ে হয়েছিল পারিবারিকভাবেই। হুজাইফার এক বন্ধুর স্ত্রী ছিলেন ইসরার বোন। সেই বন্ধুর পরামর্শেই এই সম্বন্ধ হয়। বন্ধুটি মেয়েটির পরিবার, তাঁর শান্ত স্বভাব এবং হুজাইফার পরিস্থিতির সাথে মানানসই ধার্মিকতার প্রশংসা করেছিলেন।

সাহাবিদের মত এক মহীয়সি নারী

গল্পের বাকি অংশ শোনান ইসরার ভাই ইমাদ। আল জাজিরাকে তিনি জানান, বিয়ের প্রস্তাব আসা মাত্রই ইসরা রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, যদিও তিনি জানতেন আবু উবায়দা তখন থেকেই সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে ভারী বিপদজনক এক দায়িত্ব বহন করে চলেছেন। প্রতিরোধের প্রতি ইসরার আত্মিক টান এতটাই গভীর ছিল যে, হুজাইফার বিয়ের প্রস্তাব তাঁর কাছে মনে হয়েছিল এক পরম আরাধ্য, যা ফিরিয়ে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তিনি এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে, কারো বাহবা বা প্রশংসার তোয়াক্কা না করেই।

ভাইয়ের চোখে ইসরা ছিলেন ইসলামের সোনালি যুগের নারী সাহাবিদের প্রতিচ্ছবি। কঠোর বিধিনিষেধ আর কঠিন জীবন নিয়ে তিনি কোনোদিন অভিযোগের সুর তোলেননি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত চাপা স্বভাবের; স্বামীর ক্ষতি হতে পারে বা কোনো গোপন তথ্য ফাঁস হতে পারে—এমন সব বিষয়ে তিনি মুখে কুলুপ এঁটে থাকতেন।

বন্ধু মহলে অজানা পরিচয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ও বান্ধবীদের কাছেও তাঁর এই মিতভাষী স্বভাব ছিল পরিচিত। তাঁর শাহাদাতের পর যখন জানা গেল তিনি কাসসামের মুখপাত্রের স্ত্রী, তখন সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লেন।

আল জাজিরাকে তাঁরা জানালেন, ইসরা কথা বলতেন খুব মেপে মেপে, প্রয়োজন ছাড়া মুখ খুলতেন না। তাঁর মেলামেশা ছিল খুব সীমিত, সবার সাথে তিনি মিশতেন না। তাঁর বান্ধবী খুলুদ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে তাঁর সান্নিধ্য দিয়ে ধন্য করেছেন। অথচ এতবার দেখা হওয়ার পরও আমি জানতাম না যে তিনি সেই মুখপাত্রের স্ত্রী। আমাদের সামনে তিনি কখনোই স্বামীর কথা উল্লেখ করেননি। তাঁর শাহাদাতের পরই কেবল আমি তা জানতে পারি।’

নিভৃতচারী এক নারী

বান্ধবীদের চোখে ইসরা ছিলেন একজন আদর্শ মুসলিম মা ও প্রকৃত শিক্ষিকা। সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপোষহীন, স্বামীর গোপনীয়তা রক্ষায় বজ্রকঠিন। ছিলেন ধীরস্থির, বিনয়ী ও মিতভাষী—যেন তাঁর উপস্থিতিতেই ঝরে পড়ত এক অনাবিল প্রশান্তি।

বান্ধবী আলার ভাষায়, ‘সে ছিল ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসের মতো কোমল ও শান্ত। পৃথিবীতে সে এসেছিল, আবার চলেও গেল; কিন্তু কাউকে কোনো কষ্ট দেয়নি, কারো মনে কোনো খারাপ স্মৃতি রেখে যায়নি।’ বান্ধবীরা বলেন, এত গোপনীয়তার মধ্যেও ইসরা তাঁর সমবয়সীদের চেয়ে খুব একটা আলাদা ছিলেন না। আবু উবায়দার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ থাকা বা কঠোর নিরাপত্তা—কোনোকিছুই তাঁর জীবনের স্বপ্ন বা এগিয়ে যাওয়ার স্পৃহাকে দমাতে পারেনি।

এক সাথে, এক পথে

এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটল হুজাইফা আল কাহলুত (শহিদ আবু উবায়দা) গল্পের শেষ অধ্যায়ের। উন্মোচিত হলো তাঁর কেফিয়াহর আড়ালে থাকা জগত এবং তাঁর স্ত্রী ‘ইসরা জাবের’-এর পরিচয়। যিনি ছিলেন তাঁর গোপনীয়তার রক্ষক, জীবন দাস্তানের বীরঙ্গনা, সফরের সাথী, সবরের সারথি।

মুখোশের আড়ালে বিচরণ করা মানুষটির পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। নিভৃতে সুতো বেঁধে সামলেছেন সংসারের সব দিক, আগলে রেখেছেন সব গোপন রহস্য, ধরে রেখেছেন স্বামীর মানসিক ইতমিনান। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, প্রতিটি মহৎ পুরুষের নেপথ্যে থাকেন এমন এক নারী, যিনি তাঁর নীরবতা আর কণ্টকাকীর্ণ পথের ধৈর্য দিয়ে রচনা করেন এমন সব বীরত্বগাঁথা, যার সাথে পৃথিবীর অন্য কোনো নারীর ত্যাগের তুলনা চলে না।

আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন