২০২৬ সালের শুরুতে উত্তর সিরিয়ার আলেপ্পোতে আবারও রণদামামা বেজে উঠেছে। কুর্দি অধ্যুষিত শেখ মাকসুদ এবং আশরাফিয়া এলাকায় সিরীয় সেনাবাহিনী ও সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) মিলিশিয়াদের মধ্যে শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
গত ৬ জানুয়ারি থেকে নতুন করে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে ইতোমধ্যে বেসামরিক নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে বলে জানা গেছে। বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের পর একে অন্যতম ভয়াবহ সংঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এসডিএফ (SDF) কারা
এসডিএফ (SDF) বা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস হলো উত্তর ও পূর্ব সিরিয়ার একটি শক্তিশালী সশস্ত্র জোট। এটি মূলত কুর্দি, আরব, এবং আসিরীয়সহ বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত।
২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসী আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এই বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। এই জোটের মূল চালিকাশক্তি হলো ওয়াইপিজি (YPG) নামক কুর্দি মিলিশিয়া গোষ্ঠী। তবে জোটটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আরব এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু যোদ্ধাও রয়েছে।এসডিএফ-এর প্রধান আন্তর্জাতিক মিত্র হলো যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাহিনী আইএস বিরোধী যুদ্ধে এসডিএফ-কে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং বিমান সহায়তা দিয়ে আসছে। এসডিএফের নিয়ন্ত্রণে আছে মূল ভূখণ্ডের ২৭.৮% এলাকা । প্রায় তিনটি বড় প্রদেশ— রাক্কা, হাসাকা, দাইর আজ জুর এবং আলেপ্পোর কিছু অংশ।
কেন এই সংঘাতের সূত্রপাত?
গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা আলেপ্পোর আবাসিক এলাকাগুলোতে এসডিএফ নির্বিচারে রকেট ও মর্টার শেল নিক্ষেপ শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এসডিএফকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরই এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। রাজনৈতিক সমাধান প্রক্রিয়া থমকে যাওয়াই মূলত নতুন করে যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়।
গত ৮ জানুয়ারি টানা তৃতীয় দিনের মতো এসডিএফ তাদের সামরিক তৎপরতা আরও জোরদার করে। তারা লেরামুন অঞ্চল এবং শিহান স্কয়ার টার্গেট করে হামলা চালায়। এসডিএফ সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং বেসামরিক এলাকাগুলো লক্ষ্য করে উসকানি দেয় এবং সাম্প্রতিক সময়ে তারা বেশ কিছু হত্যাযজ্ঞও চালায়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে এসডিএফ-এর হামলায় ২০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং অন্তত ১৫০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন সেনাসদস্য।
রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান: এবারের লড়াই ভিন্ন কেন?
আলেপ্পোতে এসডিএফের এমন তৎপরতা নতুন নয়। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবর ও ডিসেম্বরেও তারা একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সে সময় সেনাবাহিনী পাল্টা জবাব দিলে পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তবে এবার রাষ্ট্রের অবস্থান অনেক বেশি কঠোর।
যুদ্ধবিরতির জন্য এবার সাফ শর্ত দিয়েছে সিরিয়া সরকার। আলেপ্পো শহর থেকে এসডিএফকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে, এটাই তাদের অবস্থান। সিরিয়ান সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়া এলাকায় এসডিএফের সব ঘাঁটিকে ‘বৈধ সামরিক টার্গেট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি চূড়ান্ত অভিযান শুরুর আগে ওই সব এলাকা ছেড়ে যেতে সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে।
কেন আলেপ্পো এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়া এলাকা এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কুর্দি–অধ্যুষিত এই এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। ২০২৫ সালের মার্চে হওয়া এক চুক্তিতে এসডিএফ আলেপ্পো ছাড়তে সম্মত হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। এতে দামেস্কের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন সিরিয়ায় এসডিএফ-এর স্বায়ত্তশাসন-এর দাবি এবং সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকৃতি এই সংকটের মূল কারণ। দামেস্ক মনে করে, স্বায়ত্বশাসন সিরিয়ার অখণ্ডতার পরিপন্থী।
কেন এখনই চূড়ান্ত অভিযানের সিদ্ধান্ত?
বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণে সিরিয়া এবার সামরিকভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে,
• রাজনৈতিক সমঝোতার সমাপ্তি: ২০২৫ সালের মধ্যে এসডিএফকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ব্যার্থ হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে মার্কিন মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনাও কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে দামেস্ক সামরিক পথেই সমাধান খুঁজছে বলে মনে করা হচ্ছে।
• বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা: এসডিএফ আলেপ্পোর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে সরকারকে চাপে ফেলতে চাইছে। এই মানবিক ও নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করা এখন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।
• ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ: দক্ষিণ সিরিয়ায় উত্তেজনা কমাতে সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে। সিরিয়া দেখতে চায় এসডিএফ-এর মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েল কতটুকু পিছু হটেছে। সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে তেল আবিব যুদ্ধকালীন বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। যার মধ্যে এসডিএফও রয়েছে। দামেস্ক এই আলোচনায় স্পষ্ট শর্ত দিয়েছে, সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তেল আবিবের যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
মানবিক বিপর্যয় ও বর্তমান পরিস্থিতি
সামরিক সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে,
• নির্বিচার গোলার আঘাতে এখন পর্যন্ত বহু মানুষ হতাহত হয়েছে।
• ৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আলেপ্পোর সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর জানায়, সংঘর্ষপ্রবণ অঞ্চলগুলো থেকে ইতোমধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
• উদ্বাস্তু হওয়া এই বিশাল জনগোষ্ঠী পায়ে হেঁটে তুর্কি সীমান্তবর্তী আফরিন অঞ্চলের দিকে রওনা দিয়েছে।
• তীব্র লড়াইয়ের কারণে অনেক পরিবার ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আটকা পড়েছে।
• কিছু বাসিন্দাকে সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্সের বিশেষ বাসে করে আলেপ্পোর নিরাপদ এলাকায় অবস্থিত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
• পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা শেইখ মাকসুদ ও আশরাফিয়ে এলাকা থেকে জাহরাহ স্ট্রিট করিডোর হয়ে বেসামরিকদের নিরাপদ বহির্গমন নিশ্চিত করেছে।
• নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলেপ্পোর স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি দপ্তরগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
• আলেপ্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সমস্ত ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
• আলেপ্পো–তুরস্ক আন্তর্জাতিক সড়ক বন্ধ আছে। লেরমোন শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো কার্যক্রম স্থগিত এবং নগরীর প্রধান সড়কপথগুলো অচল হয়ে পড়েছে।
দুই পক্ষের সামরিক শক্তি
মাঠপর্যায়ে সিরীয় সেনাবাহিনীর পাল্লা অনেক বেশি ভারী। তারা আলেপ্পোতে সাঁজোয়া যান, ভারী ট্যাংক, গোলন্দাজ বাহিনী এবং অ্যাটাক ড্রোন মোতায়েন করেছে। সিরীয় সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই আলেপ্পোর অভিমুখে সাঁজোয়া ইউনিট এবং ভারী সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। শেখ মাকসুদ এবং আশরাফিয়া এলাকায় এসডিএফ-এর অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে তারা নিয়মিত ট্যাংক, কামান এবং রকেট লঞ্চার ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, আলেপ্পোর ভেতরে থাকা এসডিএফ সদস্যরা মূলত হালকা অস্ত্রে সজ্জিত। তাদের অস্ত্রভাণ্ডার মূলত রাইফেল এবং হালকা মেশিনগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তাদের কাছে কোনো সাঁজোয়া যান বা ভারী কামানের মতো সরঞ্জাম নেই।
কুর্দি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছে, আলেপ্পোর ভেতরে এসডিএফ-এর যে বাহিনী রয়েছে, তারা মূলত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষী (আসায়িশ) এবং কয়েকশ যোদ্ধা, যাদের কাছে কেবল ব্যক্তিগত হালকা অস্ত্র রয়েছে। তবে তারা এই শহুরে ভৌগোলিক পরিবেশ এবং আগে থেকে তৈরি করা প্রতিরক্ষামূলক বাঙ্কারগুলোকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি
নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সামরিক অভিযান শুরুর আগে সাধারণ নাগরিকদের সেই স্থানগুলো ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
তা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সূত্রগুলো মনে করছে, জনবল ও ক্ষমতার কারণে সামরিক পাল্লা স্পষ্টভাবেই সিরীয় সেনাবাহিনীর দিকে ঝুঁকে আছে। সরকারি বাহিনী এই কুর্দি ছিটমহলটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার মতো পর্যাপ্ত সেনা মোতায়েন করেছে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই আবাসিক এলাকাগুলো শত্রুমুক্ত করতে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চূড়ান্ত অভিযান শুরুর আগে সেনাবাহিনী মূলত অবশিষ্ট বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সিরিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে শহরে একটি বড় ধরনের চূড়ান্ত সামরিক অভিযান সময়ের ব্যাপার মাত্র।
একইভাবে তাঁদের ধারণা, এসডিএফের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া এবং রসদ সরবরাহের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দামেস্কের সামনে এখন তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতিতেই দ্রুত বিজয় অর্জনের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ঝুলে থাকা ‘একীভূতকরণ চুক্তি’ বাস্তবায়ন না হলে সংকটের মূল শিকড় অক্ষতই থাকবে। একদিকে দামেস্ক পুরো ভূখণ্ডে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে আনতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে; অন্যদিকে এসডিএফ এখনো তাদের ‘স্বায়ত্তশাসন’ ছাড়তে রাজি নয়।
সূত্র: এন পোস্ট











