বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে আফগানিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য উপমন্ত্রী মাওলানা আহমদুল্লাহ জাহিদ দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি ঢাকা ও কাবুলের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ চলাচল এবং বাংলাদেশ থেকে আফগানিস্তানে বিনিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছেন।
গত ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের কাছে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন আফগানিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপমন্ত্রী মাওলানা আহমদুল্লাহ জাহিদের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। এ সময় ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের সুতা ও বস্ত্র শিল্পের কাঁচামালের বিপুল চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে এই আলোচনায় আফগান তুলা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আফগানিস্তান বাংলাদেশের কাছে প্রায় ৪৫টি পণ্যের শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা চেয়েছে, যার মধ্যে তুলা প্রধান। বিনিময়ে আফগান পক্ষ বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধান রপ্তানি পণ্যের জন্য তাদের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের প্রস্তাব দিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
বৈঠকে মাওলানা জাহিদ বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের জন্য একটি প্রধান আমদানির উৎস হিসেবে বর্ণনা করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, পানীয়, মিষ্টান্ন এবং প্যাকেটজাত মসলার প্রতি তাদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। আফগান কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, উন্নত বাজার সুবিধা নিশ্চিত হলে একদিকে যেমন তাদের কাঁচামাল রপ্তানি বাড়বে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের বৈচিত্র্যও তৈরি হবে।
এর পাশাপাশি তিনি ১৯ জানুয়ারি (সোমবার) ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়ে একটি সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। খসড়া সূচি অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি (বুধবার) মাওলানা জাহিদ বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পরিমাণে ওষুধ আমদানির বিষয়ে জানতে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পরিমাণে ওষুধ আমদানি করতে আগ্রহী বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট পলিটিক্যাল ডিভিশনের মহাপরিচালক ও বর্তমানে ভারতে ইমারতে ইসলামিয়া সরকারের রাষ্ট্রদূত মোল্লা নুর আহমদ স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পরিদর্শনে যান।
এদিকে বর্তমানে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাত তাদের প্রয়োজনীয় তুলার সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ভারত এবং কয়েকটি আফ্রিকান দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আফগান তুলা বাংলাদেশের জন্য একটি বিকল্প ও মানসম্মত উৎস হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
আফগানিস্তানে রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৯৮টি পণ্য কেনাবেচা হয়। তিনি আরও যোগ করেন, আফগানিস্তান তুলা ছাড়াও শুকনো খাবার, ফলমূল, জাফরান, কাঠবাদাম এবং পাথরজাতীয় পণ্য রপ্তানিতে আগ্রহী। অন্যদিকে, আফগান বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল পণ্যের আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, আফগান উপমন্ত্রী বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা বাড়াতে যত দ্রুত সম্ভব পণ্যবাহী উড়োজাহাজ চলাচলের প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, কাবুল থেকে ঢাকায় ফলমূল পরিবহন করা হবে। ফিরতি ফ্লাইটে বাংলাদেশের ওষুধ পাঠানো হবে কাবুলে। তিনি এশিয়ার হৃদয় খ্যাত আফগানিস্তানে বিনিয়োগেরও অনুরোধ জানান।
উল্লেখ্য, এর কয়েক মাস আগেও একটি আফগান প্রতিনিধি দল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ে বাংলাদেশ সফর করেছিল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের ভ্যালু চেইনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সুসংগঠিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান ধারাবাহিকভাবে আগ্রহী।











